বিশাল লটারি জিতে যেভাবে হয়রানি আর বিড়ম্বনার শিকার অটোচালক

ছবির উৎস, Getty Images
- Author, মেরিল সেবাস্টিয়ান
- Role, বিবিসি নিউজ, কোচি
“আমি দোকানে গিয়েছি আমার ছেলের জন্য একটা ব্যাগ কিনতে। দোকানি বলল খুচরাটা আর ফেরত দেবে না। কারণ আমি তো এখন অনেক ধনী- আমার পয়সার দরকার নেই!”
এটাই প্রথমবার নয়- বলছিলেন দক্ষিণ ভারতের কেরালার বাসিন্দা অনুপ বি (পুরো নাম দেয়া হল না)। তিনি বলছেন, দোকান-বাজারে এখন হরহামেশা তাকে একই সমস্যার মুখে পড়তে হচ্ছে।
দু মাস আগে সরকারি লটারিতে প্রথম প্রাইজ পেয়ে কপাল খুলে যাবার পর ৩২ বছর বয়স্ক অনুপের জীবন সব দিক দিয়ে এমনভাবে বদলে গেছে যা ছিল তার চিন্তার বাইরে।
এখন তিনি বাড়ির বাইরে বেরুতে পারছেন না। বেরুলেই লোকজন তাকে চিনে ফেলছে। বহু বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন তার ওপর ক্ষুব্ধ। যার সাথেই দেখা হয়, প্রায় প্রত্যেকেই তার কাছে টাকা চায়।
“একসময় যারা আমাদের ঘনিষ্ঠ ছিলেন, তাদের অনেকেই আমাদের সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছেন,” বলছিলেন অনুপ।
‘না জেতাই ছিল ভাল’
অনুপ কেরালা রাজ্য সরকারের লটারিতে বিশাল ২৫ কোটি রুপির প্রথম পুরস্কার জেতার পর সেপ্টেম্বর মাসে সে খবর সংবাদ শিরোনাম হয়। কেরালায় লটারিতে এই পরিমাণ অর্থ জয়ের কোন ইতিহাস নেই।
ভারতের অনেক রাজ্যেই লটারি অবৈধ। কিন্তু কেরালা সহ কিছু কিছু রাজ্যে লটারি বৈধ, তবে লটারি প্রকল্প চালানোর ক্ষেত্রে নানা কঠোর বিধিনিষেধ আছে।

ছবির উৎস, Getty Images
তার লটারি জেতার খবর সংবাদ মাধ্যমে ফলাও করে প্রচার হবার মাত্র কয়েকদিনের মধ্যেই অনুপের একটি ভিডিও ভাইরাল হয়ে ওঠে। তবে এই ভিডিও-র মেজাজ ছিল একদম আলাদা। সেখানে আনন্দ উচ্ছ্বাস ছিল না। ছিল বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়স্বজনের প্রতি তার কাতর অনুনয়- তাকে হয়রানি করা বন্ধের জন্য আকুল আর্তি।
কপাল ফেরার মাত্র কয়েকদিনের মাথায় অনুপ বলেন এই জ্যাকপট প্রাইজ – এই বিশাল অর্থ, তার জন্য না জেতাই ছিল ভাল।
বিবিসি যখন এ সপ্তাহে অনুপের সাথে যোগাযোগ করে, তিনি প্রথমে কথা বলতে রাজি ছিলেন না। তিনি বলেন তার ছবি যেন বিবিসি প্রতিবেদনের সাথে প্রকাশ না করা হয় । কারণ “প্রতিবার সংবাদমাধ্যমে তাকে নিয়ে নতুন প্রতিবেদন প্রকাশ হবার পরই আবার নতুন করে বিড়ম্বনার ঢেউ ওঠে।”
“আপনি এর মধ্যে দিয়ে না গেলে বুঝবেন না এই হয়রানি, বিড়ম্বনা কতটা চাপের,” বিবিসির সাথে ফোন আলাপের সময় অনুপ জানান। “এটা যেন সিনেমার কোন একটা দৃশ্য। হঠাৎ আপনার চেনা পরিচিতরা সবাই আপনার বাসায় ভেঙে পড়েছে।”
কে এই লটারি জয়ী অনুপ?
কেরালার তিরুভানান্তাপুরমের বাসিন্দা অনুপ বি একসময় পাচক হিসাবে কাজ করতেন। শেফের পেশা ছেড়ে তিনি অটো চালানো শুরু করেন।

ছবির উৎস, Getty Images
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
গত এক দশকের ওপর তিনি ভাগ্য ফেরাতে লটারির টিকিট কিনে যাচ্ছিলেন। আগেও ছোটখাট অর্থ জিতেছেন।
কিন্তু এবারে একেবারে প্রথম পুরস্কার – ২৫ কোটি রুপি তার জীবনকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে।
ভাগ্য ফেরার আনন্দ উপভোগ করার বদলে এখন প্রতিদিন মানুষের হয়রানি সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন অনুপ।
“মানুষের আচরণ রাতারাতি পাল্টে গেছে,” অনুপের মন্তব্য।
তিনি লটারিতে এই বিপুল অঙ্কের অর্থ জিতেছেন এ খবর ঘোষণার পর থেকেই প্রতি সপ্তাহে তার বাসায় এবং পাড়ায় শত শত মানুষ আসছে তার কাছে সাহায্য চাইতে।
“ঘুম থেকে উঠেই দেখি বাসার বাইরে মানুষের ভিড়। ভোর পাঁচটা থেকে শুরু হয়ে যায় মানুষের আসা- তারা বসে থাকে গভীর রাত পর্যন্ত,” তিনি বলেন।
অনুপের স্ত্রী মায়া স্থানীয় একটি সংবাদ চ্যানেলে বলেন যে, মানুষকে সাহায্য করার বিষয়টি নিয়ে তারা স্বামী-স্ত্রী আলোচনা করেছেন। কিন্তু সেটা লটারির অর্থ হাতে পাবার পর।
“লোকে সব ব্যাপারেই আমাদের কাছে অর্থ সাহায্য চাইতে আসছে,” মায়া বলছেন।
রাজ্যের বিভিন্ন জায়গা থেকে অর্থ সাহায্যের অনুরোধ আসছে। “কেউ চাইছে বাড়ি কেনার বন্ধকী ঋণ বা অন্য ঋণ পরিশোধের জন্য আমরা যেন অর্থ দিই। কেউ আবার তাদের কন্যার বিয়ের খরচ বাবদ অর্থসাহায্য চাইছে।''
“এমনকি নানান ব্যাংক ও বীমা কোম্পানির দালালরা অনবরত বহুবার ফোন করেছে,” অনুপ জানালেন। “চেন্নাই থেকে একটা দল এসে আমার কাছে একটা চলচ্চিত্র বানানোর জন্য অর্থ তহবিল দিতে বলেছে।”
কেউ কেউ হয়ত আত্মীয়তা বা বন্ধুত্বের সুবাদে অর্থের অনুরোধ করছেন। কিন্তু এমন মানুষও আসছেন যাদের তারা চেনেনও না। তারাও মনে করছেন এই অর্থে তাদেরও ন্যায্য দাবি রয়েছে, বলছিলেন অনুপ।
“এক ব্যক্তি আমার বাড়ির বাইরে সারা দিন ধর্না দিয়ে বসেছিল। তার দাবি আমি যেন তাকে রয়াল এনফিল্ড ব্র্যান্ডের মোটরবাইক কিনে দিই।”
অনুপ জাানালেন: “প্রত্যেকেই মনে করছে আমি মাগনা এই অর্থ পেয়ে গেছি। আমাকে তো এর জন্য কোন পরিশ্রম করতে হয়নি। তাই তাদের প্রশ্ন- আমি কেন তাদেরও এর ভাগ দেব না?”
End of বিবিসি বাংলার অন্যান্য খবর:
অনলাইন গুজব

ছবির উৎস, Getty Images
এছাড়াও রয়েছ অনলাইনে ছড়ানো গুজব, যা প্রতিদিন তাদের শান্তি নষ্ট করেছে, দম্পতিটি বললেন।
“লটারি জেতার পর সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট দিয়ে বলা হয়েছে আমি যে লটারি জিতেছি, সে বিষয়ে আমি মিথ্যা বলেছি। আমার আগে থেকেই অঢেল টাকা ছিল এবং আমার এই লটারি জেতাটা একটা জালিয়াতির ঘটনা,” অনুপ বলেন।
তিনি বলেন, এখনও তিনি লোকের সামনে যেতে ভয় পাচ্ছেন।
“আমি যেখানেই যাই মানুষ আমাকে চিনে ফেলে, কারণ এতগুলো নিউজ চ্যানেলে, ওয়েবসাইটে আর সংবাদপত্রে আমার মুখ মানুষ দেখেছে।”
স্ত্রীর নিরাপত্তা নিয়েও তিনি উদ্বিগ্ন। তার স্ত্রী এখন আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা। তাদের ছোট একটি ছেলেও আছে।
‘বন্ধুও শত্রু হয়ে যায়’
তবে তার একমাত্র স্বস্তি যে এ ধরনের অভিজ্ঞতা তারই প্রথম হয়নি।
অক্টোবর মাসে স্থানীয় একটি টিভি চ্যানেলে একটি গেমস শোতে যখন তিনি অংশ নেন, তখন অনুপের সাথে আলাপ হয় ৫৯বছর বয়স্ক জয়াপালানের। গত বছর একই রাজ্য সরকার লটারিতে তিনি জ্যাকপট প্রাইজ পেয়েছিলেন। তিনিও ছিলেন অটোচালক।

ছবির উৎস, ANI
গত বছর প্রথম পুরস্কারের অঙ্ক ছিল ১২ কোটি রুপি। গত বছর তার জেতা নিয়েও মিডিয়াতে দারুণ হৈচৈ হয়েছিল এবং মি. জয়াপালানও অর্থ সাহায্যের অনুরোধে জর্জরিত হয়ে পড়েন।
“এত হয়রানির থেকে বোঝা কঠিন হয়ে যাচ্ছিল সাহায্য আসলেই কার দরকার আর অর্থই বা কার প্রয়োজন!” টিভি শো-তে মন্তব্য করেন মি. জয়াপালান।
“এসময় বন্ধুও শত্রু হয়ে যায়,” মি. জয়াপালান আরও বলেন, যিনি এখনও অটো চালান। “অনেকে এখনও আমার ওপর চটে আছে আমি তাদের টাকা দিইনি বলে।”
হুমকি-ধামকি দিয়ে চিঠি পাবার পর মি. জয়াপালান পুলিশের কাছে অভিযোগ দায়ের করতে বাধ্য হন। বাসার চারপাশে তাকে সিসিটিভি ক্যামেরাও বসাতে হয়।
অনুপকে তিনি জয়ের অর্থ নিয়ে “খুবই সতর্ক” থাকার পরামর্শ দিয়েছেন।
“লোকে মনে করে - ও লটারি জিতেছে আর কী! অর্থ নিয়ে তো ওর এখন আর কোন চিন্তাভাবনা নেই। কিন্তু এখনও তো সবকিছুই অনিশ্চিত। আমি তো জানিও না যে কর দেবার পর শেষ পর্যন্ত আমি হাতে কী পাব!” বলেন অনুপ।
লটারিতে জেতা অর্থের কতটা বিজয়ীর হাতে আসবে তার হিসাব নিকাশ বেশ “জটিল”।
প্রথমত রাজ্য সরকার পুরস্কারের অর্থ দেবার সময়ই ৩০% কর বাবদ কেটে নেবে। এরপর টিকিট বিক্রি করেছে যে সংস্থা তারা তাদের কমিশন কাটবে। এর ওপর বিজয়ীকে এই পুরস্কার বাবদ কেন্দ্রীয় সরকারকে বাড়তি সেস কর এবং সারচার্জ পরিশোধ করতে হবে।
অনুপ বলছেন, এই লটারিতে জেতা অর্থ দিয়ে তিনি কী করবেন সে বিষয়ে আগামী কয়েক বছরের আগে তিনি কোন সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন না।
“এই অর্থ যে আমার জন্য একটা আর্শীবাদ সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই,” তিনি বলেন।
“তবে আর কাউকে কোনভাবে সাহায্য করার আগে, আমি চাই এই অর্থ এমনভাবে ব্যবহার করতে, যাতে আমার পরিবারের ভবিষ্যত নিরাপত্তা আমি নিশ্চিত করতে পারি, আমার পরিবার যাতেে স্বাচ্ছন্দ্যে থাকে সেটা দেখাই আমার প্রথম লক্ষ্য।”








