কলকাতায় গীতাপাঠ অনুষ্ঠান চলাকালে মুসলিম চিকেন প্যাটিস বিক্রেতাকে মারধরের অভিযোগ

বিক্রেতা শেখ রিয়াজুল
ছবির ক্যাপশান, বিক্রেতা শেখ রিয়াজুল

কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে গত রোববার গীতাপাঠের আয়োজন করেছিল সনাতন সংস্কৃতি সংসদ। সেই ধর্মীয় অনুষ্ঠান চলাকালে চিকেন প্যাটিস বিক্রি করায় খাবার বিক্রেতাকে হেনস্তা করার অভিযোগ উঠেছে।

জানা গেছে নিগ্রহের শিকার ওই ব্যক্তির নাম শেখ রিয়াজুল। দীর্ঘদিন ধরে নিরামিষ ও আমিষ দুই ধরনেরই প্যাটিস বিক্রি করেন তিনি।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, মুরগির মাংসের পুর যুক্ত প্যাটিস বা পাফ বিক্রির কারণে 'রোষাণলের' শিকার হতে হচ্ছে মি. রিয়াজুলকে। তাকে মারধর করা হয়, কান ধরে ওঠবস করানো হয় এবং বাক্সে থাকা খাবার মাটিতে ফেলে দেওয়া হয়।

অভিযোগ, মোহম্মদ সালাউদ্দিন নামে আরেক বিক্রেতাকেও একইভাবে হেনস্তার শিকার হতে হয়েছে।

ওইদিন যারা এই বিক্রেতাদের ওপর চড়াও হন, তারা গীতা পাঠ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতে এসেছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনায় ময়দান থানায় অভিযোগ দায়ের হয়েছে। ডিসিপি সাউথ প্রিয়ব্রত রায় অভিযোগ দায়েরের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছেন ঘটনার তদন্ত শুরু হয়েছে।

এই ঘটনায় একটি পৃথক অভিযোগ দায়ের করেছেন আইনজীবী ও বাম নেতা সায়ন ব্যানার্জি।

ওই আইনজীবী বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, "এর আগে এমন ঘটনা আমরা উত্তর প্রদেশে দেখেছি, পশ্চিমবঙ্গে নয়। একে মব লিঞ্চিং ছাড়া কী বলব? কলকাতার বুকে এমন ঘটনা বিশ্বাস করা যায় না।"

এই ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর ঘটনার সমালোচনা করেছেন অনেকেই। পেশায় শিক্ষিকা সুদেষ্ণা সেন বলেছেন, "কী খাব, আমার পেশা কী হবে তা-ও অন্য কেউ ঠিক করে দেবে? এমন অবস্থা এই রাজ্যে অন্তত আগে দেখিনি। বাঙালিরা মুক্তমনা এবং উদার মনোভাবাপন্ন। সেখানে এই সংস্কৃতি থাবা বসাবে ভাবলে ভয় হয়।"

এদিকে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক বিতণ্ডাও শুরু হয়েছে। তৃণমূল ও বামসহ বিরোধীদলগুলো ইতোমধ্যে বিজেপির সমালোচনায় মুখর হয়েছে।

প্রসঙ্গত, রোববারের ওই গীতা পাঠ অনুষ্ঠানে রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী, বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার, দিলীপ ঘোষ, তথাগত রায়, রাহুল সিনহাসহ গেরুয়া শিবিরের বহু নেতাই উপস্থিত ছিলেন।

আয়োজকদের তরফে অবশ্য এই ঘটনার নিন্দা জানিয়ে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।

গীতাপাঠ অনুষ্ঠানের আয়োজক সংস্থা সনাতন সংস্কৃতি সংসদ হামলার ঘটনার নিন্দা জানিয়ে বলেছে, "আমরা কোনো সহিংসতাকে সমর্থন করি না। মাঠ কোনো মন্দির বা আশ্রম নয়। কে কী খাবার বিক্রি করবে সে নিয়ে আমরা কোনো নির্দেশে দিইনি। যারা হামলা করেছে, তাদের আইনের আওতায় আনা উচিত।"

আরও পড়ুন
রোববার আয়োজিত অনুষ্ঠানের ছবি

ছবির উৎস, Hindustan Times via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, রোববার আয়োজিত অনুষ্ঠানের ছবি

ঘটনা সম্পর্কে যা জানা যাচ্ছে

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

গত রোববার কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে গীতা পাঠের এক ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল সনাতন সংস্কৃতি সংসদ। এই অনুষ্ঠানে বহু সাধুসন্তরাই উপস্থিত ছিলেন।

মূলত অরাজনৈতিক অনুষ্ঠান বলে দাবি করা হলেও অনুষ্ঠানে বিজেপি তো বটেই, গেরুয়া শিবিরের বহু নেতাই উপস্থিত ছিলেন।

এর আগে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর মাসে অনুরূপ অনুষ্ঠান দেখা গিয়েছিল কলকাতায়। লোকসভা ভোটের ঠিক আগে সেই অনুষ্ঠানকে ঘিরে গেরুয়া শিবিরের উৎসাহ ছিল চোখে পড়ার মতো।

চলতি বছরের অনুষ্ঠানের ব্যপ্তি ঘটেছে, জমায়েত নিয়েও শুভেন্দু অধিকারীর মতো নেতাদের প্রকাশ্যে কথা বলতে শোনা গেছে।

রোববারের অনুষ্ঠানের দিন দু'জন খাবার বিক্রেতাকে মাংসের পুর যুক্ত প্যাটি বা পাফ বিক্রি করার কারণে হেনস্তা করার অভিযোগ উঠেছে।

খাবার বিক্রির উদ্দেশ্যে রোববার কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে গিয়েছিলেন বছর পঞ্চাশের শেখ রিয়াজুল। গত কুড়ি বছরেরও বেশি সময় ধরে এই কাজ করছেন তিনি। নিরামিষ ও আমিষ দুই ধরনেরই প্যাটিস বিক্রি করেন হুগলীর এই বাসিন্দা। কিন্তু এমন অভিজ্ঞতা তার এর আগে হয়নি।

পুলিশের কাছে অভিযোগে মি. রিয়াজুল উল্লেখ করেছেন, "প্যাটিস বিক্রির জন্য ওখানে গিয়েছিলাম। দুপুর একটা নাগাদ হঠাৎ কয়েকজন অজ্ঞাত ব্যক্তি আমার উপর এসে চড়াও হয়। তারা আমার কাছে জানতে চায় আমি কী বিক্রি করছি। চিকেন প্যাটিস রয়েছে কি না।"

উত্তর দেওয়া মাত্র তাকে হেনস্তা করা শুরু হয় বলে মি. রিয়াজুল অভিযোগ জানিয়েছেন। বিক্রির উদ্দেশ্যে আনা তার খাবার মাটিতে ফেলে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ।

চড়াও হওয়া ব্যক্তিরা কোনো অনুনয়-বিনয়ই শোনেনি বলেই পুলিশকে অভিযোগ জানিয়েছেন হুগলীর এই বাসিন্দা।

তিনি বলেছেন, "প্রায় তিন হাজার টাকার খাবার ছিল বাক্সে, ওরা সব ফেলে দেয়।"

শারীরিক পরীক্ষার জন্য মঙ্গলবার রাতে এসএসকেএম হসপিটালে আনা হয়েছিল মি. রিয়াজুলকে। সেই সময় তিনি চিকিৎসকদের জানিয়েছেন, মারধরের সময় তার গালে এবং পিঠে চোট লেগেছিল।

অন্যদিকে, দ্বিতীয় বিক্রেতা মোহাম্মদ সালাউদ্দিন পুলিশকে জানিয়েছেন, তার উপর তিন-চার জন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তি রোববার চড়াও হন। তিনিও মুরগির মাংসের পুর দেওয়া প্যাটিস বিক্রি করছেন জানার পর, তাকেও হেনস্তা করা হয়।

এই ঘটনায় ময়দান থানায় অভিযোগ দায়ের করেছেন যে আইনজীবী তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, "আমি ভেবেছিলাম পুলিশ এই ঘটনায় স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে পদক্ষেপ নেবে। কিন্তু তা হয়নি। যেহেতু পুলিশ কোনো পদক্ষেপ নেয়নি, তাই আমি ব্যক্তিগতভাবে এই বিষয়ে অভিযোগ দায়ের করার সিদ্ধান্ত নিই।"

"হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির কাছেও লিখিতভাবে স্বতঃপ্রণোদিতভাবে মামলা গ্রহণ করার আর্জি জানিয়েছি।"

সমালোচনা

ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর এই নিয়ে নিন্দায় সরব হয়েছেন অনেকেই।

মানবাধিকার সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রোটেকশন অফ ডেমোক্রেটিক রাইটস-এর রঞ্জিত শূর বলেছেন, "কলকাতার বুকে এমন ঘটনা কিন্তু আগে দেখা যায়নি। এটি অত্যন্ত লজ্জাজনক একটি ঘটনা। দিল্লির বাজারে মাছ বিক্রি নিয়ে আপত্তির কথা প্রকাশ্যে এসেছিল, সেই একই সংস্কৃতি তারা পশ্চিমবঙ্গেও আনতে চায়।"

"এই রাজ্যের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের, স্বাধীন চিন্তার ঐতিহ্য রয়েছে সেখানেই আঘাত হানতে চায় তারা। এই ঘটনায় বিক্রেতার ধর্মীয় পরিচয়, পেশা ও আর্থসামাজিক অবস্থান দেখলেই সংঘপরিবারের দর্শন স্পষ্ট হয়ে যাবে। সেই দর্শনের প্রতিফলন উত্তর প্রদেশে দেখা গিয়েছে, এখন তারা তা পশ্চিমবঙ্গেও আনতে চায়।"

চৈতালি দাশগুপ্ত নামে দক্ষিণ কলকাতার এক বাসিন্দা এই প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে দিল্লির প্রসঙ্গ টেনে এনেছেন। তিনি বলেছেন, "কে কী খাবেন, সেটি তাদের ব্যক্তিগর বিষয়। এই সময় ময়দানে অনেকেই বেড়াতে যান, তাদের অনেকেই মাংসের প্যাটিস খেতে পছন্দ করেন। যার খেতে ইচ্ছে হবে না, তিনি খাবেন না। কিন্তু এই জাতীয় আক্রমণ কেন হবে?"

"এর আগে দিল্লিতে মন্দিরের কাছাকাছি থাকা বাজারে মাছ বিক্রি নিয়ে আপত্তির খবর পড়েছিলাম, শ্রাবণ মাসে মাংস বিক্রি করা যাবে না বলে উত্তর প্রদেশে ফতোয়া জারির কথাও শুনেছি। কখনো ভাবিনি পশ্চিমবঙ্গেও এমন ছবি দেখব!"

বিবিসি বাংলায় অন্যান্য খবর
কুণাল ঘোষ- ফাইল ছবি

ছবির উৎস, ANI

ছবির ক্যাপশান, এই ঘটনায় বিজেপিকে কটাক্ষ করেছেন কুণাল ঘোষ- ফাইল ছবি

রাজনৈতিক বিতণ্ডা

এই ঘটনাকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতণ্ডাও সমান তালে চলছে।

তৃণমূল মুখপাত্র কুণাল ঘোষ বিজেপিকে নিশানা করতে ছাড়েননি। তিনি সাংবাদিকদের বলেছেন, "এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করছি। বিক্রেতারা জাতি-ধর্ম দেখে বিক্রি করেন না। ওই এলাকায় ছুটির দিনে অনেক লোক হয়। কেউ সেখানে ঝালমুড়ি, কেউ লজেন্স বিক্রি করেন।"

"তারা তো আমিষ না নিরামিষ এইভাবে বিক্রি করতে অভ্যস্ত নন। রোজ নিজেদের পণ্য নিয়ে বিক্রি করেন। যাদের প্যাটিস খাওয়ার নয়, তারা খাবেন না। কিন্তু এদের মারবেন কেন? ওই জায়গা কারো কাছে কর্মসংস্থানের জায়গা, আয়ের জায়গা। কেউ কিছু না বুঝে হঠাৎ মারলেন কেন?"

বামেদের তরফেও এই ঘটনার নিন্দা জানানো হয়েছে। নেত্রী দীপ্সিতা ধরের কথায়, "ব্রিগেডে গীতার অনুষ্ঠানে যা ঘটেছে তা নজিরবিহীন এবং বাংলার সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের পরিপন্থী। এর আগে আমিষ খাবার বিক্রি নিয়ে কাউকে এইভাবে হেনস্তার শিকার হতে হয়নি আমাদের রাজ্য।"

এই ঘটনা থেকে 'দূরত্ব' বজায় রাখতে চেয়েছে গেরুয়া শিবির। বিজেপির সুকান্ত মজুমদারকে এই প্রসঙ্গে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি সাংবাদিকদের বলেছেন, "কারা করেছে, কী করেছে সেটা এখনো স্পষ্ট নয়।"

এদিকে আয়োজকদের তরফেও ঘটনাটির নিন্দা জানানো হয়েছে। তাদের তরফে বলা হয়েছে, "আমরা কোনো ধরনের সহিংস কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করি না। আমিষ খাবার বিক্রি নিষিদ্ধ করতে আমাদের পক্ষ থেকে কোনো নির্দেশ দেওয়া হয়নি। আমরা জানি না ওই হামলাকারীরা কারা কারণ লক্ষ লক্ষ মানুষ ওই অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিলেন।"

"আমরা ভক্তদের সাত্ত্বিক আহার (বিশুদ্ধ নিরামিষ খাবার) খাওয়ার জন্য অনুরোধ করেছি, কিন্তু আমরা কাউকে জোর করিনি। এই মাঠটি মন্দির বা আশ্রম না হওয়ায় কোনো ধরনের খাবার বিক্রির ক্ষেত্রে কোনো নিষেধাজ্ঞা ছিল না। কেউ আইন লঙ্ঘন করলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।"