জুলাই ঘোষণাপত্রের অনুষ্ঠান ঘিরে সংসদ ভবন এলাকায় সারাদিন যা যা হলো

শেখ হাসিনা সরকার পতনের বর্ষপূর্তিতে ঢাকার মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে নানা আয়োজন ছিল অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পক্ষ থেকে। এ অনুষ্ঠানে যোগ দেয়ার জন্য দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে সরকারি উদ্যোগে লোকজন আনা হলেও দিনভর গুড়ি গুড়ি বৃষ্টিতে কিছুটা ছন্দপতনও হয় পুরো আয়োজনে।
যে কারণে পুরো আয়োজন ঘিরে লোক সমাগমও কিছুটা কম ছিল দিনের প্রথম দিকে। সকাল থেকে গান, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান কনসার্ট, ড্রোন শোসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, শিল্পকলা একাডেমি ও সংসদ সচিবালয়।
কেউ এসেছিলেন বাবা মায়ের সাথে জাতীয় পতাকা হাতে। আবার বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মীরা এসেছিলেন মিছিল ও শোডাডাউন নিয়ে।
এদিকে, 'জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস' উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে গ্যাসভর্তি বেলুন বিস্ফোরণে কয়েকজন আহতের ঘটনাও ঘটেছে।
সকাল থেকে এই অনুষ্ঠানে যোগ দিতে দেখা যায় বিভিন্ন ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মীদের।
এই প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে অনুষ্ঠানে যোগ দিতে আসা কেউ কেউ বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে অনুষ্ঠানে যোগ দেয়ার জন্য এক ধরনের নির্দেশনাও ছিল।
বিকেল পাঁচটার পরপর চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিক স্বীকৃতির অঙ্গীকার রেখে 'জুলাই ঘোষণাপত্র' ঘোষণা করেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস।
ঘোষণাপত্র শুনতে যারা এসেছিলেন তারাও, ঘোষণাপত্রের নানা দিক নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।

'নির্দেশনা ছিল, নিজেরাও স্বতঃস্ফূর্তভাবে এসেছি'
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
গণঅভ্যুত্থান দিবসে জুলাই ঘোষণাপত্রের মূল আয়োজন ছিল বিকেলে। তবে সকাল থেকে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, গান, কনসার্টসহ নানা আয়োজন ছিল সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও শিল্পকলা একাডেমির আয়োজনে।
সকাল এগারোটার পর থেকে ব্যক্তিগত উদ্যোগের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকেও অনেককে মানিক মিয়া এভিনিউয়ের অনুষ্ঠানস্থলে আসতে দেখা যায়।
দলবদ্ধভাবে যারা অনুষ্ঠানস্থলে এসেছিলেন, তাদের মধ্যে বেশিরভাগই ছিল ব্যাংক, বীমাসহ বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা।
তাদের কেউ কেউ বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন, গণঅভ্যুত্থান দিবসের এই অনুষ্ঠানে যোগ দিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে নির্দেশনা ছিল। তবে সেটি সবার জন্য বাধ্যতামূলক ছিল না।
মানিক মিয়া এভিনিউতে অনুষ্ঠানে অংশ নিতে আসা রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকের কর্মকর্তা শোয়েব হাসান বিবিসি বাংলাকে বলেন, "আমরা সেলিব্রেশন করার জন্য এখানে আসলাম। আমাদের অফিস থেকেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, আবার স্বতঃস্ফূর্তভাবেও অনেকে এখানে এসেছি"।
ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে ব্যানার-ফেস্টুন ও গণঅভ্যুত্থান দিবসের টিশার্ট গায়ে মিছিল নিয়ে অনেকে অংশ নেন অনুষ্ঠানে।
বেসরকারি ব্যাংক মার্কেন্টাইল ব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট মুকিতুল কবির বিবিসি বাংলাকে বলেন, "বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে একটা নির্দেশনা ছিল, সেটা আসলে ওনারা ওভাবে বলে নাই। বলছে যদি কেউ আসতে চায় আসতে পারে। এখানে কতজন আসতে হবে, কিভাবে আসতে হবে ওভাবে ওনারা আমাদের কিছু বলে নাই"।
জামায়াতে ইসলামী, গণঅধিকার পরিষদ, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদেরও মিছিল নিয়ে এই অনুষ্ঠানে যোগ দিতে দেখা যায়।
নরসিংদী থেকে নাঈম আহমেদ নামে একজন এসেছিলেন পরিবার নিয়ে। তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেন, "শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার বর্ষপূর্তির অনুষ্ঠানটি নিজে উপস্থিত থেকে দেখার আগ্রহ ছিল। যে কারণে নিজে এসেছি, পরিবার নিয়েও এসেছি"।
রাজধানী ঢাকাসহ আশপাশের জেলাগুলো থেকেও অনেকেই অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন পরিবারসহ। তবে, সকাল থেকে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি অনুষ্ঠানে কিছুটা ছন্দপতনও ঘটায়।
এই সমাবেশে লোকজনের আসার সুবিধার জন্য সরকার বিশেষ ট্রেন ও বাসের ব্যবস্থা করেছে বলে গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে।

গ্যাস বেলুন বিস্ফোরণ, আহত কয়েকজন
অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের বর্ষপূর্তির দিনটি উদযাপন উপলক্ষে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের প্যান্ডেল প্রস্তুত করা হয়েছিল জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার সামনের মানিক মিয়া এভিনিউতে।
এই রাস্তাজুড়ে মুল মঞ্চ ছাড়াও দুই পাশে বেশ কিছু বিশালাকারের এলইডি স্ক্রিনও স্থাপন করা হয়েছিল দর্শনার্থীদের সুবিধার জন্য।
দুপুর নাগাদ হাজারো মানুষ জড়ো হন মানিক মিয়া এভিনিউয়ে রাস্তায়। সেখানেই শুরুতেই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে গান পরিবেশন করেন জামায়াত ঘনিষ্ঠ সাইমুম শিল্পীগোষ্ঠী, কলরব শিল্পী গোষ্ঠী।
এরপর কণ্ঠশিল্পী নাহিদ, তাশফি, আর্টসেল, ওয়ারফেজসহ বিভিন্ন ব্যান্ডদল জুলাই আন্দোলন ও দেশাত্মবোধক গান পরিবেশন করে।
দুপুর সোয়া দুইটার দিক থেকে মানিক মিয়া এভিনিউয়ের মঞ্চ থেকে ঘোষণা আসে করা হয়, ২০২৪ সালের ৫ই অগাস্ট দুপুর দুইটা ২৫মিনিটে বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে ভারত গিয়েছিলেন শেখ হাসিনা।
সেই ক্ষণটিকে উৎযাপন করতে ঠিক দুইটা ২৫ মিনিটে হেলিকপ্টার আকৃতির বেলুন উড়ানোর ঘোষণা দেওয়া হয় মঞ্চ থেকে।
মঞ্চের সামনেই বেলুন রাখা হয়েছিলো ওড়ানোর জন্য। প্রথমেই তারই একটিতে আগুন জ্বলে উঠলে প্লাস্টিকের টুকরো ছড়িয়ে পড়ে।
সেই আগুনে সেখানে উপস্থিত কয়েকজনের হাত ও পায়ের কিছু অংশে আগুনও ধরে যায়। পরে দ্রুত আহতদের নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকার বার্ন ইন্সটিটিউটে।
সেখান থেকে অনুষ্ঠানের সাউন্ড বক্সের তারেও আগুন ধরে গেলে অনুষ্ঠানস্থলে কিছুটা বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হয়। পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের তৎপরতায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসে।

ছবির উৎস, CA PRESS WING
'সংস্কার ও বিচার তারুণ্যের ভাবনা
সারাদিন গুড়িগুড়ি বৃষ্টি উপেক্ষা করে অনেকেই এসেছিলেন জাতীয় সংসদ ভবন সংলগ্ন মানিক মিয়া এভিনিউয়ের এলাকায়।
বিকেল পাঁচটার দিকে সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার আলাদা মঞ্চ থেকে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস জুলাই ঘোষণাপত্রের ঘোষণা দেন।
গত প্রায় আট মাস ধরে জুলাই ঘোষণাপত্র নিয়ে নানা আলোচনার পর এ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়াও পাওয়া গেছে সেখানে উপস্থিত তরুণদের কাছ থেকে।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সাইফুল ইসলাম বিবিসি বাংলাকে বলেন, "আমরা আশা করেছি সংবিধানে জুলাই জুলাই আন্দোলনের স্বীকৃতি দেওয়া হবে। জুলাইয়ের যারা আহত হয়েছেন তাদের সুরক্ষা নিশ্চিতসহ আমাদের অনেক বেশি আশা ছিল। তার অনেক কিছুই এই ঘোষণাপত্রে আমরা পাইনি"।
এই অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়া তরুণদের অনেকেই জুলাই আন্দোলনের আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবায়নের দাবি জানান।
ভবিষ্যতে স্বৈরাচারি কাঠামো প্রতিরোধে তাদের অনেকেই জুলাই গণহত্যার বিচার, রাষ্ট্র ব্যবস্থার বড় ধরনের সংস্কারের প্রত্যাশার কথাও জানান।
সুমাইয়া আক্তার নাদিয়া এসেছিলেন মানিক মিয়া এভিনিউয়ের ঘোষণাপত্র অনুষ্ঠানে। তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেন, "১৬ বছরের সব কিছু মাত্র এক বছরে পরিবর্তন হয়তো হবে না। তবে আমরা আপাতত আশা করছি সংস্কার। আমরা সংসদীয় গণতন্ত্র রাজনৈতিক সংস্কৃতির আমূল সংস্কার চাই।''








