শাহরুখ খান ও তার ছেলের সঙ্গে আবার 'সংঘাতে' জড়ালেন যে সাবেক কর্মকর্তা

ছবির উৎস, ANI/AFP via Getty Images
ভারতীয় অভিনেতা শাহরুখ খান ও তার স্ত্রী গৌরী খানের ওটিটি প্ল্যাটফর্ম 'রেড চিলিজ এন্টারটেইনমেন্ট'-এর বিরুদ্ধে দিল্লি হাইকোর্টে মানহানির মামলা দায়ের করেছেন নারকোটিক্স কন্ট্রোল ব্যুরো-র সাবেক কর্মকর্তা সমীর ওয়াংখেড়ে।
শাহরুখ খানের ছেলে আরিয়ানকে ২০২১ সালে এক বিলাসবহুল ক্রুজের পার্টিতে মাদক বিরোধী অভিযান চালিয়ে গ্রেফতার করেছিলেন মি. ওয়াংখেড়েই। সেই সময় আরিয়ান খানের বয়স ছিল ২৩ বছর। তার বিরুদ্ধে মাদক সেবন এবং মাদক রাখার অভিযোগ তোলা হয়েছিল। পড়ে অবশ্য আরিয়ান খানকে এই মামলায় 'ক্লিন চিট' দেওয়া হয়েছিল। ওই মামলার তদন্তকে ঘিরে আবার পাল্টা প্রশ্ন ওঠে মি ওয়াংখেড়ে এবং আরো কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।
এই ঘটনাকে ঘিরে কম বিতর্ক হয়নি।
সম্প্রতি রেড চিলিজ প্রযোজিত নেটফ্লিক্সের ওয়েব সিরিজ 'দ্য ব্যাডস অফ বলিউড'- এর মুক্তির পর আবার ওই বিতর্ক নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। চিত্রনাট্যে মি. ওয়াংখেড়ের মতো দেখতে এক ব্যক্তিকে দেখা যায়।
যাকে ঘিরে ঘোরতর আপত্তি প্রকাশ করেছেন মি. ওয়াংখেড়ে। শুধু তাই নিয়, এনসিবি-র এই সাবেক কর্মকর্তার অভিযোগ, ওই ওয়েব সিরিজ 'ভুল, বিদ্বেষপূর্ণ এবং অবমাননাকর'।

ছবির উৎস, AFP via Getty Images
এরপরই দিল্লি হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন তিনি। দুই কোটি টাকার মানহানি মামলা দায়ের করেছেন। তবে ওই অর্থ টাটা মেমোরিয়াল ক্যান্সার হাসপাতালে দান করতে চান তিনি। আদালতেও এই বিষয়ে জানিয়েছেন সমীর ওয়াংখেড়ে।
আসলে নেটফ্লিক্সের ওই ওয়েব সিরিজে সমীর ওয়াংখেড়ের মতো দেখতে এক ব্যক্তিকে বলিউড সেলিব্রিটিদের তাড়া করতে দেখা যায়। ওয়েব সিরিজের মুক্তির পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই চরিত্রকে নিয়ে বেশ আলোচনা শুরু হয়।
মি. ওয়াংখেড়ের মতে এই ধরনের দৃশ্য তাকে বদনাম করার জন্যই সম্প্রচার করা হয়েছে। এই দৃশ্যে একজন মাদক বিরোধী অভিযানের দায়িত্বে থাকা এক অফিসারকে এমনভাবে চিত্রিত করা হয়েছে যেন তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে বলিউড তারকাদের নিশানা করছেন।
সংবাদ সংস্থা পিটিআই জানিয়েছে, আদালতে দায়ের করা পিটিশনে বলা হয়েছে, সমীর ওয়াংখেড়ের সুনাম ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে এই সিরিজ তৈরি করা হয়েছে। পাশাপাশি উল্লেখ করা হয়েছে যে এমন এক সময়ে এই সিরিজ প্রস্তুত করা হয়েছে, যখন আরিয়ান খানের মামলা মুম্বাই হাইকোর্ট এবং এনডিপিএসের (নারকোটিক ড্রাগস অ্যান্ড সাইকোট্রপিক সাবটেন্স অ্যাক্টের অধীনে) বিশেষ আদালতে বিচারাধীন।

ছবির উৎস, Getty Images
আরিয়ান খানের বিরুদ্ধে মামলা
আরিয়ান খান ও সমীর ওয়াংখেড়েকে কেন্দ্র করে এই বিতর্কের শুরু চার বছর আগে। নিষিদ্ধ পার্টির খবর পেয়ে ২০২১ সালের দোসরা অক্টোবর মুম্বইয়ের কর্ডেলিয়া ক্রুজ-এ অভিযান চালায় নারকোটিক্স কন্ট্রোল ব্যুরোর টিম।
সেই সময় মুম্বইয়ে এনসিবি-র জোনাল ডিরেক্টরের দায়িত্বে ছিলেন সমীর ওয়াংখেড়ে। তিনি এবং সুপারিনটেনডেন্ট ভিভি সিং ওই অভিযানের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তদন্তকারী অফিসার হিসাবে অভিযানে অংশগ্রহণ করেছিলেন আশিস রঞ্জন। অন্যদিকে, কিরণ গোসাভি ও প্রভাকর সাইল স্বতন্ত্র সাক্ষী হিসাবে উপস্থিত ছিলেন। এরমধ্যে, প্রভাকর সাইলের মৃত্যু হয়েছে।
সেই সময় দীর্ঘদিন ধরে খবরের শিরনামে ছিল এই ঘটনা। এরপর তেসরা অক্টোবর শাহরুখ খানের বড় ছেলে আরিয়ানকে গ্রেফতার করা হয়। ২৫দিন কারাবাসের পর ২৮শে অক্টোবর মুম্বই হাইকোর্ট তাকে জামিন দেয়।
তদন্ত যে দিকে মোড় নেয়
এই অভিযান এবং তার সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তাদের নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর ওই বছরেরই ২৫শে অক্টোবর, এনসিবি একটা বিশেষ তদন্ত দল গঠন করে।
মুম্বই ও দিল্লির এনসিবি কর্মকর্তাসহ স্বতন্ত্র সাক্ষীদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। মি. ওয়াংখেড়ে ও অন্যান্য কর্মকর্তাদের কাজ নিয়ে বেশ কিছু প্রশ্নও তোলা হয়।
তদন্তের পর সিবিআই সমীর ওয়াংখেড়ে, বিশ্ব বিজয় সিং, আশিস রঞ্জন, কেপি গোসাভি, সানভিল ডি'সুজা এবং অজ্ঞাতপরিচয় এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করে।
সমীর ওয়াংখেড়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
এই বিতর্কের আগেও সমীর ওয়াংখেড়ে খবরের শিরনামে এসেছেন। মুম্বই বিমানবন্দরে কাস্টমস ডিপার্টমেন্টে কাজ করার সময় তিনি বহু বলিউড তারকার বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। এই সমস্ত ঘটনাকে কেন্দ্র করে তার একটা ভাবমূর্তিও তৈরি হয়েছিল
আরিয়ান খানের গ্রেপ্তারের পর আবার প্রকাশ্যে আসে তার নাম। তবে এই মামলার তদন্তে তার ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল। তৎকালীন মহারাষ্ট্র সরকারের মন্ত্রী নবাব মালিকের অভিযোগ তোলেন, মি. ওয়াংখেড়ে বলিউড তারকাদের মিথ্যা মামলায় জড়ানোর ষড়যন্ত্র করছেন। তার নামেও ভুয়ো নথি তৈরি করা হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই অভিযোগ তুলেছিলেন মি. মালিক, যা বিতর্ককে আরো উস্কে দেয়। পরে নবাব মালিককে অন্য এক মামলায় গ্রেফতার করা হয়।
অন্যদিকে ২০২২ সালের ২৭শে মে কর্ডেলিয়া ড্রাগ মামলায় আরিয়ান খানকে ক্লিনচিট দেয় এনসিবি।
এই মামলায় ১৪জন অভিযুক্তের বিরুদ্ধে প্রায় ছয় হাজার পাতার চার্জশিট দায়ের করা হয়েছিল।
আরিয়ান খানের মুক্তির পর মি. ওয়াংখেড়েকে নিয়ে সমালোচনা শুরু হয় যা তার ভাবমূর্তিতেও প্রভাব ফেলে।
অবশেষে, এনসিবি তার কাজের মেয়াদ বাড়ায়নি। নারকোটিক্স কন্ট্রোল ব্যুরো থেকে রাজস্ব ডায়রেক্টোরেট অফ রেভেনিউ ইন্টেলিজেন্স-এ (ডিআরআই) পাঠিয়ে দেওয়া হয় তাকে।

ছবির উৎস, ANI
কে এই সমীর ওয়াংখেড়ে?
সমীর ওয়াংখেড়ে ২০০৮-এর ব্যাচের ইন্ডিয়ান রেভিনিউ সার্ভিস (আইআরএস) অফিসার। তার বাবাও আবগারি বিভাগের ইন্সপেক্টর-এর পদে ছিলেন।
সমীর ওয়াংখেড়ে ২০০৬ সালে সেন্ট্রাল পুলিশ অর্গানাইজেশন-এ যোগদান করেন যার আওতায় ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো (আইবি), সিবিআই, এনডিআরএফ এবং জাতীয় তদন্ত সংস্থা (এনআইএ) রয়েছে। এরপর ২০০৮ সালে আইআরএস অফিসার হিসাবে তার পোস্টিং হয় শুল্ক বিভাগে।
মুম্বই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার (কাস্টমস) হিসাবে কাজ করার সময়, তিনি বেশ কয়েকজন বলিউড তারকাকে শুল্ক না দেওয়ার জন্য গ্রেফতার করেছিলেন।
পরে ডিরেক্টরেট অফ রেভিনিউ ইন্টেলিজেন্সে (ডিআরআই) কাজ করেন তিনি। এনআইএ-তে সন্ত্রাসবাদ বিষয়ক মামলার তদন্তও করেছেন।
মুম্বাই জোনের নারকোটিক্স কন্ট্রোল ব্যুরোর পরিচালক হিসাবে নিযুক্ত হন ২০২০ সালে। কর্মজীবনে তার অসামান্য কাজের জন্য কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক থেকে পুরষ্কারও পেয়েছেন মি. ওয়াংখেড়ে।
সমীর ওয়াংখেড়ে ও আরিয়ান খানের এই পুরো বিতর্কে শাহরুখ খান অভিনীত চলচ্চিত্র জওয়ানের এর একটা সংলাপও বেশ জনপ্রিয় হয়েছে। ২০২৩ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত এই ছবিতে শাহরুখ খানের চরিত্রকে বলতে শোনা যায় "ছেলেকে স্পর্শ করার আগে বাবার সঙ্গে কথা বলো।"
আরিয়ান খান ও সমীর ওয়াংখেড়ে মামলার আবহে এই সংলাপ অনেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করেছেন।








