অবহেলিত, বঞ্চিত শিশুদের কাছে যেভাবে 'স্যার' হয়ে উঠলেন কলকাতার এক যুবক

কয়েকজন শিশুর সঙ্গে পথিকৃৎ সাহা

ছবির উৎস, Pathikrit Saha

ছবির ক্যাপশান, বছর দশেক আগে নতুন পথ চলা শুরু কলকাতার পথিকৃৎ সাহার
    • Author, রূপসা সেনগুপ্ত
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, কলকাতা

"লোকে বলত, এরা প্ল্যাটফর্মে ভিক্ষা করে। কিছুদিন পর নেশা করবে, কুসঙ্গে পড়বে- এটাই স্বাভাবিক," এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলছিলেন উত্তর কলকাতার পথিকৃৎ সাহা।

"এও বলত, লেখাপড়া করেও খুব বেশি হলে কী হবে- মেয়ে হলে কারো বাড়িতে কাজ করবে, আর ছেলেরা মিস্ত্রি হবে!"

একইসঙ্গে পথিকৃৎ সাহা বলেন, "লোকের এই ভাবনাগুলো আমাকে ধাক্কা দিত। শুধু অর্থের অভাবে এই বাচ্চারা লেখাপড়া করতে পারবে না, ভবিষ্যৎ নষ্ট হবে- এটা মেনে নিতে পারিনি।"

মেনে নিতে পারেননি বলেই দশ বছর আগে দমদম ক্যান্টনমেন্ট রেলওয়ে স্টেশনে বসে সেখানকার শিশুদের পড়াতে শুরু করেন তিনি।

প্রথম ছাত্র ছিল বছর এগারো বছর বয়সী বুধো। সেই সময় প্ল্যাটফর্মে ভিক্ষা করত ওই শিশু।

মি. সাহার কথায়, "আমি নিজে সাধারণ পরিবারের ছেলে। স্ট্রাগল কাকে বলে আমার জানা। কিন্তু এই বাচ্চারা রোজকার জীবনে যে ধরনের সমস্যার মুখে পড়ে, তা কল্পনা করা যায় না।"

"আমি বুঝতে পেরেছিলাম একবেলা খাবার বা একটা জামা কিনে দিলে কিছু হবে না। এর ওয়ান-টাইম সলিউশন বলে কিছু নেই। একমাত্র উপায় হলো শিক্ষা।"

পথিকৃৎ সাহার সঙ্গে খুদে পড়ুয়ারা।
ছবির ক্যাপশান, দমদম ক্যান্টনমেন্টের পাঠশালায় পড়াশোনায় ব্যস্ত শিশুরা

কথাগুলো তিনি বলছিলেন দমদম ক্যান্টনমেন্ট স্টেশন লাগোয়া একটা ছোট্ট ক্লাবঘরে বসে। এ তল্লাটে তিনি 'স্যার' বলেই পরিচিত, আর এই ছোট্ট ঘর এই শিশুদের 'পাঠশালা'।

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

ক্লাবঘরের ভেতরে উঁকি মারতেই চোখে পড়ল, বিভিন্ন বয়সের পড়ুয়াদের। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে রয়েছে চতুর্থ শ্রেণির এক ছাত্র, ঢোকার মুখেই স্যারের প্রশ্নের মুখে পড়েছে সে। গত কয়েকদিন পড়তে না আসার কারণ না বলা পর্যন্ত ছাড় নেই।

শিক্ষককে 'কড়া' প্রশ্নোত্তর পর্বে ব্যস্ত দেখে তার চোখ এড়িয়ে ঘরে ঢোকার চেষ্টা করছিল আরেক শিশু। বয়স টেনেটুনে চার, পিঠে একটা বড় ব্যাগ। কিন্তু স্যারের চোখ এড়ানো সহজ নয়। সটান তাকে উদ্দেশ্য করে প্রশ্ন ধেয়ে আসে, "আজ এত দেরি কেন…পাঁচটা বেজে গেছে?"

শেষপর্যন্ত এই দুই পড়ুয়াকে ইশারায় ঘরের ভেতরে আসার অনুমতি দেন তিনি। তারপর একটু হেসে পথিকৃৎ সাহা বলেন, "আসলে এই বাচ্চাদের মধ্যে কামাই করার, ড্রপআউট (স্কুলছুট) হওয়ার প্রবণতা খুব বেশি। তাই একটু শাসন করতে হয়।"

যে পড়ুয়ারা এখানে আসে, তারা প্রায় সকলেই স্টেশনের আশপাশে থাকে।

"এদের কোনও মতে দিন চলে। কারো বাড়িতে দেখাশোনা করার মতো কেউ নেই, কারো বাবা রাতে নেশাগ্রস্ত অবস্থায় বেধড়ক মারধর করে," বলছিলেন পথিকৃৎ সাহা।

গত দশ বছর ধরে এই শিশুদের লেখাপড়া করিয়ে ভবিষ্যৎ গড়ার দায়িত্ব তুলে নিয়েছেন নিজের কাঁধে। তাদের স্কুলে পাঠানো থেকে শুরু করে, যাতে স্কুলছুট না হয় এবং একটা ভালো পরিবেশ পায় তার খেয়াল রেখেছেন।

তার এই যাত্রায়, কেউ সঙ্গী হয়েছেন, কেউ সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন।

এভাবেই এখন দমদম ক্যান্টনমেন্ট ছাড়াও, সুন্দরবন অঞ্চল, ঝাড়গ্রাম, উত্তরবঙ্গে রয়েছে তার 'ইনফর্মাল ক্লাসরুম' (অর্থাৎ প্রথাগত ক্লাসরুম নয়) যেখানে চারশোরও বেশি শিশু বিনামূল্যে লেখাপড়া করে এবং খাবার পায়।

তার কথায়, "এই ক্লাসরুমকে পাঠশালা বলি। এখানে হেসে খেলে আমাদের সময় কাটে।"

ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি তথা শিক্ষাবিদ ড. সর্বপল্লিরাধাকৃষ্ণণের জন্মজয়ন্তী পাঁচই সেপ্টেম্বর। ওইদিন শিক্ষক দিবস হিসেবে মর্যাদার সঙ্গে পালন করা হয়।

এই শিক্ষক দিবসে এমন একজন শিক্ষকের সফরের কথা তুলে ধরছে বিবিসি বাংলা, যিনি বাচ্চাদের সময় দেওয়ার জন্য নিজের সরকারি চাকরি ছেড়েছেন, আর্থিক সংকটের সঙ্গে লড়াই করেছেন কিন্তু হাল ছাড়েননি।

রেলওয়ে স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে স্কুলব্যাগ নিয়ে বসে রয়েছে কয়েকজন শিশু

ছবির উৎস, Pathikrit Saha

ছবির ক্যাপশান, দমদম ক্যান্টনমেন্ট রেলওয়ে স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে শুরু হয়েছিল শিশুদের পঠন-পাঠন

যেভাবে প্ল্যাটফর্মই হয়ে উঠেছিল 'পাঠশালা'

সালটা ২০১৫। সে সময় একটা সরকারি চাকরি করতেন পথিকৃৎ সাহা। সফ্টওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং-এ ডিপ্লোমা করেছেন তিনি।

মি. সাহা বলছিলেন, "একদিন, দমদম ক্যান্টনমেন্টের প্ল্যাটফর্ম দিয়ে যাওয়ার সময় একটা বাচ্চা ছেলে আমার কাছে এসে ভিক্ষা চায়। পা ধরে জোরাজুরি করতে থাকে।"

"এমন অবস্থা হয় যে রেললাইনে প্রায় আমাদের দু'জনের মধ্যে যে কেউ রেললাইনে পড়ে যেতাম। মরিয়া হয়ে ওকে ছাড়ানোর জন্য আস্তে করে মেরেছিলাম। পরে ভীষণ অনুশোচনা হয়।"

পরদিন স্টেশন চত্বরে গিয়ে ওই শিশুর খোঁজ করেন তিনি। জানতে পারেন ছেলেটার নাম বুধো। মা এবং ভাইয়েদের সঙ্গে এখানেই থাকে।

"আমি জানতে পারলাম ওকে দিয়ে জোর করে ভিক্ষা করানো হয়। টাকা না আনতে পারলে মারধর করা হয়। ওর ছেঁড়া জামা, ধুলো-বালি মাখা মুখের দিকে তাকিয়ে আর থাকতে পারিনি," বলছিলেন তিনি।

"আমি বুঝতে পেরেছিলাম এর স্থায়ী সমাধান করতে গেলে শিক্ষা দরকার।"

বুধোকে লেখাপড়া করানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। প্ল্যাটফর্মে প্লাস্টিকের ওপর বসে তার হাতেখড়ি হয়।

"আমি বুধোকে বলি তোর বন্ধুদেরও নিয়ে আয়। আরও দু'জন যোগ দেয়। প্ল্যাটফর্মে বসেই পড়াতাম," বলছিলেন তিনি।

লেখাপড়া শেখানোর পাশাপাশি খাবারও থাকত তাদের জন্য।

মি. সাহার কথায়, "খালিপেটে পড়াশোনা হয় না। ওদের জন্য সামর্থ্য অনুযায়ী খাবার নিয়ে যেতাম। চেষ্টা করতাম পুষ্টিকর কিছু দেওয়ার। কখনো ঝালমুড়ি, আলুকাবলিও থাকত।"

"এমনো হয়েছে, মাসের শেষে আমার পকেটে টান পড়েছে। ওদিকে, আলুর চপ খাওয়ার বায়না ধরেছে বাচ্চারা। একটা চপই ওরা তিনজন ভাগ করে খেয়েছে," কথাগুলো বলতে বলতে একটু আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন মি. সাহা।

দমদম ক্যান্টনমেন্টের ক্লাবঘরে পথিকৃৎ সাহা
ছবির ক্যাপশান, শিশুদের জন্য সরকারি চাকরি ছেড়েছেন পথিকৃৎ সাহা

ধীরে ধীরে পড়ুয়ার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৭জনে।

সেই সময়, পথ চলতি যাত্রীদের কেউ কৌতূহলী চোখে দেখতেন, কিছুক্ষণ দাঁড়াতেন আর কেউবা খুদে পড়ুয়াদের জন্য বিস্কুট, কেক এনে দিতেন।

পথিকৃৎ সাহার কথায়, "প্ল্যাটফর্মে পড়ানোটা সহজ ছিল না। এমনিতেই ওদের মনোযোগ কম, তার ওপর লোকেদের ভিড়, কোলাহল। অসুবিধা হতো।"

সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসে স্থানীয় অটো ইউনিয়ন। স্টেশনের গায়ে ইউনিয়নের দফতরের এক ঘরে পুরো উদ্যমে শুরু হয়ে যায় ক্লাস। কোনো দাতা কেউ খাতা, পেন্সিল কিনে দেন। এই শিশুরা যাতে স্কুলে যেতে পারে তার ব্যবস্থা হয়।

বুধো, এবং তার বন্ধু বিজয়, সেলিমদের নিয়ে নতুন পথ চলা শুরু হয় পথিকৃৎ সাহার।

"এই বাচ্চাদের জীবন খুব কঠিন। লেখাপড়া করানো যতটা চ্যালেঞ্জিং, তার চেয়ে অনেক বেশি কঠিন ছিল নেশার হাত থেকে বাঁচানো এবং সুরক্ষিত রাখা। রীতিমত লড়াই করতে হয়েছে," বলছিলেন তিনি।

বুধোদের ঘিরে এই তরুণের ব্যক্তিগত জীবনও অন্যদিকে মোড় নিচ্ছিল একটু একটু করে। কাজের চাপে সন্ধ্যায় বাচ্চাদের পড়ানোর সময় কমে আসছিল। শেষপর্যন্ত ২০১৮ সালে ওই চাকরি ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন পথিকৃৎ সাহা।

"আমি বাচ্চাদের সময় দিতে পারছিলাম না। এটা আমার কাছে খুব কষ্টের ছিল। ঠিক করলাম, ধরাবাঁধা সময়ের চাকরি ছেড়ে ফ্লেক্সিবল টাইমিং-এর কাজ করব যেখানে স্বাধীনতাও থাকবে।"

তার সিদ্ধান্তে খুশি হননি পরিবারের অনেকে। সম্পর্কেও আঁচ পড়েছে।

"আমার এই সিদ্ধান্তের জন্য অনেক কিছু শুনতে হয়েছে। কিন্তু আমি মত বদলাইনি," বলছিলেন তিনি।

ফুড ডেলিভারির কাজ শুরু করেন এই তরুণ। দমদম ক্যান্টনমেন্ট স্টেশনের স্যার হয়ে ওঠেন কলকাতার 'রোলকাকু'।

দুই শিশুর সঙ্গে পথিকৃৎ সাহা

ছবির উৎস, Pathikrit Saha/Facebook

ছবির ক্যাপশান, ফুড ডেলিভারির কাজ করার সময় ক্যান্সেল হওয়া খাবার পথশিশুদের দিতেন এই তরুণ

বাচ্চাদের রোলকাকু

কলকাতার অনেকেই তাকে চেনেন 'রোলকাকু' নামে। এর পিছনে গল্প বলতে গিয়ে মৃদু হাসলেন মি. সাহা।

তার কথায়, "সেই সময় কলকাতায় ফুড ডেলিভারি অ্যাপগুলো সবে লঞ্চ হয়েছে। প্রচুর অফার থাকত, অর্ডার ক্যান্সেলও হতো।"

অর্ডার ক্যান্সেল হলে সেই খাবার সংশ্লিষ্ট রেস্তরাঁতে ফেরানোর পর ডেলিভারি পার্সনদের সেখান থেকে কিছু খাবার দেওয়া হতো, যা সাধারণত 'এগরোল' বা অন্যান্য ধরনের রোলই হতো।

নিজে না খেয়ে, ওই খাবার পথশিশুদের মধ্যে বিলিয়ে দিতেন তিনি। সেই সময় কলেজ স্ট্রিট অঞ্চলটাই ছিল তার কর্মক্ষেত্র।

তিনি বলেন, "রাস্তা-ঘাটে কত বাচ্চা না খেয়ে থাকে। ওদের মুখে খাবার তুলে দিতেই এটা করতাম। একটা বাচ্চা আমার নাম দিয়েছিল রোলকাকু, তারপর অন্যান্য বাচ্চারাও একই নামে ডাকতে শুরু করে।"

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের হাত ধরে তার নাম ক্রমে ছড়িয়ে পড়ে। এই উদ্যোগের কথা জানতে পেরে কলকাতার একটা খাবারের দোকানও নিয়মিত ক্যান্সেল হওয়া অর্ডারের খাবার তাকে দিত।

তার নিজের পড়ুয়ারাও বাদ যেত না। এই প্রসঙ্গে একটা ঘটনার কথা বলছিলেন তিনি।

মি. সাহার কথায়, "নাগের বাজারের একটা মলে খাওয়াতে নিয়ে গিয়েছিলাম বুধো আর অন্যান্য বাচ্চাদের। কিন্তু ছেঁড়া জামা পড়া আমার বাচ্চাদের ঢুকতে দিতে চায়নি মলের সিকিউরিটি গার্ডরা।"

"জেদ চেপে যায়। ঠিক করি, এই রেস্তরাঁ তো বটেই, ওদের এই এলাকার সবকটা বড় রেস্তরাঁ নিয়ে গিয়ে খাওয়াব আর ভবিষ্যতে যাতে ওদের এমন অভিজ্ঞতা না হয়, তার ব্যবস্থাও করব।"

বুধোদের নতুন পোশাক কিনে ওই রেস্তোরাঁতেই খাওয়াতে নিয়ে গিয়েছিলেন পথিকৃৎ সাহা।

শিক্ষার্থী সৌরভ মণ্ডল ও আয়ুষ সাহা।
ছবির ক্যাপশান, শিক্ষার্থী সৌরভ মণ্ডল ও আয়ুষ সাহা।

বিনামূল্যে শিক্ষা ও খাবার

বর্তমানে অ্যাপ-ভিত্তিক বাইক চালান মি. সাহা। ছোটখাটো ব্যবসাও করেন আর বাকি সময়টা খুদে পড়ুয়াদের সঙ্গে কাটান।

একজন শিশুকে নিয়ে প্লাটফর্মে যে ক্লাস শুরু হয়েছিল, তার বিস্তার হয়েছে। সুন্দরবন, ঝাড়গ্রাম, উত্তরবঙ্গের প্রত্যন্ত গ্রামে তার পাঠশালা রয়েছে, যেখানে দারিদ্যের সঙ্গে লড়াই করা শিশুরা পড়াশোনা করে।

মি. সাহার কথায়, "সব মিলিয়ে আমাদের পাঠশালায় চারশোর বেশি বাচ্চা আছে। এই বাচ্চাদের বই, খাতা, পেন্সিল, জামা-কাপড়, খাবার দেওয়া হয়। কম্পিউটার, নাচ, গান, আবৃত্তি, দাবাখেলা, ক্যারাটে শেখানো হয়। ওদের পড়ানোর জন্য স্থানীয় শিক্ষক-শিক্ষিকা আছেন।"

"বহু মানুষ সাহায্য করেছেন। আমার আয় তা দিয়ে এত কিছু করা সম্ভব নয়। অনুদানের উপর নির্ভর করতে হয়।"

"পাঠশালার শিক্ষক-শিক্ষিকাদের আমি যৎসামান্য পারিশ্রমিক দিতে পারি। কিন্তু তারা হাসি মুখে বাচ্চাদের পড়ান। কেউ আবার সাম্মানিক না নিয়েই আবৃত্তি শেখান।"

দমদম ক্যান্টনমেন্টের ক্লাব ঘরে প্রায় ৪০জনের মতো শিশু পড়াশোনা করে। তারা বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় পুরস্কারও পেয়েছে।

তাদেরই একজন আয়ুষ সাহা। জেলাস্তরে ক্যারাটে প্রতিযোগিতায় পুরস্কার পেয়েছে। সপ্তম শ্রেণির এই ছাত্রের কথায়, "আমার একটা বন্ধু স্যারের কাছে পড়তে আসে। ওর দেখাদেখি আমিও পাঠশালায় আসা শুরু করি।"

"এখানে পড়াশোনা ছাড়াও ব্যাডমিন্টন খেলা, ক্যারাটে শিখেছি।"

স্থানীয় সরকারি স্কুলের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র সৌরভ মণ্ডলও এই পাঠশালার পড়ুয়াদের মধ্যে একজন। সে বলেছে, "আমি বৈদ্যনাথ বয়েজ স্কুলে পড়ি। এখানে তিন বছর আগে থেকে আসা শুরু করি। বড় হয়ে ইঞ্জিনিয়ার হতে চাই।"

পথিকৃৎ সাহার পাঠশালার দুই ছাত্রী- নেহা বিশ্বাস ও রুমা দাস।
ছবির ক্যাপশান, পথিকৃৎ সাহার পাঠশালার দুই ছাত্রী- নেহা বিশ্বাস ও রুমা দাস।

সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী নেহা বিশ্বাস। স্থানীয় সরকারি স্কুলে পড়ে সে। এই পড়ুয়া বলেছে, "ছয় বছর আগে আমি এখানে এসেছিলাম। স্কুলের পড়া বুঝতে অসুবিধা হলে এখানে বুঝিয়ে দেয়। আমিও ক্যারাটে শিখেছি।"

ষষ্ঠ শ্রেণির রুমা দাস জানিয়েছে, লেখাপড়া করে স্বনির্ভর হওয়াই তার স্বপ্ন।

তাদের এই উড়ানে যারা সাহায্য করছেন তাদেরই একজন মিতা দাস। ২০১৯ সাল থেকে এই পাঠশালায় পড়াচ্ছেন তিনি।

এই শিক্ষিকার কথায়, "আমি বাচ্চাদের সঙ্গে সময় কাটাতে ভালোবাসি। এই বাচ্চাগুলো কঠিন পরিবেশের সঙ্গে লড়াই করে বড় হচ্ছে। আমরা সবাই চেষ্টা করি ওদের লেখাপড়ায় যেন এটা প্রভাব না ফেলে।"

এই শিশুরা নিয়মিত স্কুলে যাচ্ছে কি না, তাও খোঁজ রাখা হয়।

শিক্ষিকা শুভ্রা সিন্হা রায় এবং মিতা দাস।
ছবির ক্যাপশান, শিক্ষিকা শুভ্রা সিন্হা রায় এবং মিতা দাস।

শিক্ষিকা শুভ্রা সিন্হা রায় বলেন, "এই বাচ্চাদের স্কুলছুট হওয়ার প্রবণতা খুব বেশি। তাই নিয়মিত স্কুল যাচ্ছে কি না খেয়াল রাখি। তবে শুধু পড়াশোনা নয়, ওরা যাতে আনন্দ করে, সেদিকেও লক্ষ্য রাখি।"

২০১৫ সালে পথ চলা শুরুর পর বেশ কয়েকটা বছর পেরিয়ে গিয়েছে। বুধো এখন একটা স্থানীয় ক্যান্টিনে কাজ করে। সেলিমও স্বনির্ভর।

তিনি বলেছেন, "হ্যাঁ আমার প্রথম ব্যাচের ছাত্ররা ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার হয়নি ঠিকই। কিন্তু ওরা যে সৎপথে উপার্জন করছে, নেশা বা অপরাধের জীবন থেকে অনেক দূরে আছে, এটাই আমার কাছে সবচেয়ে বড় পাওনা।"

কলকাতার বাসিন্দা শান্তনু গুহঠাকুরতা পথিকৃৎ সাহাকে বেশ কয়েক বছর ধরে চেনেন। তার কথায়, "ওর কাজ আমি দীর্ঘ সময় ধরে কাছ থেকে দেখেছি। এই শিশুদের জীবন একেবারেই সহজ নয়। বাচ্চারা যে সময়টা ওর পাঠশালায় কাটায়, সেটাই ওদের দিনের সেরা মুহূর্ত বললে বাড়িয়ে বলা হবে না।"

কয়েক দশক ধরে শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করছেন সত্যগোপাল দে। তিনি বলছেন, "আমি পথিকৃৎ সাহার বিষয়ে শুনেছি এবং তাকে সাধুবাদ জানাই। এই ধরনের যে কোনো উদ্যোগই প্রশংসনীয়। এই কাজে সিভিল সোসাইটির (সুশীল সমাজ) অংশগ্রহণ যত বাড়বে, ততই ভালো।"