নিজ্জর হত্যা : মোদী জড়িত নন, বলল কানাডা

ছবির উৎস, Getty Images
শিখ বিচ্ছিন্নতাবাদী কানাডার নাগরিক হরদীপ সিং নিজ্জর হত্যার পরিকল্পনা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী জানতেন, কানাডার গণমাধ্যমে এরকম খবর প্রচারিত হওয়ায় ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে যে “কালিমালিপ্ত করার প্রচারণা চলছে।”
ভারতের ওই বিবৃতির একদিন পরে শুক্রবার সকালে কানাডার জাতীয় নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা উপদেষ্টা এক বিবৃতি জারি করে বলেছে ভারতের প্রধানমন্ত্রী, বিদেশমন্ত্রী বা জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা কানাডার মাটিতে কোনও অপরাধমূলক কাজের সঙ্গে যুক্ত, এরকম কোনও প্রমাণ তাদের কাছে নেই।
কানাডার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা নাথালি ড্রুইন এক লিখিত বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছেন “প্রধানমন্ত্রী মোদী, মন্ত্রী জয়শঙ্কর বা জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ডোভাল কানাডার অভ্যন্তরে কোনও গুরুতর অপরাধমূলক কাজের সঙ্গে যুক্ত এই কথা কানাডার সরকার বলেনি, বা এ বিষয়ে কোনও প্রমাণ আছে বলেও জানা নেই।”
এর আগে কানাডার একটি সংবাদমাধ্যমে খবর ছাপা হয়েছিল যে হরদীপ সিং নিজ্জর নামে যে শিখ বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা গতবছর খুন হন, ‘সেই পরিকল্পনার কথা ভারতের প্রধানমন্ত্রী জানতেন না, এটা ভাবা যায় না।’
যদিও তারা বলেছিল যে মি. মোদীর সংশ্লিষ্টতা নিয়ে কোনও প্রমাণ তাদের কাছে নেই।
কানাডার এক সিনিয়র জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তা ওই হত্যার ঘটনার সঙ্গে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ'র সংশ্লিষ্টতার কথা প্রকাশ করেছিলেন। সেই একই ‘নামহীন’ সূত্র উদ্ধৃত করে কানাডার সংবাদপত্র ‘দ্য গ্লোব অ্যান্ড মেইল’ জানিয়েছিল যে ভারতের বিদেশ মন্ত্রী ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ‘নিজ্জর হত্যার’ পরিকল্পনা আগে থেকেই জানতেন।
ওই খবর প্রকাশিত হওয়ার পরে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছিলেন, “আমরা সাধারণত সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবর নিয়ে মন্তব্য করি না। কিন্তু যে ধরনের হাস্যকর খবর কানাডার এক সরকারি সূত্র থেকে একটি সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া হয়েছে, তা যথাসম্ভব অবজ্ঞার সঙ্গে খারিজ করা উচিত।”
“কালিমালিপ্ত করার এ ধরনের প্রচারণার ফলে আমাদের সম্পর্কে যে টানাপোড়েন চলছে তা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে,” মন্তব্য করেছেন রণধীর জয়সওয়াল।

ছবির উৎস, MEA
কী লিখেছিল কানাডার পত্রিকা?
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
‘দ্য গ্লোব অ্যান্ড মেইল’ পত্রিকাটি কানাডার এক জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তাকে নাম না করে উদ্ধৃত করে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে বলে জানিয়েছে ভারতের সংবাদ সংস্থা পিটিআই।
পত্রিকাটি লিখেছিল যে হরদীপ সিং নিজ্জর হত্যার পরিকল্পনাটি আগে থেকেই জানতেন ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর।
ভারতের একাধিক সংবাদ মাধ্যম ‘দ্য গ্লোব অ্যান্ড মেইল’ পত্রিকাটিকে উদ্ধৃত করে জানিয়েছে যে ওই প্রতিবেদনে এমনটাও লিখেছে কানাডার পত্রিকাটি যে তাদের কাছে এমন কোনও প্রমাণ নেই যে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও পরিকল্পনাটির ব্যাপারে অবগত ছিলেন। কিন্তু তারা মনে করে যে ভারতের তিনজন অতি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব একটি ‘খুন’-এর পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করবেন অথচ প্রধানমন্ত্রী সেটা জানবেন না, এটা “অভাবনীয়”।
এর আগে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ যে কানাডায় খালিস্তান-বিরোধী অভিযানে ‘অনুমোদন’ দিয়েছিলেন, সেই অভিযোগ সরাসরিভাবে তুলেছিলেন কানাডার এক মন্ত্রী।
সে দেশের পররাষ্ট্র বিষয়ক উপমন্ত্রী ডেভিড মরিসন এও জানিয়েছিলেন যে মি. শাহের সঙ্গে ওই অভিযানের সংশ্লিষ্টতা সংক্রান্ত তথ্য তিনিই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পত্রিকা ওয়াশিংটন টাইমসকে দিয়েছিলেন।

ছবির উৎস, Getty Images
কানাডায় শিখ-হিন্দু সংঘর্ষ
এ মাসের গোড়ায় কানাডার একটি হিন্দু মন্দিরের সামনে বহু শিখ জড়ো হয়ে বিক্ষোভ দেখানোর সময়ে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বাঁধে।
টরন্টোর কাছে ব্রম্পটনের একটি হিন্দু মন্দিরের সামনে হলুদ রঙের খালিস্তানি পতাকা নিয়ে অনেক শিখ বিক্ষোভ দেখাচ্ছেন, এরকম বেশ কয়েকটি ভিডিও অনলাইনে ছড়িয়ে পড়ে। ওইসব ভিডিওতে এটাও দেখা গেছে যে সেখানে ভারতের জাতীয় পতাকা হাতেও অনেক মানুষ জড়ো হয়েছেন।
ওই বিক্ষোভের মধ্যেই দু পক্ষের সংঘর্ষ হয়। উত্তর আমেরিকা ভিত্তিক শিখ গোষ্ঠী ‘শিখস ফর জাস্টিস’ দাবি করেছিল, “খালিস্তানপন্থীদের ওপরে বিনা প্ররোচনায় হামলা হয়েছে।”
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী স্বয়ং ওই সংঘর্ষকে ‘পরিকল্পিত হামলা’ বলে অভিহিত করেছিলেন। এক্স হ্যান্ডেলে তিনি লেখেন, “এ ধরনের সংঘর্ষ ভারতের অবস্থানকে দুর্বল করে দিতে সমর্থ হবে না। আমরা আশা করব কানাডার সরকার বিচার সুনিশ্চিত করবে এবং আইনের শাসন তুলে ধরবে।”
ওই সংঘর্ষের সময়ে একজন কানাডীয় পুলিশ কর্মকর্তাও শিখ বিক্ষোভকারীদের সঙ্গেই হাজির ছিলেন বলে অনলাইনে প্রকাশিত ভিডিওগুলিতে দেখা যায়। ওই পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও নেওয়া হয়।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোও ওই সংঘর্ষের ব্যাপারে বলেছিলেন যে “এ ধরনের ঘটনা গ্রহণযোগ্য নয়।”

ছবির উৎস, VANCOUVER SUN
কে হরদীপ সিং নিজ্জর?
গত বছরের ১৯ জুন কানাডার সারে-তে একটি গুরুদ্বারের পার্কিং লটে কেউ বা কারা খালিস্তানি নেতা হরদীপ সিং নিজ্জরকে গুলি করে হত্যা করে।
হরদীপ সিং নিজ্জর ভারত সরকারের কাছে একজন ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ হিসেবে চিহ্নিত ছিলেন – তিনি ‘খালিস্তান টাইগার ফোর্স’ বা কানাডাতে ‘শিখস ফর জাস্টিসে’র (এসএফজে) মতো একাধিক সংগঠনেরও প্রধান ছিলেন।
৪৬ বছর বয়সী মি. নিজ্জর আদতে পাঞ্জাবের জলন্ধরের বাসিন্দা হলেও বহু বছর তিনি ভারতে আসেননি। বছরকয়েক আগে তার জলন্ধরের সম্পত্তিও ভারত সরকার বাজেয়াপ্ত করে নেয়।
ভারত সরকার কানাডার কর্তৃপক্ষর কাছে এর আগে অভিযোগ জানিয়েছিল, বব্বর খালসা ইন্টারন্যাশনাল (বিকেআই) নামে খালিস্তান-সমর্থক যে ‘জঙ্গি গোষ্ঠী’টি কানাডাতে দীর্ঘকাল ধরে সক্রিয়, তাদের হয়েও প্রচুর অর্থ সংগ্রহ করতেন হরদীপ সিং নিজ্জর।
ওই হত্যাকাণ্ডে ভারতের গোয়েন্দা বাহিনীর হাত থাকতে পারে, কোনও কোনও খালিস্তানি সংগঠন আগেই সন্দেহ প্রকাশ করেছিল। পরে কানাডার সরকারও সে বক্তব্যকে সমর্থন করেছে।
লক্ষণীয় হলো, হরদীপ সিং নিজ্জরের হত্যার ঠিক এক বছর আগে রিপুদমন সিং মালিক নামে সাবেক একজন খালিস্তানপন্থী নেতাও কানাডাতে আততায়ীদের হাতে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন।
১৯৮৫ সালে বোমা হামলায় এয়ার ইন্ডিয়ার বিমান ‘কণিষ্ক’ ধ্বংস হয়ে যাওয়ার ঘটনায় রিপুদমন সিং মালিক ছিলেন প্রধান অভিযুক্ত– যাতে দোষী সাব্যস্ত হয়ে তাকে বহু বছর কারাদণ্ডও ভোগ করতে হয়েছিল।
আজ পর্যন্ত কানাডার ইতিহাসে ওটিই ছিল সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসবাদী হামলা।
সম্প্রতি অবশ্য রিপুদমন সিং মালিক খালিস্তানপন্থীদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যেই সরব হতে শুরু করেন– যার পর হরদীপ সিং নিজ্জর তাকে ‘গদ্দার’ বা বেইমান বলে চিহ্নিত করতে থাকেন।
মি. নিজ্জরকে হত্যার ঘটনায় ভারতের দিকে অভিযোগের আঙ্গুল তোলার পাশাপাশি কানাডার পুলিশ তিনজনকে গ্রেফতার করে, যারা ভারতীয়, তবে তিন থেকে পাঁচ বছর ধরে কানাডায় বসবাস করছিলেন।

ছবির উৎস, Getty Images
ভারত-কানাডা সম্পর্কের চরম অবনতি
শিখ বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা, কানাডার নাগরিক হরদীপ সিং নিজ্জর গত বছর ১৮ই জুন ব্রিটিশ কলাম্বিয়া প্রদেশের সারে-র একটি গুরুদ্বারের সামনে খুন হন।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো আগেই অভিযোগ তুলেছিলেন যে ওই হত্যাকাণ্ডের পিছনে ভারতের ‘সরকারি এজেন্সি’গুলির হাত রয়েছে।
তারপর থেকেই দুই দেশের সম্পর্কের অবনতি হতে শুরু করে।
গত মাসে মি. ট্রুডো নতুন করে অভিযোগ করেন যে হরদীপ সিং নিজ্জরের হত্যা মামলায় ভারত সহযোগিতা করছে না। একইসঙ্গে দাবি করেছিলেন, ওই মামলা সংক্রান্ত সমস্ত তথ্য ভারতের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে।
তার এই দাবি অবশ্য নস্যাৎ করে দেয় ভারত।
দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের এতটাই অবনতি হয়েছে যে ভারত সম্প্রতি কানাডা থেকে হাইকমিশনার সঞ্জয় কুমার ভার্মা ও অন্য কয়েকজন কূটনীতিককে ফিরিয়ে এনেছে আর কানাডার ছয় কূটনীতিককে বহিষ্কার করেছে।
তবে কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো সে দেশের রাজধানী অটোয়ায় আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে দাবি করেছিলেন যে ভারতীয় কূটনীতিকদের আসলে তার দেশই বহিষ্কার করেছে।








