জামায়াতে ইসলামীর সমাবেশ ঘিরে রাজনীতিতে যত প্রশ্ন ও হিসেব-নিকেশ

জমায়াত ইসলামী

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, এক দশক পরে পুলিশের অনুমতি নিয়ে ঢাকায় সামাবেশ করেছে জামায়াতে ইসলামী।
    • Author, সায়েদুল ইসলাম
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা

এক দশকের বেশি সময় পর ঢাকায় জামায়াতে ইসলামীর প্রকাশ্য সমাবেশ নিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা তৈরি হয়েছে।

যে দলটিকে এতো বছর কোন সভা সমাবেশের অনুমতি দেয়া হয়নি, নিজেদের কার্যালয়ে সভা করতে গেলেও যাদের গ্রেপ্তার হতে হয়েছে, সেই দল হঠাৎ কীভাবে রাজধানীতে সমাবেশ করতে পারলো, তা নিয়ে কৌতূহল তৈরি হয়েছে অনেকের মধ্যে।

বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন, জাতীয় নির্বাচন ঘিরে রাজনীতিতে 'পর্দার অন্তরালে' যেসব যোগাযোগ বা নানারকম হিসাবের চেষ্টা চলছে, তারই প্রতিফলন ঘটেছে জামায়াতের ইসলামীর সমাবেশের মাধ্যমে।

শনিবার ঢাকার ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউশনের মিলনায়তনে সমাবেশ করেছে জামায়াতে ইসলামী, যেখানে দলটির বহু নেতাকর্মী অংশ নেয়।

ওই সমাবেশের বিষয়ে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করলে রবিবার আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, “জামায়াত মাঠে নামে নাই, তাদের মাঠে নামিয়েছে তাদের বিশ্বস্ত ঠিকানা, তাদের আসল মুরব্বি বিএনপি।”

ওই সমাবেশের প্রসঙ্গে তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদ বলেছেন, ‘’জামায়াতে ইসলামীর সভা থেকে যেভাবে আস্ফালন করা হয়েছে, এগুলো জামায়াতের বক্তব্য নয়, বিএনপির বক্তব্য। বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের শরিক হচ্ছে জামায়াত। বিএনপি জামায়াতকে দিয়ে এসব কথা বলিয়েছে।‘’

অন্যদিকে বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে থাকা গণতন্ত্র মঞ্চের নেতা মাহমুদুর রহমান মান্না কিছু প্রশ্ন তুলেছেন।

“জামায়াতের ব্যাপারটা কিন্তু বিস্ময়কর। এতদিন তারা দেয়নি কেন? নতুন করে আবার পারমিশন দিল কেন? এই ব্যাখ্যা আমরা তাদের কাছে চাই,” বলেন মি. মান্না।

গণতন্ত্র মঞ্চের সমন্বয়ক, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, ‘‘সরকার একটা রাজনৈতিক সমীকরণের জায়গা থেকে পুরো বিষয়টা করছে.. এ রকম অনুমান করার যথেষ্ট কারণ আছে।”

তবে এসব আলোচনা প্রসঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মোঃ তাহের বলেছেন, “বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের জোট এখন আর কার্যকরী নেই, কিন্তু আমরা সরকার বিরোধী আন্দোলনে আছি।‘’

তিনি বলেন, “সভা-সমাবেশ করা তো আমাদের রাজনৈতিক অধিকার। গত ১০ বছর ধরে আমাদের প্রকাশ্যে কোন সমাবেশ করার অনুমতি দেয়া হয়নি। । তাদের হয়তো সেই বোধোদয় হয়েছে, তাই এখন অনুমতি দিয়েছে। এর অন্য কোন কারণ আছে বলে আমরা মনে করি না।‘’

মঙ্গলবার সমাবেশের মাধ্যমে জামায়াতে ইসলামী তুলে ধরতে চেয়েছে যে দল হিসেবে তারা এখনো 'দুর্বল হয়নি'।
ছবির ক্যাপশান, মঙ্গলবার সমাবেশের মাধ্যমে জামায়াতে ইসলামী তুলে ধরতে চেয়েছে যে দল হিসেবে তারা এখনো 'দুর্বল হয়নি'।

কারা লাভবান হচ্ছে?

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

নির্বাচনের রাজনীতিতে জামায়াতে ইসলামী দলটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠার বিষয়টিকে উড়িয়ে দেননি আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির নেতারা।

কিন্তু তাদের এই সমাবেশের সাথে কোন রকম 'সম্পৃক্ততা' বা 'নমনীয়' হওয়ার বিষয়টি উভয় দলের নেতারাই নাকচ করে দিয়েছেন।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘’যে আওয়ামী লীগ জামায়াতের ব্যাপারে এতো শক্ত অবস্থান নিয়ে রয়েছে বহু বছর, আমাদেরকে বলা হয় জামাত-বিএনপি, কিন্তু তাদের সমাবেশের অনুমতি তো সরকারই দিয়েছে, তাই না? সেখানে বিএনপির কী করার আছে? এটা হচ্ছে আওয়ামী লীগের চিরাচরিত অপপ্রচারের যে অভ্যাস, সেই জন্যই তারা এসব কথা বলছে।‘’

জামায়াতে ইসলামী রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হয়ে উঠলে বিএনপিও লাভবান হতে পারে। কারণ বহুদিন ধরে জামায়াতের সাথে জোটবদ্ধভাবে রাজনীতি করেছে বিএনপি। এক্ষেত্রে বিএনপি কতটা সুবিধা পাবে?

এই প্রশ্ন করা হলে মি. মাহমুদ বলেন, ‘’এখন তো আমরা কারও সঙ্গে জোটে নেই আমরা যুগপৎ আন্দোলনে চলে গেছি। এখানে লাভবান কে হবে না হবে, রাজনৈতিক হিসাব বড় কঠিন, যখন সময় আসবে, তখন হিসাব মেলানো যাবে, এখন হিসাব মেলানো খুব কঠিন।‘’

‘’ভোটের হিসাব নিকাশ করে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে আমরা একটা জোট করেছিলাম, কিন্তু তার আগে বিএনপিকে সরানোর জন্য আওয়ামী লীগ তো জামায়াতের সাথে আন্দোলন করেছিল, ইতিহাস তা ভুলে যাবে কেমন করে?’’ তিনি বলেন।

ইকবাল হাসান মাহমুদ, স্থায়ী কমিটির সদস্য, বিএনপি

ছবির উৎস, বিবিসি বাংলা

ছবির ক্যাপশান, ইকবাল হাসান মাহমুদ, স্থায়ী কমিটির সদস্য, বিএনপি

বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন, আসন্ন জাতীয় নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে আড়ালে যেসব 'হিসাব-নিকাশ' করা শুরু হয়েছে, তারই অংশ হিসাবে জামায়াতে ইসলামীকে অনেকটা হঠাৎ করে এভাবে প্রকাশ্যে বড় ধরনের সভা করার সুযোগ দেয়া হয়েছে।

এই কারণেই তারা অনুমতি চাওয়ার পর রাজনীতির প্রাণকেন্দ্রে সভা করতে দেয়া হয়েছে। নেতাকর্মীদের চলাচলেও কোন বাধা দেয়া হয়নি।

লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমেদ বিবিসি বাংলাকে বলছেন, ‘’বিএনপি মনে করে, সুষ্ঠু নির্বাচন হলে তারা জামায়াতকে ছাড়াই জিততে পারবে। তবে ইসলামিস্ট যেসব শক্তি আছে, বরাবরই দেখো গেছে, তারা বিএনপির প্রতি সহানুভূতিশীল। ফলে জামায়াতের সাথে বিএনপির কী ধরনের আলোচনা হচ্ছে সেটা জানি না। কিন্তু নির্বাচনের এখনো বাকি আছে। জামায়াত রাজনীতির মাঠে সক্রিয় হয়ে উঠলে কী ঘটবে, এখনি বলা কঠিন।‘’

‘’কিন্তু আওয়ামী লীগ চায়, জামায়াত যেন বিএনপির সঙ্গে না যায়, তাদের সঙ্গে আসুক আর নাই আসুক। তারা জামায়াতকে বিএনপি থেকে বিচ্ছিন্ন করতে চায়। এক্ষেত্রে নেপথ্যে হয়তো কোন আলোচনা হতে পারে,‘’বলেন মি. আহমেদ।

মহিউদ্দিন আহমদ, রাজনৈতিক বিশ্লেষক

ছবির উৎস, বিবিসি বাংলা

ছবির ক্যাপশান, মহিউদ্দিন আহমদ, রাজনৈতিক বিশ্লেষক

‘’নির্বাচনের সমীকরণে আওয়ামী লীগের টার্গেট হচ্ছে বিএনপিকে ক্রমাগত বিচ্ছিন্ন করা। সেজন্য যেসব দল আপাত দৃষ্টিতে আওয়ামী লীগের শত্রু বলে মনে হয়, বিএনপিকে বিচ্ছিন্ন করার জন্য দরকার হলে আওয়ামী লীগ তাদের সঙ্গে নেবে,’’ তিনি বলছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন,১৯৯১ এবং ২০০১ সালের নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী বিএনপির সঙ্গে থাকার জন্য ভোটের ব্যবধানটা সবার নজরে পড়েছিল। ফলে নিজেদের সাথে না হলেও অন্তত বিএনপি থেকে দূরে রাখতে চায় আওয়ামী লীগ।

জামায়াতে ইসলামী রাজনীতিতে সক্রিয় না হলে এবং বিএনপি মত বদলে নির্বাচনে এলে এসব ভোট বিএনপির ঘরে যাওযার সম্ভাবনা রয়েছে।

তাই আওয়ামী লীগ চাইছে বিএনপির বলয় থেকে জামায়াতে ইসলামীকে বিচ্ছিন্ন করে নিয়ে আসতে, এমনটাই মনে করছেন মহিউদ্দিন আহমদ।

তবে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে সরকার বা আওয়ামী লীগের কোনরকম 'যোগাযোগ বা নমনীয় মনোভাব' তৈরি হয়নি বলে বলছেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য সাজাহান খান।

তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘’নির্বাচনের সময়, নির্বাচন সামনে রেখে অনেক ধরনের কথাবার্তা, আলাপ আলোচনা চলবেই। যেহেতু দেশে রাজনৈতিক মিটিং-মিছিল করার ক্ষেত্রে কোনরকম প্রতিবন্ধকতা নেই, জামায়াতে ইসলামীও মিটিং করেছে। এ নিয়ে তাদের সঙ্গে আমাদের কোন আলাপ-আলোচনার দরকার নেই। নির্বাচনের সময় কে কার দিকে যাবে, সেটা নিয়ে এখনো সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় আসেনি।‘’

সাজাহান খান, সভাপতি মণ্ডলীর সদস্য, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ
ছবির ক্যাপশান, সাজাহান খান, সভাপতি মণ্ডলীর সদস্য, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ

কিন্তু আওয়ামী লীগ কি ভেতরে ভেতরে জামায়াতে ইসলামীর প্রতি কিছুটা নমনীয় হচ্ছে কি না? জানতে চাইলে সাজাহান খান বলেন, ‘’না, সেটা বলা যাবে না। কারণ জামায়াতের সাথে আমাদের জোটবদ্ধ হওয়ার কোন কারণ নেই, সুযোগও নেই। আমরা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের দল, জামায়াতে ইসলামী মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী দল। তাদের সাথে সখ্যতা গড়ে উঠবে, এটা আমার মনে হয় না।‘’

অতীতে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে মিলে আওয়ামী লীগ আন্দোলন করেছে, মনে করিয়ে দেয়া হলে তিনি বলেন, ‘’১৯৯৬ সালে আমরা আন্দোলন করেছি, তারাও পাশাপাশি আন্দোলন করেছে। আমাদের প্রোগ্রাম দেখে তারা প্রোগ্রাম দিয়েছে, সেখানে আমরা বাধা দিতে যাবো কেন? তারা তাদের মতো আন্দোলন করলে আমরা কেন সেখানে বাধা দেবো?‘’

‘’তারা নির্বাচন করবে কি করবে না, সেটা তাদের ব্যাপার। তবে আমাদের সাথে সম্পর্ক গড়ে ওঠার মতো কোন আভাস আমি পাচ্ছি না, সেরকমটা আমি মনেও করি না,‘’তিনি বলেন।

ঘুরে দাঁড়াচ্ছে জামায়াত?

বহু বছর পরে ঢাকায় আবার সমাবেশ করেছে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ
ছবির ক্যাপশান, বহু বছর পরে ঢাকায় আবার সমাবেশ করেছে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ

বিশ্লেষকরা বলছেন, ঢাকার এই সমাবেশের পেছনে যে কারণই খোঁজা হোক না কেন, এর মাধ্যমে রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে লাভবান হয়েছে আসলে জামায়াতে ইসলামী।

কারণ রাজনৈতিক দল হিসাবে তারা আবার নিজেদের উপস্থিতি জানান দিতে পারছে।

লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমেদ বলছেন, ‘’জামায়াতের জন্য এটা হচ্ছে তাদের টিকে থাকার প্রশ্ন। এই যে তারা বাইরে বের হতে পারছে, এর ফলে তারা আবার নিজেদের শক্তি জানান দিতে পারছে। ছিন্নভিন্ন অবস্থা থেকে তারা আবার উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। এখন নির্বাচনের রাজনীতিতে তাদের সাথে একটা আলোচনায় আসতে হবে আওয়ামী লীগ বা বিএনপিকে। কার কাছ থেকে তারা কতটুকু সুবিধা আদায় করে নিতে পারবে, সেটাই হচ্ছে দেখার বিষয়।‘’

তিনি বলেন, ‘’ধর্ম-ভিত্তিক দল হলেও হেফাজতকে অনেক সুযোগ সুবিধা দিয়েছে আওয়ামী লীগ, এখন দরকার হলে তারা জামায়াতকেও ছাড় দিতে পারে। কারণ তাদের লক্ষ্য একটাই ক্ষমতা টিকে থাকা, সেটার জন্য তারা বিএনপি ছাড়া যেকোনো শক্তির সাথে সমঝোতা করতে পারে,’’ তিনি বলছেন।

জামায়াতের নতুন করে এই সক্রিয়তার পেছনে সম্প্রতি ঘোষিত মার্কিন ভিসা নীতিরও একটি প্রভাব দেখছেন বিশ্লেষকদের কেউ কেউ।

জামায়াতে ইসলামী রাজনীতির পর্যবেক্ষক ও দৈনিক নয়া দিগন্তের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সালাউদ্দিন বাবর বিবিসি বাংলাকে বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতি জামায়াতে ইসলামীর জন্য নতুন ‘অপরচুনিটি’ বা সুযোগ তৈরি করেছে।

যদিও জামায়াতের নেতারা বিষয়টি স্বীকার করেননি।

লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমেদ মনে করেন, ‘’আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হল বিএনপি, জামায়াত নয়। জামায়াত এককভাবে নিজের শক্তিতে রাষ্ট্রক্ষমতায় যেতে পারবে, সেই সম্ভাবনা এখনো তৈরি হয়নি।”

“সুতরাং জামায়াতকে টিকে থাকতে হলে আওয়ামী লীগ অথবা বিএনপি- কোন একটা বড় দলের সাথে গাঁটছড়া বাধতে হবে। নির্বাচন ঘিরে সেসব হিসাব-নিকাশ হয়তো শুরু হয়েছে, কিন্তু তারা শেষ পর্যন্ত কী করবে, সেটা দেখতে একটু অপেক্ষা করতে হবে,” তিনি বলেন।