বাংলাদেশের সঙ্গে উত্তেজনা, নাগরিকত্ব আইন কার্যকর- ২০২৪ সালে ভারতে যত উল্লেখযোগ্য ঘটনা

রাজনীতির ময়দান হোক বা খেলার মাঠ, ভারতের জন্য ঘটনাবহুল ছিল হয়েছে ২০২৪ সাল। দেশের ভেতরে লোকসভা নির্বাচন, নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল (সিএএ) কার্যকর হওয়া নিয়ে যেমন উত্তেজনা ছড়িয়েছে, তেমনি কানাডা, মালদ্বীপ ও বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েনে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে।

গুজরাট দাঙ্গার সময় বিলকিস বানোর গণধর্ষণ এবং তার পরিবারের সদস্যদের হত্যার মামলায় সাজাপ্রাপ্তদের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ রায় দেয় ভারতের সুপ্রিম কোর্ট।

আবার শীর্ষ আদালতের রায়েই বাতিল হয় বেনামে রাজনৈতিক দলগুলোকে আর্থিক অনুদান দেওয়ার জন্য ব্যবহৃত নির্বাচনি বন্ড।

একদিকে যেমন এক দশক পর জম্মু ও কাশ্মীরে বিধানসভা নির্বাচন হয়, অন্যদিকে দফায় দফায় উত্তপ্ত ওঠে মণিপুর।

সব মিলিয়ে কেমন কেটেছে ভারতের ২০২৪ সাল, তার কিছুটা দেখে নেওয়া যেতে পারে।

ভারত-মালদ্বীপ সম্পর্ক

ভারত ও মালদ্বীপের সম্পর্কের টানাপোড়েন একাধিকবার খবরের শিরোনামে এসেছে গত বছর। ২০২৩ সালে ক্ষমতায় আসার পর রাষ্ট্রপতি মোহামেদ মুইজ ভারতীয় সেনাদের দেশ ছেড়ে চলে যেতে বলায় দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কে কিছুটা শীতলতা নেমে আসে।

পরিস্থিতির আরও অবনতি হয় জানুয়ারি মাসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর লাক্ষাদ্বীপ সফরের ছবিতে মালদ্বীপের মন্ত্রী মরিয়াম শিউনা এবং অন্যান্য নেতাদের আপত্তিজনক মন্তব্যের পর। এনিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন ভারতীয় নাগরিকরা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে #বয়কটমালদ্বীপ এবং #এক্সপ্লোরলাক্ষাদ্বীপ ট্রেন্ড করতে থাকে।

চীনপন্থী বলে পরিচিত মি. মুইজের ভারতবিরোধী নীতির কারণে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের ফাটল আরও গভীর হয়। যদিও মি. মুইজকে নরেন্দ্র মোদীর শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে দেখা গিয়েছিল এবং ধারণা করা হচ্ছিল, সম্পর্কের উন্নতি হতে চলেছে।

অক্টোবর মাসে ভারত সফরে আসেন মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট। তার দেশকে বিপুল আর্থিক সহায়তা করার জন্য ভারতকে অকুণ্ঠ ধন্যবাদ জানান। মালদ্বীপের ফরেন রিজার্ভ সংকট মোকাবিলায় ভারতের সিদ্ধান্ত সহায়ক হবে বলেও প্রেসিডেন্ট মুইজ মন্তব্য করেন।

নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে বৈঠকের পর মুইজের বক্তব্য তার তীব্র ভারত-বিরোধিতার নীতি থেকে প্রায় ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে যাওয়ার লক্ষণ হিসেবেই দেখা হয়।

বিলকিস বানো মামলার রায়

গুজরাট দাঙ্গার সময় বিলকিস বানোকে গণধর্ষণ এবং তার পরিবারের সদস্যদের হত্যা মামলায় ১১ জন যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত অপরাধীদের সাজা কমানোর যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল গুজরাটের বিজেপি সরকার, তা জানুয়ারি মাসে খারিজ করে দেয় সুপ্রিম কোর্ট।

আদালত জানায় ২০০২ সালের ওই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত অপরাধীদের সাজা কমানোর কোনও এখতিয়ারই ছিল না গুজরাট সরকারের। তারা 'সাংবিধানিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে এবং দোষীদের সঙ্গে যোগসাজশ করে এই কাজ করেছে'।

ভারতের স্বাধীনতার ৭৫ বছরের উদযাপন উপলক্ষ্যে সে সময়ে সাজাপ্রাপ্তদের মুক্তি দেওয়া হয়েছিল যে তালিকায় গণধর্ষণ কাণ্ডের ওই অপরাধীরাও ছিলেন। জেল থেকে বেরোনোর পর তাদের সংবর্ধনাও জানিয়েছিলেন স্থানীয় বিজেপি নেতারা যাকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে।

এরপর সুপ্রিম কোর্ট সাজাপ্রাপ্তদের আবার জেলে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেয়। এই রায়কে কেন্দ্র করে অস্বস্তিতে পড়তে হয়েছিল নরেন্দ্র মোদীর বিজেপি সরকারকে।

সন্দেশখালি ইস্যু

জানুয়ারি মাসে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট বা ইডির তল্লাশির সময় কর্মকর্তাদের ওপর হামলাকে কেন্দ্র করে খবরের শিরোনামে উঠে আসে পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগণা জেলার সন্দেশখালি গ্রাম। দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত স্থানীয় তৃণমূল নেতা শাহজাহান শেখের বাড়িতে তল্লাশি চালাতে গেলে ইডি কর্মকর্তাদের ওপর হামলা চালানো হয়।

শাহজাহান শেখ নিখোঁজ হয়ে যান। এরপর একের পর এক অভিযোগ উঠতে থাকে শাহজাহান শেখ ও তার অনুগামীদের বিরুদ্ধে। স্থানীয় নারীরা অভিযোগ তোলেন শাজাহান শেখ ও তার অনুগামীরা তাদের ওপর দিনের পর দিন নির্যাতন চালিয়েছেন। এই ঘটনায় অস্বস্তিতে পড়তে হয় তৃণমূলকে। পরে শাহজাহান শেখকে গ্রেপ্তার করা হয়।

২০২৪-এর ভোটের আবহে ক্রমে নির্বাচনি ইস্যুতে পরিণত হয় সন্দেশখালি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও সন্দেশখালি ইস্যু নিয়ে মন্তব্য করেন। তিনি পশ্চিমবঙ্গ সফরে এসে নির্যাতনের শিকার কয়েকজনের সঙ্গে দেখা করেন। নারী নির্যাতন আন্দোলনের মুখ হিসাবে সেখানকার বাসিন্দা রেখা মহাপাত্রকে বিজেপি প্রার্থীও করা হয়।

এরইমাঝে একটা ভিডিও প্রকাশ করে তৃণমূলের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, নারী নির্যাতনের ঘটনা আসলে ঘটেনি। রাজনৈতিক ফায়দার জন্য এই ইস্যুকে ব্যবহার করছে বিজেপি। যদিও গেরুয়া শিবির সেই অভিযোগ খারিজ করে।

নির্বাচনি বন্ড বাতিল

২০২৪ সালের উল্লেখযোগ্য ঘটনার মধ্যে একটা ছিল রাজনৈতিক দলগুলোকে বেনামে আর্থিক অনুদান দেওয়ার জন্য ব্যবহৃত 'নির্বাচনি বন্ড' বাতিলের নির্দেশ। ফেব্রুয়ারি মাসে ওই নির্দেশ দেয় সুপ্রিম কোর্ট।

নির্বাচনি বন্ড রাজনৈতিক দলগুলোকে অনুদান দেওয়ার একটা মাধ্যম যা ভারতের যে কোনও নাগরিক বা সংস্থা স্টেট ব্যাংক অফ ইন্ডিয়ার নির্বাচিত শাখাগুলো থেকে কিনতে পারেন এবং পছন্দের যে কোনও রাজনৈতিক দলকে বেনামে দান করতে পারেন।

আদালত জানিয়েছিল, ওই বন্ডের ব্যবহার রাজনৈতিক দলগুলোকে আর্থিক অনুদান দেওয়ার পরিবর্তে দাতাকে কিছু পাইয়ে দেওয়ার প্রবণতাকে উৎসাহ দিতে পারে।

আদালত এসবিআইকে কোন দল কার কাছ থেকে কত টাকা অনুদান পেয়েছে, তার তথ্য নির্বাচন কমিশনের হাতে তুলে দিতে বলে যা কমিশনের ওয়েবসাইটে প্রকাশও করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল, যে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান ওই নির্বাচনি বন্ড কিনেছে তার সঙ্গে যে দল ওই বন্ড ভাঙিয়েছে সম্পর্ক এবং এর পরিবর্তে সেই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কোনও বিশেষ সুবিধা পেয়েছিল কি না সেটা দেখা।

সংশ্লিষ্ট তথ্য প্রকাশ পাওয়ায় 'অস্বস্তিতে' পড়ে একাধিক রাজনৈতিক দল।

সুপ্রিম কোর্টের রায় অনুযায়ী, ২০১৭-১৮ থেকে ২০২২-২৩ সালের মধ্যে বিজেপি প্রায় ৬৫৬৬ কোটি রুপির নির্বাচনি বন্ড পায়। কংগ্রেস পেয়েছিল ১১২৩ কোটি এবং তৃণমূল কংগ্রেস ১০৯৩ কোটি রুপির বন্ড।

সিএএ আইন কার্যকর

বছরের আরও একটা উল্লেখযোগ্য ঘটনা ছিল সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন বা সিএএ কার্যকর করা। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর তীব্র বিরোধিতা সত্ত্বেও ১১ই মার্চ ভারত সরকার ঘোষণা করে যে সেইদিন থেকেই সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন চালু হতে চলেছে।

২০১৯ সালে পাশ করা হলেও ততদিনে আইনের ধারা বা রুল তৈরি হয়নি। সেই কাজ সম্পন্ন করে আইন বলবৎ করে সরকার।

সিএএ'র ধারায় বলা হয়, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, আফগানিস্তান থেকে সেদেশের সংখ্যালঘু হিন্দু, বৌদ্ধ, পার্শি, শিখ, জৈন ও খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীরা যদি ২০১৪ সালের ৩১শের ডিসেম্বরের আগে ভারতে চলে এসে থাকেন তাহলে তারা ভারতে নাগরিকত্বের জন্য অনলাইনে আবেদন করতে পারবেন।

এই আইন ঘিরে প্রথম থেকেই বিতর্ক ছিল। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীসহ একাধিক বিরোধী নেতার দাবি, সিএএ'র নিশানায় রয়েছেন সংখ্যালঘুরা। অন্যদিকে বিজেপির দাবি, এই আইন নাগরিকত্ব দেওয়ার, কেড়ে নেওয়ার জন্য নয়।

অরবিন্দ কেজরিওয়াল ও হেমন্ত সোরেনকে গ্রেপ্তার

আবগারী দুর্নীতির অভিযোগে মার্চ মাসে দিল্লির তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালকে গ্রেপ্তার করে কেন্দ্রীয় তদন্ত এজেন্সি এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট। প্রথমদিকে তার জামিন মঞ্জুর না হলেও পরে ভারতের লোকসভা নির্বাচনের আগে প্রচারের জন্য তিনি অন্তর্বর্তীকালিন জামিন পান। পরে সেপ্টেম্বর মাসে সুপ্রিম কোর্ট তাকে জামিন দেন।

মি. কেজরিওয়াল জেলে থাকা অবস্থাতেই মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছিলেন দলের নেত্রী অতিশী, পরে তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে সেই দায়িত্ব দেওয়া হয়।

অন্যদিকে ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চার নেতা হেমন্ত সোরেনকে জমি সংক্রান্ত বেনিয়মের জানুয়ারি মাসে অভিযোগে গ্রেপ্তার করে ইডি। এর আগে অবশ্য তিনি মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দেন এবং সেই দায়িত্ব নেন চম্পাই সোরেন। পরে হেমন্ত সোরেন জামিন পান। ক্রমে মুখ্যমন্ত্রী হন যা ভালোভাবে নেননি চম্পাই সোরেন এবং তিনি বিজেপিতে যোগ দেন।

প্রসঙ্গত, মি. কেজরিওয়াল এবং মি. সোরেনের গ্রেপ্তারের ঘটনাকে ঘিরে বিজেপিকে নিশানা করেছিল বিরোধী জোট ইন্ডিয়া। তারা অভিযোগ তোলে ভোটের আগে বিরোধী শূন্য ময়দান চাইছে বিজেপি।

ইন্ডিয়া-কানাডা সম্পর্কে উত্তেজনা

শিখ বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা হরদীপ সিং নিজ্জর হত্যার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইন্ডিয়া এবং কানাডার সম্পর্কে চিড় ধরেছিল যা ক্রমশ বেড়েছে। দুই দেশই একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছে। দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক বলতে গেলে তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে।

অক্টোবর মাসে নিজ্জর হত্যাকাণ্ডের তদন্তে সহযোগিতা না করার জন্য সরাসরি ভারত সরকারকে দায়ী করেছিলেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো। তার দাবি, সব প্রমাণ দেওয়া হয়েছে ভারতকে।

অন্যদিকে, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায় সমস্ত রকম সহযোগিতাতে প্রস্তুত ভারত। কিন্তু কানাডা যে অভিযোগ তুলছে তার সমর্থনে যথেষ্ট প্রমাণ দেওয়া হয়নি।

এই টানাপোড়েনের মাঝে তাদের দেশে অবস্থিত কানাডিয়ান মিশন থেকে ছয়জন কূটনীতিককে বহিষ্কার করে দিল্লি এবং কানাডা থেকে হাইকমিশনার-সহ অন্যান্য কূটনীতিকদেরও প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেয়। কানাডা পাল্টা বিবৃতিতে জানায়, ছয়জন ভারতীয় কূটনীতিককে তাদের পক্ষ থেকেই বহিষ্কার করা হয়েছে।

সম্পর্কের আরও অবনতি হয় যখন ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের বিরুদ্ধে কানাডায় খালিস্তান-বিরোধী অভিযানে 'অনুমোদন' দেওয়ার অভিযোগ তোলেন সে দেশের ডেপুটি ফরেন অ্যাফেয়ার্স মিনিস্টার (উপ-পররাষ্ট্র বিষয়ক মন্ত্রী) ডেভিড মরিসন।

এরপর নভেম্বর মাসে কানাডিয়ান গণমাধ্যমে শিখ বিচ্ছিন্নতাবাদী কানাডার নাগরিক হরদীপ সিং নিজ্জর হত্যার পরিকল্পনা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী জানতেন- এমন তথ্য প্রকাশ পায়। একথা খারিজ করে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায় ভারত।

পরে কানাডার জাতীয় নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা উপদেষ্টা নাথালি ড্রুইন তার বিবৃতিতে জানান- ভারতের প্রধানমন্ত্রী, বিদেশমন্ত্রী বা জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা কানাডার মাটিতে কোনও অপরাধমূলক কাজের সঙ্গে যুক্ত, এরকম কোনও প্রমাণ তাদের কাছে নেই।

লোকসভা নির্বাচন

২৯শে এপ্রিল শুরু হয় ভারতের লোকসভা নির্বাচন যা পহেলা জুন পর্যন্ত চলেছে। চৌঠা জুন নির্বাচনের ফল প্রকাশ হয়।

কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন নরেন্দ্র মোদীর সরকার লোকসভা ভোটে টানা তৃতীয়বার জিতলেও চিত্রটা এই বছর অন্যরকম ছিল। নির্বাচনি প্রচারে দলের জন্য লক্ষ্যমাত্রা বেঁধে দিলেও নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন বিজেপি 'আশানুরূপ' ফল করতে পারেনি। এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি দলটি।

গেরুয়া শিবিরের ঝুলিতে ছিল ২৪০টি আসন। সরকার গড়ার জন্য পার্লামেন্টে দরকার অন্তত ২৭২টি আসন। ক্ষমতায় থাকতে শরিক-নির্ভর সরকার গড়তে হয়েছে বিজেপিকে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে গেরুয়া শিবিরকে বিরোধীদের কটাক্ষের মুখেও পড়তে হয়েছে।

লোকসভায় প্রধান বিরোধী দল হিসাবে উঠে আসে কংগ্রেস। বিরোধী ইন্ডিয়া জোটের নির্বাচনি ফলও উল্লেখযোগ্য।

পশ্চিমবঙ্গে আরও একবার জয়ী হয় তৃণমূল কংগ্রেস। নির্বাচনি প্রচারে প্রধানমন্ত্রী মোদীর একাধিক সভা সত্ত্বেও বঙ্গে আশানুরূপ ফল করতে পারেনি বিজেপি।

ক্রীড়ায় সাফল্য

টি-২০ বিশ্বকাপ জয়, প্যারাঅলিম্পিক্সে পদকজয় থেকে শুরু করে দাবায় বিশ্বরেকর্ড গড়া––খেলার জগতে একাধিক উল্লেখযোগ্য ঘটনার সাক্ষী থেকেছে ভারত।

টি-২০ বিশ্বকাপ ফাইনালে দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারিয়ে জয়ী হয় ভারতীয় ক্রিকেট দল।

প্যারিস অলিম্পিক্সে রুপা ও ব্রোঞ্জ মিলিয়ে ছয়টা পদক জেতেন ভারতীয় অ্যাথলেটরা।

অন্যদিকে চীনা দাবাড়ু তিং লিরেন-কে হারিয়ে বিশ্বের সর্বকনিষ্ঠ দাবাড়ু খেতাব অর্জন করেন চেন্নায়ের গুকেশ ডোম্মারাজু।

ভারত-বাংলাদেশ উত্তেজনা

বাংলাদেশে তীব্র বিরোধিতার মুখে টিকতে না পেরে শেখ হাসিনা ভারতে চলে আসেন। এরপর থেকেই বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কে টানাপোড়েন দেখা গিয়েছিল। ক্রমে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কের অবনতি শুরু হয়।

বাংলাদেশে সম্মিলিত সনাতনী জাগরণ জোটের মুখপাত্র চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের গ্রেপ্তার ও সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার অভিযোগ ঘিরে কলকাতা, মুম্বাই, আসাম, ত্রিপুরা-সহ একাধিক জায়গায় মিছিল-সমাবেশ, ডেপুটেশন জমা দেওয়া, কুশপুত্তলিকা দাহ-সহ নানা ধরনের বিক্ষোভের ঘটনা ঘটে।

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, সে দেশে হিন্দু-সহ সংখ্যালঘুরা অসুরক্ষিত এই তথ্য ঠিক নয়, ভারতীয় গণমাধ্যমে বিষয়টিকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে উপস্থাপন করছে।

এরই মাঝে, আগরতলায় বাংলাদেশের সহকারী হাইকমিশনে হামলা, ভাঙচুর ও পতাকা নামিয়ে ছিঁড়ে ফেলার ঘটনার পর তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায় বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার। এই ঘটনার পর দুঃখ প্রকাশ করে বিবৃতি দেয় ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

অন্যদিকে, বাংলাদেশের একটা কলেজে ভারতের জাতীয় পতাকার অবমাননার অভিযোগ তোলা হয় ভারতের পক্ষ থেকে।

বছরের একেবারে শেষ দিকে এসে শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে আনতে ভারত সরকারের কাছে 'নোট ভার্বাল' পাঠানো হয়েছে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে। চিঠি পাওয়ার কথা স্বীকার করলেও আর কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি ভারত।

কলকাতায় নারী চিকিৎসককে ধর্ষণ ও খুন

কলকাতার আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে এক নারী চিকিৎসককে নয়ই অগাস্ট ধর্ষণ ও খুনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে তোলপাড় ওঠে রাজ্যজুড়ে। এর ঢেউ ভারতের সীমানা ছাড়িয়ে অন্য দেশেও দেখা যায়। এই ঘটনায় হাসপাতালে কর্মরত একজন সিভিক ভলান্টিয়ারকে গ্রেফতার করে কলকাতা পুলিশ।

কিন্তু তদন্তে গাফিলতি, তথ্য গোপনসহ একাধিক অভিযোগ তোলেন নিহতের পরিবার ও সতীর্থরা। ক্রমে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে মামলা গ্রহণ করে সুপ্রিম কোর্ট, মামলার তদন্ত সিবিআইকে দেওয়া হয়।

ধর্ষণ-খুনের ঘটনায় বিচার, কর্মরত অবস্থায় সুরক্ষা, পরিকাঠামোগত উন্নয়ন-সহ একাধিক দাবি জানিয়ে কর্মবিরতির সিদ্ধান্ত নেন ওই হাসপাতালের জুনিয়র চিকিৎসকরা। পরে প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অন্যান্য হাসপাতালের জুনিয়র চিকিৎসকরাও অংশ নেন।

আরজি কর হাসপাতালের তৎকালীন অধ্যক্ষ সন্দীপ ঘোষসহ একাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। পুলিশ ও স্বাস্থ্য দফতরের বিভিন্ন কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও বিভিন্ন অভিযোগ তোলেন আন্দোলনরতরা। তীব্র সমালোচনার মুখে পড়তে হয় তৃণমূল কংগ্রেসকে।

মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে আন্দোলনকারীদের একাধিকবার বৈঠক হয়। এরপর রিলে অনশনেও বসেন চিকিৎসকরা। পুলিশ ও স্বাস্থ্য দফতরের কর্মকর্তাদের রদবদল সহ আন্দোলনকারীদের একাধিক দাবি দাওয়া মেনে নেন মুখ্যমন্ত্রী। ক্রমে জুনিয়র চিকিৎসকদের কর্মবিরতিও ওঠে।

এই মামলা এখনও বিচারাধীন। এদিকে সিবিআইয়ের তদন্তে অখুশি নিহত পড়ুয়া-চিকিৎসকের পরিবার এবং সতীর্থরা। আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন মৃত চিকিৎসকের পরিবার। আবারও প্রতিবাদ কর্মসূচির কথা ভাবছেন চিকিৎসকরা।

আবার উত্তপ্ত মণিপুর

বছরজুড়ে একাধিকবার অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে মণিপুর। এক কুকি নারীকে হত্যার অভিযোগ, সিআরপিএফ জওয়ানের গুলিতে সশস্ত্র গোষ্ঠীর ১০ জন কুকি যুবকের মৃত্যু, তারপর নারী-শিশু মিলিয়ে ছয়জনের (মেইতেই গোষ্ঠীর) অপহরণ এবং পরবর্তীতে নদী থেকে তাদের মৃতদেহ উদ্ধারকে কেন্দ্র করে সে রাজ্যে নতুনভাবে হিংসা ছড়ায়।

নভেম্বর মাসে একাধিক মন্ত্রী ও বিধায়কের পদত্যাগ দাবি করে তাদের বাড়িতে হামলার ঘটনা প্রকাশ্যে আসে। বিক্ষুব্ধদের মোকাবিলা করতে নামানো হয় বিপুল পুলিশ বাহিনী।

তার আগে, সেপ্টেম্বর মাসে দফায় দফায় গুলি বিনিময়, বোমা বিস্ফোরণ, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হামলা, বেসামরিক নাগরিকের মৃত্যু, মণিপুর রাইফেলসের দু'টি ব্যাটেলিয়নের অস্ত্রাগার থেকে অস্ত্রশস্ত্র লুটের চেষ্টা-সহ একাধিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। এদিকে মণিপুরে কীভাবে অত্যাধুনিক অস্ত্র এবং ড্রোন কোথা থেকে আসছে তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মাঝে মণিপুরে রাজনৈতিক টানাপোড়েনও তুঙ্গে। সেখানে ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকারকে কটাক্ষ করছে বিরোধীরা। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী কেন পরিস্থিতি সামাল দিতে কেন সক্রিয় হচ্ছেন না সে নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে তারা। অন্যদিকে, বিজেপির দাবি, মণিপুরে শান্তি ফেরাতে সচেষ্ট সরকার।

যাদের হারাল ভারত

বিগত বছরে একাধিক কৃতী ব্যক্তিকে হারিয়েছে ভারত। সঙ্গীতশিল্পী উস্তাদ রশিদ খানের মৃত্যু হয় জানুয়ারি মাসে। প্রস্টেট ক্যান্সারের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে লড়ছিলেন তিনি। গজল শিল্পী পঙ্কজ উদাসের প্রয়াণ হয় ফেব্রুয়ারি মাসে।

ভারতের কমিউনিস্ট নেতা ও পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের মৃত্যু হয় অগাস্ট মাসে। দীর্ঘদিন অসুস্থ ছিলেন তিনি। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। সিপিআইএমের প্রবীণ নেতা তথা দলের সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরির মৃত্যু হয় ৭২ বছর বয়সে।

হাসপাতালে ভর্তি থাকার পর শিল্পপতি রতন টাটা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন অক্টোবর মাসে।

ডিসেম্বরে প্রয়াত হন তবলা বাদক জাকির হুসেন। ক্যালিফোর্নিয়ার সান ফ্রান্সিসকোয় এক হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন তিনি।

চলচ্চিত্র পরিচালক শ্যাম বেনেগালের মৃত্যু হয় ডিসেম্বর মাসের ২৩ তারিখে। বহু দিন ধরেই বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় ভুগছিলেন তিনি।

২৬শে ডিসেম্বর ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং মারা যান । দিল্লির হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি। বয়স হয়েছিল ৯২ বছর।

জম্মু কাশ্মীরে বিধানসভা ভোট

ভারতীয় রাজনীতির একটা উল্লেখযোগ্য ঘটনা ছিল জম্মু ও কাশ্মীরের বিধানসভা ভোট। এক দশক পর বিধানসভা নির্বাচন হয় সেখানে। এর আগে জম্মু ও কাশ্মীরে শেষবার বিধানসভা নির্বাচন হয়েছিল ২০১৪ সালে। ৩৭০ ধারার বিলুপ্তির পরে বিশেষ মর্যাদা হারানোর পর এটা ছিল প্রথম নির্বাচন।

ভোটে জম্মুও কাশ্মীর ন্যাশনাল কনফারেন্স, কংগ্রেস এবং কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া'র (মার্ক্সিস্ট) জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। আসন সংখ্যার দিক থেকে এদের মধ্যে এগিয়ে ছিল জম্মু ও কাশ্মীর ন্যাশনাল কনফারেন্স পার্টি। ওই দলেরই ওমর আব্দুল্লাহ মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

মন্দির-মসজিদ ইস্যু

বছরের শেষ দিকে বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে আসে ভারতের উত্তর প্রদেশের সম্ভলের শাহী জামা মসজিদ। গত ২৪শে নভেম্বর সকালে কার্যত রণক্ষেত্রের চেহারা নিয়েছিল শতাব্দী প্রাচীন শাহী জামা মসজিদ সংলগ্ন অঞ্চল।

মসজিদে দ্বিতীয় দিনের সমীক্ষাকে ঘিরে তীব্র উত্তেজনা দেখা দেয়। পুলিশ ও বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষে কমপক্ষে চার জনের মৃত্যু হয়।

হিন্দত্ববাদী সংগঠনের দাবি যে ওই মসজিদে এককালে মন্দির ছিল এবং ওই ভবনের স্থাপত্যে তার প্রমাণও রয়েছে। এই দাবিকে কেন্দ্র করে আদালতে মামলা দায়ের করেন আইনজীবী বিষ্ণু শঙ্কর জৈন।

মুসলিম পক্ষ ওই দাবি খারিজ করে বলা হয়, শতাব্দী প্রাচীন এই মসজিদে তারা বংশ পরম্পরায় নামাজ পড়ে এসেছেন, সেখানে মন্দির ছিল না।

এই বিতর্কের জেরে নিম্ন আদালত ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণকে সমীক্ষার নির্দেশ দেয়।

তবে ভারতের উপাসনাস্থল আইনের কয়েকটি ধারার বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে দায়ের হওয়া একাধিক আপিলের শুনানিতে সুপ্রিম কোর্ট সম্প্রতি জানিয়েছে, যতদিন এই আইনের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দায়ের করা আবেদনগুলোর শুনানি চলছে ততদিন নতুন কোনও মামলা করা উচিত নয়। নিম্ন আদালতকেও উপাসনাস্থলের অবস্থা নিয়ে কোনও ধরনের রায় বা নির্দেশ দিতেও নিষেধ করেছে সুপ্রিম কোর্ট।

বাবরি মসজিদ-রাম মন্দির বিতর্ক চলাকালীন ১৯৯১ সালে ভারতে উপাসনাস্থল আইন পাশ করা হয়েছিল।