'খুব তাচ্ছিল্যবশতঃ বলেছিলাম, এসব ফকির-ফাকরার গান আমার ভালো লাগে না'

- Author, শারমিন রমা
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
- পড়ার সময়: ৫ মিনিট
বাংলাদেশের লালন সংগীতের বরেণ্য শিল্পী ফরিদা পারভীন ৭১ বছর বয়সে মারা গেছেন। ১৩ই সেপ্টেম্বর শনিবার রাত ১০টা ১৫ মিনিটে ঢাকার ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তার মৃত্যু হয় বলে বিবিসিকে জানিয়েছেন হাসপাতালটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আশীষ কুমার চক্রবর্তী।
দীর্ঘদিন ধরে কিডনি জটিলতার কারণে ফরিদা পারভীনকে সপ্তাহে দুই দিন ডায়ালাইসিস করাতে হতো। তারও আগে কোভিডে আক্রান্ত হয়েছিলেন এই শিল্পী।
তারপর থেকেই ধীরে ধীরে কিডনিসহ অন্যান্য শারীরিক জটিলতায় আক্রান্ত হতে শুরু করেন তিনি।
সবশেষ নিয়মিত ডায়ালাইসিসের অংশ হিসেবে এই মাসের দুই তারিখে মহাখালীর ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয় তাকে।
তবে ডায়ালাইসিসের পর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়।
হাসপাতালের আইসিইউতে (নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে ভেন্টিলেশনে রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
"ওনার একটার পর একটা নতুন জটিলতা সৃষ্টি হয়। কিডনির পাশাপাশি ব্রেন ও ফুসফুসে সমস্যা দেখা দেয়। অনিয়মিত হৃৎস্পন্দন, রক্তের সংক্রমণও সারা দেহে ছড়িয়ে যায়। তিনি মাল্টিঅর্গান ফেইলিউরের পেশেন্ট ছিলেন," বিবিসিকে জানান ইউনিভার্সেল হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আশীষ কুমার চক্রবর্তী।
দেশবরেণ্য শিল্পী জীবনের সূচনা
বাংলাদেশে লালন সংগীতের অনন্য শিল্পী হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছিলেন ফরিদা পারভীন। দীর্ঘ সংগীত জীবনে লালনের গান চর্চা তাকে পৌঁছে দেয় খ্যাতির শিখরে।
১৯৫৪ সালের ৩১শে ডিসেম্বর নাটোরে জন্মগ্রহণ করা ফরিদা পারভীনের শৈশবের অনেকটা সময় কেটেছে কুষ্টিয়ায়। খুব অল্প বয়সে তার গানের হাতেখড়ি হয় ওস্তাদ কমল চক্রবর্তীর কাছে।
পরবর্তীতে ফরিদা পারভীন উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতে তালিম নেন উস্তাদ ইব্রাহিম খান, উস্তাদ ওসমান গনিসহ আরও কয়েক জনের কাছে।
১৯৬৮ সালে মাত্র ১৪ বছর বয়সে তিনি রাজশাহী বেতারে নজরুল সংগীত শিল্পী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন।
End of এই সাক্ষাৎকারগুলো দেখতে পারেন:

ছবির উৎস, Indian National Museum
লালনের গানে ঘুরে যায় সংগীত জীবনের মোড়
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
নজরুল সংগীত দিয়ে সূচনা করলেও তার সংগীত জীবনের মোড় ঘুরে যায় লালনের গান পরিবেশনার মাধ্যমে।
বিবিসিকে ২০১৩ সালে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ফরিদা পারভীন বলেছিলেন, স্বাধীনতার পর তার গুরু মকছেদ আলী সাঁই তাকে অনুপ্রাণিত করেছিলেন লালনের গান গাইতে।
"আমি খুব তাচ্ছিল্যবশতঃ বলেছিলাম, এসব ফকির-ফাকরার গান আমার ভালো লাগে না।"
কেন এমনটা বলেছিলেন তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ফরিদা পারভীন বলেন, "আমি যেহেতু নজরুলের গানের চর্চা করছিলাম, ক্ল্যাসিকালের চর্চা করছিলাম, লালন সাঁইজি সম্পর্কে আমার সেই রকম ঠিক ধারণার মধ্যে ছিল না।"
"এখন আমি খুব অনুতপ্ত হই, কেন এই কথাটা বলেছিলাম," যোগ করেন তিনি।
গানের ক্ষেত্রে তার প্রাপ্তি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে বিবিসিকে তিনি বলেছিলেন যে, প্রথম প্রাপ্তি হচ্ছে মানুষের ভালোবাসা।
লালনের গান ছাড়াও ফরিদা পারভীনের কন্ঠে বেশ কয়েকটি আধুনিক গানও ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য -- 'এই পদ্মা এই মেঘনা', 'তোমরা ভুলে গেছো মল্লিকাদির নাম', 'নিন্দার কাঁটা'।
তবে নজরুল সংগীত কিংবা আধুনিক গান চালিয়ে না যাওয়া প্রসঙ্গে বিবিসিকে ফরিদা পারভীন বলেছিলেন, "আমার ভাবনার মধ্যে এসে গেলো যে, নজরুল সংগীত গেয়ে আমি তো ফিরোজা বেগম হতে পারবো না বা আধুনিক গান গেয়ে আমি তো ফেরদৌসী রহমান হতে পারবো না, বা সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় হতে পারবো না, সে জন্য লালন সাঁইজির গান যখন আমার শ্রোতারা ভালোবেসে গ্রহণ করলো, আমার ভিতরে একটা ঐশ্বরিক অনুরণন ঘটেছিল যে সাঁইজির গান করলেই সবচাইতে ভালো হবে।"
বিবিসি বাংলার অর্চি অতন্দ্রিলাকে দেওয়া সেই সাক্ষাৎকারে লালনের গান রিমিক্স বা ফিউশন করা প্রসঙ্গেও কথা বলেছিলেন ফরিদা পারভীন।
"ফিউশনের নামে কনফিউশন তৈরি হচ্ছে।"
ফরিদা পারভীন আরো বলেছিলেন, "যন্ত্র ব্যবহার করতে আমার কোনও আপত্তি নেই, কিন্তু মূল সুরটাও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, অনেক যন্ত্রের ঝনঝনানিও হচ্ছে।"
"আমি যদি এখন গান করি, আমার গানটাকে ছাপিয়ে যদি যন্ত্রটা ব্যবহার হয়, তাহলে তো সেই মূল অংশটি থাকলো না," বলছিলেন তিনি।
শ্রোতাদের ভূয়সী প্রশংসা ও স্বীকৃতি
ফরিদা পারভীনের কণ্ঠে 'খাঁচার ভিতর অচিন পাখি', 'সময় গেলে সাধন হবে না', 'মিলন হবে কত দিনে', 'নিন্দার কাঁটা', 'বাড়ির কাছে আরশিনগর' -- এই গানগুলো শ্রোতাদের কাছে এতটাই জনপ্রিয়তা পেয়েছিল যে, সেগুলো এক সময় মানুষের মুখে মুখে ফিরতো।
ফরিদা পারভীনের তীক্ষ্ণ কন্ঠে যে প্রাণ ছিল, তা অনেক শ্রোতাকেই আবেগতাড়িত করে কাঁদিয়েছে বলে বলছিলেন তার সঙ্গে একই মঞ্চে বহুবার সংগীত পরিবেশন করা জনপ্রিয় সংগীত শিল্পী কনকচাঁপা।
"আমরা তো অনেক রকম ক্যাটাগরি আছি, গায়িকা, কন্ঠশিল্পী, সাধক – উনি আসলে সত্যিকার অর্থে আমাদের এই সংগীতাঙ্গনে খুব কম সাধকদের একজন। উনি গানকে উনার সাধনার পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন," বিবিসিকে বলছিলেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত এই শিল্পী।
"লালন সাঁইয়ের আখড়ায় যে গান হয়, সেই গানকে উনি আধুনিকায়ন করে বা আরও সহজ করে সারা বাংলাদেশের মানুষের ড্রয়িং রুমে নিয়ে এসেছেন," আরো যোগ করেন তিনি।
মানুষ হিসেবেও ফরিদা পারভীন সহশিল্পীদেরকে খুব সহজেই আপন করে নিতেন বলে স্মৃতিচারণ করেন শিল্পী কনকচাঁপা।
"আমরা যারা শিল্পী, আমরা তার শূন্যতা অনুভব করবোই।"
লালনসংগীতে বিশেষ অবদান রাখায় ১৯৮৭ সালে একুশে পদক পান ফরিদা পারভীন।
পরবর্তীতে ১৯৯৩ সালে তিনি চলচ্চিত্র 'অন্ধ প্রেম'-এ তার কন্ঠে 'নিন্দার কাঁটা' গানটির জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান। ২০০৮ সালে জাপানের মর্যাদাপূর্ণ ফুকুওয়াকা পুরস্কারেও ভূষিত হন ফরিদা পারভীন।
End of বিবিসি বাংলার অন্যান্য খবর:

ছবির উৎস, Getty Images
বিশ্বমঞ্চে সমাদৃত
দেশের গন্ডি পেরিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে লালনের গান পরিবেশন করে সমাদৃত হয়েছিলেন ফরিদা পারভীন।
তার মৃত্যুতে দেশের অপূরনীয় ক্ষতি হয়েছে বলে বিবিসিকে বলছিলেন বাংলাদেশের আরেকজন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত খ্যাতনামা লোকশিল্পী কিরণ চন্দ্র রায়।
"বাঙ্গালী সংস্কৃতির আকাশের উজ্জ্বল একটি নক্ষত্রের পতন, আমরা ফরিদা পারভিনকে নয়, আমরা হারিয়েছি আমাদের সংস্কৃতির শেকড়ের বিশাল একটি মূলাধার,"বলছিলেন তিনি।
"ফরিদা পারভিনের সঙ্গে আমাদের পারিবারিক বন্ধন ছিল খুব দৃঢ়। আমার সাথে খুব বন্ধুভাবাপন্ন ছিল। আমরা বয়সেও প্রায় কাছাকাছি,"স্মৃতিচারণ করেন কিরণ চন্দ্র রায়।
"বাংলাদেশ থেকে একই সাংস্কৃতিক দলের অংশ হয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বাংলা সংস্কৃতিকে আমরা উপস্থাপন করার সুযোগ পেয়েছি।"
বিদেশের মাটিতে বিভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের কাছে বাংলা গান, বিশেষ করে লালনের গান তুলে ধরার ক্ষেত্রে ফরিদা পারভীন অনন্য ভূমিকা পালন করেছেন বলে মনে করেন কিরণ চন্দ্র রায়।
"যদি বলি, লালন সঙ্গীতকে একেবারে পুরোদস্তুর এককভাবে সারা বিশ্বের দরবারে পৌঁছে দিয়েছিলেন তিনি, তাতে মোটেই ভুল বলা হবে না।"
অন্য সব গানকে পাশে সরিয়ে একমাত্র লালনের গানকে, লালনের ভাব, দর্শন, ইত্যাদিকে ধারণ করে উনি সারা বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছে দিয়েছেন," যোগ করেন কিরণ চন্দ্র রায়।
এই শিল্পীর মতে, সারাবিশ্বে আজ লালনের গান, দর্শন, বিচিত্রতা নিয়ে গবেষণা হচ্ছে, তার মূখ্য অবদান ফরিদা পারভীনের।
জনপ্রিয় গীতিকার ও সুরকার আবু জাফরের সঙ্গে বিয়ে হয় ফরিদা পারভীনের। এই দম্পতির এক মেয়ে ও তিন ছেলে রয়েছে। 'এই পদ্মা এই মেঘনা', 'তোমরা ভুলে গেছো মল্লিকাদির নাম', 'নিন্দার কাঁটা'সহ আবু জাফরের লেখা ও সুর করা অনেক গানই ফরিদা পারভীনের কণ্ঠে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়।
তবে পরবর্তীতে তাদের দাম্পত্যজীবনে বিচ্ছেদ ঘটে । এরপর ২০০৫ সালে একুশে পদকে ভূষিত বংশীবাদক গাজী আবদুল হাকিমের সঙ্গে বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হন ফরিদা পারভীন।








