বাংলাদেশে বই নিয়ে আলোচনা শুধু অমর একুশে গ্রন্থমেলা কেন্দ্রিক কেন

অমর একুশে গ্রন্থমেলা

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, অমর একুশে গ্রন্থমেলা
    • Author, সানজানা চৌধুরী
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা

বাংলাদেশে নতুন বই প্রকাশ, নতুন লেখকদের আবির্ভাব, বই বেচা কেনা এবং বইকে ঘিরে নানা আলোচনা থাকে মূলত ফেব্রুয়ারির অমর একুশে গ্রন্থমেলা কেন্দ্রিক। এর বাইরে সারা বছর নতুন বইয়ের তেমন দেখা পাওয়া যায় না। শুধু বইমেলার সময় এলেই বই প্রকাশের হিড়িক পড়ে যায়।

প্রকাশকদের মতে, সারাবছর যে পরিমাণ নতুন বই প্রকাশ হয় তার মধ্যে ৯০ ভাগ হয় এই বইমেলাকে টার্গেট করে।

সে হিসেবে বলা যায়, দেশটির পুরো প্রকাশনা শিল্প বছরের এই নির্দিষ্ট সময়কে ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে। এর পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য দিয়েছেন লেখক-প্রকাশকরা।

প্রকাশকরা বলছেন, তারা সারা বছর বই ছাপাতে চাইলেও বেশিরভাগ লেখক ফেব্রুয়ারিকে ডেডলাইন ধরে বইয়ের পাণ্ডুলিপি দেন। এ কারণে অধিকাংশ প্রকাশক সারা বছর অলস সময় কাটালেও অক্টোবর থেকে তাড়াহুড়ো করে বই সম্পাদনা ও ছাপা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন।

একেকটি প্রকাশনী সংস্থা বইমেলায় প্রতিযোগিতামূলকভাবে বেশি বেশি সংখ্যক বই প্রকাশ করতে থাকে।

অন্যদিকে লেখকরা বলছেন, তারা সারা বছর ধরেই লেখালেখি করেন। পাণ্ডুলিপি যখনই জমা দিন না কেন বেশিরভাগ প্রকাশক বছরের অন্য সময় লেখা ছাপাতে চান না। তারা ফেব্রুয়ারি মাসেই বই প্রকাশ করতে চায়।

অমর একুশে গ্রন্থমেলায় মেলায় বই বিক্রি এবং মোটা অংকের ব্যবসার সুযোগ থাকায় প্রকাশকরা এই উৎসবকে টার্গেট করে বই ছাপাতে আগ্রহী বলে লেখকরা জানিয়েছেন।

লেখক প্রকাশকদের মতে, গণমাধ্যমে বইগুলোর রিভিউ নিয়মিত প্রকাশ না পাওয়া, বই নিয়ে লেখালেখির ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের পক্ষপাতমূলক অবস্থান সেইসাথে বাংলাদেশে বেস্ট সেলিং বা সর্বোচ্চ পঠিত বইয়ের তালিকা প্রকাশের সংস্কৃতি গড়ে না ওঠায় সারা বছর ধরে বই পড়ার চর্চা ধরে রাখা যাচ্ছে না।

আরও পড়তে পারেন
বইপড়া

ছবির উৎস, Getty Images

যথার্থ বই বোঝার মানদণ্ড নেই

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী কাজী সিন্থিয়া উপন্যাস, ছোটগল্প ও কবিতা পড়তে পছন্দ করেন, সেইসাথে গবেষণাধর্মী বইয়ের প্রতিও রয়েছে তার আগ্রহ।

তার বইয়ের কেনাকাটা মূলত হয়ে থাকে এই অমর একুশে গ্রন্থমেলা থেকে।

তবে গত কয়েক বছর ধরে বই কিনতে গিয়ে নানা বিভ্রান্তির মুখে পড়ার কথা জানান তিনি।

মিস সিন্থিয়া বলেন, “বছরের মূল বইগুলো বইমেলা থেকেই কিনি। মেলায় বইগুলো নেড়েচেড়ে দেখে, ফেসবুকে রিভিউ দেখে একটা আইডিয়া পাওয়া যায়। কিন্তু অন্য সময় নতুন বই নিয়ে কোন আলোচনা হয় না। তাই কনফিউজড থাকি। অনলাইনে কেনা হয়, কিন্তু বেশিরভাগই বিদেশি বইয়ের অনুবাদগুলো।”

নিউইয়র্ক টাইমস, বার্নস অ্যান্ড নোবেল, অ্যামাজন ডট কম - এমন বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম প্রতিবছর বেস্ট সেলিং বইয়ের একটি তালিকা প্রকাশ করে থাকে। সেখানে বইয়ের সংক্ষিপ্তসার দেয়া থাকে যা দেখে পাঠকদের মানসম্মত বইটি বেছে নেয়া সহজ হয়। তবে সেগুলো ইংরেজি ভাষায় লেখা বা ইংরেজিতে অনূদিত বই।

আবার কমপ্লিট রিভিউ, গুড রিডস রিভিউ, স্কুল লাইব্রেরি জার্নাল, অ্যাডরয়েট জার্নালসহ বিভিন্ন ওয়েবসাইট ও পত্রিকা নিয়মিত বইয়ের নির্ভরযোগ্য রিভিউ প্রকাশ করে থাকে। সারা বছর ধরে সেগুলো পড়েও পাঠকরা ধারণা নিতে পারেন যে কোন বইটি তার জন্য কেনা যথার্থ হবে।

পশ্চিমা দেশে সারা বছরই বই প্রকাশ হয়, বিভিন্ন পত্রিকায় সেগুলো রিভিউ আসে। বেস্ট সেলার বইগুলো সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে যায়, সেগুলোর বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়।

কিন্তু বাংলাদেশে আজ পর্যন্ত বেস্ট সেলারের তালিকা বের করার মতো নির্ভরযোগ্য কোন প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা গড়ে ওঠেনি। এক্ষেত্রে গণমাধ্যম, লেখক ও প্রকাশকদের সারা বছর সম্মিলিত প্রচেষ্টার প্রয়োজন বলে জানান, অন্বেষা প্রকাশনীর প্রকাশক শাহাদাত হোসেন।

বই বিক্রেতা

ছবির উৎস, Getty Images

বুক রিভিউ অপ্রতুল, হলেও প্রশ্নবিদ্ধ

বাংলাদেশে আশি ও নব্বইয়ের দশকে সাহিত্য পত্রিকাগুলোয় নিয়মিত বইয়ের রিভিউ ছাপানো হতো, বড় বড় লেখকরা তরুণদের লেখা পড়ে রিভিউ দিতেন। দিনে দিনে সেই চর্চা সংকুচিত হয়ে এসেছে বলে মনে করেন অন্যপ্রকাশের নির্বাহী মাজহারুল ইসলাম।

যে কয়েকটি পত্রিকা বা গণমাধ্যম বইয়ের রিভিউ প্রকাশ করে থাকে সেগুলোর নিরপেক্ষতা নিয়েও তার প্রশ্ন রয়েছে। এ কারণে পাঠকরা প্রায়শই মানসম্মত নতুন বই সম্পর্কে কোনও তথ্য পান না।

মি. ইসলাম বলেন, “মিডিয়াতে এখন আর নিয়মিত বুক রিভিউ হয় না। হাতে গোনা যে কয়েকটি পত্রিকা রিভিউ দেয়, সেখানে তাদের পছন্দের লোক স্থান পায়। এখন সাংবাদিকরাই লেখক। ফলে তাদের বই কিংবা তাদের পছন্দের গ্রুপের লেখা প্রচার পায়। বইয়ের মান বিচার করে রিভিউ আর হচ্ছে না।”

এ ব্যাপারে অনন্যা প্রকাশনীর কর্ণধার মনিরুল হক জানান, আগে সাহিত্য পাতার সাংবাদিক ও সম্পাদকরা বেশ প্রজ্ঞাবান ছিলেন। সারাবছর তারা বই পড়ে মানসম্মত রিভিউ লিখতেন। এতে ভালো লেখকরাও উঠে আসতো আবার পাঠকরাও একটা গাইডলাইন পেতেন।

বর্তমানে সাহিত্য পাতা বা সাহিত্য পত্রিকা যারা কাজ করছেন তাদের সাহিত্য বোধ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।

মি. হক বলেন, “একসময় বিচিত্রা পত্রিকায় ভালো ভালো বইয়ের রিভিউ হতো। বিচিত্রায় কোন বইয়ের রিভিউ হওয়া মানে বিশাল ব্যাপার ছিল। লেখকরা ব্যাপক পরিচিতি পেতেন। বইয়ের বিক্রি বেড়ে যেতো। আগে সাহিত্য সম্পাদকরা প্রচুর বই পড়তেন, সেখান থেকে সেরা বইটি রিভিউ হতো। এখন এমনটা নেই।”

নতুন বই রিভিউয়ের অভাবে নতুন লেখকরা আলোচনায় আসছেন খুব কম। বরং যাদের লেখা কয়েক দশক ধরে পাঠক পড়ে আসছেন, তদের লেখাই এখনো বাজার দখল করে রেখেছে।

বিভিন্ন বয়সী পাঠক

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, বিভিন্ন বয়সী পাঠক
বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন

লেখক-প্রকাশকদের আগ্রহ মেলাকে ঘিরে

বর্তমানে চট্টগ্রাম ও খুলনা জেলায় গ্রন্থমেলার আয়োজন করা হলেও বাংলা একাডেমীর আয়োজনটির মতো কোনটি এতোটা জনপ্রিয়তা পায়নি।

তাই, প্রকাশক লেখক পাঠকদের দৃষ্টি থাকে ওই মেলা কেন্দ্রিক। বই প্রকাশ করার সব পরিকল্পনা সাজানো হয় এই মেলাকে সামনে রেখে। ফলে দেখা যায় সারা বছর নতুন বই প্রকাশিত হচ্ছে খুব কম।

কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন বলছেন, বাংলাদেশে বই ব্যবসা গত দশ-পনেরো বছর ধরে শুধুমাত্র মেলা কেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে।

তবে সত্তর ও আশির দশকের চিত্র ছিল ভিন্ন সে সময়ে তিনি ও সমসায়মিক সময়কার লেখকরা প্রায় প্রতিমাসেই বই প্রকাশ করতেন। এভাবে বছরে ১০-১২টি বই লেখা হতো।

সেই বইগুলো মেলার বাইরেও বছরের অন্যান্য সময় বাংলাবাজার নাহলে নিউমার্কেটের বইয়ের দোকানে বিক্রি হতো।

সারা দেশ থেকে খুচরা বিক্রেতারা বাংলাবাজার থেকে বইগুলো পাইকারি দরে কিনে নিয়ে বিক্রি করতেন।

অর্থাৎ সারাবছর ধরে বই প্রকাশ হতো। মেলা উপলক্ষে বিশেষ কয়েকটি বই থাকতো। সেইসাথে সারা বছরে ছাপা বইগুলো জায়গা পেতো। কিন্তু এখন সেখানে আমূল পরিবর্তন দেখছেন মি. হক।

তিনি বলেন, “আমরা এখনও সারা বছর ধরে লিখি। কিন্তু পাণ্ডুলিপিগুলো অলস পড়ে থাকে। যখনই ফেব্রুয়ারির অমর একুশে গ্রন্থমেলার সময় আসে, তখনই প্রকাশকরা হুড়োহুড়ি করে নভেম্বর/ ডিসেম্বরে সেগুলো ছাপতে শুরু করেন। এ কারণে সারা বছর বইয়ের তেমন কেনাবেচা হয় না। যেটুকুই বিক্রি হয়, সেটা বইমেলায়। এই প্রবণতা পৃথিবীর কোথাও নেই।”

এক্ষেত্রে প্রকাশকদের ব্যবসায়িক মনোভাবকে দায়ী করে তিনি বলেন, “প্রকাশকরা একটা বইয়ের পেছনে যে পরিমাণ লগ্নি করেন, মেলার কারণে মাস শেষে পুরো লভ্যাংশ তাদের হাতে চলে আসে। যেহেতু প্রচারণা বেশি। কিন্তু বছরের অন্য সময় এমনটা হয় না।”

অবশ্য উল্টো কথা বলছেন অনন্যা প্রকাশনীর কর্ণধার মনিরুল হক। তার মতে, লেখকরাও ফেব্রুয়ারির জন্য বসে থাকেন। পাণ্ডুলিপি রেডি থাকলেও প্রকাশকদের দেন না।

“আমরা তাদেরকে আগেভাগে লেখা দিতে বলি। কিন্তু তারা ফেব্রুয়ারির আগে দিতে চান না। কারণ মেলাতেই বইয়ের কাটতি বেশি হয়। পাঠকদের সাথে সংযোগ হয়। মিডিয়া কভারেজ থাকে।” তিনি বলেন।

আবার পাঠকদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের ওপরও জোর দিয়েছেন তিনি।

তিনি জানান, বাংলাদেশের বেশিরভাগ পাঠক ফেব্রুয়ারিতে কি বই এলো সেটাই খোঁজেন। জানুয়ারিতে প্রকাশিত বইটিকেও তারা বলেন পুরনো। কিনতে চান না। এটাও একটা সংকট।

মেলায় লেখক ও পাঠকদের যোগাযোগের সুযোগ সৃষ্টি হয়।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, মেলায় লেখক ও পাঠকদের যোগাযোগের সুযোগ সৃষ্টি হয়।

বইয়ের প্রকাশ হচ্ছে দেদারসে

অমর একুশে গ্রন্থমেলায় প্রতিবছর গড়ে চার থেকে পাঁচ হাজার বই প্রকাশ হয়ে থাকে। একে “অস্বাস্থ্যকর ব্যাপার” বলে মন্তব্য করেছেন মি. হক। কারণ সব বই মানসম্পন্ন নয়।

এক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাহিত্য অঙ্গনে সম্পাদক পরিষদের বড় অভাবকে দুষছেন তিনি।

“নতুন লেখকদের মধ্যে দুই একজন ছাড়া কারও লেখা বা ভাষা প্রয়োগের ন্যূনতম কোন মান নেই। সেই বইগুলোর মান যাচাই বাছাই করার মতো বেশিরভাগ প্রকাশনার কোন ‘সম্পাদক পরিষদ’ নেই। এ কারণে আপনি যা দেবেন, তাই বই হয়ে বেরোচ্ছে। এতে ভালো লেখকরা চাপা পড়ে যাচ্ছেন। পাঠকদের ঠকানো হচ্ছে।” বলেন মি. হক।

এ নিয়ে অনন্যা প্রকাশনীর কর্ণধার মনিরুল হক বলেন, “আগে আহসান আল হাবিব, আবুল হাসনাত, শামসুর রহমানের মতো পণ্ডিত ব্যক্তিরা সাহিত্য সম্পাদক ছিলেন, এখন সেখানে খুব দৈন্যদশা। নতুনদের গুনগত মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ”

আবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বুক রিভিউয়ের স্বচ্ছতা নিয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন লেখক প্রকাশকরা।

আবার, ফেসবুকে যারা বই রিভিউ দিচ্ছেন সেগুলো ভরসা করার মতো না। বেশিরভাগই লেখকদের কাছের লোক। এতে পাঠকরা বিভ্রান্ত হন। সোশ্যাল মিডিয়ায় কাউকে নিয়ে খুব আলোচনা দেখে বই কিনে পাঠকরা হতাশ হচ্ছেন। এটি সাহিত্যের জন্য মঙ্গলজনক নয় বলে তারা মনে করেন।

এ ব্যাপারে পাঠক কাজী সিন্থিয়া বলেন, “এখন অনেকের রিকোয়েস্টে বই কিনতে হয়। আবার ফেসবুকে ভালো রিভিউ দেখেও কিনেছি। কিন্তু দুঃখজনকভাবে বেশিরভাগ বই কিনেই ঠকতে হয়েছে। আসলে কনফিউজড থাকি, প্রত্যেকটা স্টলে অনেক নতুন বই। কোনটা যে ভালো, বোঝার উপায় নাই। ”

যাদের লেখা কয়েক দশক ধরে পাঠক পড়ে আসছেন, তদের লেখাই এখনো বাজার দখল করে রেখেছে।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, যাদের লেখা কয়েক দশক ধরে পাঠক পড়ে আসছেন, তদের লেখাই এখনো বাজার দখল করে রেখেছে।

পুস্তক বিমূখ সংস্কৃতি

বাংলাদেশে বই শুধু অমর একুশে গ্রন্থমেলায় কেনাবেচা হয় এটি মানতে নারাজ লেখক আনিসুল হক। তার মতে, বই সারাবছর একই হারে অনলাইনেও বিক্রি হয়। সেখানও সারা বছর ২৫% কমিশন পাওয়া যায়।

তার মতে, যারা প্রকৃত পাঠক তারা সাহিত্য পত্রিকা পড়েন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখক পাঠকদের বিভিন্ন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে, অন্য পাঠকদের থেকে খোঁজখবর করে মানসম্মত বইয়ের তথ্য তারা আগেই পেয়ে যান।

তবে নতুন প্রজন্মের অনেকে যারা প্রথম বইমেলায় এসেছেন বা বইমেলার সংস্কৃতির সাথে নতুন পরিচিত তারা হয়তো বুঝতেও পারেন না কোন বইটা কিনবেন।

এক্ষেত্রে সারা বছর ধরে বই বিক্রির চাইতে সারা বছর ধরে বইয়ের পাঠক গড়ে তোলার ওপর জোর দিয়েছেন তিনি।

আনিসুল হক বলেন, বিদেশি মানুষরা চলতি পথে বই পড়েন। সেখানে বাংলাদেশের মানুষ পুস্তক বিমুখ হয়ে পড়েছে, সার্বিক শিক্ষা ব্যবস্থার অবনমনের কারণে। বইমেলা তাদের সবাইকে বই পড়ার উপলক্ষ তৈরি করে দিলেও এখন দরকার বইয়ের পাঠক তৈরি করা। এজন্য পরিবার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগী হওয়া প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।

এ ব্যাপারে কথা সাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন জানান, “একসময় ঘরে ঘরে বইয়ের আলমারি ছিল। পাড়ায় পাড়ায়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠাগার ছিল, ছোট পরিসরে মেলা হতো। এগুলো নিঃশব্দে আমাদের সমাজ থেকে উঠে গিয়েছে। এই সংস্কৃতি পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন বলে তিনি জানান।

এদিকে গ্রন্থমেলা শুধুমাত্র ঢাকা-কেন্দ্রিক না রেখে জেলা উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত ছড়িয়ে দিলে সারা বছর বই নিয়ে আলোচনা জিইয়ে রাখা সম্ভব বলে মনে করছেন অন্বেষা প্রকাশনীর প্রকাশক শাহাদাত হোসেন।

তিনি জানান, নতুন বই কেনার আগে মানুষ সেটা দেখে কিনতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে । বইমেলা ছাড়া বইকে নেড়েচেড়ে দেখার সুযোগ নেই। তাই বইমেলা জেলা উপজেলা পর্যায়ে ছড়িয়ে দিতে হবে।

“লেখকরা সারা বছর লেখা দেন না। মেলার জন্য ফেলে রাখেন। প্রকাশকরাও ফেব্রুয়ারির মেলার ওপরেই নির্ভর করে। কিন্তু বই প্রদর্শনী বছর জুড়ে হলে সারা বছর বই বের করার সুযোগ সৃষ্টি হবে। আমাদের বড় উৎসবগুলোয় নতুন বই প্রকাশ করার চেষ্টা করতে হবে।” তিনি বলেন।

গ্রন্থমেলায় পাঠকদের ভিড়।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, গ্রন্থমেলায় পাঠকদের ভিড়।

সেইসাথে প্রতিটি প্রকাশনী সংস্থার একটি সম্পাদনা পরিষদ থাকা দরকার যারা মানসম্মত বই যাচাই বাছাই করে তবেই প্রকাশ করবেন।

প্রকাশকদের তাগিদ দিয়ে ইমদাদুল হক বলেন, শুধু ফেব্রুয়ারি মাসে বই বিক্রি করে লাভ করবেন, এই লাভের আশায় বসে না থেকে সারা বছর ধরে বই প্রকাশ ও প্রচার করা প্রয়োজন। এখনও বড় বড় কয়েকটি প্রকাশনা সংস্থা তা করে।

গণমাধ্যমে বইয়ের নিয়মিত রিভিউ ও নিম্ন রেটে বিজ্ঞাপনের সুযোগ সৃষ্টির ব্যবস্থার কথা বলছেন তিনি।

এক্ষেত্রে গণমাধ্যমকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের তাগিদ দিয়েছে অন্যপ্রকাশের নির্বাহী মাজহারুল ইসলাম।

তার মতে, গণমাধ্যমও শুধু ফেব্রুয়ারির মেলাকে ঘিরে বইয়ের প্রচারণা করে থাকে। মিডিয়ার কভারেজের কারণে মানুষ নতুন বইয়ের ব্যাপারে জানতে পারে, কিনতে আগ্রহী হয়।

এক্ষেত্রে সারা বছর বইয়ের ব্যাপারে পাঠকদের আগ্রহী করতে গণমাধ্যম নিয়মিত বইয়ের রিভিউ ছাপানোর ওপর জোর দেন তিনি। তাহলে মেলার বাইরেও পাঠকরা অনলাইন থেকে বই কিনতে পারেন।

সেইসাথে সারা বছর বই প্রকাশ অব্যাহত রাখতে কাগজের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং ভর্তুকি দেয়া প্রয়োজন বলেও লেখক প্রকাশকরা একমত জানিয়েছেন।

বাংলা একাডেমী প্রাঙ্গণ

ছবির উৎস, Bangla Academy

ছবির ক্যাপশান, বাংলা একাডেমী প্রাঙ্গণ

বইমেলা যেভাবে শুরু হয়েছে

বাংলাদেশে প্রকাশনা ব্যবসার বিস্তৃতি মূলত ষাটের দশক থেকে। সেই সময়ে প্রথম বইমেলা অনুষ্ঠিত হয়। তবে সেটি ছিল শিশু গ্রন্থমেলা।

প্রয়াত কথাসাহিত্যিক জাতীয় গ্রন্থ কেন্দ্রের সাবেক পরিচালক সরদার জয়েনউদদীনের হাত ধরে ১৯৬৫ সালে শুরু হয় ওই বইমেলার যাত্রা।

যেটি তৎকালীন কেন্দ্রীয় পাবলিক লাইব্রেরির (বর্তমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরি) নিচতলায় অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

বাংলা একাডেমীর সাবেক মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খানের নিবন্ধ থেকে এমন তথ্য জানা যায়।

তবে বাংলা একাডেমী প্রাঙ্গণে বইমেলার যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৭২ সাল থেকে। ইউনেস্কো ওই বছরকে ‘আন্তর্জাতিক গ্রন্থবর্ষ’ হিসেবে ঘোষণা করে সরদার জয়েনউদদীন ওই বছর ডিসেম্বর মাসে বাংলা একাডেমী প্রাঙ্গণে একটি আন্তর্জাতিক গ্রন্থমেলার আয়োজন করেন।

সেইবার মুক্তধারা প্রকাশনীর চিত্তরঞ্জন সাহা, বর্ণ-মিছিলের তাজুল ইসলামসহ সাত-আটজন প্রকাশক বইয়ের পসরা সাজিয়ে বসেছিলেন।

এরপর ১৯৭৪ সালে বাংলা একাডেমীর উদ্যোগে বিশাল জাতীয় সাহিত্য সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।

ধীরে ধীরে বাংলা একাডেমীতে বইমেলা আয়োজনের জন্য গ্রন্থমনস্ক মানুষের চাপ বাড়তে থাকে।

মূলত আশির দশকে বাংলাদেশের ছোট-বড় প্রকাশনা সংস্থা আত্মপ্রকাশ করে, যাদের অনেকে প্রায় প্রতিবছরই অনেক উল্লেখযোগ্য বই প্রকাশ করতে থাকে।

তারই ধারাবাহিকতায় যখন বাংলা একাডেমীর সাবেক মহাপরিচালক ১৯৮৩ সালে কাজী মনজুরে মওলা প্রথম ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’র আয়োজন সম্পন্ন করেন।

উনিশশো চুরাশি সাল থেকে সাড়ম্বরে অমর একুশে গ্রন্থমেলার সূচনা হয়। এরপর প্রতিবছর বইমেলা বিশাল থেকে বিশালতর আকার ধারণ করে। বাংলা একাডেমী চত্বরে স্থান সংকুলান না-হওয়ায় ২০১৪ সাল থেকে বইমেলা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সম্প্রসারণ করা হয়।