আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে আমেরিকা কি ভারতের বন্দর ব্যবহার করছে?
- Author, রূপসা সেনগুপ্ত
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, কলকাতা
- পড়ার সময়: ৫ মিনিট
ইরানে হামলা চালানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রর ভারতীয় বন্দর ব্যবহারের দাবি খারিজ করেছে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
সম্প্রতি ডগলাস ম্যাকগ্রেগর নামে মার্কিন সেনাবাহিনীর এক সাবেক কর্মকর্তা দাবি করেন, ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধে মার্কিন সেনাবাহিনী না কি ভারতীয় বন্দর ব্যবহার করেছে। যুক্তরাষ্ট্র-ভিত্তিক সংবাদমাধ্যম 'ওয়ান আমেরিকা নিউজ নেটওয়ার্ক'কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি একথা বলেছেন।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুতে নরেন্দ্র মোদীর সরকারের 'নীরবতা' নিয়ে দেশের ভিতরে এবং বাইরে ইতিমধ্যে সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়েছে ভারতকে।
এই যুদ্ধে ভারতের অবস্থান নিয়ে কেন্দ্র সরকারকে কোণঠাসা করতে ছাড়েনি বিরোধী দলগুলো। সাবেক মার্কিন সেনা কর্মকর্তার মন্তব্য বিতর্ক আরও খানিকটা উস্কে দেয়।
এরপরই ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিক্রিয়ায় ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের তরফে দেশের বন্দর ব্যবহার করার দাবি খারিজ করা হয়।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ফ্যাক্ট চেক বিভাগের সামাজিক মাধ্যমে জানানো হয়, 'ওয়ান আমেরিকা নিউজ নেটওয়ার্ক'কে দেওয়া ওই সাবেক সেনা কর্মকর্তার দাবি 'ভুয়া'।
প্রসঙ্গত, ১৯৯১ সালে উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় তৎকালীন ভারত সরকার মার্কিন বিমানকে ভারতীয় ভূখণ্ডে জ্বালানি ভরার অনুমতি দিয়েছিল। যা নিয়ে ক্ষমতাসীন সরকারের তীব্র সমালোচনা করেছিল বিরোধী দলগুলো।
অন্য দিকে, ২০১৬ সালে ভারতের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের 'লজিস্টিকস এক্সচেঞ্জ মেমোরেন্ডাম অব এগ্রিমেন্ট' (এলইএমওএ) স্বাক্ষর হয়।
এটা একটা মৌলিক সামরিক চুক্তি, যা জ্বালানি, সরবরাহ এবং লজিস্টিক সহায়তার জন্য (যেমন, খাদ্য, জল, খুচরা যন্ত্রাংশ, চিকিৎসা পরিষেবা) মনোনীত সামরিক সুবিধাগুলোর ক্ষেত্রে একে অপরকে অ্যাক্সেস দেয়।
ভারতের নৌবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ভাইস অ্যাডমিরাল শেখর সিন্হা এই প্রসঙ্গে বিবিসি বাংলাকে বলেছেন "ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে লজিস্টিক্স এক্সচেঞ্জ মেমোরেন্ডাম অব এগ্রিমেন্ট আছে মানেই তারা (যুক্তরাষ্ট্র) ভারতের লজিস্টিক্স ব্যবহার করতে পারবে এমনটা নয়।"
তিনি ভারতীয় নৌবাহিনীর পশ্চিমাঞ্চলীয় নৌ কমান্ডের কমান্ডার-ইন-চিফ ছিলেন।
তার কথায়, "এর নির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে, শর্তাবলী রয়েছে। পার্টনার দেশের না বলার অধিকার আছে এক্ষেত্রে।"
সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা কী বলেছিলেন?
'ওয়ান আমেরিকা নিউজ নেটওয়ার্ক'কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সাবেক মার্কিন সেনা কর্মকর্তা কর্নেল ডগলাস ম্যাকগ্রেগরকে বলতে শোনা যায়, "আমাদের সমস্ত ঘাঁটি ধ্বংস করা হয়েছে। আমাদের বন্দরের ইনস্টলেশন (স্থাপনা) ধ্বংস করা হয়েছে।"
"আমাদের আসলে ভারত এবং ভারতীয় বন্দরগুলির উপর নির্ভর করতে হচ্ছে, যা আদর্শ নয়… নৌবাহিনী এটাই জানিয়েছে।"
তার এই দাবি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। দ্রুত ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তরফে প্রতিক্রিয়া মেলে।
ভারতের প্রতিক্রিয়া
মন্ত্রণালয়ের ফ্যাক্ট চেক বিভাগের পক্ষ থেকে এক্স হ্যান্ডেলে জানানো হয়, "মার্কিন নৌবাহিনীর তরফে ভারতীয় বন্দর ব্যবহার করা হচ্ছে বলে মার্কিন ভিত্তিক চ্যানেল ওয়ান-এ যে দাবি করা হয়েছে, তা ভুয়া এবং মিথ্যে। আমরা আপনাদের এই ধরনের ভিত্তিহীন এবং বানিয়ে বলা মন্তব্যের বিরুদ্ধে সতর্ক করছি।"
ভারতের প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরো-র তরফে ওই সাক্ষাৎকারের একটা ক্লিপ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করা হয়েছে।
সেখানে উল্লেখ করা হয়- "মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক একটি চ্যানেল, ওয়ান আমেরিকা নিউজ নেটওয়ার্কে, মার্কিন সেনাবাহিনীর সাবেক কর্নেল ডগলাস ম্যাকগ্রেগর বিবৃতি দিয়েছিলেন যে ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের চলমান সংঘাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানে আক্রমণ করার জন্য ভারতীয় নৌঘাঁটি ব্যবহার করছে।"
"এই দাবি ভুয়া", বলা হয় বিবৃতিতে।
অতীতে এমনটা হয়েছে?
এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা দরকার, ১৯৯১ সালে সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় ভারত সরকার মার্কিন বিমানকে তার ভূখণ্ডে জ্বালানি ভরার অনুমতি দিয়েছিল। তা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছিল ক্ষমতাসীন সরকারকে।
এরপর ২০০৩ সালে শোনা গিয়েছিল, ইরাকে সামরিক অভিযানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশের সাহায্যের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী।
তৎকালীন বিদেশমন্ত্রী যশবন্ত সিনহা অবশ্য জানিয়েছিলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তরফে ভারতকে এমন কোনো অনুরোধ করা হয়নি। বিবিসিকে মি. সিন্হা এ-ও জানিয়েছিলেন, ভারত যুদ্ধের প্রতি নিজেদের দ্ব্যর্থহীন বিরোধিতার ক্ষেত্রে অটল রয়েছে।
এরপর ২০১৬ সালে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে 'লজিস্টিকস এক্সচেঞ্জ মেমোরেন্ডাম অব এগ্রিমেন্ট' স্বক্ষর হয়।
এটা একটা 'কার্যকরী' চুক্তি যার ভিত্তিতে 'একটা দেশ (তার বন্দর বা বিমানবন্দর) অন্য দেশের সফররত সামরিক বাহিনীকে প্রয়োজনীয় সরবরাহ এবং পরিষেবা প্রদান করে।'
বিশ্বের বহু দেশের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এমন ব্যবস্থাপনা রয়েছে।
তা সত্ত্বেও ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত ওই চুক্তির প্রতীকী এবং কৌশলগত গুরুত্ব উপেক্ষা করা যায় না।
End of বিবিসি বাংলায় অন্যান্য খবর
বিশেষজ্ঞদের মতামত
অবসরপ্রাপ্ত ভাইস অ্যাডমিরাল শেখর সিন্হা বিসি বাংলাকে বলেছেন, "এই প্রসঙ্গে ভারত ইতিমধ্যে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করে দিয়েছে। দেশের ঘাঁটিগুলোর রেকর্ড ঘাঁটলেই সঠিক তথ্য জানা যাবে।"
সাম্প্রতিক পরিস্থিতির গভীরতার দিকে ইঙ্গিত করে তিনি ব্যাখ্যা করেছেন, "দুই দেশ যুদ্ধ ঘোষণা করলে পক্ষ নেওয়াটা কঠিন। প্রথম থেকে ভারত এটা স্পষ্ট করে দিয়েছে দুই দেশের যুদ্ধে তারা কোনো পক্ষ নেবে না। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের দিক থেকেও কিন্তু সেটাই কাম্য।"
প্রবীণ সাংবাদিক এবং প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ মনোজ জোশীর কথায়, "মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তি থাকলেও সেটা সব ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। যদি কোনো সময় বিষয়টা দেশের স্বার্থের বিরুদ্ধে যায় তাহলে ভারত যুক্তরাষ্ট্রকে অ্যাক্সেস না-ও দিতে পারে।"
"ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ভারতীয় বন্দর ব্যবহারের যে দাবি উঠেছে, সেই বিষয়টাকে সরকারের গুরুত্ব সহকারে দেখা উচিত এবং তার উপর কড়া নজর রাখা উচিত। যাতে ভবিষ্যতে অন্য কেউ এসে এমন দাবি না করতে পারে।"
বর্তমান পরিস্থিতি ভারতের পক্ষে কঠিন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ওপি জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির জিন্দাল স্কুল অফ ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স-এর অ্যাসিস্টেন্ট প্রফেসর ড. গীতাঞ্জলি সিন্হা রায় বলেছেন, "পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তরফে ওই মন্তব্যকে ভুয়া বলে খারিজ করার পদক্ষেপ কিন্তু ইন্টারন্যাশানাল রিলেশন্সের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্রথমত, কারো বিরুদ্ধে গিয়ে এই বিবৃতি দেওয়া এবং বৈশ্বিকস্তরে এর ফল কী হতে পারে তা অনুমান করা যায়।"
"ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বিশ্বের শক্তিশালী দেশগুলোর বেশির ভাগই কোনো না কোনো পক্ষ নিয়েছে এবং বিশ্বজুড়ে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। তাই এই পরিস্থিতিতে ভারত যে পদক্ষেপই নিক তার কিন্তু গুরুত্ব রয়েছে।"
শেখর সিন্হার মতে, চলমান সংঘর্ষের প্রেক্ষিতে ভারত এখনো পর্যন্ত নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রেখেছে।
যদিও ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধে ভারতের অবস্থান নিয়ে ভিন্ন মত পোষণ করেন মনোজ জোশী।
তাঁর কথায়, "সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে যে, চলমান পরিস্থিতিতে ভারত নিরপেক্ষ অবস্থান নিয়েছে। কিন্তু আমি তা মনে করি না।"
"ভারত উপসাগরীয় দেশগুলোয় হামলার পর ভারত তাদের সঙ্গে কথা বলেছে এবং তাদের উপর হামলার নিন্দা করেছে। কিন্তু ইরানের সর্বোচ্চ নেতার উপর হামলার নিন্দা করতে দেখা গিয়েছে কি?", বলেন মি জোশী।