জামায়াত, ইসলামী আন্দোলন ও খেলাফত মজলিসসহ কয়েকটি দলের যুগপৎ আন্দোলন, কিন্তু কেন

গত পাঁচই অগাস্ট ঘোষণা করা হয় জুলাই ঘোষণাপত্র

ছবির উৎস, CA PRESS WING

ছবির ক্যাপশান, জুলাই সনদের অবিলম্বে বাস্তবায়নই এই যুগপৎ কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য।

বাংলাদেশে জুলাই সনদের বাস্তবায়নসহ পাঁচ দফা দাবিতে জামায়াত, ইসলামী আন্দোলন ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসসহ ধর্মভিত্তিক কয়েকটি দল যুগপৎ আন্দোলনের কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামছে। এই দলগুলো ১৮ই সেপ্টেম্বর থেকে বিক্ষোভের অভিন্ন কর্মসূচি শুরুর ঘোষণা দিয়েছে।

তাদের যুগপৎ আন্দোলনের কর্মসূচি অভিন্ন, কিন্তু তারা সেই কর্মসূচি ঘোষণা করছে পৃথক সংবাদ সম্মেলন করে।

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস আজ রোববার সংবাদ সম্মেলন করে যুগপৎ আন্দোলনের শরিক হিসেবে কর্মসূচি ঘোষণা করেছে।

দলটির ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী তারা ১৮ই সেপ্টেম্বর ঢাকায় বিক্ষোভ মিছিল করবে। পরদিন ১৯শে সেপ্টেম্বর বিক্ষোভ মিছিল করবে বিভাগীয় শহরগুলোয়। আর জেলা-উপজেলায় তারা বিক্ষোভ মিছিল করবে ২৬ শে সেপ্টেম্বর।

বিক্ষোভের অভিন্ন কর্মসূচি ঘোষণা করতে আগামীকাল সোমবার জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলনের সংবাদ সম্মেলন করার কথা রয়েছে।

জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারী জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, সংস্কার ও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করে নির্বাচন করলে পুরোনো স্বৈরাচারী ব্যবস্থাই ফিরে আসবে।

সে কারণে "আমরা বাস্তবায়নের দাবি নিয়ে যুগপৎ আন্দোলনের কর্মসূচি নিচ্ছি" বলেন মি. পরওয়ার।

সরকার ও নির্বাচন কমিশন যখন আগামী বছরের ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়ার কথা বলছে, এমন এক প্রেক্ষাপটে জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনসহ ধর্মভিত্তিক কয়েকটি দল যুগপৎ কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামছে।

প্রশ্ন উঠছে, এই দলগুলো এখন কেন রাজপথে নামছে? তারা বিএনপির ওপর চাপ তৈরি করতে চাইছে কি না, এই প্রশ্নে চলছে আলোচনা।

তাদের এই কর্মসূচি নেওয়ার বিষয়কে সন্দেহের চোখে দেখছে বিএনপি। দলটির একাধিক নেতা বিবিসিকে বলেছেন, "সংস্কার বা জুলাই সনদ নিয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে আলোচনা চলছে। কিন্তু আলোচনার টেবিল থেকে বিষয়টিকে রাজপথে আনা হচ্ছে; যা নির্বাচন প্রশ্নে অনিশ্চয়তা বাড়াতে পারে।"

যদিও জামায়াত,ইসলামী আন্দোলন বা খেলাফত মজলিসের নেতারা এসব বক্তব্য মানতে রাজি নন। তাদের বক্তব্য হচ্ছে, সংস্কার বা জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করা না হলে নির্বাচনের পরে তা বাস্তবায়ন করা হবে কি না, সেই সন্দেহ তাদের রয়েছে।

সেজন্য জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি দিয়ে নির্বাচনের আগেই এর বাস্তবায়ন চাইছেন তারা এবং সমাধান না হওয়ায় তারা রাজপথে নামছেন।

বিবিসি বাংলার অন্যান্য সংবাদ
সরকার ও নির্বাচন কমিশন যখন আগামী বছরের ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়ার কথা বলছে, এমন এক প্রেক্ষাপটে জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনসহ ধর্মভিত্তিক কয়েকটি দল যুগপৎ কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামছে।
ছবির ক্যাপশান, সরকার ও নির্বাচন কমিশন যখন আগামী বছরের ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়ার কথা বলছে, এমন এক প্রেক্ষাপটে জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনসহ ধর্মভিত্তিক কয়েকটি দল যুগপৎ কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামছে।
স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

গত বছর জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার শাসনের পতনের পর সংবিধানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের দাবি সামনে আসে।

অন্তর্বর্তী সরকার বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের প্রস্তাব তৈরির জন্য ১৪টি কমিশন গঠন করে। এ সব কমিশনের প্রস্তাব বা সুপারিশ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য তৈরির জন্য আরেকটি কমিশন গঠন করা হয়। সেই জাতীয় ঐকমত্য কমিশন দলগুলোর সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করছে।

সংস্কারের বিভিন্ন বিষয়ে দলগুলোর একমত হওয়ার কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু সংবিধান সংস্কারের মূল কিছু বিষয়ে এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রশ্নে বিএনপিসহ এর মিত্র কিছু দল এবং জামায়াতসহ ধর্মভিত্তিক দলগুলো বিপরীতমুখী অবস্থান নিয়েছে।

জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গত দুই মাসে কয়েক দফা সময় দিয়েও জুলাই সনদ ও এর বাস্তবায়ন পদ্ধতি চূড়ান্ত করতে পারে নি।

কারণ বিএনপি চাইছে, ভোটের পরে নির্বাচিত সংসদ তা বাস্তবায়ন করবে। আর জামায়াতসহ যুগপৎ আন্দোলনে নামা দলগুলো নির্বাচনের আগেই সনদের আইনি ভিত্তি ও বাস্তবায়ন চাইছে।

এরই মধ্যে ফেব্রুয়ারিতে রোজার আগে নির্বাচন করার বিষয় রয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস লন্ডন সফরের সময় গত ১৩ই এপ্রিল সেখানে অবস্থানরত বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেই বৈঠকের পর নির্বাচন নিয়ে যৌথ বিবৃতি দেওয়া হয়েছিল।

তাতে ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে নির্বাচনের কথা বলা হয়েছিল। পরে ফেব্রয়ারিতে নির্বাচনের জন্য প্রধান উপদেষ্টা চিঠি দেন নির্বাচন কমিশনকে। এখন সে অনুযায়ী প্রস্তুতি চলছে।

এরপরও নির্বাচন ঠিক সময়ে হবে কি না, এমন আলোচনা রয়েছে রাজনীতিতে। অবশ্য সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকে এখন এমন সতর্ক বার্তাও দেওয়া হচ্ছে যে, ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে নির্বাচন না হলে মহাসংকট হতে পারে।

তবে দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে কথা বলে মনে হয়েছে, নির্বাচন প্রলম্বিত করা বা অনিশ্চয়তা সৃষ্টির দায় কোনো রাজনৈতিক দলই নিতে চায় না। সেজন্য জামায়াতসহ যুগপৎ আন্দোলনে নামা দলগুলো ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের ব্যাপারে আপত্তি করতে পারছে না।

তারা নির্বাচনের আগে সংস্কার ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবি সামনে এনেছে। এসব দাবি তোলা ও কর্মসূচি নেওয়ার বিষয়ের সমালোচনা করছেন বিএনপি নেতারা। তারা বলছেন, এর পেছনে নির্বাচন প্রলম্বিত করার চিন্তা থাকতে পারে।

যদিও জামায়াতসহ ওই দলগুলো অভিযোগ অস্বীকার করছে। তারা পাল্টা বিএনপির বিরুদ্ধে একটি যেনতেন নির্বাচন অনুষ্ঠানের চেষ্টার অভিযোগ আনছে।

জাতীয় ঐকমত্য কমিশন জুলাই সনদ ও এর বাস্তবায়ন পদ্ধতিএখনও চূড়ান্ত করতে পারে নি। (ফাইল ছবি)

ছবির উৎস, CA PRESS WING

ছবির ক্যাপশান, জাতীয় ঐকমত্য কমিশন জুলাই সনদ ও এর বাস্তবায়ন পদ্ধতি এখনও চূড়ান্ত করতে পারে নি।

কোন কোন দাবিতে যুগপৎ আন্দোলন

যুগপৎ আন্দোলনের ক্ষেত্রে জামায়াত,ইসলামী আন্দোলন ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসসহ তাদের সমমনা দলগুলো যে পাঁচ দফা দাবি তুলে, তাতে প্রধান দাবিই হচ্ছে, অবিলম্বে জুলাই সনদের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন।

আওয়ামী লীগের মিত্র হিসেবে পরিচিত জাতীয় পার্টি ও ১৪ দলের রাজনীতি নিষিদ্ধ করার দাবিও তুলেছে তারা।

ধর্মভিত্তিক ওই দলগুলো জাতীয় নির্বাচনে লেভেল–প্লেইং ফিল্ড নিশ্চিত করার বিষয়ে জোর দিচ্ছে।

গত বছরের জুলাই-অগাস্টের আন্দোলনে হত্যকাণ্ডের বিচার দৃশ্যমান করার দাবিও তারা তুলছে।

এছাড়া ভোটের আনুপাতিক হারে বা পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচনের দাবিও তাদের রয়েছে।

এসব দাবিতে যুগপৎ আন্দোলনের কর্মসূচি প্রথম যে দলটি সংবাদ সম্মেলন করে ঘোষণা করল, সেই বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব জালালুদ্দীন আহমদ বিবিসি বাংলাকে জানান, "জুলাই সনদ বাস্তবায়নটা খুব জরুরি হয়ে পড়ছে। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন যদি না হয় যদি আইনি ভিত্তি না হয় তাহলে সেই আগের যেই সংবিধান সেটাতে নির্বাচন হইলে একটা সুষ্ঠু নির্বাচন হবে বলে আমরা মনে করি না " বলেন তিনি।

বিবিসি বাংলার অন্যান্য খবর:
যুগপৎআন্দোলন থেকে ধর্মভিত্তিক দলগুলো নির্বাচনি জোট করতে পারে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করেন।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, যুগপৎ আন্দোলন থেকে ধর্মভিত্তিক দলগুলো নির্বাচনি জোট করতে পারে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করেন।

থাকছে কোন কোন দল

যদিও যুগপৎ কর্মসূচি ঘোষণা করার ক্ষেত্রে খেলাফত মজলিস বা ইসলামী আন্দোলনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, আটটি দল এ অভিন্ন কর্মসূচি নিচ্ছে।

তাতে যে সব দলের নাম বলা হচ্ছে, তাদের মধ্যে এবি, গণঅধিকার পরিষদ ও এনসিপি বলেছে, যুগপৎ আন্দোলনের কর্মসূচি নেওয়ার ব্যাপারে তাদের কিছু জানা নেই। তবে দাবিগুলোর বিষয়ে তারা একমত বলে দলগুলোর নেতারা জানিয়েছেন।

ফলে এখন যুগপৎ কর্মসূচি নিয়ে দৃশ্যমান হচ্ছে জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এবং খেলাফত মজলিসের দুই অংশ।

দৈনিক নয়া দিগন্ত পত্রিকার সম্পাদক সালাহউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর মনে করেন, জুলাই আন্দোলনের প্রতিফলন চাওয়ার কারণেই রাজনৈতিক দলগুলোর একসাথে এমন কর্মসূচি।

মি. বাবর বিবিসি বাংলাকে বলেন, "এখনও চার-পাঁচ মাস আছে নির্বাচনের। ফলে তারা যে দাবিগুলো এখন তুলছে, এগুলো হলেই তো নির্বাচন হয়ে যাবে। ফেব্রুয়ারি আসতে আসতে এগুলো হলেই তো নির্বাচন হয়ে যাবে"।

যুগপৎ আন্দোলন থেকে এই দলগুলো নির্বাচনি জোট করতে পারে বলেও রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করেন।

তাদের অনেকে এ-ও বলছেন, ধর্মভিত্তিক এই দলগুলো বিএনপি বিরোধী একটি জোট করে নির্বাচনে যেতে পারে বলেও তাদের মনে হচ্ছে।

তবে ওই দলগুলো এখনই তা স্পষ্ট করছে না।