নির্বাসিত সাবেক থাই প্রধানমন্ত্রী দেশে ফিরতেই কারাবন্দী

থাইল্যান্ডের সাবেক প্রধানমন্ত্রী থাকসিন শিনাওয়াত ১৫ বছর নির্বাসিত থাকার পর দেশে ফিরেই কারাবন্দী হয়েছেন।

তবে অনেকের বিশ্বাস তিনি এমন এক সমঝোতা করেছেন যার ফলে তাকে খুব বেশি কারাভোগ করতে হবে না।

থাইল্যান্ডে সামনের সপ্তাহে পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন করা হবে এবং এতে তার দল ফিউ থাই পার্টির প্রার্থীই এগিয়ে আছেন। এই ভোটের আগে মঙ্গলবার একটি প্রাইভেট জেটে চড়ে মি. থাকসিন দেশে ফেরেন।

দেশে ফেরার পরপরই তাকে আট বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়। এই ফৌজদারি মামলায় তিনি আগেই দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন। তবে তিনি এই মামলাটিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে বর্ণনা করেছেন।

মি. থাকসিনকে থাইল্যান্ডের সবচেয়ে সফল নির্বাচিত নেতা বলে গণ্য করা হয়। থাইল্যান্ডের রাজতন্ত্র-পন্থী রক্ষণশীলরা তাকে নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই শঙ্কায় আছেন। তাকে দুর্বল করার জন্য এই রক্ষণশীলরা সামরিক অভ্যুত্থান হতে শুরু করে বিতর্কিত সব মামলা দায়েরের পক্ষে সমর্থনও দিয়েছেন।

কিন্তু থাইল্যান্ডের এই দুর্বিনীত এবং রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষী টেলিকম ধনকুবের সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার বহু বছর পর এখন আবার দেশে ফিরে এসেছেন। তিনি যখন ব্যাংককের প্রধান বিমানবন্দরে অবতরণ করেন তখন তার হাজার হাজার ‘লাল শার্ট’ পরা সমর্থক উল্লাস ধ্বনি দিয়ে তাকে স্বাগত জানায়। আগের রাত হতেই এই সমর্থকরা সেখানে জড়ো হয়েছিল।

এদের একজন ৬৩ বছর বয়সী সামনিয়াং কংপোলপার্ন, যিনি দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সুরিন প্রদেশ থেকে এসেছেন। ঐ এলাকাটি বহু বছর ধরেই মি. থাকসিনের দলের শক্ত ঘাঁটি বলে পরিচিত।

“আমরা এযাবত যত প্রধানমন্ত্রী পেয়েছি তিনি ছিলেন তাদের মধ্যে সেরা। আমি যদিও আজকে তার দেখা পাবো না, তারপরও আমি এসেছি তার প্রতি আমার সমর্থন প্রকাশ করতে”, বলছেন তিনি। “সামরিক-পন্থী সরকারের সঙ্গে ওরা সমঝোতা করলে আমি আপত্তির কিছু দেখি না, নইলে তো আমরা সেনেটরদের কাছে জিম্মি হয়ে থাকবো। আমরা সেটা চাই না।”

মি. থাকসিন টার্মিনাল ভবন থেকে যখন বেরিয়ে আসেন, তখন তার সঙ্গে ছিলেন দুই কন্যা এবং ছেলে। সেখানে তিনি থাইল্যান্ডের রাজা এবং রানির প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা জানান। বিমানবন্দর থেকেই ৭৪ বছর বয়সী মি. থাকসিনকে সোজা সুপ্রিম কোর্টে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে আগে থেকে দোষী সাব্যস্ত হওয়া তিনটি মামলায় তাকে আট বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়। এরপর তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।

কারাগারের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বয়সের কথা বিবেচনা করে তাকে কারাগারের একটি বিশেষ অংশে রাখা হবে যেখানে তার চিকিৎসার জন্য বিশেষ ধরণের চিকিৎসা সরঞ্জামের ব্যবস্থা থাকবে। তাকে দশদিনের জন্য কোয়ারেন্টিনে রাখা হবে। প্রথম পাঁচদিন তিনি তার কক্ষেই বন্দী থাকবেন।

থাকসিন শিনাওয়াত রাজার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে পারেন এরকম জল্পনা ছিল। কারা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তিনি কারাগার থেকেই আবেদন করতে পারবেন। তবে এই প্রক্রিয়ায় প্রায় দুই মাস সময় লাগতে পারে।

সামনের কাতারে থাকসিনের দল

মি. থাকসিনের ফিউ থাই পার্টি মঙ্গলবার পরের দিকে একটি কোয়ালিশন সরকারে যোগ দেবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই কোয়ালিশন সরকার গঠনের জটিল এবং গোপন প্রক্রিয়া চলছে তিন মাস ধরে।

গত মে মাসে থাইল্যান্ডে যে নির্বাচন হয় তাতে সবচেয়ে বেশি আসন জিতেছিল এক নতুন দল ‘মুভ ফরোয়ার্ড পার্টি’। এই দলটির বৈপ্লবিক কর্মসূচী তরুণদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছিল।

মুভ ফরোয়ার্ড পার্টি শুরুতে ফিউ থাই পার্টির সঙ্গে জোট করে। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে এই জোটে আসলে সবাই থাকছে কেবল সংস্কারপন্থীরা বাদে। এমনকি যারা সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়েছিল, তাদের দুটি দলও যোগ দিচ্ছে এই কোয়ালিশনে। অথচ ফিউ থাই পার্টি এর আগে বলেছিল, তারা কখনোই এদের সঙ্গে সমঝোতা করবে না।

তবে ফিউ থাই পার্টি বলছে, এর সঙ্গে মি. থাকসিনের দেশে ফেরার কোন সম্পর্ক নেই। কিন্তু খুব কম লোকই আসলে তা বিশ্বাস করে।

এটা সত্যি যে থাইল্যান্ডের অনির্বাচিত সেনেটের কারণে ফিউ থাই পার্টির হাত বাঁধা। থাইল্যান্ডে ২০১৪ সালে যে সামরিক অভ্যুত্থান হয়, তারপর সামরিক শাসকরা সংবিধান কাটাছেঁড়া করে ২৫০ আসনের এই সেনেট তৈরি করে। এটিকে থাইল্যান্ডের রাজনীতিতে একটি ‘সাংবিধানিক স্থলমাইন’ বলে বর্ণনা করা হয়। সামরিক বাহিনীই ২০১৪ সাল হতে থাইল্যান্ডে সরকার চালাচ্ছে।

নির্বাচনে ফিউ থাই পার্টি প্রত্যাশার চেয়ে খারাপ ফল করেছিল। তারা মুভ ফরোয়ার্ড পার্টির কাছে অনেক অনেক ভোট হারায়, এবং এই প্রথম তারা দ্বিতীয় স্থানে নেমে যায়। ফলে দরকষাকষির জন্য তাদের খুব শক্ত অবস্থান ছিল না।

সেনেটের ২৫০ জন সদস্যের সবাইকে মনোনীত করে সামরিক জান্তা। নতুন প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনের সময় ৫০০ নির্বাচিত এমপির সঙ্গে এই অনির্বাচিত সেনেটররাও ভোট দিতে পারে। থাইল্যান্ডে বিদ্যমান রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি হুমকি তৈরি করতে পারে, এমন যে কোন কিছু আটকে দেয়ার জন্যই যে এদের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে, সেটা নিয়ে খুব লুকোছাপা নেই। থাইল্যান্ডের এই রাজনৈতিক ব্যবস্থা টিকে আছে রাজতন্ত্র, সামরিক বাহিনী এবং বৃহৎ পুঁজির ব্যবসায়ীদের এক গাঁটছড়ার ফলে। থাইল্যান্ডে দশকের পর দশক ধরে সব সিদ্ধান্ত হয় এদের কথামতো।

পার্লামেন্টের নিম্ন কক্ষে মুভ ফরোয়ার্ড পার্টিরই প্রাধান্য ছিল, কিন্তু তাদের সঙ্গে ফিউ থাই পার্টির জোটকে এরা সমর্থন করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। এতে অবশ্য কেউ অবাক হয়নি। এরপর ফিউ থাই পার্টিকে যখন নতুন কোয়ালিশন গঠন করতে বলা হলো, তখন তাদের সেনেটের সমর্থন দরকার ছিল। ফলে সাবেক রাজনৈতিক শত্রুদের সঙ্গে হাত মেলানো ছাড়া তাদের উপায় ছিল না।

তবে ফিউ থাই পার্টির কিছু রাজনীতিক মনে করেন কট্টর রক্ষণশীলদের সঙ্গে সরকার গঠনে অস্বীকৃতি জানিয়ে তাদের আরও ভালো একটা সমঝোতার জন্য অপেক্ষা করার দরকার ছিল। কারণ ফিউ থাই পার্টি এবং মুভ ফরোয়ার্ড পার্টিকে বাদ দিয়ে যদি কোন সংখ্যালঘু জোট সরকার গঠন করতো, সেটি বেশিদিন টিকতো না।

তবে ফিউ থাই পার্টির নেতারা অপেক্ষায় থাকতে চাননি। এমনকি তারা কট্টর রাজতন্ত্রবাদী দল ইউনাইটেড থাই নেশন পার্টিকেও কোয়ালিশনে আমন্ত্রণ জানিয়েছে। এই দলের নেতারা ছিলেন থাকসিন শিনাওয়াত পরিবার এবং তাদের সমর্থকদের সবচেয়ে বড় সমালোচক। থাকসিনের বোন ইংলাকের নেতৃত্বাধীন সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে এরা কলকাঠি নেড়েছিল। রাজনীতির এই দুই প্রবল বৈরি শক্তি যে এখন একসঙ্গে একই সরকারে যোগ দিচ্ছে, তা থেকে বোঝা যায় থাই রাজনীতির মাটি কতটা সরে গেছে।

মুভ ফরোয়ার্ড পার্টি এবং থাইল্যান্ডের তরুণ প্রজন্ম দেশটিতে রাজতন্ত্রের ক্ষমতা এবং সম্পদ নিয়ে যেসব প্রশ্ন তুলেছে, সেটিকেই কট্টর রাজতন্ত্রপন্থীরা এখন সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে দেখছে। সেজন্যে শিনাওয়াত পরিবারের সঙ্গে দীর্ঘদিনের বিবাদকে তারা আপাতত পেছনে রাখছে।

অন্যদিকে শিনাওয়াত পরিবার, এবং ফিউ থাই পার্টির রক্ষণশীল, ব্যবসা-ঘনিষ্ঠ অংশ বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে ক্ষমতায় ফিরে আসা এবং থাকসিনকে দেশে ফিরিয়ে আনার নিশ্চয়তা দেয় এমন একটি সমঝোতাকে। দলের ভাবমূর্তি নিয়ে তারা চিন্তিত নয়।

কিন্তু বাস্তবতার কথা বলে ফিউ থাই পার্টি যে সমঝোতা শেষ পর্যন্ত করেছে, তাতে দলের অনেকে রীতিমত শিউরে উঠেছেন। তারা হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন, এর পরিণামে সামনে তৃণমূল পর্যায়ে তারা অনেক সমর্থন হারাবে। এবং থাইল্যান্ডে দুই দশক ধরে নির্বাচনী রাজনীতিতে তাদের যে প্রাধান্য ছিল, হয়তো সেই অবস্থানও তারা হারিয়ে ফেলবে চিরদিনের জন্য।