উত্তরাঞ্চল সফর হলো না, তারেক রহমানের নির্বাচনী সফর সিলেট থেকেই শুরু?

ছবির উৎস, BNP MEDIA CELL
বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান রোববার থেকে উত্তরবঙ্গ সফরের ঘোষণা দিলেও সফরের একদিন আগে শুক্রবার রাতে তা স্থগিত ঘোষণা করা হয়। কারণ হিসেবে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম জানিয়েছিলেন, নির্বাচন কমিশনের অনুরোধে তারেক রহমানের উত্তরাঞ্চল সফর স্থগিত করা হয়েছে।
ওই সফর স্থগিতের পরদিনই শনিবার ঢাকায় বিভিন্ন গণমাধ্যমের সম্পাদক ও সিনিয়র সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিমিয় সভা করেন বিএনপি চেয়ারম্যান।
এই মতবিনিময় সভায় যোগ দিয়ে বিএনপি নেতা মি. রহমান জানান, আগামী ২২ তারিখ থেকে তিনি তার পরিকল্পনা নিয়ে সারাদেশের মানুষের কাছে যাবেন।
রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের জন্য নির্বাচনী আচরণবিধি অনুযায়ী, নির্বাচনের প্রতীক বরাদ্দের আগ পর্যন্ত কোনো ধরনের সভা সমাবেশ বা ভোট চাওয়ার ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ রয়েছে।
যে কারণে উত্তরের জেলা বগুড়াসহ বিভিন্ন জায়গায় তারেক রহমানের আগমন উপলক্ষে প্রস্তুতি নেওয়ার পরও সেই কর্মসূচি স্থগিত করা হয়।
নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, আগামী ২১শে জানুয়ারি প্রার্থীদের প্রতীক বরাদ্দ দেবে নির্বাচন কমিশন। আর প্রতীক বরাদ্দের পরই আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচার প্রচারণা শুরু করতে পারবে রাজনৈতিক দলগুলো ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা।
বিএনপির সূত্রগুলো বলছে, বিএনপি নেতা তারেক রহমানের উত্তরবঙ্গ সফরের ঘোষণার পর এটি নিয়ে জামায়াতসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দল নির্বাচন কমিশনের কাছে অভিযোগও জানিয়েছে। যে কারণে নির্বাচন কমিশনের অনুরোধে তারেক রহমানের সফর স্থগিত করা হয়।
শুক্রবার রাতে যে বৈঠকে এই সফর স্থগিতের ঘোষণা দেওয়া হয়, সেই সভায়ই খালেদা জিয়ার মৃত্যুজনিত কারণে দলীয় প্রধানের পদ শূন্য হওয়ায় দলীয় চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পান তারেক রহমান।
শনিবার গণমাধ্যমকর্মীদের সাথে মতবিনিময় সভায় বিএনপি চেয়ারম্যান দেশ গঠনে তার পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। আর দেশে ফেরার দিন তিনি যে- 'আই হ্যাভ এ প্ল্যান' কথাটি বলেছিলেন, তারও কিছু ধারণা সংক্ষিপ্ত আকারে সাংবাদিকদের সামনে উপস্থাপন করেন।
মি. রহমান এসময় বলেন, "বিএনপি সরকার গঠন করলে জাতিকে সঠিকপথে পরিচালিত করবে। অবশ্যই আমরা ৫ই অগাস্টের আগে ফিরে যেতে চাই না"।
এছাড়াও বেকারত্ব দূরীকরণ, আর্থ-সামাজিক উন্নয়নসহ আগামীতে বিএনপি ক্ষমতায় এলে যে সব পরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে তার নানা দিক নিয়েও খোলামেলা করেন তারেক রহমান।

ছবির উৎস, BNP MEDIA CELL
সিলেট থেকেই নির্বাচনী সফর শুরু?
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
প্রায় দেড়যুগ পর গত ২৫শে ডিসেম্বর যুক্তরাজ্য থেকে দেশে ফেরেন বিএনপি নেতা তারেক রহমান। এর পাঁচ দিনের মাথায় মারা যান দলীয় চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া।
এর দশদিনের মাথায় শুক্রবার রাতে স্থায়ী কমিটির সভায় তারেক রহমানকে বিএনপির চেয়ারম্যান ঘোষণা করা হয়।
শনিবার ঢাকার একটি হোটেলে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভায় বিএনপির এই নেতা বলেন, "আমার দেশে ফিরে আসার পরে আমি যে কয়বার আমার বাইরে যাওয়ার একটু বেশি সুযোগ হয়েছে, আমি সাভারে গিয়েছিলাম, আরও কয়েকটি জায়গায় গিয়েছিলাম। আমার কাছে মনে হয়েছে নতুন প্রজন্ম একটি গাইডেন্স চাইছে, নতুন প্রজন্ম একটি আশা দেখতে চাইছে"।
মি. রহমান দেশে ফেরার প্রায় দুই সপ্তাহ আগে গত ১১ই ডিসেম্বর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে।
নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার কারণে তার ফেরার দিন ঢাকায় একটি সংবর্ধনার বাইরে কোনো সভা-সমাবেশ বা রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করতে পারেনি বিএনপি।
রোববার থেকে তারেক রহমানের নিজ জেলা ও তার নির্বাচনী এলাকা বগুড়া থেকে উত্তরাঞ্চলে বেশ কয়েকটি কর্মসূচি ঘোষণা করেছিলেন। যদিও সেখানে কোনো রাজনৈতিক সভা-সমাবেশের ঘোষণা ছিল না। দলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল- ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠানের অংশ হিসেবে সফরটি হচ্ছে। তবে শুক্রবার রাতেই সেই কর্মসূচি স্থগিত করার কথা জানান বিএনপি মহাসচিব।
শনিবার সাংবাদিকদের কাছে ক্ষমতায় গেলে বিএনপির পরিকল্পনা তুলে ধরার পাশাপাশি তিনি দেশের মানুষের কাছেও তার পরিকল্পনা তুলে ধরার কথা জানান।
এসময় তারেক রহমান বলেন, "সামনে নির্বাচন। আমি একটি রাজনৈতিক দলের সদস্য। স্বাভাবিকভাবে আমরা ২২ তারিখ থেকে সকল রকম পরিকল্পনা নিয়ে জনগণের কাছে যাবো"।
তবে কোন জায়গা থেকে তিনি এই সফর শুরু করবেন সেটি নিয়ে স্পষ্ট করে কিছু বলেননি এই মতবিনিময় সভায়।
তবে, ওই বৈঠকের পর শনিবার রাতে বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন আগামী ২২শে জানুয়ারি সিলেট থেকে তারেক রহমানের সফর শুরু হচ্ছে।
নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী ২১শে জানুয়ারি প্রতীক বরাদ্দের পর থেকেই আনুষ্ঠানিক প্রচার প্রচারণা শুরু করতে পারবে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীরা।
বাংলাদেশের নির্বাচনের ইতিহাসে দেখা যায় বেশিরভাগ সময়ই সিলেটে শাহজালালের মাজার জিয়ারতের মাধ্যমেই বিএনপি আওয়ামী লীগের মতো রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করে থাকে।

ছবির উৎস, BNP MEDIA CELL
তারেক রহমানের পরিকল্পনা কী?
শনিবারের সভায় দেশের বিভিন্ন পত্রিকা, টেলিভিশন ও অনলাইনের শীর্ষ কর্তা ব্যক্তিরাও যেমন বক্তব্য রাখেন। তেমনি প্রশ্ন করেন সিনিয়র সাংবাদিকরাও।
তারা এসময় তারেক রহমানের পরিকল্পনার বিষয়গুলো নিয়েও জানতে চান। যে কারণে মি. রহমান তার বক্তব্যে কিছু পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, "পরবর্তীতে আগামী নির্বাচনে ইনশাআল্লাহ জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে আমরা সরকার গঠনে সক্ষম হলে আমাদের একটি পরিকল্পনা রয়েছে; এই নারীরাই শিক্ষিত হয়েছে, এদেরকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলা"।
বহুল আলোচিত ফ্যামিলি কার্ডের প্রসঙ্গ টেনে বিএনপির চেয়ারম্যান বলেন, "একটু আগে আমি যে ফ্যামিলি কার্ডটির কথা বলেছিলাম, সেটির লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য হচ্ছে, সেটাই এই নারী সমাজকে গড়ে তোলা। আমাদের হিসাব মতে বাংলাদেশে চার কোটি ফ্যামিলি আছে। আমরা যদি পরিবার হিসেবে ভাগ করি, এভারেজে একটি পরিবারে পাঁচ জন করে সদস্য ধরা হয়েছে"।
"আমরা এই ফ্যামিলি কার্ডটি আপনাদের সামনে তুরে ধরতে চাইছি। আমি বলেছিলাম আই হ্যাভ এ প্ল্যান। সেই প্ল্যানের একটি অংশ হচ্ছে ফ্যামিলি কার্ড। আমাদের জনসংখ্যার অর্ধেক হচ্ছে নারী"।
ফ্যামিলি কার্ড কাকে কীভাবে দেওয়া হবে সে সবের কিছু ধারণাও দেন তিনি।
"ফ্যামিলি কার্ড মানে এই নয় যে একটা ফ্যামিলি কার্ড যেই পাবে, সে সারাজীবনের জন্য পাবে। যে গৃহিনী কার্ডটা পাবেন সেটা সারাজীবনের জন্য না। ৫-৭ বছর তাকে আমরা একটা সাপোর্ট দেওয়ার চেষ্টা করবো। সেটা টাকার হিসেবে হতে পারে বা নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের হিসেবেও হতে পারে"।
তারেক রহমান বলেন, "এই কার্ডটি প্রথমত তার ফ্যামিলির স্বাস্থ্যের পেছনে, ছেলে মেয়ের শিক্ষার পেছনে। তৃতীয়ত সে ছোট ছোটভাবে ইনভেস্ট করতে পারবে। স্বাভাকিভাবে এইভাবে যে যখন ইনভেস্ট করবে, তখন তার গ্রামের অর্থনীতিটা শক্তিশালী হবে"।
তিনি জানান, চার কোটি পরিবারের মধ্যে কার্ডটি দেওয়া হবে। তবে সবগুলো পরিবারের মধ্যে একবারে নয়। ধীরে ধীরে দেওয়া হবে। সেটি যেমন হত দরিদ্ররা পাবে। প্রয়োজন হলে সেটি ডিসি-এসপির স্ত্রীরাও পাবেন।
কৃষকদের সহায়তার জন্য কৃষি কার্ড চালুর ভাবনা রয়েছে জানিয়ে বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, "একটি বড় সমস্যা হচ্ছে হেলথ ইস্যু। বাংলাদেশে ২০ কোটি মানুষ। আমরা স্লোগান দিয়ে হয়তো বলতে পারি যে, সকলের জন্য স্বাস্থ্যের ব্যবস্থা করব, আমরা সকলকে স্বাস্থ্য সুবিধা দেব"।

ছবির উৎস, BNP MEDIA CELL
গণতান্ত্রিক চর্চায় গুরুত্ব
এইদিনের মত বিনিময় সভায় তারেক রহমান তার বক্তব্যে বেশ কিছু বিষয়ে তার অবস্থান স্পষ্ট করেন। সেই সাথে আগামী দিনের রাজনীতির চ্যালেঞ্জের কথাও তুলে ধরেন তিনি।
তারেক রহমান বলেন, "সামনে আমাদের অনেক কঠিন চ্যালেঞ্জ আছে। আমাদের মধ্যে বিভিন্ন মত পার্থক্য আছে। একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে আজকে আপনাদের কাছে এবং আপনাদের মাধ্যমে সকল রাজনৈতিক দলের সদস্যদের কাছে, সমাজের সব মানুষের কাছে আমি একটি বিনীত আহবান রাখতে চাই যে আমাদের বিভিন্ন মত পার্থক্যগুলো নিয়ে যেন আলোচনা করতে পারি"।
গণতান্ত্রিক চর্চা অব্যাহত রাখতে হবে জানিয়ে বিএনপির চেয়ারম্যান বলেন, "আমাদের যে কোনো মূল্যে গণতান্ত্রিক প্রসেসটা চালু রাখতে হবে। আমাদের জবাবদিহিতাটা চালু রাখতে হবে। সেটা জাতীয় পর্যায় হোক, কিংবা ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা নির্বাচন কিংবা ব্যবসায়ীদের নির্বাচন হোক"।
"আমরা যে কোনো পর্যায়ে জবাবদিহিতা বা গণতান্ত্রিক প্রসেসটা যদি কন্টিনিউ করতে পারি, তাহলে নিশ্চয়ই আমরা অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে পারবো", যোগ করেন তিনি।
মতবিনিময় সভায় তিনি বলেন, "আমি কাউকে আঘাত করতে চাইছি না। কাউকে আঘাত না করেই বলছি আসুন আমরা দেশের মানুষের শিক্ষা, দেশের মানুষের স্বাস্থ্য দেশের নারীদের অধিকার, কর্মসংস্থান, পরিবেশ, সব কিছু মিলিয়ে যেটি একটি সাধারণ মানুষের জন্য প্রযোজ্য"।
সংস্কারের প্রসঙ্গ টেনে তারেক রহমান বলেন, "আমরা সাংবিধানিক ও আইনগত বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছি। আমার মনে হয় সেই বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করা উচিত। প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দলের আলোচনা করা উচিত। অবশ্যই সেগুলো প্রয়োজন আছে। একই সাথে আমরা মানুষের প্রতিদিনকার তার চিকিৎসা ব্যবস্থা কেমন হবে, তার কর্মসংস্থান কী হবে, পরিবারের সন্তানদের শিক্ষা ব্যবস্থা কী হবে, তার রাস্তায় বের হলে নিরাপদে ফিরে আসতে পারবে কী না এই বিষয়গুলো আলোচনা আরেকটু বেশি হওয়া উচিত"।








