রাশিয়ার কাছ থেকে কিয়েভ পুরো ইউক্রেন জয় করে নিতে পারে: ট্রাম্প

ছবির উৎস, Reuters
- Author, রুথ কমারফোর্ড এবং অ্যান্থনি জুরচার
- Role, উত্তর আমেরিকা সংবাদদাতা
কিয়েভ "পুরো ইউক্রেনকে তার আসল রূপে আবার ফিরিয়ে আনতে পারবে", বলে মন্তব্য করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ট্রাম্পের এই মন্তব্যকে রাশিয়ার সাথে ইউক্রেনের যুদ্ধের বিষয়ে তার অবস্থানের একটি বড় পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সামাজিক মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া একটি পোস্টে ট্রাম্প বলেছেন, রাশিয়ার অর্থনীতির ওপর চাপ অব্যাহত থাকায়, ইউরোপ এবং নেটোর সহায়তায় ইউক্রেন সেই মূল সীমানা ফিরে পেতে পারে "যেখান থেকে এই যুদ্ধের শুরু হয়েছিল"।
মঙ্গলবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে নিজের ভাষণের পর ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সাথে আলোচনা শেষে এই মন্তব্য করেন ট্রাম্প।
এই যুদ্ধ অবসানের বিষয়ে বারবার তাগিদ দিয়ে আসছেন ট্রাম্প। যদিও অতীতে তিনি এটিও সতর্ক করে করেছেন যে, এই প্রক্রিয়ায় সম্ভবত ইউক্রেনকে কিছু ভূখণ্ড ছেড়ে দিতে হবে, যা জেলেনস্কি ধারাবাহিকভাবে প্রত্যাখ্যান করে আসছেন।
নিজের পোস্টে, ট্রাম্প আরও বলেছেন, ইউক্রেন "হয়তো এর চেয়েও বেশি কিছু করতে পারে", কিন্তু এই বক্তব্যের মাধ্যমে কী বলতে চেয়েছেন সেটি তিনি নির্দিষ্ট করেননি।
এমনকি তিনি ক্রাইমিয়ার কথাও উল্লেখ করেননি, ২০১৪ সালে যেখানে আক্রমণ করে নিজেদের সঙ্গে যুক্ত করে নিয়েছিল রাশিয়া। এরপর ২০২২ সালে ইউক্রেনে পূর্ণ মাত্রায় আক্রমণ শুরু করে।
ট্রাম্প বলছেন, "ইউক্রেন বা রাশিয়ার সামরিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি জানার এবং সম্পূর্ণরূপে বোঝার পর" তার অবস্থান বদলে গেছে।
রাশিয়াকে "কাগজের বাঘ" হিসেবে আখ্যা দিয়ে তিনি আরও বলেন, "পুতিন এবং রাশিয়া বড় অর্থনৈতিক সংকটে আছে এবং এখনই ইউক্রেনের পদক্ষেপ নেওয়ার সময়।"
ট্রাম্পের অবস্থানে "বড় পরিবর্তন" আসায় প্রশংসা করেছেন জেলেনস্কি। জাতিসংঘ ভবনে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেছেন, তিনি বুঝতে পেরেছেন যে "যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরে" মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনকে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে ইচ্ছুক।
এটি কেমন হবে এ বিষয়ে জানতে চাইলে জেলেনস্কি আরও বলেন, "আমি মিথ্যা বলতে চাই না, আমাদের কাছে সুনির্দিষ্ট কোনও বিবরণ নেই।" তবে আরও অস্ত্র, বিমান প্রতিরক্ষা এবং ড্রোন পাওয়ার সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন তিনি।
ফক্স নিউজে পরে কথা বলতে গিয়ে ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেন, ইউক্রেনের অবস্থান সম্পর্কে ট্রাম্পের ট্রুথ সোশ্যাল পোস্ট তাকে অবাক করেছে কিন্তু তিনি এটিকে "ইতিবাচক সংকেত" হিসেবে নিয়েছেন যে ট্রাম্প এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র "যুদ্ধের শেষ পর্যন্ত আমাদের সাথে থাকবে"।
"আমি মনে করি পুতিন যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছে এতবার মিথ্যা কথা বলছিলেন, তা আমাদের মধ্যে পার্থক্য তৈরি করেছে," ফক্সের উপস্থাপক ব্রেট বেয়ারকে বলেন জেলেনস্কি।

ছবির উৎস, Getty Images
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
মঙ্গলবার জাতিসংঘে নিজের ভাষণের পর ট্রাম্প আরও বলেন, সম্প্রতি রাশিয়ান যুদ্ধবিমান এবং ড্রোনের ধারাবাহিক অনুপ্রবেশের পর, নেটো দেশগুলোর উচিত তাদের আকাশসীমা লঙ্ঘনকারী রাশিয়ান বিমানগুলোকে গুলি করে ভূপাতিত করা।
গত সপ্তাহে, রাশিয়া পৃথক ঘটনায় তাদের আকাশসীমা লঙ্ঘন করার পর, এস্তোনিয়া এবং পোল্যান্ড অন্যান্য নেটো সদস্যদের সাথে পরামর্শের অনুরোধ করেছিল। নেটোর আরেক সদস্য রোমানিয়াও দাবি করেছে যে, রাশিয়ান ড্রোনগুলো তাদের আকাশসীমা লঙ্ঘন করেছে।
মঙ্গলবারের বৈঠকের পর, রাশিয়ার কর্মকাণ্ডের নিন্দা জানিয়ে একটি বিবৃতি জারি করেছে নেটো। যেখানে রাশিয়াকে সতর্ক করে বলা হয়েছে, আত্মরক্ষার জন্য "প্রয়োজনীয় সকল সামরিক এবং অ-সামরিক সরঞ্জাম" ব্যবহার করবে তারা।
"এই কর্মকাণ্ডের জন্য রাশিয়া সম্পূর্ণ দায়ী, যা উত্তেজনা সৃষ্টিকারী, ভুল হিসাব-নিকাশের ঝুঁকি তৈরি করে এবং জীবনকে বিপন্ন করে তোলে। এগুলো অবশ্যই বন্ধ করতে হবে," বিবৃতিতে বলা হয়েছে।
জোটটি আরও জানিয়েছে যে মস্কোর পদক্ষেপগুলো "ক্রমবর্ধমান দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণের একটি নমুনা।"
নেটোর মহাসচিব মার্ক রুট বলেছেন, " হ্যাঁ, আমরা একটি প্রতিরক্ষামূলক জোট, কিন্তু আমরা নির্বোধ নই, তাই আমরা দেখতে পাচ্ছি কী ঘটছে।"
জাতিসংঘে বক্তৃতা দিতে গিয়ে একই মন্তব্য করেন পোল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট ক্যারল নওরোকিও। তিনি বলেন যে, তার দেশ "তার ভূখণ্ড রক্ষা" এবং "পর্যাপ্ত প্রতিক্রিয়া" জানাতে প্রস্তুত।
"পোলিশ জনগণ, সেইসাথে মধ্য ও পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো, রাশিয়ান ড্রোনগুলিকে ভয় পাবে না," তিনি উল্লেখ করেন।
যদিও এস্তোনিয়ার আকাশসীমা লঙ্ঘনের কথা অস্বীকার করেছে রাশিয়া। তারা জোর দিয়ে বলেছে যে, পোলিশ অনুপ্রবেশ ইচ্ছাকৃত ছিল না এবং রোমানিয়ার ঘটনা সম্পর্কে তারা কোনও মন্তব্য করেনি।
রাশিয়ান বিমান ভূপাতিত করলে আমেরিকা তার নেটো মিত্রদের সমর্থন করবে কিনা জানতে চাইলে ট্রাম্প বলেন, এটি "পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে" এবং প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধির জন্য সামরিক জোটের প্রশংসা করেন।
"নেটো এগিয়ে এসেছে," উল্লেখ করে ২০৩৫ সালের মধ্যে নিজেদের দেশের অর্থনৈতিক উৎপাদনের পাঁচ শতাংশ প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধির জন্য, নেটো নেতাদের এক চুক্তির কথাও উল্লেখ করেন ট্রাম্প।

ছবির উৎস, Getty Images
এর কয়েক ঘণ্টা আগে জাতিসংঘে দেওয়া নিজের ভাষণে, ট্রাম্প রাশিয়ার জ্বালানি ক্রয় বন্ধ না করার জন্য কিছু নেটো সদস্যের সমালোচনা করে বলেছিলেন যে তারা "নিজেদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অর্থায়ন করছে"।
মঙ্গলবার ট্রুথ সোশ্যালে দেয়া ট্রাম্পের পোস্টটিতে, বেশিরভাগ সময় ইউক্রেনের পরিস্থিতি ভয়াবহ বলে উল্লেখ করেছেন ট্রাম্প, যদিও অতীতে তিনি এর বিপরীত ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন।
ফেব্রুয়ারিতে, ওভাল অফিসে আলোচনার সময় ডোনাল্ড ট্রাম্প জেলেনস্কিকে বলেছিলেন, একটি বৃহৎ এবং অধিক জনবহুল দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়লাভ করতে" কোনো কার্ড এখন তার (জেলেনস্কির) কাছে নেই।
অগাস্টে আলাস্কায় রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সাথে আলোচনার আগে ট্রাম্প বলেছিলেন যে, তিনি ইউক্রেনের জন্য কিছু অঞ্চল ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করবেন। তবে তিনি এটাও সতর্ক করেছিলেন যে "কিছু জমির বিনিময়, করতে" হবে।
ওই সময় এমন খবরও পাওয়া গিয়েছিল যে, তিনি পূর্ব ইউক্রেনিয় অঞ্চল দোনেৎস্ক ও লুহান্সকে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণের জন্য জেলেনস্কিকে চাপ দেওয়ার পরিকল্পনা করছেন। যার বিনিময়ে যুদ্ধের ময়দানে থাকা সেনা প্রত্যাহার করে নেবে রাশিয়া- আলাস্কায় পুতিন এই প্রস্তাবটি উত্থাপন করেছিলেন।
বারবারই রাশিয়ার ওপর আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প, কিন্তু ক্রেমলিন যখন তার সময়সীমা এবং নিষেধাজ্ঞার হুমকি উপেক্ষা করেছে, তখন তিনি কোনও পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছেন।
'অনুমান করা কঠিন' এটিই দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন প্রেসিডেন্টের পররাষ্ট্র নীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
আর সর্বশেষ এই পদক্ষেপটি সম্ভবত, আলাস্কার শীর্ষ সম্মেলনে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে আতিথ্য দেওয়ার পর, শান্তি আলোচনাকে আবারো প্রাসঙ্গিক করে তুলতে ট্রাম্পের একটি চেষ্টা।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কথাটি ট্রাম্পের পোস্টের শেষ অংশে এসেছে বলেই মনে হয়। যেখানে তিনি বলেছেন যে, আমেরিকা নেটোর কাছে অস্ত্র বিক্রি চালিয়ে যাবে এবং যেটি তারা ইউক্রেনে হস্তান্তর করতে পারবে।
যুদ্ধ চালিয়ে যেতে আপাতদৃষ্টিতে বাইডেন প্রশাসন যেভাবে প্রায় উন্মুক্ত প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল এটি তেমন না হলেও, এই বছর যুদ্ধ থামাতে ট্রাম্প যেভাবে আগ্রহ দেখিয়েছিলেন, তার চেয়ে বেশি কিছু।








