সোশাল মিডিয়া কীভাবে চলচ্চিত্র তারকা ভিজয়কে রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত করল

ভিজয় একটি সাদা শার্ট এবং গলায় লাল ও হলুদ ডোরাকাটা উত্তরীয় পরা অবস্থায় একটি নির্বাচনী প্রচার যানে হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর দুই পাশে নিরাপত্তারক্ষীরা রয়েছেন। তাঁর চারপাশে উজ্জ্বল হলুদ ও লাল রঙের কনফেটি উড়ছে।

ছবির উৎস, TVK

ছবির ক্যাপশান, ভিজয়-এর টিভিকে তামিলনাড়ু নির্বাচনে একক বৃহত্তম দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে
    • Author, আনবারাসন ইথিরাজন
    • Role, গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স করেসপনডেন্ট
  • পড়ার সময়: ৫ মিনিট

ভারতের দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্য তামিলনাড়ুর সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনে প্রচারের সময় যখন মাধার বদরুদ্দিনের ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় সামনে আসে, তখন খুব কম লোকই ভেবেছিলেন যে তাঁর জেতার কোনো সম্ভাবনা আছে।

বদরুদ্দিন তামিলগা ভেট্টি কাজগম (টিভিকে) নামক রাজনৈতিক দলের সদস্য, যার নেতৃত্বে রয়েছেন চলচ্চিত্র তারকা থেকে রাজনীতিতে আসা চন্দ্রশেখর জোসেফ ভিজয়, যিনি জনপ্রিয়ভাবে 'থালাপ্যাথি' (কমান্ডার) ভিজয় নামে পরিচিত। তিনি মাদুরাই সেন্ট্রাল নির্বাচনী এলাকা থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন, যেখানে বিখ্যাত হিন্দু তীর্থস্থান মীনাক্ষী আম্মান মন্দির অবস্থিত।

গত মাসে নির্বাচনের আগে, ৪২ বছর বয়সী মাংসের দোকানের মালিক বদরুদ্দিনকে টিভিকে সমর্থকদের একটি দলের সাথে ভোট চাইতে দেখা গিয়েছিল।

বিপরীতে, তাঁর দুই প্রতিদ্বন্দ্বী-প্রভাবশালী আঞ্চলিক দল দ্রাবিড় মুনেত্র কাজগম (ডিএমকে) এবং অল ইন্ডিয়া আন্না দ্রাবিড় মুনেত্র কাজগম (এআইএডিএমকে)-র প্রার্থীরা বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা, উচ্চকিত প্রচারণা এবং হেভিওয়েট সিনিয়র নেতা ও তারকাদের নিয়ে মাঠে নেমেছিলেন।

তাঁরা বেশ শক্তিশালী প্রার্থীও ছিলেন। যেমন ডিএমকে প্রার্থী ছিলেন রাজ্য সরকারের মন্ত্রী ও প্রবীণ নেতা পালানিভেল থিয়াগা রাজন এবং এআইএডিএমকে-র পক্ষে ছিলেন বিশিষ্ট অভিনেতা-পরিচালক সুন্দর সি।

এ কারণে রাজনৈতিক বিশ্লেষকসহ কেউই ভাবেননি যে বদরুদ্দিন হিন্দু-প্রভাবিত একটি খ্যাতনামা মন্দির নগরীর কেন্দ্রীয় অঞ্চলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা টুপি-পরা একজন মুসলিম সেখানে জিততে পারেন। তিনি কোনো প্রখ্যাত পরিবার বা রাজনৈতিক বংশের সদস্য ছিলেন না। এমনকি টিভিকে নেতা ভিজয়ও তাঁর পক্ষে প্রচারে ওই আসনে যাননি।

কিন্তু গত সপ্তাহে বদরুদ্দিন তাঁর শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বীদের পরাজিত করেন, ১৯ হাজারের বেশি ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়ে।

"আমার একমাত্র শক্তি ছিল আমাদের নেতা ভিজয় এবং দলের নির্বাচনী প্রতীক (একটি বাঁশি)। আমাদের নেতার নীতির ভিত্তিতে আমি প্রচার করেছি, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে," বিবিসিকে বলেন বদরুদ্দিন।

টিভিকে দলের নারী সমর্থকরা হাত তুলে আনন্দে উদ্‌যাপন করছেন; তাঁদের অনেকের পরনে লাল ও হলুদ স্যাশ। পেছনে পুরুষদের একটি ভিড়, যাদের একজন বাঁশি বাজাচ্ছেন।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ভিজয়ের সাম্প্রতিক নির্বাচনী সাফল্য উদ্‌যাপন করছেন তাঁর সমর্থকেরা
স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

তিনি একাই চমক দেখাননি। টিভিকে প্রার্থীরা—যাঁদের বেশিরভাগই নতুন মুখ—জিতেছেন ১০৮টি আসন, ফলে ২৩৪ সদস্যের তামিলনাড়ু বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতার থেকে ভিজয়ের দল মাত্র ১০ আসন পিছিয়ে থাকে। এটি ভারতের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম বড় অঘটন।

কয়েক দিন অনিশ্চয়তার পর, পর্যাপ্ত সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবেন কি না তা নিয়ে সংশয়ের মধ্যে, রোববার ভিজয় রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন।

ভারতের নির্বাচনী রাজনীতিতে সাধারণত অর্থ, জাত ও ধর্মের আধিপত্য দেখা যায়। রাজ্যের অন্যতম পরিচিত মুখ হওয়া সত্ত্বেও, ভিজয় ব্যক্তিগতভাবে তিন সপ্তাহেরও কম সময় প্রচার চালান।

গত বছরের সেপ্টেম্বরে তাঁর এক সমাবেশে পদদলনে কয়েক ডজন মানুষ নিহত হওয়ার পর তিনি দু'মাসেরও বেশি সময় প্রচার থেকে বিরতি নেন।

কিছু জায়গায় সময়ের অভাব ও লজিস্টিক জটিলতার কথা বলে তাঁর সমাবেশ বাতিল করা হয়।

তাহলে কীভাবে বদরুদ্দিনের মতো কম দৃশ্যমান প্রার্থীরা জিতলেন? বিশেষজ্ঞদের মতে, এর বড় অংশের উত্তর সোশাল মিডিয়ায়।

পর্দার আড়ালে, টিভিকে-র হাজার হাজার "সোশাল মিডিয়া যোদ্ধা" অনলাইনে ভিজয় ও তাঁর প্রার্থীদের পক্ষে নিরলস প্রচার চালান।

ব্যাঙ্গালোরভিত্তিক মিডিয়া কৌশলবিদ অনুপ চন্দ্রশেখরনের ভাষায়, "সম্ভবত ভারতে এটাই প্রথম নির্বাচন, যা প্রায় পুরোপুরি সোশাল মিডিয়ার সাহায্যে জেতা হয়েছে।"

ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম, ফেসবুকসহ নানা প্ল্যাটফর্ম কৌশলে ব্যবহার করে "ভিজয়ের সমর্থকেরা একটি ডিজিটাল বিপ্লব সূচনা করেছেন," তিনি বলেন।

যে 'সুপারস্টার' প্রতিদ্বন্দ্বীদের চমকে দিলেন

ভারতে নির্বাচন সাধারণত মাঠে নেমে লড়া হয়-বড় সমাবেশ, উত্তপ্ত ভাষণ, ব্যানার, বাড়ি বাড়ি প্রচার এবং আগ্রাসী মিডিয়া উপস্থিতির মাধ্যমে। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম স্মার্টফোন বাজার হিসেবে ডিজিটাল প্রচারের ভূমিকা থাকলেও, ভিজয়ের সমর্থকেরা প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় অনেকটাই এগিয়ে ছিলেন।

গত বছর সক্রিয় রাজনৈতিক প্রচার শুরু করার পর ভিজয় কোনো মিডিয়া সাক্ষাৎকার দেননি, সংবাদ সম্মেলনও করেননি। তাঁর প্রকাশ্য ভাষণগুলোও ছিল অন্য নেতাদের তুলনায় বেশ সংক্ষিপ্ত। এর বদলে তিনি সোশাল মিডিয়ায় সরাসরি সমর্থকদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।

তবে ভিজয়ের প্রতিটি উপস্থিতি অনলাইনে নিরবচ্ছিন্নভাবে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। তাঁর ভাষণ ও একক সংলাপগুলোকে ইনস্টাগ্রাম রিলস ও ইউটিউব শর্টসে রূপান্তর করা হয়, এরপর হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ ও অন্যান্য প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে দেওয়া হয়-যার মাধ্যমে পুরোনো ও নতুন সমর্থকরা 'বাঁশি' প্রতীকে ভোট দেন, নতুন নেতৃত্ব থেকে ইতিবাচক পরিবর্তনের আশায়।

যেমন, মাদুরাই শহরে এক দলীয় সম্মেলন থেকে নেওয়া ভিজয়ের একটি সম্পাদিত সেলফি ভিডিও ২৪ ঘণ্টায় প্রায় ৯ কোটি বার দেখা হয়।

তাঁর বহু চলচ্চিত্রে তিনি দুর্নীতি, অবিচার ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করা এক ক্রুদ্ধ মানুষের চরিত্রে অভিনয় করেছেন। তিনি নিজেকে উপস্থাপন করেছেন বঞ্চিত ও কণ্ঠহীন মানুষের পক্ষে দাঁড়ানো একজন মানুষ হিসেবে সামাজিক ন্যায়ের রক্ষক হিসেবে। এতে ভক্তদের মধ্যে তিনি বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেন।

চারজন নারী, চারজন পুরুষ এবং একটি শিশু একটি ছবির জন্য পোজ দিচ্ছে।

ছবির উৎস, TVK

ছবির ক্যাপশান, মাধার বদরুদ্দিন (টুপি পরা) প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের তুলনায় বেশ সাদামাটা প্রচার চালিয়েছিলেন

ভিজয়ের সবচেয়ে বড় সুবিধাগুলোর একটি ছিল তাঁর প্রায় ৮৫ হাজার ফ্যান ক্লাবের নেটওয়ার্ক, যা তিনি তামিল চলচ্চিত্র শিল্পে ৩০ বছরের ক্যারিয়ারে যত্ন করে গড়ে তুলেছেন। দুই বছর আগে দল গঠনের পর, এই বিশাল ফ্যানবেস একটি সংগঠিত রাজনৈতিক যন্ত্র ও পরিশীলিত অনলাইন বাহিনীতে রূপ নেয়—যারা প্রচার সামগ্রী ও ভাষণের ক্লিপ ছড়িয়ে দেয়।

"ভিজয়ের সরাসরি উপস্থিতি সীমিত ছিল। কিন্তু ভার্চুয়াল প্রচারের সেই অদৃশ্য শক্তি ছিল অত্যন্ত কার্যকর। প্রচলিত জনমত জরিপ এবং পর্যবেক্ষকেরা এই প্রবণতা ধরতে পারেননি," ফলাফলের আগে রাজনৈতিক ঢেউ ধরা না পড়ার কারণ হিসেবে বলেন চন্দ্রশেখরন।

তিনি জানান, ভিজয়ের প্রতিটি সমাবেশ দ্রুতই একটি 'দ্বিতীয়', ডিজিটাল জীবন পেত। তাঁর দল ও সমর্থকেরা মিনিটের মধ্যেই ভাষণগুলোকে ঝরঝরে ছোট ক্লিপে রূপান্তর করে ইউটিউবসহ নানা প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে দিত।

দলের শক্তিশালী ও সুসংগঠিত তথ্যপ্রযুক্তি শাখাও প্রচার সামগ্রী তৈরি এবং প্রতিদ্বন্দ্বীদের সমালোচনার জবাব দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

"এই কাজের ধারা সবকিছু একত্র করেছে-উপস্থিতি, বিষয়বস্তু, নেটওয়ার্ক, সময়, গতি ও প্রতীক-একটি একক ধারাবাহিকতায়," বলেন চন্দ্রশেখরন।

এই কৌশল জেন-জেড ভোটার ও নারীদের সঙ্গে বিশেষভাবে সাযুজ্যপূর্ণ হয়েছে বলে ধারণা করা হয়; এদের বড় একটি অংশ তাঁকে সমর্থন দিয়েছেন।

তামিলনাড়ুতে কোনো দলের জন্য ভোটারদের প্রভাবিত করার অভিযোগ ছাড়াই এমন সাফল্য পাওয়া বিরল। তবে দীর্ঘমেয়াদে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন চন্দ্রশেখরন।

"এই মডেলটি কাজ করেছে, কারণ ভিজয় নতুন এবং তাঁর 'বাগেজ' নেই। কিন্তু ক্ষমতায় এসে তাঁকে কাজ করে দেখাতে হবে। দলের কাঠামোও শক্ত করতে হবে-শুধু ডিজিটাল দুনিয়ায় প্রচার চালিয়ে যথেষ্ট নয়," তিনি বলেন।

শীর্ষ পদে দায়িত্ব নিতে গিয়ে অনেকেই তাঁর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার অভাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তবে তাঁর দলের সহকর্মীরা উদ্বিগ্ন নন।

"১৯৬৭ সালে ডিএমকে যখন ক্ষমতায় আসে, তখন তাদের কী ধরনের অভিজ্ঞতা ছিল? আমাদের লক্ষ্য পরিষ্কার প্রশাসন দেওয়া, আর আমাদের নেতা তা দিতে পারবেন," বলেন বদরুদ্দিন।

তামিলনাড়ুর প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক শক্তি ডিএমকে ও এআইএডিএমকের বিরুদ্ধে একাই লড়াই করে ভিজয় যে ইতিহাস গড়েছেন, সে বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। তবে উদ্‌যাপনের মধ্যেই এই উপলদ্ধিও বাড়ছে যে রাজনীতিতে নির্বাচনে জয় কেবল শুরু।

থালাপাতি ভিজয় ও তাঁর ভার্চুয়াল যোদ্ধাদের জন্য বাস্তব দুনিয়ার চ্যালেঞ্জ শুরু হলো এখনই।