কলকাতার যে ক্যাফে চালান বিশেষভাবে সক্ষম তরুণ-তরুণীরা

অপরচুনিটি ক্যাফের কর্মী- অরিত্র সরকার, নূপুর ভট্টাচার্য ও রামু।
ছবির ক্যাপশান, অপরচুনিটি ক্যাফের কর্মী অরিত্র সরকার, নূপুর ভট্টাচার্য ও রামু।
    • Author, রূপসা সেনগুপ্ত
    • Role, বিবিসি নিউজ কলকাতা

"উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করার পর মেয়েকে কীভাবে স্বনির্ভর করে তুলব এটাই চিন্তা ছিল। কারণ আমার মেয়ে আর পাঁচজনের মতো নয়," কথাগুলো বলছিলেন কলকাতার বাসিন্দা গায়ত্রী ভট্টাচার্য। তার একমাত্র মেয়ে নূপুর ভট্টাচার্য বিশেষভাবে সক্ষম।

একই কারণে চিন্তাগ্রস্ত দক্ষিণ কলকাতার আরও এক অভিভাবক। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই পিতা বলেছেন, "আমার ছোট ছেলের অটিজম। ওর যখন পাঁচ বছর বয়স তখন চিকিৎসক আমাদের একথা জানান।"

"ওকে প্রথাগত স্কুল ওকে রাখতে চায়নি। এখন স্পেশাল স্কুলে পড়াশোনা করলেও ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয় হয়।"

এই একই উদ্বেগের সঙ্গে বছর কয়েক আগে লড়াই করছিলেন কলকাতারই দুই বাসিন্দা - সুমন্ত সিংহরায় ও সিদ্ধান্ত ঘোষ। তারা একটা বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন চালান।

শিশুদের উদ্ধার করা, তাদের আশ্রয় দেওয়া, লেখাপড়া করানো, পুনর্বাসন-সহ বিভিন্ন কাজের সঙ্গে যুক্ত ওই সংগঠন। তাদের হোমে এমন অনেক আবাসিক হয়েছেন, যারা বিশেষভাবে সক্ষম।

মি. সিংহরায়ের কথায়, "আমরা বিশেষভাবে সক্ষম ছেলে-মেয়েদের কাজে পাঠিয়ে দেখেছি, দিন কয়েকের মধ্যে তাদের ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছে।"

"আমাদের বলা হয়েছে, ওদের (বিশেষভাবে সক্ষম যে তরুণ-তরুণীদের কাজের জন্য পাঠানো হয়েছিল) দ্বারা কিছু হবে না। ওরা কোনও কাজের নয়। কথাগুলো শুনে খুব কষ্ট পেয়েছিলাম।"

তিনি জানিয়েছেন রেস্তোরাঁতে বিভিন্ন কাজের জন্য নিয়োগ করা হয়েছিল ওই তরুণ-তরুণীদের।

এরপর সিদ্ধান্ত ঘোষ, সুমন্ত সিংহরায় এবং তাদের সংগঠনের সদস্যরা স্থির করেন, তারা নিজেরাই ওই বিশেষভাবে সক্ষম তরুণ-তরুণীদের জন্য কাজের সুযোগ তৈরি করবেন।

শেষপর্যন্ত ২০২৩ সালে কলকাতার দমদমে একটা ক্যাফে চালু করেন তারা, যেটা চালাচ্ছেন বিশেষভাবে সক্ষম তরুণ-তরুণীরা।

নয়জন বিশেষভাবে সক্ষম তরুণ ও তরুণীর সঙ্গে এই 'অপরচুনিটি ক্যাফে'তে কর্মরত রয়েছেন আরও সাতজন তরুণ-তরুণী যারা বিশেষভাবে সক্ষম নন।

ছেলেবেলায় মানবপাচারের অথবা নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছিল তাদের এবং পুলিশ উদ্ধার করার পর তারা হোমে বড় হয়েছেন।

ক্যাফেতে আসা অতিথিদের আপ্যায়ন, খাবার পরিবেশন করা, রান্না ও তার জোগাড় করা থেকে শুরু করে ক্যাফের প্রায় সব কাজই করেন এই তরুণ-তরুণীরা।

রান্না থেকে শুরু করে খাবার পরিবেশ, আপ্যায়ন সবই করেন এই তরুণ-তরুণীরা।

ছবির উৎস, Opportunity Cafe/Facebook

ছবির ক্যাপশান, রান্না থেকে শুরু করে খাবার পরিবেশ, আপ্যায়ন সবই করেন এই তরুণ-তরুণীরা।

অপরচুনিটি ক্যাফে

অরিত্রি চ্যাটার্জী, নূপুর ভট্টাচার্য, অরিত্র সরকার, রামু, শ্যামলদের মধ্যেই কেউ এগিয়ে গিয়ে অতথিদের আপ্যায়ন করেন, অর্ডার নেন, তাদের খাবার পরিবেশন করেন, কেউ হাসি মুখে টফি দেন, চলে যাওয়ার আগে অতিথিদের সঙ্গে হাত মেলান আর কেউ বা অতিথিদের আবার আসার জন্য অনুরোধ করেন।

এখানে কর্মরতদের মধ্যে এমন তরুণ-তরুণী রয়েছেন যাদের নিজেদের পরিবার বলতে একমাত্র এই সংগঠন ও তার সদস্যরা।

তেমনই এমন সদস্যও রয়েছেন, যাদের নিজস্ব পরিবার রয়েছে। কাজ শেষ করে পরিবারের কাছে ফিরে যান তারা। এদের মধ্যে অনেকেই বিশেষভাবে সক্ষম।

কেউ ক্যাফের সফর শুরু হওয়ার সময় থেকে ছিলেন, কেউ বা পরে যোগ দিয়েছেন।

অপরচুনিটি ক্যাফেতেই এই মুহূর্তে কর্মরত গায়ত্রী ভট্টাচার্যর একমাত্র মেয়ে নূপুর। প্রতিদিন মেয়েকে পৌঁছে দিতে আসেন তিনি।

মা গায়ত্রী ভট্টাচার্যের সঙ্গে নূপুর।
ছবির ক্যাপশান, মা গায়ত্রী ভট্টাচার্যের সঙ্গে নূপুর।

নিজের অভিজ্ঞতার কথা ভাগ করে গায়ত্রী ভট্টাচার্য বলছেন, "এই ক্যাফের কথা জানতে পাড়ার পর মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে এসেছিলাম ওর কাজের বিষয়ে কথা বলতে। দ্বিধা ছিল, ওকে কেউ কাজ দেবেন কি না।"

"কিন্তু যখন জানতে পারলাম ওকে সিলেক্ট করা হয়েছে, আমি বিশ্বাস করতে পারিনি। আমার স্বামী পেশায় ইঞ্জিনিয়ার। বরাবর আমাদের একটাই চিন্তা ছিল, মেয়ের ভবিষ্যৎ কী হবে?"

লেখাপড়ার পাশাপাশি নাচ এবং আঁকা শেখার ব্যাপারে মেয়েকে ছেলেবেলা থেকে উৎসাহ দিয়ে এসেছেন তিনি, কিন্তু তাকে স্বনির্ভর করে তোলার তাগিদ ছিল সবচেয়ে বড়।

তার কথায়, "ছেলেবেলা থেকে ওকে নিয়ে নানান কটুকথা শুনতে হয়েছে। কিন্তু চেষ্টা ছাড়িনি।"

"ও যখন কাজে যোগ দেয় তখন প্রথম প্রথম ভয় লাগত। ভাবতাম পারবে? কিন্তু এখন ওকে কাজ করতে দেখে ভাল লাগে। নিশ্চিন্ত বোধ করি।"

নূপুরের সহকর্মীরা জানিয়েছেন, তিনি সবসময় হাসি মুখে অতিথিদের আপ্যায়ন করেন। কাজের বিষয়ে তাকে জিজ্ঞাসা করা হলে এই তরুণী বলেছেন, "আমি এখানে সবাইকে কফি দিই, খাবারও দিই। সবাই আমাকে ভালবাসে।"

শ্যামলের সঙ্গে মি. সিংহরায়।
ছবির ক্যাপশান, শ্যামলের সঙ্গে মি. সিংহরায়।

কেন এই প্রচেষ্টা

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

এই ক্যাফে চালু করার পিছনে একটা গল্প রয়েছে। এক সময় নামকরা তথ্য প্রযুক্তি কোম্পানিতে কর্মরত ছিলেন সুমন্ত সিংহরায় । সেই সময় সপ্তাহান্তে একটা স্বেচ্ছাসেবী সংস্থায় স্বেচ্ছাসেবক হিসাবে কাজ করতেন।

সেখানেই আলাপ হয় পেশায় আইনজীবী মি. ঘোষের সঙ্গে। এক সময় দু'জনে মিলে সিদ্ধান্ত নেন একটা পৃথক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন তৈরির। চাকরি ছেড়ে দেন মি. সিংহরায়।

তিনি বলেছেন, "কাজ করতে গিয়ে বাস্তব সমস্যার বিষয়গুলো আমাদের সামনে আসে। একটা বড় সমস্যা হলো ১৮ বছর হয়ে গেলে সরকারি নিয়ম মাফিক আবাসিকদের হোম ছেড়ে চলে যেতে হবে।"

"অন্যান্যরা যদি কাজ খুঁজেও নেয় বিশেষভাবে সক্ষম বাচ্চারা কী করবে এই চিন্তা আমাদের তাড়িয়ে নিয়ে ফিরত।"

"ওদের স্কিল ডেভেলপমেন্টের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু যখন ওদের কাজের জন্য অন্যত্র পাঠাই, তখন আবার ধাক্কা খাই আমরা। দিন কয়েকের মধ্যে তাদের ফেরত পাঠিয়ে বলা হয় ওরা কাজ করতে পারবে না।"

এরপর নিজেরাই সমাধান খোঁজার সিদ্ধান্ত নেন তারা।

"সমস্যা আমাদের চিন্তায়। ২০২৫ দাঁড়িয়েও আমরা আমাদের চিন্তা বদলাতে পারিনি। বুঝতে পারি চিন্তার বদল আনতে হলে সূত্রপাত কোথাও না কোথাও থেকে হওয়া দরকার। সেটা এখান থেকেই হোক।"

"আমরা ঠিক করি যে কাজ ওরা পারবে না বলে জানানো হয়েছে, সেটাই করে দেখাবে ওরা। আসলে জেদ চেপে গিয়েছিল।"

শুরু হয় তরুণ-তরুণীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া।

স্বাতী সেনগুপ্ত এবং সুমন্ত সিংহরায় জানিয়েছেন, এই পথচলা সহজ ছিল না।
ছবির ক্যাপশান, স্বাতী সেনগুপ্ত এবং সুমন্ত সিংহরায় জানিয়েছেন, এই পথচলা সহজ ছিল না।

দক্ষতা অনুযায়ী কাজ

স্পেশাল ট্রেনার স্বাতী সেনগুপ্তর কথায় "ওদের ক্রমাগত প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। যেমন যারা অটিস্টিক, তাদের ক্ষেত্রে জোর দেওয়া হয়েছে কমিউনিকেশন স্কিলের উপর। এখানে যারা আসছেন, তাদের সঙ্গে তারা কীভাবে কমিউনিকেট করবে, কীভাবে আপ্যায়ন করবে তার উপর জোর দেওয়া হয়েছে।"

বিশেষজ্ঞদের মতে, অটিজমের ক্ষেত্রে সোশ্যাল কমিউনিকেশনে সমস্যা থাকে।

স্বাতী সেনগুপ্ত বলেছেন, "ওদের প্রত্যেকের আলাদা আলাদা দক্ষতা রয়েছে। সেই অনুযায়ী তাদের ক্রমাগত দক্ষতার উপর নির্ভর করে কাউকে অতিথিদের আপ্যায়ন, কাউকে হাউজ কিপিং-এর কাজ, কাউকে রান্নার কাজে নিযুক্ত করা হয়েছে।"

একই সঙ্গে অন্যান্য বিষয়ও মাথায় রাখা হয়েছে।

"কাজ ভাগ করে দেওয়ার সময় আমরা অনেকগুলো বিষয় নজরে রেখেছি। যেমন যাদের হাত কাঁপে (নিউরো মোটর ডিজঅর্ডার বা অন্য সমস্যার কারণে) তাদের রান্না বা সব্জি কাটার কাজ দেওয়া হয়নি যাতে কোনও দুর্ঘটনা না ঘটে। একইভাবে অন্যান্যদের ক্ষেত্রেও প্রয়োজনীয় বিষয় মাথায় রাখা হয়েছে," বলেছেন তিনি।

ওই ক্যাফেরই কর্মীদের মধ্যে একজন রামু। যখন ৯-১০ বছর বয়স তখন তাকে পুলিশ উদ্ধার করে এনেছিল।

সেই সময় জানা যায়, তিনি মূক ও বধির। মি. সিংহরায় বলেছেন,"রামু নিপুণভাবে সব্জি কাটতে পারে। ইনফ্যাক্ট অন্যদের ওই শেখাচ্ছে। শুনলে আশ্চর্য হবেন নতুনরা শিখতে না পারলে ও বারবার করে দেখায় একবারও ধৈর্য্য হারায় না।"

কথোপকথনের মাঝেই রামু সাইন ল্যাঙ্গুয়েজে জানিয়েছেন,দিন কয়েক আগে তিনি বাকিদের সব্জি কাটা শেখাচ্ছিলেন। কোনো একজনের রপ্ত করতে সমস্যা হচ্ছিল। তাকে বারবার শেখাতে গিয়ে, পাঁচটা শশা কাটতে হয়েছে তাকে।

রামু জানিয়েছেন, তিনি পিৎজা বানাতে ভাল পারেন আর খেতে ভালবাসেন বিরিয়ানি।

শ্যামল এই সংস্থার অন্তর্গত হোমে আসেন বছর সাতেক আগে। এর আগে তিনি যে হোমে থাকতেন সেটা বন্ধ হয়ে যায়। তিনিও বিশেষভাবে সক্ষম।

ক্যাফেতে কাজ করতে কেমন লাগে, তার উত্তরে এই তরুণ বললেন,"কাজ করতে ভাল লাগে।" অতিথি এলে তাদের জল পরিবেশন করেন তিনি, হাসিমুখে আপ্যায়ন করেন।

ক্যাফের এক তরুণী কর্মী বলেন, "আমরা ওদের (বিশেষভাবে সক্ষম কর্মীদের) সঙ্গে সঙ্গে যাই। মাঝে সাঝে প্রয়োজন মতো সাহায্য করি। আসলে আমরা একটা বড় পরিবার।"

বছর ১৯-এর ওই তরুণী জানিয়েছেন, তিনি কেক বানাতে পারেন, পিৎজাও।

অপরচুনিটি ক্যাফেতে আসা এক অতিথি বলেন, "এখানকার কর্মীদের উষ্ণ আতিথেয়তাই এই ক্যাফের ইউএসপি। এটাই অন্যান্য রেস্তোরাঁ এবং ক্যাফের চেয়ে একে আলাদা করে।"

অরিত্র সরকার জানিয়েছেন, এই ক্যাফেতে কাজ করে তিনি খুশি।
ছবির ক্যাপশান, অরিত্র সরকার জানিয়েছেন, এই ক্যাফেতে কাজ করে তিনি খুশি।

'আরও বদল দরকার'

পথ চলাটা সহজ ছিল না।

স্পেশাল ট্রেনার স্বাতী সেনগুপ্ত বলেন, "প্রথম প্রথম অনেক বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সম্মুখীন হতে হয়েছে আমাদের। কেউ কেউ ওদের ওপর রাগ করে ক্যাফে থেকে চলে গেছেন। কেউ মুখের ওপর দু'কথা শুনিয়েছেন।"

তবে তারা হাল ছাড়েননি।

মি সিংহরায় বলেছেন, "ক্রমাগত প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। কী করলে আমাদের ছেলেমেয়েরা খুশি থাকতে পারবে তার উপর জোর দেওয়া হয়েছে।"

"এখানে আসা অতিথিরা যখন ইতিবাচক কথা বলেন, তখন সত্যিই বড় ভাল লাগে। এরই মধ্যে একাধিক খাদ্য মেলায় আমাদের স্টলে এই ছেলেমেয়েরাই কাজ করেছে। নিজেরাই মেলায় আসা লোকজনের সঙ্গে কথা বলেছে।"

তিনি জানিয়েছেন তাদের উদ্দেশ্য অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ে তোলা। তার কথায়, "আমরা বেশ কিছুটা এসেছে কিন্তু আমাদের আরও অনেকটা পথ যেতে হবে।"

"ইনক্লুসিভ এনভায়রনমেন্ট গড়ে তুলতে গেলে আমাদের নিজেদের বদলাতে হবে। চিন্তা ভাবনার পরিবর্তন করতে হবে।"