কেন মহাকাশ থেকে ক্ষুদ্র সামুদ্রিক প্রাণী গুনছেন বিজ্ঞানীরা?

ক্রিল মাত্র কয়েক ইঞ্চি লম্বা

ছবির উৎস, WWF

ছবির ক্যাপশান, ক্রিল মাত্র কয়েক ইঞ্চি লম্বা
    • Author, ভিক্টোরিয়া গিল
    • Role, বিজ্ঞান সংবাদদাতা, বিবিসি নিউজ

সাগরের পানির রং হালকা বদলে গেলে সাধারণ চোখে কি তা টের পাওয়া যায়? কেন পানির রং পাল্টালো সেটাও কি চট করে বোঝা বা বলা সম্ভব? কিন্তু মহাকাশ থেকে দেখেই সেটা বলতে পারছেন বলে জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা।

রংয়ের সূক্ষ্ম পার্থক্য ধরে অ্যান্টার্কটিকার অতিক্ষুদ্র, কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক প্রাণীর সংখ্যা গণনার কাজ করা সম্ভব হবে বলে দাবি করেছেন তারা। এই গণনার কাজ চলছে মহাকাশ থেকে, উপগ্রহের মাধ্যমে।

গবেষণর মূল লক্ষ্যবস্তু––অ্যান্টার্কটিক ক্রিল। ক্রিল প্রজাতির এই প্রাণী যার দেখা মেলে দক্ষিণ মহাসাগরে।

পূর্ণাঙ্গ বয়সে কেবল কয়েক সেন্টিমিটার লম্বা এই প্রাণী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জীব। সাগরে এর উপস্থিতি বহুল পরিমাণে লক্ষ্য করা যায়।

তিমি, পেঙ্গুইন, সীল ও সামুদ্রিক পাখিসহ বিভিন্ন সামুদ্রিক প্রাণীর খাদ্য অ্যান্টার্কটিক ক্রিল।

তবে সংরক্ষণবাদী বিজ্ঞানীরা এই বিষয় নিয়ে উদ্বিগ্ন যে, জলবায়ু পরিবর্তন এবং নির্বিচারে মাছ ধরার নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে এই প্রজাতির ওপর।

বিজ্ঞানীদের মতে, এই ক্ষুদ্র কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক প্রাণীর নিরীক্ষণের জন্য প্রয়োজন একটি নতুন উপায়।

ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ডলাইফ ফান্ড, ইউকে (ডাব্লুডাব্লিউএফ ইউকে)-এর প্রধান মেরু উপদেষ্টা রড ডাউনি বলেছেন, "দক্ষিণ মহাসাগরের সুপারহিরো হলো অ্যান্টার্কটিক ক্রিল।"

"এরা ক্ষুদ্র, অজ্ঞাত নায়ক যারা অবিশ্বাস্য সামুদ্রিক জীবনকে টিকিয়ে রাখে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন এবং মাছ ধরা এদের জন্য ঝুঁকির কারণ হয়ে উঠেছে।"

গবেষণার কাজে ব্যস্তু ড. ম্যাক্যারি

ছবির উৎস, WWF

ছবির ক্যাপশান, গবেষণার কাজে ব্যস্তু ড. ম্যাক্যারি
স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

প্রসঙ্গত, ডাব্লুডাব্লিউএফ একটি দাতব্য সংগঠন যারা বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের সঙ্গে যুক্ত।

ইউনিভার্সিটি অফ স্ট্র্যাথক্লাইড, ডাব্লুডাব্লিউএফ এবং ব্রিটিশ অ্যান্টার্কটিক সার্ভের (বিএএস) গবেষকরা অ্যান্টার্কটিকার সমুদ্রে কী পরিমাণ ক্রিল রয়েছে তা খুঁজে বের করার জন্য একটি নতুন উপায় খুঁজে বের করেছেন। এই কাজের জন্য তারা উপগ্রহ ব্যবহার করছেন।

মহাকাশ থেকে মূলত সাগরের পানির রঙের তারতম্যকে পর্যবেক্ষণ করা হয়। সাগরের পানি কতটা আলো শোষণ করছে তার মধ্যে সূক্ষ্ম তারতম্য নির্ভর করে ওই পানিতে কতগুলো ক্রিল সাঁতার কাটছে তার ওপরে।

স্ট্র্যাথক্লাইড ইউনিভার্সিটির ড. কথ ম্যাক্যারি অ্যান্টার্কটিকায় সাগরের পানির রঙের পরিবর্তন দেখতে ক্রিল ধরেছিলেন।

বিষয়টি বিশদে ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, "প্রথমে আমরা শুধু সাগরের পানি দিয়ে পর্যবেক্ষণ করা শুরু করি। তারপর একটি করে ক্রিল ওই পানিতে যোগ করতে থাকি এবং পরিমাপ করি (পানি কতটা আলো শোষণ করল)। তারপর আমরা আরও একটি ক্রিল ওই পানিতে যোগ করি এবং আরও একবার পরিমাপ করি।"

এইভাবেই পরিমাপ চলতে থাকে।

ক্রিলের সন্ধানে বিশালাকার তিমি হাজার হাজার কিলোমিটার পাড়ি দেয়

ছবির উৎস, Victoria Gill/BBC

ছবির ক্যাপশান, ক্রিলের সন্ধানে বিশালাকার তিমি হাজার হাজার কিলোমিটার পাড়ি দেয়

গবেষকরা জানিয়েছেন, ক্রিলের সংখ্যার ঘনত্ব সাগরের পানির রংকে কীভাবে পরিবর্তন করে তা বিশ্লেষণ করা হয়। এই বিশ্লেষণের ওপর ভিত্তি করেই উপগ্রহের মাধ্যমে মহাকাশ থেকে তোলা ছবির সাহায্যে ক্রিলের জনসংখ্যা গণনার কাজ চলে।

বিশ্বের একটি বিরাট অংশের প্রাণীর খাদ্য হলো ক্রিল। এই তালিকায় রয়েছে বিশালাকার তিমি যারা হাজার হাজার কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে অ্যান্টার্কটিকায় পৌঁছায় ক্রিলের সন্ধানে।

একটি 'সুস্থ' মহাসাগরের ভিত্তিও কিন্তু এই ক্রিল। বলা যেতে পারে এটি একটি চক্রের অংশ।

এমন বলার কারণ তিমিরা ক্রিল খায়। আবার ক্রিল সমুদ্রের বরফে বসবাসকারী আণুবীক্ষণিক উদ্ভিদ খায়, আবার সেই উদ্ভিদগুলো বেড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে উষ্ণায়ন সৃষ্টিকারী কার্বন শোষণ করে।

আবার তিমি মলত্যাগ করলে তা সামুদ্রিক উদ্ভিদকে নিষিক্ত করতে সাহায্য করে। এই উদ্ভিদ আবার এই গ্রহকে ঠান্ডা রাখতে সাহায্য করে।

ক্রিলের সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে সাগরের পানির রংয়ের তারতম্য বিশ্লেষণ করা হয়

ছবির উৎস, WWF

ছবির ক্যাপশান, ক্রিলের সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে সাগরের পানির রংয়ের তারতম্য বিশ্লেষণ করা হয়

বর্তমানে সংরক্ষণ বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন, বিশ্ব উষ্ণায়নের সঙ্গে সঙ্গে সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে ওই চক্র ব্যাহত হতে পারে। এর প্রভাব গিয়ে পড়তে পারে ক্রিলের ওপর যা ওই প্রজাতিকে অসংরক্ষিত করে তুলতে পারে।

এই বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে মি. ডাউনি বলেছেন, "আমাদের জরুরি ভিত্তিতে মৎস্য চাষের বিষয়টিকে আরও ভালোভাবে পরিচালনা করতে হবে। একইসঙ্গে ক্রিলের বাসস্থানকেও সামুদ্রিক সুরক্ষিত এলাকার নেটওয়ার্কের মধ্যে রক্ষা করতে হবে।"

"(এই প্রকল্প) এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রজাতির নিরীক্ষণ এবং সংরক্ষণের ক্ষেত্রে একটি প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম হয়ে উঠতে পারে বলে আমরা মনে করি।"