নম্বর মিলিয়ে সন্তানের লাশ খুঁজছেন যে মা-বাবারা

    • Author, অমিতাভ ভট্টশালী
    • Role, বিবিসি বাংলা, বালাসোর

তফসিরের বয়স ১৬। ওর ভাই তৌসিফ বছর তিনেকের ছোট। বয়সের ফারাক অল্পই, কিন্তু ওদের নম্বরের ফারাক অনেকটাই। তফসিরের নম্বর ২০, আর তৌসিফের নম্বর ১৬৯।

ওদের দাদু মুহম্মদ নিজামুদ্দিন হঠাৎই বলে উঠলেন, “এই তো বাচ্চারা!”

বালাসোর জেলা হাসপাতালের দেওয়ালে ওদের দুই ভাইয়ের ছবি লাগানো ছিল আরও অনেক ছবির সঙ্গে। কোনও ছবির চেহারা কটা বিকৃত, আবার কারও মুখ স্পষ্ট।

তফসির আর তৌসিফ ওদের বাবা মুহম্মদ ভিখারির সঙ্গে চেন্নাই যাচ্ছিল। দুর্ঘটনাগ্রস্ত করমণ্ডল এক্সপ্রেসেই ছিল ওরা।

ওদের বাবা মুহম্মদ ভিখারির অবশ্য কোনও নম্বর নেই, কারণ তার দেহটাই খুঁজে পাওয়া যায় নি। যেরকম খুঁজে পাওয়া যায় নি সাত বছর বয়সী জাহিদা খানকেও।

জাহিদার মা শবনম বিবিকে দাফন করে ছোট্ট মেয়েকে খুঁজতে হাসপাতালে ফিরে এসেছিলেন ওর বাবা মুহম্মদ সরফরাজ আহমেদ।

“স্ত্রীকে দাফন করার জন্য হায়দরাবাদের বাড়িতেও নিয়ে যেতে পারলাম না। ভুবনেশ্বরেই কবর দিয়ে মেয়েকে খুঁজতে ফিরে এলাম এখানে,” বালাসোরের হাসপাতালে দাঁড়িয়ে বিবিসিকে বলছিলেন মি. আহমেদ।

একটু আগেই দেখেছি সরকারি কর্মকর্তাদের ল্যাপটপে অশনাক্ত মৃতদেহগুলির ছবি দেখছিলেন তিনি, যদি পাওয়া যায় মেয়েকে।

জাহিদা তার মা শবনম বিবির সঙ্গে কলকাতা থেকে বাড়ি ফিরছিল।

“ওদের একটা টিকিট ছিল এয়ার কণ্ডিশন্ড কোচে। কিন্তু সেটা কনফার্ম হয় নি। আরেকটা টিকিট কেটে দিয়েছিলাম এস১ বগিতে। ঘন্টা দেড়েক আগেও স্ত্রীর সঙ্গে কথা হয়েছিল। তারপরেই এই… “ কথা শেষ করার আগেই চোখে জল চলে এসেছিল মি. আহমেদের।

ট্রেন দুর্ঘটনার অভিঘাত করমণ্ডল এক্সপ্রেসের যে কয়েকটি বগিতে সবথেকে বেশি পড়েছিল, এস ১ বগিটা তার অন্যতম।

মি. আহমেদ স্ত্রীর সঙ্গে দুর্ঘটনার ঘন্টা দেড়েক আগে কথা বলেছিলেন, আর দুর্ঘটনার খবর পেয়েই বিহারের পুর্ণিয়া জেলার বাসিন্দা মুহম্মদ ভিখারির আত্মীয় পরিজনরা সমানে ফোন করছিলেন তার মোবাইল নম্বরে।

মি. ভিখারির এক আত্মীয় বলছিলেন, “শুক্রবার সারা রাত আমরা বারবার ওর মোবাইলে ফোন করে গেছি। শনিবার সকালে কেউ একটা ফোনটা ধরে বলে যে এই ফোনটা যার, তিনি মারা গেছেন, তাই আর ফোন করবেন না।“

তার ওই আত্মীয়র প্রশ্ন, “ফোনের মালিক যে মারা গেছে, এটা যখন বলা হল, তাহলে তার দেহটা কোথায় গেল!”

জাহিদার বাবাকে যেমন কর্মকর্তারা ভুবনেশ্বরে পাঠিয়ে দিলেন, তেমনই মুহম্মদ নিজামুদ্দিনদের পরিবারকেও সেখানে যাওয়ারই পরামর্শ দেওয়া হল বালাসোরের হাসপাতাল থেকে।

বালাসোরে এতগুলো মৃহদেহ সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেই, তাই সব দেহ পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে রাজধানী শহরে।

তবে মুহম্মদ নিজামুদ্দিনদের ব্যাপারে হঠাৎই একটা প্রশ্ন তুললেন এক সরকারি কর্মকর্তা।

তারা যে ২০ নম্বর দেহটা তফসির আনসারির বলে দাবি করছেন, সেটা তো ঘন্টা তিনেক আগে আরেক পরিবার তাদের আত্মীয়র দেহ বলে দাবি জানিয়ে গেছে!

“কী করে এটা সম্ভব! আমি কি আমার নাতিদের চিনতে পারব না?” বলছিলেন মুহম্মদ নিজামুদ্দিন।

বয়স্ক মানুষটিকে শান্ত করার চেষ্টা করছিলেন হাসপাতাল কর্মকর্তারা। তারা বললেন, “আপনারা ভুবনেশ্বরে যান। আমরাই গাড়ির ব্যবস্থা করছি। ভুবনেশ্বর পৌর কর্পোরেশনের কর্মকর্তারা থাকবেন সেখানে। তারা আপনাদের আর অন্য পরিবারটির দাবি খতিয়ে দেখবেন। প্রয়োজন মনে করলে ডিএনএ পরীক্ষাও করা হবে।“

মুহম্মদ নিজামুদ্দিন আর তার আরেক আত্মীয় তাবরেজ আলম মেনে নিলেন কর্মকর্তাদের কথা।

মি. আলম বিবিসিকে বললেন, “আমাদের ছেলে তো মুসলমান। ওর সুন্নত করা আছে কী না, সেটা দেখলেই তো বোঝা যাবে। আর যদি দরকার হয়, তাহলে ডিএনএ পরীক্ষা করাতেও রাজি আমরা।“

কিন্তু অন্য যে পরিবারটি ২০ নম্বর দেহটি তাদের আত্মীয়র বলে দাবি করে গেছে, তারা কারা?

সরকারি নথিতে লেখা আছে ২০ নম্বর দেহটি শুকলাল মারাণ্ডির বলে দাবি করা হয়েছে আগেই।

মি. মারাণ্ডির বয়স ২০, বাড়ি ঝাড়খণ্ড রাজ্যের দুমকা জেলায়।

নথিতে লেখা ছিল বেটকা মারাণ্ডি নামে একজন শনাক্ত করেছেন শুকলাল মারাণ্ডির দেহটা। একটা ফোন নম্বরও দেওয়া ছিল হাসপাতালের খাতায়।

ওই নম্বরে ফোন করেত অনিল মারাণ্ডি নামে একজন ধরলেন ফোনটা। তারা তখনও বালাসোর থেকে ভুবনেশ্বরের রাস্তায়।

তাদের শনাক্ত করে যাওয়া দেহটির যে আরেকজন দাবিদার এসেছেন, সেটা জানতেন না মি. মারাণ্ডি।

তবে তিনি বললেন, “আমরা তো শুধু ছবিই দেখেছি। মনে হয়েছিল যে ওটা আমাদের শুকলালের মুখ। কিন্তু হতে পারে আমাদেরও ভুল হয়েছে কোথাও। আসল দেহটা ভুবনেশ্বরে গিয়ে দেখলে নিশ্চিত হওয়া যাবে।“

একই দেহের দুটি দাবিদার বালাসোর হাসপাতালে এই প্রথম।

একজন নারী কর্মকর্তা, যিনি নিজের নাম বলতে চাইলেন না, তিনি বলছিলেন, “একটি দেহের একাধিক দাবিদার হলে যেটা করা হবে, দেহটি সব দাবিদার পরিবারের সামনে রাখা হবে। সেখানে ভুবনেশ্বর পৌর কর্পোরেশনের কর্মকর্তারা থাকবেন। তারা দাবিদার পরিবারগুলির নথি, ছবি সব পরীক্ষা করে দেখবেন। তারাই ঠিক করবেন যে ডিএনএ পরীক্ষার দরকার আছে কী না।“

সেই সব পরীক্ষার আগে ২০ নম্বর দেহটি আসলে কার, তা জানা সম্ভব নয়।

যেমন জানা যায় নি, দুই আনসারি ভাইয়ের বাবা অথবা শিশু জাহিদার দেহ কোথায় গেল, সেটাও।