আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
পাকিস্তানের সিন্ধ প্রদেশ কেন ভারতের অংশ হলো না?
- Author, ওয়াকার মুস্তাফা
- Role, সাংবাদিক ও গবেষক, পাকিস্তান
ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং সম্প্রতি মন্তব্য করেছেন যে পাকিস্তানের সিন্ধ প্রদেশ "সাংস্কৃতিকভাবে সর্বদাই ভারতের অংশ"। তার এই মন্তব্য "অবাস্তব, উসকানিমূলক এবং বিপজ্জনক পর্যায়ে ইতিহাস বিকৃত করার প্রচেষ্টা" বলে বিবৃতি দিয়েছে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
রাজনাথ সিং ভারতের প্রাক্তন উপ-প্রধানমন্ত্রী লালকৃষ্ণ আদভানির কথা উল্লেখ করে বলেছিলেন, মি. আদভানি তার একটি বইতে লিখেছেন যে সিন্ধি হিন্দুরা, বিশেষ করে তার প্রজন্মের মানুষরা সিন্ধ প্রদেশকে ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন করা এখন পর্যন্ত মেনে নিতে পারেননি।
মি. সিং আরও বলেন, "এখন যদিও সিন্ধের ভূমি ভারতের অংশ নয়, কিন্তু সাংস্কৃতিকভাবে সিন্ধ সবসময়েই ভারতের অংশ হয়েই থাকবে এবং জমির প্রসঙ্গ যদি ওঠে, তাহলে সীমানা তো পরিবর্তন হতেই পারে। কে বলতে পারে, সিন্ধ কাল আবারও ভারতে ফিরে আসতে পারে।"
ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের এই নতুন তিক্ততার প্রসঙ্গে ইতিহাসটি দেখে নেওয়া যাক, আর ঐতিহাসিক এবং রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরাই বা সিন্ধ নিয়ে কী বলেন, তাও জেনে নেওয়া যাক।
এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা অনুযায়ী, সিন্ধু নদের ব-দ্বীপ অঞ্চলে অবস্থিত সিন্ধ প্রদেশের বর্তমান অঞ্চলটি প্রাচীন সিন্ধু সভ্যতার কেন্দ্র ছিল।
এই সভ্যতারই অন্তর্ভুক্ত ছিল মহেঞ্জোদারো এবং কোট ডিজির মতো অঞ্চলগুলো। এই প্রাচীন সভ্যতার সময়কাল ছিল আনুমানিক ২৩০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ থেকে ১৭৫০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত।
মহেঞ্জোদারো থেকে বোম্বে প্রেসিডেন্সি পর্যন্ত
এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা থেকে জানা যায়, বিশ্বের তিনটি প্রাচীন সভ্যতা - মেসোপটেমিয়া, মিশর এবং সিন্ধু - এগুলোর মধ্যে সিন্ধু সভ্যতা আয়তনের দিক থেকে সব থেকে বিস্তৃত ছিল। এই সভ্যতা প্রথমে ১৯২১ সালে পাঞ্জাবের হরপ্পায় এবং তারপর ১৯২২ সালে মহেঞ্জোদারোয় (বর্তমান সিন্ধ প্রদেশে সিন্ধু নদের তীরে) আবিষ্কৃত হয়েছিল।
সোহেল জাহির লারি তার 'এ হিস্ট্রি অফ সিন্ধ' বইতে লিখেছেন যে বর্তমান পাকিস্তানের প্রায় পুরো ভূখণ্ডজুড়ে এই সভ্যতা বিস্তৃত ছিল। এই সভ্যতা দক্ষিণ ও পূর্বে বর্তমানের ভারতীয় রাজ্য গুজরাট, রাজস্থান এবং হরিয়ানা আর পশ্চিমে আফগানিস্তান পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।
তিনি লিখেছেন, "গ্রীষ্মকালে সিন্ধু নদের জলস্তর শীতকালের তুলনায় ১৬ গুণ বেশি হতে পারে এবং এই পরিবর্তনই পরিকল্পিত সেচ ব্যবস্থা ও কৃষিকাজের সুযোগ কমিয়ে দেয়। সেচ, কৃষিকাজ এবং কৃষকদের বসতি স্থাপনের জন্য উপযুক্ত এলাকাগুলো আসলে একেকটি ছোট নদী ছিল। সেকারণেই সিন্ধু সভ্যতার বেশিরভাগ বসতিই সিন্ধু নদের মূল স্রোত থেকে দূরে অবস্থিত ছিল"।
"এই ব্যবস্থা প্রায় খ্রিষ্টপূর্ব ২৫০০ পর্যন্তও অব্যাহত ছিল। সেই সময়েই হরপ্পাবাসীরা একটি বৈপ্লবিক সিদ্ধান্ত নেয় যে হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারোকে পূর্বপরিকল্পিত নগর হিসেবে গড়ে তোলা হবে, যাতে সিন্ধু নদকে যাতায়াত এবং বাণিজ্যের কাজে ব্যবহার করা যায়"।
"এই সিদ্ধান্তের ফলে সিন্ধু নদের উভয় তীরে অবস্থিত হরপ্পার বিভিন্ন জনবসতি এক নদী পরিবহন ব্যবস্থার মাধ্যমে যুক্ত হয়েছিল। বৃষ্টি আর বন্যায় সমুদ্রের মতো আকার নেয় যে অঞ্চলটি, সেখানে এই নদী পরিবহন ব্যবস্থাই সব থেকে কার্যকর হয়ে উঠত," লিখেছেন মি. লারি।
End of বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন
তার বিশ্লেষণ, "এর ফলে হরপ্পা সভ্যতা উপকূল রেখা বরাবর প্রসারিত হতে পেরেছিল - একদিকে পারস্য উপসাগর, অন্যদিকে দাক্ষিণাত্য পর্যন্ত।"
এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা অনুসারে, তারপর থেকে এক হাজার বছরেরও বেশি সময়ের কোনো ঐতিহাসিক তথ্য পাওয়া যায় না।
"এরপরে খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীর শেষের দিকে দারিয়াস প্রথম সিন্ধ জয় করার পরে অঞ্চলটি ইরানের আখামেনিড সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়ে বলে উল্লেখ পাওয়া যায়," লেখা হয়েছে এনসাইক্লোপিডিয়ায়।
সেখানে আরও লেখা হয়েছে, "প্রায় দুই শতাব্দী পরে আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট ৩২৬ থেকে ৩২৫ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের মধ্যে এই অঞ্চল জয় করেন। তার মৃত্যুর পরে প্রথমে সেলিউকাস প্রথম নিকেটর, চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য (প্রায় ৩০৫ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ) এবং আরও পরে, খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় থেকে দ্বিতীয় শতাব্দী পর্যন্ত ইন্দো-গ্রিক এবং পার্থিয় শাসকরা এবং খ্রিষ্টপূর্ব প্রথম থেকে দ্বিতীয় খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত শক ও কুষাণ শাসকরা এই অঞ্চলে শাসন করেছিলেন"।
"খ্রিষ্টীয় প্রথম শতাব্দীতে কুষাণ আমলে সিন্ধ অঞ্চলের বেশিরভাগ জনগোষ্ঠী বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করেন। খ্রিষ্টীয় তৃতীয় থেকে সপ্তম শতাব্দী পর্যন্ত এই অঞ্চলটি ইরানি সাসানীয় সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল," লেখা হয়েছে এনসাইক্লোপিডিয়ায়।
এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা বলছে, ৭১১ খ্রিষ্টাব্দে সিন্ধ অঞ্চলে আরবদের আগমনের মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ায় ইসলামের ভিত্তি স্থাপিত হয়। খ্রিষ্টীয় ৭১২ থেকে প্রায় ৯০০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত সিন্ধ অঞ্চল উমাইয়া ও আব্বাসীয় সুলতানদের 'আল-সিন্দ' প্রদেশের অংশ ছিল, সেই সময়ে প্রদেশের রাজধানী ছিল আল-মানসুরা। এটি বর্তমানের পাকিস্তানের শহর হায়দ্রাবাদ থেকে ৭২ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত ছিল।
খিলাফতের কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা দুর্বল হয়ে যাওয়ার পরে দশম থেকে ষোড়শ শতাব্দীর মধ্যে আল-সিন্দের আরব গভর্নররা এই অঞ্চলে নিজেরাই রাজবংশীয় শাসন প্রতিষ্ঠা করে।
"ষোড়শ এবং সপ্তদশ শতাব্দীতে (১৫৯১-১৭০০) সিন্ধ মুঘল শাসনের অধীনে ছিল। পরবর্তীকালে সেখানে বেশ কয়েকটি স্বাধীন সিন্ধি রাজপরিবার শাসন করে। শেষ সিন্ধি রাজ্যটি ১৮৪৩ সালে ব্রিটিশ বাহিনীর হাতে পরাজিত হয়েছিল। সেই সময়েই সিন্ধ প্রদেশের বেশিরভাগ অংশ বোম্বে প্রেসিডেন্সির অন্তর্ভুক্ত করা হয়", জানিয়েছে এনসাইক্লোপিডিয়া।
সিন্ধ কেন পাকিস্তানের অংশ হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল?
পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলি জিন্নাহ তার ১৪ দফায় সিন্ধকে বোম্বে থেকে পৃথক করার দাবি জানিয়েছিলেন।
মুসলমানদের দাবি মেনে নিয়ে ব্রিটিশ সরকার ১৯৩৬ সালে সিন্ধকে বোম্বে থেকে পৃথক করে আলাদা প্রদেশের মর্যাদা দেয়। মুসলমান প্রধান প্রদেশ হওয়ায় ১৯৪৭ সালে সিন্ধ পাকিস্তানের অংশ হয়ে যায়।
গবেষক ও লেখক ড. মোহাম্মদ আলি শেখ একটি প্রবন্ধে লিখেছেন যে বৌদ্ধ রাজা দ্বিতীয় সিহাসির ২৮ বছরের রাজত্বকালে তার অনুগত ব্রাহ্মণ মন্ত্রী চাচের ওপরেই বেশিরভাগ বিষয় দেখাশোনার ভার ছিল। চীনা পর্যটক হিউয়েন সাং ৬৪২ খ্রিষ্টাব্দে যখন সিন্ধ সফর করেন। তিনি লিখেছিলেন যে সেখানে 'অগণিত স্তূপ' এবং 'শত শত বিহার' ছিল - যেগুলিতে প্রায় 'দশ হাজার ভিক্ষু' বসবাস করতেন।
ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ জন কেয়ে তার 'ইন্ডিয়া: আ হিস্ট্রি' বইতে লিখেছেন যে সিন্ধে সব থেকে শক্তিশালী ধর্ম ছিল বৌদ্ধ, তবে হিন্দুধর্মও উপস্থিত ছিল এবং এখানে প্রায় ৩০টি 'হিন্দু মন্দির' ছিল।
সপ্তম শতাব্দীতে শুধু উত্তর অংশ ছাড়া প্রায় সমগ্র সিন্ধু উপত্যকাই সিন্ধ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। একসময়ে সিন্ধ সাম্রাজ্যের মন্ত্রী চাচ নিজে সিংহাসনে আরোহণ করে বিজয় অভিযান শুরু করার পরে তার রাজত্বের সীমানা চিহ্নিত করার এক অনন্য পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন – একেকটি অঞ্চল চিহ্নিত করার জন্য একেক ধরনের গাছ লাগানো হত।
এই প্রসঙ্গে ইতিহাসবিদ কেয়ে লিখেছেন যে উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত প্রাচীন গান্ধার অঞ্চলটি অন্তর্ভুক্ত হলেই চাচের সাম্রাজ্য বর্তমান পাকিস্তানের এক আদি রূপ পেয়ে যেত।
ইতিহাসবিদ ড. তাহির কামরানের মতে, বর্তমানের পাকিস্তানই প্রাচীন সিন্ধু সভ্যতার কেন্দ্রস্থল ছিল।
তিনি বিবিসিকে বলেন, "এরমধ্যে পাঞ্জাব, বালুচিস্তান যেমন ছিল, তেমনই খাইবার পাখতুনখোয়া আর তক্ষশিলাও ছিল। এই সম্পূর্ণ অঞ্চলটিই সিন্ধু ও মহেঞ্জোদারোর কেন্দ্রস্থল। এখান থেকেই সিন্ধু সভ্যতার শুরু, সেখান থেকেই নানা দিকে প্রসারিত হয়ে গুজরাট পর্যন্ত পৌঁছিয়েছিল"।
রাজনাথ সিংয়ের মন্তব্যের প্রেক্ষিতে মি. কামরানের বিশ্লেষণ হলো, "সাংস্কৃতিকভাবে এই অঞ্চলটি একত্রিত হওয়াই স্বাভাবিক। সিন্ধ পৃথক হয়ে ভারতে চলে গেলে সেটাই অস্বাভাবিক হত। ঐতিহাসিকভাবে এবং সভ্যতার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে এই কথার কোন অর্থ হয় না"।
তিনি বলছিলেন, "সিন্ধ বলতে কোনো একটি নির্দিষ্ট অঞ্চল বা প্রদেশ বোঝায় না, বরং সমগ্র অঞ্চলকে বোঝায় যা ছিল সিন্ধু সভ্যতার কেন্দ্র। একই অক্ষে পাঞ্জাব, বালুচিস্তান এবং সিন্ধের অবস্থান একই অক্ষরেখায়। বর্তমানের পাকিস্তানে, আসলে এই সামগ্রিক অঞ্চলেরই সম্মিলিত সংস্কৃতি। এই অঞ্চলের সাংস্কৃতিক ধারা পরবর্তীতে অন্যান্য অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়েছে"।
তার অভিমত, ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং "একটা কথার কথা বলেছেন। এর পেছনে না আছে কোনও জ্ঞান, না আছে গভীরতা"।
সিন্ধ প্রদেশের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. আমির আলি চান্ডিয়ো বলছিলেন যে ভারতীয় প্রতিরক্ষামন্ত্রীর এই বক্তব্য 'স্পষ্টতই সাম্রাজ্যবাদী মানসিকতার প্রতিফলন' এবং এর মধ্যে 'দখলদারির গন্ধ' পাওয়া যাচ্ছে।
বিবিসির সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন যে ইতিহাসের দিকে তাকালেই বোঝা যায় যে সিন্ধ 'কখনই হিন্দুস্তান বা ভারতের অংশ ছিল না'।
"মুঘল সাম্রাজ্য অল্প সময়ের জন্য সিন্ধ দখল করলেও সিন্ধি জনগণ তার তীব্র বিরোধিতা করেছিল। শাহ ইনায়েত শহিদকে ইতিহাসের প্রথম সমাজতান্ত্রিক সুফি সন্ত বলা হয়। তিনি জায়গিরদারি প্রথা আর সেই ব্যবস্থাটির পৃষ্ঠপোষক মুঘল আধিপত্যের বিরুদ্ধে দৃঢ়ভাবে লড়াই করেছিলেন," বলছিলেন মি. চান্ডিয়ো।
তার মতে, ১৮৪৩ সালে "যখন ব্রিটিশ সাম্রাজ্য এবং ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সিন্ধ দখল করে, তখনও সিন্ধ ছিল একটি স্বাধীন রাজ্য এবং একটি পৃথক অঞ্চল। তা ভারতের অংশ ছিল না"।
"জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে ১৮৪৭ সালে ষড়যন্ত্র করে সিন্ধকে জোর করেই বোম্বে প্রেসিডেন্সির অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। সিন্ধের জনগণ সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দীর্ঘ লড়াই চালিয়েছিল, যার পরে শেষমেষ সিন্ধের পৃথক পরিচয় পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়েছিল"।
"পরবর্তীকালেও সিন্ধ যে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সংসদীয় ও গণতান্ত্রিক লড়াই চালিয়েছিল, তা নয়, বরং সুফি সম্প্রদায় ভুক্ত 'হুর' জনগোষ্ঠীর সশস্ত্র আন্দোলনও সিন্ধের প্রতিরোধী ইতিহাসের এক উজ্জ্বল অধ্যায় হয়ে রয়েছে। এমনকি সিন্ধে সামরিক আইন জারি করতেও বাধ্য হয়েছিল ব্রিটিশরা, তবুও সিন্ধ কখনই দাসত্ব স্বীকার করেনি," বলছিলেন তিনি।
মি. চান্ডিয়ো বলছিলেন যে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতার সঙ্গে সিন্ধের ঘনিষ্ঠতা ছিল এবং সিন্ধের প্রাদেশিক আইনসভাই প্রথম পাকিস্তান গঠনের পক্ষ নিয়ে লাহোর প্রস্তাব পাশ করেছিল।
তারও আগে, ১৯৩৮ সালে, সিন্ধ প্রাদেশিক আইনসভা ঘোষণা করেছিল- "আমরা ভারতের সঙ্গে থাকব না"।
'সিন্ধ কখনোই ভারতের শ্রেষ্ঠত্ব মেনে নেয়নি'
চুগতাই মির্জা ইজাজউদ্দিনের গবেষণাতেও দেখা যায়, একটি স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্র গঠনের আহ্বান জানিয়ে প্রথম প্রস্তাবটি সিন্ধ প্রদেশই পাশ করেছিল। সেই প্রস্তাবটি উত্থাপন করেছিলেন শেখ আব্দুল মজিদ সিন্ধি।
"পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বিশ্বাস করতেন যে ভারত কখনই একক রাষ্ট্র ছিল না এবং মুসলিম হিন্দুস্তান চিরকালই স্বতন্ত্র থেকে গেছে। এই কথাটি সেসময়ে মুসলিম লীগের ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য এবং একজন বিশিষ্ট সিন্ধি নেতা জিএম সৈয়দের বক্তব্যেও উঠে এসেছিল।
মি. ইজাজউদ্দিন বলছেন, "জিএম সৈয়দ বলেছিলেন যে মহেঞ্জোদারোতে আবিষ্কৃত সিন্ধু সভ্যতা প্রমাণ করে যে পাকিস্তানের অঞ্চলগুলো কখনই ভারতের অংশ ছিল না। সিন্ধ, পাঞ্জাব, আফগানিস্তান দূরবর্তী পূর্বাঞ্চলের নয়, বরং সেগুলো মধ্যপ্রাচ্যের অংশ ছিল"।
"দক্ষিণ এশিয়ার সব প্রদেশের মধ্যে শুধু সিন্ধ প্রাদেশিক আইনসভাই ১৯৪৩ সালের তেসরা মার্চ জিএম সৈয়দের আনা প্রস্তাবের মাধ্যমে 'লাহোর প্রস্তাব' অনুযায়ী পাকিস্তান গঠনের দাবি পাশ করে"।
"পরবর্তীতে ১৯৪৭ সালের ২৬শে জুন সিন্ধ আইনসভার একটি বিশেষ অধিবেশনে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে সেটি নতুন পাকিস্তান গণপরিষদের অংশ হবে। এইভাবে সিন্ধ পাকিস্তানে যোগদানকারী প্রথম প্রদেশ হয়ে ওঠে," বলছিলেন মি. ইজাজউদ্দিন।
তার মতে, সিন্ধ প্রাদেশিক আইনসভার যে-সব সদস্য পাকিস্তান সৃষ্টির পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন, তারাই হলেন পাকিস্তানি রাষ্ট্রের স্রষ্টা।
এদের মধ্যে ছিলেন গোলাম হোসেন হিদায়াতুল্লাহ, মুহাম্মদ আইয়ুব খোরো, মীর বান্দা আলি খান তালপুর, পিরজাদা আবদুসাত্তার, মোহাম্মদ হাশিম গজদার, পীর ইলাহি বখশ, মিরান মোহাম্মদ শাহ, মাহমুদ হারুন প্রমুখ। স্পিকার আগা বদরুদ্দিন অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেছিলেন।
মি. চান্ডিয়ো বলছিলেন, আজও, "সিন্ধের জনগণ যা বলে, তা হলো আমরা পাকিস্তানের অংশ, শুধু ১৯৪০ সালের প্রস্তাব অনুসারে আমাদের সাংবিধানিক এবং রাজনৈতিক অধিকার দেওয়া হোক"।
"এভাবেই ব্রিটিশদের দখলে থাকলেও একটি স্বাধীন প্রদেশ হয়ে থেকে যাওয়া সিন্ধ স্বেচ্ছায় পাকিস্তানের অংশ হয়ে যায়। পাকিস্তান আন্দোলনে বাংলার পাশাপাশি সিন্ধ প্রদেশের ভূমিকাও ঐতিহাসিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল," বলছিলেন মি. চান্ডিয়ো।
তার কথায়, "সিন্ধের মানুষ কখনোই ভারতের আধিপত্য মেনে নেয়নি। ভারতের সাম্রাজ্যবাদী আকাঙ্ক্ষা আজও তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়, আর কখনো হবেও না। ভারতের অংশ হওয়ার বা তাদের কোনো আধিপত্য মেনে নেওয়ার কোনো প্রশ্নই ওঠে না"।
বুদ্ধিজীবী ওয়াজাহাত মাসুদ বিবিসিকে বলছিলেন, "প্রায় পৌনে এক শতাব্দী আগে ভারত বিভক্ত হয়ে দুটি জাতি-রাষ্ট্র গঠিত হয়েছিল। সেই সময়ের নেতৃত্ব এই সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছিলেন। গত সাত দশক ধরে, উভয় দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি এবং সংস্কৃতি অনন্য হয়ে উঠেছে। এখন রাজনাথ সিংয়ের মতো বক্তব্যে অপ্রয়োজনীয় তিক্ততা ছাড়া আর কিছুই হবে না"।