স্কুল যাওয়ার পথে বাঘের দাপট; শিশুদের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিলেন মহারাষ্ট্রের চার নারী

মহারাষ্ট্রের সীতারামপেঠ গ্রামের এই চার নারী পড়ুয়াদের সুরক্ষার ভার নিজদের কাঁধে তুলে নিয়েছেন।

ছবির উৎস, BHAGYASHRI RAUT

ছবির ক্যাপশান, মহারাষ্ট্রের সীতারামপেঠ গ্রামের এই চারজন নারী পড়ুয়াদের সুরক্ষার ভার নিজদের কাঁধে তুলে নিয়েছেন।
    • Author, ভাগ্যশ্রী রাউত
    • Role, বিবিসি মারাঠি

ভারতের মহারাষ্ট্রের এই গ্রামের চারপাশে ঘন জঙ্গল। বাসিন্দাদের সকলেই বাঘের ভয় সঙ্গে নিয়ে বাস করেন। কখন, কোথা থেকে বাঘ চলে আসবে, সেটা অনুমান করা মুশকিল।

বন্যপ্রাণীদের হাত থেকে রক্ষা পেতে গ্রামের চারপাশে তারের বেড়াও বসানো হয়েছে। পশুরা অবাধে জঙ্গলে ঘুরে বেড়ায়, কিন্তু এই গ্রামের বাসিন্দারা 'খাঁচায়' বন্দি।

মহারাষ্ট্রের চন্দ্রপুর জেলায় অবস্থিত এই গ্রামের নাম সীতারামপেঠ। মোহারলি বনাঞ্চলে অবস্থিত গ্রামটা তাডোবা ব্যাঘ্র সংরক্ষণ অঞ্চলের অন্তর্গত।

গ্রাম থেকে নিকটবর্তী বাসস্ট্যান্ড যেতে প্রায় ৪০০ মিটার কাঁচা রাস্তা রয়েছে। রাস্তার একদিকে ঘন জঙ্গল, অন্যদিকে খামার। রাস্তায় একটাও আলো নেই। গ্রামবাসী এই রাস্তায় প্রায়শই বাঘের দেখা পান।

কখনো গবাদি পশুকে আক্রমণ করে, কখনো জঙ্গল থেকে গ্রামের দিকে আসতে দেখা যায় এই বাঘেদের। তাই এই রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করার বিষয়ে আতঙ্কে থাকেন তারা। বনবিভাগ জানিয়েছে, বেশ কয়েকবার গ্রামের আশপাশে ১২- ১৩টা বাঘও দেখা গেছে।

গ্রামের বাচ্চারাও এই রাস্তা দিয়েই স্কুলে যায়, সেখানেও ঝুঁকি রয়েছে। তবে গ্রামের শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার জন্য এগিয়ে এসেছেন সীতারামপেঠেরই চারজন নারী। শিশুরা যাতে পঠনপাঠনের জন্য নিরাপদে স্কুলে যেতে এবং ফিরতে পারে তার দায়িত্ব তুলে নিয়েছেন।

আরও পড়ুন
রাস্তার মাঝখান দিয়ে হাঁটছে গ্রামের কয়েকজন শিক্ষার্থী, তাদের ঘিরে আছেন চারজন নারী

ছবির উৎস, BHAGYASHRI RAUT

ছবির ক্যাপশান, বাসস্ট্যান্ডে যাওয়ার পথে এইভাবে রাস্তার মাঝখান দিয়ে হাঁটে গ্রামের শিক্ষার্থীরা, আর তাদের ঘিরে থাকেন ওই চারজন নারী

রাতে ঘন অন্ধকারে মোড়া রাস্তায় যেখানে যে কোনো সময়ে অতর্কিতে বাঘ হামলা করতে পারে, সেখানে মশাল এবং লাঠি হাতে গ্রামের বাচ্চাদের রক্ষা করেন এই চার নারী। বাঘের আতঙ্কে ঘেরা গ্রামে পড়ুয়াদের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়েছেন কিরণ গেডাম, বেণু রান্দায়ে, রীনা নাট এবং সীমা মাদাভি।

গ্রামের সকলেই তাদের সাহসিকতার সঙ্গে পরিচিত। তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেই বিবিসির টিম পৌঁছেছিল তাডোবার কাছে অবস্থিত সীতারামপেঠ গ্রামে।

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

এই গ্রামে প্রায় ২০০ জন মানুষের বাস। তাদের মধ্যে শিক্ষার্থী ১১জন। গ্রাম থেকে প্রায় সাত কিলোমিটার দূরে অবস্থিত মুধোলিতে অবস্থিত স্কুলে যায় তারা।

স্কুলে যাওয়ার জন্য তাদের নিকটবর্তী বাসস্ট্যান্ড থেকে বাস ধরতে হয়। এই বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছতে হলে পেরিয়ে যেতে হয় সেই ৪০০ মিটার কাঁচা রাস্তা যা বন্যপ্রাণীদের আনাগোনার কারণে বেশ বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে।

এই রাস্তায় যে কোনো সময় বাঘের মুখোমুখি হওয়াটা নতুন কিছু নয়। এই গ্রামের বাসিন্দা সুশান্ত নাট দশম শ্রেণির ছাত্র।

তার কথায়, "গত মাসে স্কুলে যাওয়ার সময় আমরা একটা বাঘ দেখতে পেয়েছিলাম। একটা গরুকে তাড়া করেছিল বাঘটা।"

"ওকে দেখতে পেয়েই আমরা সবাই গ্রামের দিকে ছুটে পালিয়ে গিয়েছিলাম। আমাদের চিৎকার শুনে গ্রামবাসীরা জড়ো হয়, জানতে চায় কী হয়েছে।"

"আমরা গ্রামবাসীদের জানাই একটা বাঘ এসেছে। এখানে বাঘকে কখনো রাস্তায় হেঁটে যেতে দেখা যায়, কখনো বা গরুকে হামলা করতে। আমরা তো ছোট বাচ্চা, বাঘ আমাদেরও আক্রমণ করতে পারে। এইভাবে আমরা কী করে স্কুলে যাব? গ্রামবাসীদের আমরা সে কথা জানাই।"

এর আগে সুশান্ত নাট এবং গ্রামের অন্যান্য ছেলেমেয়েরা ওই কাঁচা রাস্তা ছুটে পার হতো। কিন্তু সেখানেও বিপদ রয়েছে বৈকি।

শিক্ষার্থীদের কথা ভেবেই এগিয়ে এসেছেন সীতারামপেঠ গ্রামের চারজন নারী।

সন্ধ্যা বেলায় গ্রামের বাচ্চাদের স্কুল থেকে বাড়ি যাওয়ার দৃশ্য।

ছবির উৎস, BHAGYASHRI RAUT

ছবির ক্যাপশান, গ্রামের নিকটবর্তী বাসস্ট্যান্ডে যেতে যে রাস্তা রয়েছে, সেখানে প্রায়শই বাঘের দেখা মেলে।

রাতের অন্ধকারে শিশুদের সুরক্ষা

মুধোলি যাওয়ার বাস সকালে ঠিক পৌনে দশটা নাগাদ এসে পৌঁছায়। সেই বাস ধরার জন্য শিশুরা গ্রামের এক জায়গায় জড়ো হয়। তারপর এই চারজন নারী পাহারা দিয়ে দিয়ে তাদের বাসস্ট্যান্ডে নিয়ে যান।

মাঝখানে এই শিক্ষার্থীরা থাকে, আর চারজন তাদের ঘিরে হাঁটেন।

তবে শুধু ওই কাঁচা রাস্তাতেই নয়, বাসস্ট্যান্ডেও প্রায়শই বাঘ দেখা যায়। তাই বাস না আসা পর্যন্ত, বাচ্চাদের নিরাপত্তার জন্য সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকেন তারা।

বাসস্ট্যান্ডের ভেতরে যখন বাসের অপেক্ষায় থাকে গ্রামের শিশুরা, তখনও তাদের ঘিরে চারজন নারী এমনভাবে দাঁড়িয়ে থাকেন যাতে পেছন থেকে বাঘ এলে চোখে পড়ে। প্রতিদিন সন্ধ্যা ছয়টা বেজে ৪৫ মিনিট নাগাদ বাসে চেপে বাড়ি ফিরে আসে তারা। ততক্ষণে অন্ধকার নেমে আসে।

গ্রাম থেকে বাসস্ট্যান্ডে যাওয়ার রাস্তায় আলো নেই। বাঘ বা অন্য বন্যপ্রাণী যেকোনো সময় আসতে পারে। তাই কিরণ গেডাম, বেণু রান্দায়ে, রীনা নাট এবং সীমা মাদাভি হাতে লাঠি এবং টর্চ সঙ্গে নিয়ে বাসস্ট্যান্ডে যান।

বাস এসে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে তারা বাচ্চাদের ঘিরে নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরি করেন এবং নিরাপদে বাড়ি পৌঁছে দেন। রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় তারা টর্চের আলো ঘুরিয়ে চারদিকে নজর রাখেন।

তারা লাঠি দিয়ে শব্দ করতে থাকেন, নিজেদের মধ্যে জোরে জোরে কথা বলেন যাতে বাঘ বা অন্য প্রাণী আশাপাশে কোথাও থাকলেও পালিয়ে যায়।

কিরণ গেডামের কথায়, "রাতের অন্ধকারে বাসস্ট্যান্ড থেকে গ্রামে যেতে এই ১৫ মিনিটের হাঁটা খুব বিপজ্জনক। ভয় হয় থেকে বাঘ বা সাপ এসে আমাদের ক্ষতি করতে পারে।"

তিনি বলেন, "এই বাচ্চাদের নিতে যাওয়ার যাওয়ার সময় আমরা প্রায়শই বাঘ দেখতে পাই। কিন্তু সেকথা বাচ্চাদের বলি না। কারণ ওরা ইতোমধ্যে ভয় পেয়ে রয়েছে।"

"ফেরার পথে বাঘ দেখলেই আমরা চিৎকার করতে থাকি বা বাঘের মনোযোগ অন্যদিকে গেলে আমরা পালিয়ে যাই। গ্রামে না পৌঁছানো পর্যন্ত শঙ্কিত থাকি আমরা। পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে একটাই কথা মনে হয়, আজ অন্তত অক্ষত অবস্থায় বেঁচে ফিরেছি।"

কিন্তু গ্রামের শিশুদের সুরক্ষার জন্য কেন এই নারীদেরই উদ্যোগ নিতে হলো?

কিরণ গেডামের, "বাচ্চারা বাঘকে ঘুরে বেড়াতে দেখেছে। মাঝেমধ্যে গবাদি পশুকেও আক্রমণ করতে দেখেছে। ভীষণ ভয় পেয়ে গিয়েছিল ওরা।"

"বলছিল আমরা ভয়ে স্কুলে যেতে পারছি না। বন দফতরের কর্মীরা যখন গ্রামে এসেছিলেন, তখন আমরা তাদের অনুরোধ করেছিলাম, বাচ্চাদের বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছানোর জন্য একজন প্রহরীর ব্যবস্থা করে দিতে। কিন্তু তারা কিছুই করেননি। এরপরই আমরা নিজেরাই সন্তানদের রক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিই।"

অন্ধকারের মধ্যে লাঠি ও টর্চ হাতে দাঁড়িয়ে আছেন চারজন নারী

ছবির উৎস, BHAGYASHRI RAUT

ছবির ক্যাপশান, বনবিভাগের কাছে নিরাপত্তার আর্জি জানিয়েছেন বাসিন্দারা

বনবিভাগের কাছে আর্জি

গ্রামের ১১জন শিক্ষার্থীর মধ্যে এই চারজনের সন্তানও রয়েছে। তাদের সন্তানের পাশপাশি বাকি বাচ্চাদেরও নিরাপত্তার দায়িত্ব নিয়েছেন তারা।

তবে তাদের আশঙ্কা যে কোনো সময় তাদের উপরেও বাঘ হামলা করতে পারে। সেই কারণেই বনবিভাগের কাছে সাহায্য চেয়েছেন তারা।

কিরণ বলেন, "বাসস্ট্যান্ড থেকে আমাদের গ্রাম পর্যন্ত বিদ্যুত ব্যবস্থা থাকা উচিত। আমরা চারজন নারী বাচ্চাদের নিরাপত্তার জন্য কাজ করছি। কিন্তু এর দায় বনবিভাগের নেওয়া উচিত।"

"আমাদের জন্য নিরাপত্তারক্ষীর ব্যবস্থা করা উচিত। আমাদের বৈদ্যুতিক লাঠি দেওয়া উচিত যা থেকে শব্দ বেরোয় এবং বাঘ তাতে ভয় পায়। এতে আমাদের মনোবল যেমন বাড়বে তেমনই আরো ভালভাবে আমরা বাচ্চাদের নিরাপত্তা দিতে পারব।"

বিবিসি বাংলায় অন্যান্য খবর
অন্ধকারে লাঠি হাতে দাঁড়িয়ে আছেন তিন জন নারী

ছবির উৎস, BHAGYASHRI RAUT

ছবির ক্যাপশান, বনবিভাগের তরফে জানানো হয়েছে ওই চারজন নারীকে কিছু সুরক্ষা সামগ্রী দেওয়ার পাশাপাশি আর্থিক সাহায্য করা হবে

বনবিভাগ কী বলছে?

বিবিসি মারাঠির সঙ্গে কথোপকথনের সময়, মোহারলি রেঞ্জ ফরেস্ট অফিসার (আরএফও) সন্তোষ থিপে জানিয়েছেন, এই চার নারীর কর্মকাণ্ডের বিষয়টা তাডোবা ব্যাঘ্র সংরক্ষণ প্রকল্পের নজরে এসেছে। তাডোবার অন্তর্গত আরো ১০৫টা গ্রামে এই পদ্ধতি পরীক্ষা করে দেখা হবে।

তিনি বলেন, "মানুষ-বন্যপ্রাণীর সংঘাত রোধের ক্ষেত্রে এটা একটা বড় উদাহরণ। এই নারীরা উদ্যোগী হয়ে এগিয়ে এসেছেন যাতে আমরা গ্রামে এই জাতীয় সংঘাত বন্ধ করতে পারি। তারা স্কুলের বাচ্চাদেরও রক্ষা করেন।"

মি. থিপে, "সংবাদমাধ্যম মারফত এই খবর মানুষের কাছে এসে পৌঁছানোর পর, তাডোবা ব্যাঘ্র সংরক্ষণের অধীনে ১০৫টা গ্রামে এই একই পদ্ধতি প্রয়োগ করা হবে।"

তিনি বলেন, "যারা বাচ্চাদের নিরাপদে নিয়ে যাওয়া আসার কাজ করবেন, তাদের প্রত্যেককে এক হাজার টাকা দেওয়া হবে। পুরো টিমকে চার হাজার টাকা দেওয়া হবে। ওই নারীদের একটা করে ইলেকট্রিক স্টিক (বৈদ্যুতিক লাঠি), একটা জ্যাকেট এবং একটা করে টর্চও দেওয়া হবে।"