নির্বাচন, সংস্কার, অর্থনীতি ইস্যুসহ ভাষণে আরো যা বললেন প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস

প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস
ছবির ক্যাপশান, প্রধান উপদেষ্টা জানান, বকেয়া দায় পরিশোধের পরও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ছে

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতেই অনুষ্ঠিত হবে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন। সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ এবং উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বাচন আয়োজনে সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহায়তা করা হবে বলে জানিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস।

'জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস' উপলক্ষ্যে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন তিনি।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, "আমরা আশা করছি এই ঐক্যমতের ভিত্তিতে অচিরেই রাজনৈতিক দলগুলো জুলাই সনদে স্বাক্ষর করবে এবং এর বাস্তবায়নেও ঐকমত্যে পৌঁছাবে।"

এছাড়া তার ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা দাবি করেছেন, ''জাতীয় জীবনে শান্তি শৃঙ্খলা ফিরে এসেছে, অর্থনীতিতে গতিশীলতা এসেছে, সংকট দূর হয়েছে।''

আর এ কারণেই তারা এখন অন্তর্বর্তী সরকার থেকে একটি নির্বাচিত সরকারের হাতে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব তুলে দেওয়ার দিকে অগ্রসর হচ্ছেন বলে তিনি দাবি করেন।

এছাড়া দেশের অর্থনীতি, বিনিয়োগ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও কথা বলেন অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস।

তিনি বলেন, "একটা গোষ্ঠী নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করার জন্য উন্মুখ হয়ে আছে। তারা দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করতে দেশের বাহিরে বসে এবং ভেতরে থেকে নানা অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে।"

এছাড়া জুলাই অগাস্টের হত্যাযজ্ঞে যারা জড়িত তাদের বিচার এ দেশের মাটিতে হবেই বলেও উল্লেখ করেন প্রধান উপদেষ্টা।

এর আগে মঙ্গলবার বিকেলে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবসের আয়োজনে 'জুলাই ঘোষণাপত্র' পাঠ করেন অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস।

'জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস' উপলক্ষ্যে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন প্রধান উপদেষ্টা

ছবির উৎস, PID

ছবির ক্যাপশান, 'জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস' উপলক্ষ্যে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন প্রধান উপদেষ্টা

নির্বাচন ও সংস্কার নিয়ে যা বললেন প্রধান উপদেষ্টা

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

জুলাই গণ অভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষ্যে জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে বার্তা দিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস।

এতোদিন ফেব্রুয়ারির শুরুতে অথবা এপ্রিলে নির্বাচন আয়োজনের কথা বলা হয়েছিল।

তবে মঙ্গলবারের ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, "অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে আমি প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাছে চিঠি পাঠাব, যেন নির্বাচন কমিশন আগামী রমজানের আগে, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন।"

এসময় নির্বাচন আয়োজনে সরকারের প্রস্তুতি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও কথা বলেন অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। এছাড়া বুধবার থেকে সবাইকে নির্বাচনের জন্য মানসিক এবং প্রতিষ্ঠানিক প্রস্তুতির কথাও বলেন তিনি।

প্রধান উপদেষ্টা দাবি করেন, ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচনের মাধ্যমে ইতিহাসের কলঙ্কিত কোনো অধ্যায়ের পুনরাবৃত্তি করতে চায় না তার সরকার।

তিনি বলেন, "দেশের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত যতগুলো বড় সংঘাত, সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে তার সবগুলোর নেপথ্যে কারণ ছিল ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচন।"

নির্বাচনি ইশতেহার থেকে নারী এবং তরুণরা যেন বাদ না পড়ে সেদিকে নজর রাখতে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিও আহ্বান জানান প্রধান উপদেষ্টা।

জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে সংস্কার ও জুলাই সনদ নিয়েও কথা বলেন প্রধান উপদেষ্টা।

তিনি জানান, কিছু বিষয় ছাড়া দ্বিতীয় পর্যায়ে ২৩ দিনের আলোচনায় চিহ্নিত ১৯টি বিষয়ের বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়েছে।

তিনি বলেন, "সংস্কারের ক্ষেত্রে আমরা আমাদের লক্ষ্যে পৌঁছাতে পেরেছি। ঐকমত্য কমিশনের পরিচালনায় দেশের সকল রাজনৈতিক দল মিলে দীর্ঘদিন ধরে প্রতিনিয়ত আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে 'জুলাই সনদ' চূড়ান্ত হওয়ার পর্যায়ে এসেছে।"

"ঐক্যমতের ভিত্তিতে অচিরেই রাজনৈতিক দলগুলো জুলাই সনদে স্বাক্ষর করবে এবং এর বাস্তবায়নেও ঐকমত্যে পৌঁছাবে," বলেন তিনি।

প্রসঙ্গত, এর আগে গত বছর দায়িত্ব গ্রহণের চার মাসের মাথায় জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া ভাষণে তিনি ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে নির্বাচনের কথা বলেছিলেন।

পরে লন্ডনে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সাথে তার বৈঠকের পর বিএনপি ও সরকার যৌথভাবে জানায় নির্বাচন ফেব্রুয়ারিতেই হতে পারে। তার আজকের ভাষণে সেই বিষয়টিই আবার উঠে আসলো।

 জুলাই অভ্যুত্থানের প্রথম বর্ষপূর্তিতে জুলাই ঘোষণাপত্র পাঠ করছেন প্রধান উপদেষ্টা

ছবির উৎস, CA Press Wing

ছবির ক্যাপশান, জুলাই অভ্যুত্থানের প্রথম বর্ষপূর্তির দিনে জুলাই ঘোষণাপত্র প্রকাশ করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার

অর্থনীতি ও অন্যান্য বিষয়ে ভাষণে যা বললেন

জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে নির্বাচন ও সংস্কারের পাশাপাশি গত এক বছরে দেশের অর্থনীতি, বিনিয়োগ, বিচার প্রক্রিয়া ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিসহ নানা বিষয়ে কথা বলেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস।

তিনি দাবি করেন, দায়িত্ব নেয়ার পর মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বাজার পরিস্থিতি স্থিতিশীল করার চ্যালেঞ্জ সরকার সফলভাবে মোকাবিলা করেছে।

"ভঙ্গুর অর্থনীতি ও বন্যার কারণে খাদ্য মূল্যস্ফীতি হয়েছিল প্রায় ১৪ পার্সেন্ট। এখন সেটা অর্ধেকে নেমে এসেছে। আমরা আশা করছি, ডিসেম্বরের মধ্যে এটি ৬ শতাংশে নেমে আসবে," দাবি করেন প্রধান উপদেষ্টা।

গত এক বছরে রেমিট্যান্সের ইতিবাচক প্রবাহের কারণে দেশের মুদ্রাবাজারে স্থিতিশীলতা ফিরে এসেছে উল্লেখ করে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস জানান, "গত অর্থবছর ব্যাংকিং চ্যানেলে রেকর্ড তিন হাজার ৩৩ কোটি ডলার প্রবাসী আয় দেশে এসেছে। রপ্তানি আয় প্রায় ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে।"

এছাড়া গত ১৬ বছরে দেশ থেকে পাচার হওয়া বিপুল অর্থ ফিরিয়ে আনা এবং চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবস্থাপনাকে নতুন করে সাজানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।

নির্বাচনে ভোট দিয়ে বেরিয়েছেন একজন নারী (প্রতীকী ছবি)

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, সবাইকে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে বলেছেন প্রধান উপদেষ্টা (প্রতীকী ছবি)

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহত এবং আহতদের জন্য সরকারের নেয়া নানা পদক্ষেপের কথাও তুলে ধরেন প্রধান উপদেষ্টা।

তিনি জানান, "এখন পর্যন্ত ৭৭৫টি পরিবারকে প্রায় ১০০ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র ও মাসিক ভাতা বাবদ ব্যাংক চেক দেওয়া হয়েছে। অবশিষ্ট যাঁরা আছেন, তাঁদেরও কয়েকটি আইনগত বিষয় নিষ্পত্তি সাপেক্ষে সঞ্চয়পত্র দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।"

এর পাশাপাশি আহত ১৩ হাজার ৮০০ জনকে তিনটি ক্যাটাগরিতে নগদ টাকা ও চেক বাবদ মোট ১৫৩ কোটি ৪ লাখ টাকা দেয়া হয়েছে বলেও তিনি জানান।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রধান উপদেষ্টা জানান, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পুলিশ সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবনা অনুযায়ী ১৬টি সংস্কারকাজ সম্পন্ন হয়েছে। আরও ৪৩টি সংস্কারকাজ শেষ হওয়ার পথে।

এর মধ্য দিয়ে "দলীয় বাহিনীতে পরিণত হওয়া ভঙ্গুর আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে" নতুন করে গড়ে তোলার জন্য তার সরকার কাজ করছে বলে জানান অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান।

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিতে আগের সরকারের করা সাইবার নিরাপত্তা আইন এবং ওই আইনের অধীনে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে করা সব মামলাও বাতিল করা হয়েছে বলে জানান অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস।