জেলেনস্কির প্রাসাদে শ্যুট করা নাটু নাটু গানটি যেভাবে অস্কার পেল

    • Author, শুভজ্যোতি ঘোষ
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, দিল্লি

ইউক্রেনের বিরুদ্ধে গত বছর রাশিয়া তাদের সামরিক অভিযান শুরু করার ঠিক মাসখানেক পরের কথা। ভারতের আঞ্চলিক তেলুগু সিনেমা জগতের দিকপাল পরিচালক এস এস রাজামৌলির ‘আরআরআর’ ছবির একটি গান ‘নাটু নাটু’ ইউটিউবসহ নানা প্ল্যাটফর্মে মুক্তি পেল।

গানটি শ্যুট করা হয়েছিল ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে, প্রেসিডেন্টের প্রাসাদে ‘মারিনস্কি প্যালেসে’র ঠিক সামনেই। যখন ওই শ্যুটিং হয়, যুদ্ধ শুরু হতে তখনও অবশ্য অনেক বাকি।

তেলুগু সিনেমার দুই জনপ্রিয় নায়ক - রাম চরণ তেজা আর জুনিয়র এনটিআর ওই গানের সঙ্গে যেভাবে পা মিলিয়ে নেচেছিলেন, সেই মাতাল করে ছন্দে গোটা ভারতের আন্দোলিত হতে সময় লাগেনি মোটেই।

মুক্তির পর নিমেষেই ‘টিকটক ট্রেন্ড’ হয়ে ওঠে ‘নাটু নাটু’, জায়গা করে নেয় লক্ষ লক্ষ ভারতীয়র মোবাইল রিংটোনেও।

‘আরআরআর’ সিনেমা হলে বাণিজ্যিক মুক্তি পাওয়ার পর সেই জনপ্রিয়তা হু হু করে আরও বাড়তে থাকে।

এরপর আসতে থাকে একের পর এক আন্তর্জাতিক সম্মান। চলতি বছরের শুরুতেই গোল্ডেন গ্লোব অ্যাওয়ার্ডসের মঞ্চে ‘বেস্ট অরিজিনাল সং’ বা সেরা মৌলিক গানের খেতাব জিতে নেয় ‘নাটু নাটু’।

অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডস

রবিবার রাতে লস অ্যাঞ্জেলসে ৯৫তম অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডসের মঞ্চে অভিনেত্রী দীপিকা পাডুকোন যখন ‘নাটু নাটু’ ইন্ট্রোডিউস করেন, দর্শকদের করতালির ঝড়ে তিনি কথা শেষই করতে পারছিলেন না।

এরপর নাটু নাটু-র দুই গায়ক, রাহুল সিপলিগাঞ্জ ও কাল ভৈরব মঞ্চে লাইভ পারফরম্যান্সের সঙ্গে গানটি পরিবেশন করেন, যার পর ডলবি থিয়েটারের দর্শকরা সবাই দাঁড়িয়ে উঠে শিল্পীদের সহর্ষ অভিবাদন জানান।

এর ঠিক ঘন্টাদেড়েক বাদেই লেডি গাগা বা রিয়ানার মতো বাঘা বাঘা প্রতিদ্বন্দ্বীকে হারিয়ে ‘বেস্ট অরিজিনাল সং’ ক্যাটেগিরিতে অস্কার জিতে নেন নাটু নাটু-র দুই স্রষ্টা – সঙ্গীত পরিচালক এম এম কীরাভানি ও গীতিকার চন্দ্রবোস।

ভারতে তখন সবে সোমবারের সকাল – গোটা দেশ এই অস্কার জয়ের খবরে আনন্দে উদ্বেল হয়ে ওঠে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও অভিনন্দন জানান নাটু নাটু এবং শর্ট ডকুমেন্টারি বিভাগে অস্কার-জয়ী আর একটি ভারতীয় তথ্যচিত্রের নির্মাতাদের।

এর আগে আর এক ভারতীয় লেজেন্ড, এ আর রহমান তার ‘জয় হো’ গানটির জন্য ২০০৮ সালে অস্কার পেলেও সেই সিনেমাটি (স্লামডগ মিলিওনেয়ার) ছিল ব্রিটিশ নির্মাতাদের তৈরি।

ফলে সেই অর্থে নাটু নাটু-ই প্রথম শতকরা একশোভাগ ‘ভারতীয়’ সঙ্গীতের অস্কার বিজয়।

কিন্তু কী এমন আছে ভারতের আঞ্চলিক সিনেমা জগতের এই গানটিতে, যা ‘নাটু নাটু’-কে এভাবে এনে দিচ্ছে একের পর এক বিরল গৌরব?

‘পুরোটাই একটা প্যাকেজ’

মুম্বাইতে ফিল্ম জার্নালিস্ট ও শিল্প সমালোচক নন্দিনী রামনাথের মতে, নাটু নাটু-র সাফল্যের পেছনে আসলে কোনও একটা বা দুটো ফ্যাক্টর নয় – ‘গোটা প্যাকেজটাই আসলে বাজিমাত করেছে’।

তিনি বিবিসিকে বলছিলেন, “কম্পোজার কিরাভানি আর লিরিসিস্ট চন্দ্রবোসের হাতে অস্কার উঠলেও আমি নিশ্চিত তারা এই পুরস্কার ছবির পরিচালক রাজামৌলি, ডান্স কোরিওগ্রাফার প্রেম রক্ষিত আর দুই নায়ক রাম চরণ ও জুনিয়র এনটিআরের সঙ্গে ভাগ করেই নেবেন।”

“আসলে এটা তো শুধু একটা মিউজিক টিউন নয়, রাজামৌলি যেভাবে দৃশ্যটা ভেবেছেন, কোরিওগ্রাফার যেভাবে নাচটা-র পরিকল্পনা করেছেন, দুই নায়ক যেভাবে তাদের নাচের তালে ঝড় তুলেছেন - তাতে বলাই যেতে পারে নাটু নাটু আসলে একটা কমপ্লিট প্যাকেজ,” বলছিলেন তিনি।

ভারতের সুপরিচিত সঙ্গীতশিল্পী আভা হানজুরাও এই মূল্যায়নের সঙ্গে অনেকটাই একমত।

বিবিসি বাংলাকে মিস হানজুরা বলছিলেন, “এই গানটায় একটা দারুণ টিমওয়ার্ক কাজ করেছে। কিরাভানি স্যার একজন সাঙ্ঘাতিক জিনিয়াস আমরা সবাই জানি, তিনি দারুণ সব মিউজিক তৈরি করে আসছেন বহুদিন ধরে।”

“পাশাপাশি চন্দ্রবোস লিখেছেন দারুণ লিরিক্স, দুই গায়কও অসাধারণ গেয়েছেন – সব মিলিয়ে একটা অপূর্ব ম্যাজিক তৈরি হয়েছে।”

“আর নাটু নাটু-তে এমন একটা ক্যাচি হুক আছে যে একবার শুনলেই মনে ধরে যায়, গুনগুন করতে ইচ্ছে করে ... এর জন্যই এই গানটা আজ ভারতের বিনোদন দুনিয়াকে এভাবে গর্বিত করতে পারল,” বলছিলেন আাভা হানজুরা।

যেভাবে তৈরি হল ‘নাটু নাটু’

‘বাহুবলী’-সহ নানা ব্লকবাস্টারের পরিচালক এস এস রাজামৌলি যখন ১৯২০র দশকে ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতের একটি গল্প নিয়ে পিরিওড ড্রামা বানানোর কাজে হাত দেন, তখনই তিনি ঠিক করে নিয়েছিলেন ওই ছবিতে রামচরণ-জুনিয়র এনটিআরের একটি জোড়া নাচের দৃশ্য রাখবেন।

রামচরণ এবং জুনিয়র এনটিআর দুজনেই তেলুগু সিনেমার ‘ডান্সিং হিরো’ হিসেবে অত্যন্ত জনপ্রিয়, তবে তাদের একসঙ্গে নাচের কোনও সিকোয়েন্স এর আগে কোনও ছবিতে দেখা যায়নি।

‘আরআরআর’ নামে ওই ছবিটিতে সুর করার জন্য রাজামৌলি দ্বারস্থ হন দক্ষিণী সিনেমার নামী কম্পোজার এম এম কীরাভানির।

কীরাভানি পরে একটি সাক্ষাৎকারে বিবিসিকে বলেছেন, “আমার কাছে এসে রাজামৌলি এমন একটা গান ডিমান্ড করেন যেখানে দুই নায়কের এনার্জি, জোশ আর প্রাণোচ্ছ্বলতা ফুটে বেরোবে – আর দুজনে নাচবে নিখুঁত কোঅর্ডিনেশনে।”

“আমাকে উনি আরও বলেছিলেন আপনি যেভাবে খুশি, যা খুশি গান বাঁধুন – শুধু মনে রাখবেন ছবির গল্পটা একশো বছর আগেকার।”

একদিন চন্দ্রবোস যখন নিজে গাড়ি চালিয়ে অফিসের দিকে আসছেন, তখন ট্রাফিক লাইটে থেমে থাকা অবস্থায় হঠাৎই তাঁর মাথায় ‘নাটু নাটু’ শব্দগুলো আসে। অফিসে ঢুকেই বাকি কথাগুলো তিনি দ্রুত লিখে ফেলেন।

তেলুগুতে ‘নাটু’ কথাটির অর্থ লোকাল বা দেশি। গানটির হিন্দি অনুবাদে অবশ্য ব্যবহার করা হয়েছে ‘নাচো নাচো’ শব্দবন্ধ।

নাটু নাটু গানটি তৈরির কাজ শুরু হয় ২০২০র জানুয়ারিতে। গানটির ৯০ শতাংশ কাজ প্রথম দুদিনেই হয়ে যায়, কিন্তু বাকিটা শেষ করতে লেগে যায় পুরো উনিশ মাস - কীরাভানি নিজেই এই তথ্য জানিয়েছেন।

কিয়েভে প্রেসিডেন্টের প্রাসাদে শ্যুটিংয়ের ঠিক আগেও শেষ মুহুর্তে বদলানো হয় গানের একটি অংশ।

সেদিন ওই গানটির সঙ্গে নাচের দৃশ্যটির মোট আঠারোটি টেক নেওয়া হয়েছিল, তবে শেষ পর্যন্ত এডিটিংয়ের টেবিলে রাখা হয় দ্বিতীয় টেকটিই। বাকিটা, যাকে বলে, ইতিহাস।

ভারতীয় সিনেমার অর্জন?

অস্কারের মঞ্চে ‘নাটু নাটু’-র সাফল্য বিশ্ব চলচ্চিত্রে ভারতের জন্য কী অর্থ বহন করছে, তা নিয়েও কিন্তু ইতিমধ্যেই আলোচনা শুরু হয়েছে।

ফিল্ম ক্রিটিক নন্দিনী রামনাথ মনে করিয়ে দিচ্ছেন, “নাটু নাটু যে ছবির গান, সেই আরআরআর কিন্তু অস্কারের মৌলিক গান ছাড়া আর কোনও গুরুত্বপূর্ণ ফিল্ম-মেকিং ক্যাটেগরিতে মনোনীত হয়নি।”

“হয়তো অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডসের জুরিরা কমিক বুক-মার্কা প্লটের এই ছবিটিকে যথেষ্ঠ সিরিয়াস বা অন্য আর কিছুতে নমিনেশনের যোগ্য বলেই মনে করেননি”, মন্তব্য করেছেন তিনি।

ফলে নাটু নাটু-র সাফল্য এককভাবে একটি ভারতীয় গানের আন্তর্জাতিক আবেদনের স্বীকৃতির বেশি কিছু নয়, এমন একটা ধারণা অনেক পর্যবেক্ষকই পোষণ করছেন।

“ভারতের মূল ধারার সিনেমা মানেই সং-অ্যান্ড-ডান্স শো বা নাচাগানার ছবি, এমন দৃষ্টিভঙ্গী পশ্চিমে হয়তো এখনও আছে – আর ভারতের আর্টহাউস ছবি অস্কারে পাতে দেওয়ার যোগ্য নয় এটাও তারা ধারণা করছেন”, বলছিলেন নন্দিনী রামনাথ।

তবে অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডস ইভেন্টের আগে পরিচালক এস এস রাজামৌলি হলিউডে যে ধরনের পরিচিতি ও মিডিয়া কভারেজ পেয়েছেন, সেটাকেও অনেকে খুব ইতিবাচক লক্ষণ বলে মনে করছেন।

ভারতীয় সিনেমা মানে যে শুধুই বলিউড নয়, বরং তামিল-তেলুগু-কন্নড় ভাষাতেও যে ভাল বিনোদনধর্মী কাজকর্ম হয় – ‘নাটু নাটু’-র অস্কার সেটাও বাকি দুনিয়াকে জানাবে, এমন আশা ব্যক্ত করেছেন পরিচালক মণি রত্নম বা কমল হাসনের মতো তারকারা।