শেখ হাসিনার মামলার রায় ঘিরে কয়েক জেলায় বিজিবি মোতায়েন, আওয়ামী লীগের 'কমপ্লিট শাটডাউন'

ছবির উৎস, Getty Images
বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল 'মানবতাবিরোধী অপরাধের' মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তিন আসামির বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার সোমবার রায় ঘোষণা করা হবে।
এর প্রতিবাদে এবং এই আদালতের কার্যক্রম বাতিলসহ বিভিন্ন দাবির কথা উল্লেখ করে রোববার ও সোমবার 'কমপ্লিট শাটডাউন' কর্মসূচি পালনের দাবি করছে বাংলাদেশে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগ।
অন্তর্বর্তী সরকার কর্তৃক রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া এই দলটির একজন নেতা বলেছেন, "বেআইনি আদালতে অবৈধ বিচারের নামে নাটকের রায়ের বিরুদ্ধে" তাদের এই কর্মসূচি। সামাজিক মাধ্যমে দলটির সমর্থকরা এর সপক্ষে প্রচার চালাচ্ছেন।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীম রোববার বলেছেন, "রায়ের যে অংশটুকু ট্রাইব্যুনাল পড়ে শোনাবেন সে অংশটুকু ট্রাইব্যুনালের অনুমতি সাপেক্ষে বাংলাদেশ টেলিভিশন সম্প্রচার করবে। বাংলাদেশ টেলিভিশনের মাধ্যমে অন্য গণমাধ্যমও সরাসরি সম্প্রচার করতে পারবে"।
এদিকে শনিবার রাত থেকেই দেশের বিভিন্ন স্থানে যানবাহনে আগুন ও ককটেল বিস্ফোরণের একাধিক ঘটনা ঘটেছে। তবে পুলিশ বলছে 'সব বিষয়কে মাথায় রেখেই নিরাপত্তা পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। তাই আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই'।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেছেন, 'দেশে যেকোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী প্রস্তুত আছে"।
ওদিকে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, "আগামীকাল সোমবার ফ্যাসিস্ট হাসিনার গণহত্যার রায়কে কেন্দ্র করে একটা মহল দেশে নৈরাজ্য সৃষ্টি করার জন্য পাঁয়তারা করছে"।
আর জামায়াতসহ আট দলের এক সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, সোমবার তারা মাঠে থাকবেন এবং কাউকে কোনো নাশকতা করতে দেবেন না।
প্রসঙ্গত, এর আগে গত বৃহস্পতিবারও 'লকডাউন' কর্মসূচি পালন করেছে আওয়ামী লীগ। সেদিনই রায় ঘোষণার তারিখ ঘোষণা করেছিলো ট্রাইব্যুনাল।

রায়কে ঘিরে কড়া নিরাপত্তা এবং সহিংসতা
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
ঢাকা মহানগর পুলিশ জানিয়েছে, ঢাকায় কড়া নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে এবং এর অংশ হিসেবে সরকারের দিক থেকে ঢাকাসহ কয়েকটি জেলায় ইতোমধ্যেই বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে।
ঢাকা ছাড়াও গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর ও ফরিদপুরে বিজিবি মোতায়েনের খবর পাওয়া গেছে। ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
এর মধ্যে শনিবার রাত থেকেই দেশের বিভিন্ন জায়গায় বাসে আগুন, ককটেল বিস্ফোরণ এবং গ্রামীণ ব্যাংকের একটি জেলা অফিসে পেট্রোল বোমা নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে।
ঢাকার হাজারীবাগ, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ এবং সাভারে তিনটি বাসে আগুন দেওয়া হয়েছে শনিবার রাতে। এছাড়া ঢাকায় ইস্কাটন, আগারগাঁও, মধুবাগসহ কয়েকটি জায়গায় হাতবোমার বিস্ফোরণও ঘটেছে। তবে এসব ঘটনায় কেউ হতাহত হয়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ এবং ফায়ার সার্ভিস।
এছাড়া শনিবার রাতে গাজীপুরে গ্রামীণ ব্যাংকের একটি কার্যালয়ে ককটেল বিস্ফোরণ ও বগুড়ার শেরপুর উপজেলায় গ্রামীণ ব্যাংকের একটি শাখায় আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে বলে স্থানীয় পুলিশ জানিয়েছে ।
তবে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাসিম এসব ঘটনার সাথে তার দলের সম্পৃক্ততার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন।
"আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে অবৈধ আদালতে রায় ঘোষণাকে ঘিরে ১৬ ও ১৭ তারিখ কমপ্লিট শাটডাউন দেয়া হয়েছে। আজ তা পালিত হয়েছে এবং আগামীকালও চলবে। জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে তা পালন করছে," বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।
নাশকতার দায় তাদের কি-না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন," আমাদের কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ ও অহিংস । অবৈধ ইউনূস সরকারের পতন না হওয়া পর্যন্ত শেখ হাসিনার নির্দেশে ধারাবাহিক কর্মসূচি আমরা চালিয়ে যাবো"।
ওদিকে রাজশাহীতে আওয়ামী লীগের জেলা কমিটির একজন নেতার বাড়িতে হামলা ও আগুন দেওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

ছবির উৎস, BBC/TANVEE
অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর তৎপরতা
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পাতায় 'পূর্ণ ন্যায়বিচার' দাবি করেছেন।
তার এ সম্পর্কিত পোস্টে বলা হয়েছে, "আগামীকাল (১৭ নভেম্বর) বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মামলার রায় ঘোষণা করতে যাচ্ছে, যেখানে গত বছরের ঢাকায় সংঘটিত প্রাণঘাতী সহিংসতা ও দমন-পীড়নের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের পাঁচটি অভিযোগ আনা হয়েছে। আমরা পূর্ণ ন্যায়বিচার দাবি করছি! বাংলাদেশ ডিজার্ভ করে একটি স্বচ্ছ এবং ন্যায়বিচার"।
তবে ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাবে এক অনুষ্ঠানে বক্তৃতায় তিনি আবার বলেছেন, "আগামীকাল সোমবার ফ্যাসিস্ট হাসিনার গণহত্যার রায়কে কেন্দ্র করে একটা মহল দেশে নৈরাজ্য সৃষ্টি করার জন্য পাঁয়তারা করছে। আমাদের তা রুখে দাঁড়াতে হবে"।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, 'কেউ যেন নাশকতা করতে না পারে' সেজন্য তারা সোমবার মাঠে সক্রিয় থাকবেন'।
রায় সম্পর্কে প্রসিকিউশন যা বলেছে
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে প্রেস ব্রিফিংয়ে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীম বলেছেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তিন আসামির বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার রায় টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচার করা হবে।
ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, শেখ হাসিনাসহ আসামিদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে সেটা শহীদ পরিবার ও আহতদের ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেয়ার জন্যও তারা আবেদন করেছেন।
"আমরা ট্রাইব্যুনালে তার (শেখ হাসিনা) সর্বোচ্চ শাস্তি প্রার্থনা করেছি। শুধু তাই নয়, একইসঙ্গে এই আসামিদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে মামলায় যারা ভিক্টিম বা শহীদ আছে, আহত পরিবার আছে - তাদের বরাবর হস্তান্তরের প্রার্থনা জানিয়েছি," বলেছেন তিনি।
তিনি আরো বলেন, "ট্রাইব্যুনাল ন্যায়বিচারের স্বার্থে যে আদেশই দিক না কেন, প্রসিকিউশন সেটা মেনে নেবে।"
এ মামলার অন্য দুই আসামি হলেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান কামাল ও সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন। মি. মামুন এ মামলা 'অ্যাপ্রুভার' বা রাজসাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দিয়েছেন।
বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ইতিহাসে কোনো আসামির এ ধরনের "অ্যাপ্রুভার" বা রাজসাক্ষী হওয়ার আবেদনের ঘটনা এটাই প্রথম বলে সেসময় জানিয়েছিলেন সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা।
মামলার আসামিদের বিরুদ্ধে আসামিদের মধ্যে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান পলাতক।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ মামলাটির রায় ঘোষণার কথা রয়েছে। এর নেতৃত্বে আছেন বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদার। ট্রাইব্যুনালের অন্য সদস্যরা হলেন- বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।

ছবির উৎস, Getty Images
একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এই ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। ২০২৪ সালের পাঁচই অগাস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর এই ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করা হয়।
পুনর্গঠিত ট্রাইব্যুনালেই শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় প্রথম মামলা (মিসকেস বা বিবিধ মামলা) হয়।
গত বছরের ১৭ই অক্টোবর পুনর্গঠিত ট্রাইব্যুনালের প্রথম বিচার কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হয়। ওইদিনই শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে এ মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে ট্রাইব্যুনাল।
ওইসময় শেখ হাসিনাই মামলাটির একমাত্র আসামি ছিলেন।
পরে এ বছরের মার্চে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং সাবেক আইজিপিকে এ মামলায় আসামি করতে প্রসিকিউশনের করা আবেদন মঞ্জুর করে ট্রাইব্যুনাল।
এ বছরের ১২ই মে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়।
এই মামলায় শেখ হাসিনাসহ আসামিদের বিরুদ্ধে পাঁচটি অভিযোগ এনে প্রতিবেদন জমা দেয় তদন্ত সংস্থা।
শেখ হাসিনা 'মাস্টারমাইন্ড, হুকুমদাতা ও সুপিরিয়র কমান্ডার' হিসেবে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংগঠিত করেছেন বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরে গত পহেলা জুন শেখ হাসিনাসহ তিন আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে প্রসিকিউশন। এরপর নানা আইনি প্রক্রিয়া শেষে বৃহস্পতিবার ট্রাইব্যুনাল ১৭ই নভেম্বর রায় ঘোষণার তারিখ নির্ধারণ করে।
এ প্রেক্ষাপটে শেখ হাসিনার দল আওয়ামী লীগ অনলাইনে তাদের কর্মসূচি ঘোষণা করে।








