বিহারে ভোটের ফল, বিজেপি নেতার 'ফুলকপি চাষের' কথা ও এক ভয়াবহ দাঙ্গার স্মৃতি

ছবির উৎস, Pravir
- Author, অমিতাভ ভট্টশালী
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, কলকাতা
(এই প্রতিবেদনে উল্লিখিত দাঙ্গার কিছু বর্ণনা পাঠককে বিচলিত করতে পারে)
গত শুক্রবার তখনও বিহারের বিধানসভা নির্বাচনের সম্পূর্ণ ফলাফল প্রকাশিত হয়নি, কিন্তু স্পষ্ট ইঙ্গিত এসে গিয়েছিল যে বিপুল ভোটে জয়ী হতে চলেছে বিজেপিসহ এনডিএ জোট।
সেদিন দুপুরে আসামের বিজেপি মন্ত্রী অশোক সিংঘল তার এক্স হ্যান্ডেলে ফুলকপি খেতের একটা ছবি দিয়ে লিখেছিলেন "বিহার অ্যাপ্রুভস গোবি ফার্মিং", অর্থাৎ কপি চাষের অনুমোদন দিলো বিহার।
তিনি বিহারের ভোটের ফলাফলের সঙ্গে কপি চাষের সম্পর্ক টেনে আনায়, সমালোচনা যেমন হয়েছে, তেমনই আবার অনেকেরই এখন মনে পড়ছে সাড়ে তিন দশক আগের এক ভয়াবহ সহিংসতার ইতিহাস – ভাগলপুর দাঙ্গার স্মৃতি।
অশোক সিংঘলের পোস্টের সমালোচনায় আসাম প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি গৌরব গগৈ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ লিখেছেন, "বিহার নির্বাচনের ফলাফলের পর আসামের একজন বর্তমান মন্ত্রীর 'কপি চাষ' ছবির ব্যবহার রাজনৈতিক আলোচনায় এক বিস্ময়কর নতুন নিম্নমানের চিত্র তুলে ধরে। এটি অশ্লীল এবং লজ্জাজনক - দুই-ই"।
তিনি আরো লিখেছেন, "এই ধরনের ট্র্যাজেডিকে এভাবে ডেকে আনা প্রমাণ করে যে কেউ কেউ জনজীবনে কতটা নেমে আসতে ইচ্ছুক"।
এই রাজনৈতিক বিতর্কের মাঝে 'ফুলকপি চাষ' প্রসঙ্গটি সেই ভয়াবহ দাঙ্গার স্মৃতি আবার সামনে নিয়ে এসেছে।
বেশ কয়েক দিন ধরে চলা ওই দাঙ্গায় সবথেকে ভয়াবহ ঘটনাগুলোর অন্যতম লোগাঁয় গ্রামের গণহত্যা।
ওই গ্রামের মুসলমানদের হত্যা করে তা গোপন করার জন্য লাশের ওপরে কপির চাষ করা হয়েছিল। দাঙ্গার প্রায় এক মাস পরে সেখান থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল ১১৬টি মৃতদেহ।
মুসলিম-বিদ্বেষ ছড়াতে কপি চাষের প্রসঙ্গ সামাজিক মাধ্যমে আগেও এনেছে কিছু কিছু হিন্দুত্ববাদী প্ল্যাটফর্ম।
বিবিসি হিন্দি ২০০৫ সালের ১২ই মে ওই দাঙ্গার বিচার সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছিল যে, ওই দাঙ্গায় ১৯৮১ জনের মৃত্যু হয়েছিল। দাঙ্গার তদন্তে গঠিত একটি তদন্ত কমিটির রিপোর্ট উদ্ধৃত করে নিহতদের এই সংখ্যাটি লেখা হয়েছিল।
ওই সময়ে রামমন্দির নির্মাণের উদ্দেশ্যে সারা দেশ থেকে 'রামশিলা', যা আদতে 'শ্রীরাম' খোদাই করা ইট, পদযাত্রা করে অযোধ্যায় নিয়ে আসার ডাক দিয়েছিল বিশ্ব হিন্দু পরিষদ। হিন্দু সংগঠনটির সেই রামশিলা পদযাত্রা ভাগলপুরের একটি মুসলমান প্রধান এলাকা দিয়ে যাওয়ার সময়েই শুরু হয় সংঘর্ষ। পরে তা ছড়িয়ে পড়ে গ্রামেগঞ্জে।

ছবির উৎস, Pravir
লোগাঁয় গ্রামের গণহত্যা
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
তারিখটা ছিল ২৭শে অক্টোবর, ১৯৮৯ সাল। তার দিন তিনেক আগে থেকেই ভাগলপুর শহর আর গ্রামাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছিল হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা।
শহর থেকে প্রায় ২০ মাইল দূরে ছোট্ট গ্রাম লোগাঁয়তে ৩৫ ঘর মুসলমানের বসবাস ছিল। বেশ রাতের দিকে মহল্লা ঘিরে ফেলে দাঙ্গাকারীরা।
সেই রাতে গ্রামের ৫৫ জন পুরুষ আর ৬১ জন নারীকে কুপিয়ে হত্যা করে লাশগুলো পুকুরে ফেলে দেওয়া হয়।
প্রায় ১৮ বছর পরে ওই দাঙ্গাকারীদের শাস্তি ঘোষণা করে ভাগলপুরের আদালত। সেই তালিকায় ছিল স্থানীয় জগদীশপুর থানা ওসি রামচন্দ্র সিংয়ের নাম। কোনো কোনো সংবাদ প্রতিবেদনে পাওয়া যায় যে তিনিই দাঙ্গাকারী দলের নেতৃত্বে ছিলেন।
দারভাঙ্গার ললিত নারায়ণ মিথিলা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের গবেষক জিতেন্দ্রনারায়ণ অনেক বছর পরে বিহারের দাঙ্গাগুলো নিয়ে গবেষণা করেছিলেন। ভাগলপুর দাঙ্গার বর্ণনা দিতে গিয়ে লোগাঁয় গণহত্যার বিবরণও তিনি দিয়েছেন তার গবেষণাপত্রে।
তিনি লিখেছেন, "আগে থেকেই মহল্লাটা চিহ্নিত করে রাখা ছিল। সশস্ত্র হামলাকারীরা গ্রামের নিরীহ বাসিন্দাদের এক জায়গায় জড়ো করে আটকিয়ে রাখে, চলতে থাকে লুটপাট। ঘরগুলো ভেঙে দেওয়া হয়। লাশগুলো কাছের একটা পুকুরে ফেলে দিয়ে পালিয়ে যায় হামলাকারীরা।"
তবে নৃশংসতার তখনো বাকি ছিল।
"একসঙ্গে এতজনকে হত্যা করা হয়েছিল বলে নয়, লোগাঁয়ের গণহত্যা সেই সময়ে খুব আলোচিত হয়েছিল তার ভয়াবহতার জন্য," বলছিলেন বিবিসির প্রাক্তন সহকর্মী ও বিহার সংবাদদাতা মণিকান্ত ঠাকুর। ভাগলপুর দাঙ্গার সময়ে তিনি পাটনা থেকে 'জনাদেশ' নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করতেন।
তিনি বলছিলেন, "আমি নিজে সেই সময়ে ঘটনাস্থলে যাইনি, কিন্তু আমাদের সংবাদদাতারা যে প্রতিবেদন আর ছবি পাঠাতেন সেসব শিউরে ওঠার মতো। ওই গণহত্যার প্রমাণ লোপাটের জন্য দেহগুলো পুকুরে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। পরে সেগুলো তুলে মাটিতে পুঁতে দেওয়া হয়, ওপরে বোনা হয় কপির বীজ"।

ছবির উৎস, @TheAshokSinghal
লাশের স্তূপ মাটিচাপা দিয়ে ওপরে শীতের সবজি
জিতেন্দ্রনারায়ণ তার গবেষণাপত্রে বর্ণনা দিয়েছেন যে ২৯ তারিখ রাতে স্থানীয় থানার তত্ত্বাবধানে লাশগুলো পুকুর থেকে তোলা হয় এবং আশপাশের চাষের খেতে পুঁতে দেওয়া হয়।
"তারও পরের দিন, ৩০শে অক্টোবর 'কৈরি'দের (যারা কৃষিকাজে পারদর্শী) নিয়ে এসে ওই জমিতে কপি আর সর্ষের বীজ বোনা হয়। কয়েক সপ্তাহ পরে যখন লোগাঁয় নিয়ে তদন্ত শুরু হয়, সেখানে তখন লাশের স্তূপের ওপরে শীতের নতুন সবজি গজিয়ে উঠেছে", লিখেছেন গবেষক জিতেন্দ্রনারায়ণ।
ঘটনার প্রায় ১৯ বছর পরে, ২০০৮ সালে হিন্দুস্তান টাইমস পত্রিকা লোগাঁয়ের ঘটনা নিয়ে একটা বিস্তারিত প্রতিবেদন করেছিল। সেটিতে দাঙ্গায় বেঁচে যাওয়া স্থানীয় গ্রামবাসী সাকিনা বিবির একটি উদ্ধৃতি ছিল।
"আমাদের হিন্দু প্রতিবেশীরা যে এরকম কিছু করতে পারে, তা এখনো বিশ্বাস হয় না। লোগাঁয়ের আশেপাশে যে সবজি চাষ হয়, সেগুলোতে যেন এখনও লাশের গন্ধ লেগে থাকে," হিন্দুস্তান টাইমসকে বলেছিলেন সাকিনা বিবি।
লোগাঁয় গ্রামের চৌকিদারের বিবৃতির ওপরে ভিত্তি করে পুলিশে একটা এফআইআর হয়েছিল ২৯শে অক্টোবর। এফআইআর দায়ের হয়ে যাওয়ার কারণেই সম্ভবত লাশগুলো লুকিয়ে ফেলা দরকার হয়ে পড়েছিল। পরে অবশ্য সেই চৌকিদার ও থানার ওসিসহ মোট ১৪জনকে দোষী সাব্যস্ত করে ভাগলপুরের আদালত – দাঙ্গার প্রায় ১৮ বছর পরে।
আদালতের রায় নিয়ে হিন্দুস্তান টাইমস যে প্রতিবেদন ছেপেছিল ২০০৭ সালের ১৮ই জুন, সেখানে সংবাদদাতা অভিজিৎ বিশ্বাস বিস্তারিতভাবে লিখেছিলেন যে কীভাবে গণহত্যার ২৫ দিন পরে লাশগুলো খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল।
ওই প্রতিবেদনে লেখা হয়েছিল, "১৯৮৯ সালের ২১শে নভেম্বর পার্শ্ববর্তী বাবরা গ্রামে পরিদর্শনে গিয়ে তৎকালীন অতিরিক্ত জেলাশাসক ওই জায়গাটি ঘুরে দেখেন। তিনি ২২শে নভেম্বর জেলা শাসকের কাছে একটি রিপোর্ট দেন। এরপরে আইএএস অফিসার সন্তোষ ম্যাথুকে ঘটনার তদন্ত করতে নির্দেশ দেওয়া হয়"।
"তিনি ১৯৮৯ সালের পয়লা ডিসেম্বর রিপোর্ট জমা দেন। তৎকালীন ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল অজিত দত্তকে রিপোর্ট পাঠানো হয় খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য। গ্রামের বাসিন্দা আজরাফ আলির বয়ানের ভিত্তিতে নতুন একটি এফআইআর দায়ের হয় ১৯৮৯ সালের তেসরা ডিসেম্বর"।

লাশের সঙ্গে পুকুরের জলে কয়েক ঘণ্টা
লোগাঁয়ের কাছেই আরেকটি গ্রাম চান্ধেরিতে হত্যা করা হয়েছিল অন্তত ৬০ জন মুসলমানকে। এদের মধ্যে যেমন বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা ছিলেন, তেমনই ছিলেন নারী ও শিশুরাও।
সেই সময়ে ১৪ বছর বয়সি মলকা বেগম প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলেন সেদিন, কিন্তু দাঙ্গাকারীদের তলোয়ারের কোপে তার ডান পায়ের গোড়ালি থেকে কাটা পড়ে।
বিবিসিকে ২০১৭ সালে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সেই ভয়াবহ রাতের বর্ণনা দিয়েছিলেন তিনি।
সেটা ছিল ২৭শে অক্টোবর, শুক্রবার। গবেষক জিতেন্দ্রনারায়ণের লেখায় রয়েছে যে গ্রামে একটি নতুন মসজিদ নির্মাণকে কেন্দ্র করে মুসলমানদের সঙ্গে স্থানীয় হিন্দুদের মধ্যে আগে থেকেই বিরোধ ছিল।
সেই মসজিদেই জুম্মার নামাজ পড়তে যেতে বাধা দেওয়া হয়েছিল বলে বিবিসিকে জানিয়েছিলেন মলকা বেগম। সেখান থেকেই দুপক্ষের মধ্যে শুরু হয় পাথর ছোঁড়া আর পটকা-বোমা ছোঁড়াছুঁড়ি।
"তখনই চারদিকে দৌড়াদৌড়ি শুরু হয়ে যায়। দুই একজনকে কেটে ফেলেছিল। আমরা মান্নাত চাচার বাড়িতে সবাই আশ্রয় নিয়েছিলাম। ওদিকে আমাদের ছেড়ে আসা খালি ঘরবাড়িতে ভাঙচুর, আগুন দেওয়া, লুটপাট চলছিল। সারাদিন ধরে ধাওয়া – পাল্টা ধাওয়া চলেছিল, পাথর ছোঁড়াছুঁড়ি হচ্ছিল। রাত নয়টা-দশটার দিকে পুলিশ এসেছিল। ওদের বলেছিলাম যে দাঙ্গাকারীরা কী কী করছে। তবে পুলিশ আমাদের কিছুটা আশ্বাস দিয়ে চলে যায় পরে আবার আসবে বলে," বলেছিলেন মলকা বেগম।
তার উল্লিখিত 'মান্নাত চাচা'র ঘরে আশ্রয় নেওয়ার ঘটনাটির উল্লেখ গবেষক জিতেন্দ্রনারায়ণের লেখাতেও পাওয়া যায়।
মলকা বেগম জানিয়েছিলেন যে অনেক রাতে 'ফৌজি'রা এসেছিল। প্রথমে তারা ভেবেছিলেন যে ফৌজি পোশাক পরে 'ডাকাত' বা দাঙ্গাকারীরা এসেছে। কিন্তু তারা আশ্বস্ত করে যে তারা গ্রামের মানুষকে বাঁচাতে এসেছে।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকে জানা যায় যে ভাগলপুরের দাঙ্গা শুরুর পরেই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী সেখানে পরিদর্শনে যান এবং সেনাবাহিনী নামানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন। সেনাবাহিনীর সঙ্গেই কেন্দ্রীয় রিজার্ভ পুলিশ এবং বিএসএফকেও নামানো হয়েছিল দাঙ্গা ঠেকাতে।
বেশ কিছুক্ষণ পরে ওই 'ফৌজি'রাও গ্রামবাসীদের আশ্বস্ত করে চলে যায়।
"এরপরে ভোর তিনটা – চারটে নাগাদ আরও কিছু মানুষ আসে। তারা প্রথমে আশ্বস্ত করেছিল যে আমাদের কোনো সুরক্ষিত জায়গায় পৌঁছিয়ে দেবে। এই বলে আমাদের বাড়ির বাইরে বার করে। সামনে পেছনে ছিল পুরুষ মানুষরা, আর মাঝে নারী আর শিশুরা," জানিয়েছিলেন মলকা বেগম।

ঘর থেকে বেরিয়ে ১০ পা এগোতেই তাদের চারদিক থেকে ঘিরে ফেলা হয়। রাস্তার পাশে অস্ত্রশস্ত্র লুকিয়ে রাখা হয়েছিল।
"কাউকে সামনের দিক থেকে, কাউকে পিছন থেকে কেটে ফেলছিল। পালানোর জায়গাই ছিল না। সামনে – পেছনে ওরা। একদিকে ঘর, অন্যদিকে পুকুর। মায়ের কোল থেকে বাচ্চাদের ছিনিয়ে নিয়ে মেরে ফেলেছিল। আমি কোনোভাবে জলে ঝাঁপ দিই – তখনই তলোয়ারের কোপ পড়ে ডান পায়ে," বর্ণনা দিচ্ছিলেন মলকা বেগম।
চোখের সামনে নিজের বাবা মাকে মারা যেতে দেখেছিলেন মলকা বেগম।
তিনি জানান, দাঙ্গাকারীরাই নিজেদের মধ্যে বলাবলি করছিল যে পুলিশ আসছে, তাই এখন পুকুরে ফেলা লাশগুলো কচুরিপানা দিয়ে ঢেকে দেওয়া হোক – পরে দেখা যাবে।
"যে ফৌজিরা আগে একবার এসেছিল, তারাই আবার ফিরে এসেছিল। তারা দাঙ্গাকারীদের কাছে জানতে চায় যে ঘরের এতগুলো মানুষ কোথায় গেল। তারা জবাব দিয়েছিল ভয়ে পালিয়ে গেছে। এদিকে আমি যে চিৎকার করব, তাও পারছিলাম না, গলা দিয়ে আওয়াজ বেরচ্ছিল না"।
"ফৌজিরা যখন চলে যাচ্ছে, তখন কোনোমতে আমি চিৎকার করে বলি গাড়ি থামাও। এরপরে তারা এসে আমাকে উঠে আসতে বলে। আমার পা তো কাটা – তাই উঠতে পারিনি। তখন একজন ফৌজি তার বন্দুকটা এগিয়ে দেয়, সেটা ধরেই আমি উঠে আসি," ভয়াবহ সেই রাতের কথা বিবিসিকে জানিয়েছিলেন মলকা বেগম।

ছবির উৎস, Pravir
'রামশিলা' নিয়ে মিছিল থেকে যেভাবে শুরু হয় দাঙ্গা
অযোধ্যায় রাম মন্দির আন্দোলন তখন সবে শুরু হচ্ছে। সেবছরই পালামপুর সম্মেলনে বিজেপি আনুষ্ঠানিকভাবে রাম মন্দির নির্মাণের দাবি সাংগঠনিকভাবে সমর্থন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
অন্যদিকে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ ওই আন্দোলনকে দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য প্রতিটা গ্রাম থেকে 'শ্রীরাম' খোদাই করা ইট নিয়ে অযোধ্যায় আসার ডাক দিয়েছে। ওই ইটগুলোকে বলা হত 'রাম শিলা'। সেগুলো অযোধ্যায় জড়ো করে প্রতীকী 'শিলান্যাস' করার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছিল বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, তারিখ ঠিক হয়েছিল নয়ই নভেম্বর, ১৯৮৯।
ওই রামশিলা নিয়ে ২৪শে অক্টোবর একটি মিছিল বেরিয়েছিল ভাগলপুরে শহরের লাগোয়া নাথনগর এলাকা থেকে।
গবেষক জিতেন্দ্রনারায়ণ লিখেছেন, "প্রায় হাজার খানেক মানুষের সেই মিছিলে নারীদের সংখ্যাই ছিল বেশি। মুসলমান-বিরোধী স্লোগান দেওয়া হচ্ছিল মিছিল থেকে। পুলিশ পাহারা ছিল, আর যত এগোচ্ছিল মিছিল, সেখানে পুলিশকর্মীর সংখ্যাটা বাড়ছিল"।
"আগের দিন জেলাশাসক আর পুলিশ সুপার মুসলমান নেতাদের সঙ্গে কথা বলে প্রতিশ্রুতি আদায় করে নিয়েছিলেন যে মিছিলটা শান্তিপূর্ণভাবে পেরোতে দেওয়া হবে। একটাই শর্ত ছিল যে মিছিল থেকে কোনো স্লোগান দেওয়া যাবে না"।
জেলাশাসককে উদ্ধৃত করে জিতেন্দ্রনারায়ণ লিখেছিলেন যে মুসলমানরা মিছিলটা আটকিয়ে দিয়েছে জানতে পেরেই তিনি ঘটনাস্থলে পৌঁছানো। কিন্তু আগের দিন যে মুসলমান নেতাদের সঙ্গে তারা আলোচনা করেছিলেন, ঘটনার দিন আর তাদের দেখা যায়নি।
কিছুটা সময় যাতে পাওয়া যায়, তাই তিনি মিছিলকারীদের অনুরোধ করেন গতি শ্লথ করে দিতে, অথবা অন্য রাস্তা দিয়ে ঘুরে যেতে। কিন্তু মিছিলকারীরা রাজি হয়নি।
তখন একমাত্র উপায় ছিল প্রচুর পুলিশ পাহারা দিয়ে মিছিলটাকে বার করে নিয়ে যাওয়া। জেলাশাসক আর পুলিশ সুপার সেখানেই ছিলেন।
"একটি মুসলিম স্কুলের কাছে মিছিলটা পৌঁছাতে হঠাৎই মিছিলের ওপরে বোমা পড়া শুরু হলো। আমরা সবাই খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম," জেলাশাসককে উদ্ধৃত করে লিখেছেন জিতেন্দ্রনারায়ণ।
জেলাশাসক একটা নর্দমায় পড়ে গিয়েছিলেন, পুলিশ সুপার আশ্রয় নিয়েছিলেন জিপের আড়ালে। এরপরে দৌড়াদৌড়ি শুরু হয়ে যায়। মিছিলকারীরা যে যেদিকে পারেন পালান। পুলিশ গুলি চালাতে শুরু করে।

পরবর্তীকালে জেলা কংগ্রেসের সভাপতি হয়েছিলেন যে সাজ্জাদ আলী, তিনি সেদিনের ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন। দাঙ্গার বিবরণ দিতে গিয়ে তিনিও বিবিসি হিন্দিকে জানিয়েছিলেন মুসলিমদের স্কুলের পাশ থেকেই বোমা ছোঁড়া শুরু হয়। তবে সেগুলো পটকা ছিল বলে দাবি মি. আলীর।
"সেসময়ে ভগবৎ ঝা আজাদ কংগ্রেসের সংসদ সদস্য ছিলেন। তিনিই মুসলমানদের অর্থ দিয়ে মিছিল আটকানোর জন্য প্রস্তুত করেছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন যে যদি কিছু হয় তাহলে অর্থ দিয়েই বোঝাপড়া করিয়ে দেবেন, আর মুসলমানদের ভোট সহজেই পেয়ে যাবেন তিনি। কিন্তু ঘটনার রাশ হাত থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল। মিছিল থেকে পারবতি থেকে মুসলমানদের মারতে শুরু করে। তিনদিন ধরে গণহত্যা চলতে থাকে," বলেছিলেন সাজ্জাদ আলি।
পারবাতি, লাহারিটোলা আর উর্দু বাজারে ছড়িয়ে পড়ে দাঙ্গা, লিখেছিলেন জিতেন্দ্রনারায়ণ।
পরের দিন, ২৫শে অক্টোবর ঘটনা আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। ভাগলপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষার শেষ দিন ছিল সেটা।
গবেষক জিতেন্দ্রনারায়ণ লিখেছেন, "কিছু ছাত্র, বেশিরভাগই হিন্দু, তারা তৈয়ারপুর এলাকার একটি লজ থেকে বেরিয়ে এলে তাদের একজনকে অপহরণ করে কিছু মুসলমান দুষ্কৃতি। তাকে সম্ভবত হত্যা করা হয়েছিল। আরেকজনকে ছুরি দিয়ে আঘাত করা হয়। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সময়ে সেই ছাত্রটি জানায় যে তাদের লজের বাইরে ঘিরে ফেলা হয়েছে"।
"কতজন ছাত্রকে ওই ঘটনায় হত্যা করা হয়েছিল, সেটা স্পষ্ট নয়। কিন্তু এই খবর যখন ছাত্রদের গ্রামে পৌঁছায়, হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ার জন্য এই খবরটাই যথেষ্ট ছিল"।

ছবির উৎস, Pravir
যে দাঙ্গা বদলে দেয় বিহারের জাতিগত সমীকরণ
ভাগলপুর দাঙ্গা থেকে যে নির্বাচনী সুবিধা তোলার চেষ্টা করেছিলেন কংগ্রেস দলে তৎকালীন সংসদ সদস্য ভগবৎ ঝা আজাদ, সেই অভিযোগ তো কংগ্রেসেরই নেতা সাজ্জাদ আলী করেছিলেন।
অন্যদিকে দাঙ্গায় অন্যতম প্রধান অভিযুক্ত হিসেবে উঠে এসেছিল কামেশ্বর ইয়াদভের নাম।
বিবিসি-র প্রাক্তন সহকর্মী মণিকান্ত ঠাকুর বলছিলেন, "এই কামেশ্বর ইয়াদভ ছিলেন লালু প্রসাদ ইয়াদভের একই জাতের মানুষ। তার নাম দাঙ্গায় বারবার উঠে এসেছিল। কিন্তু লালু প্রসাদ মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরে তাকে শাস্তি দেওয়ার বদলে তাকে শোনপুরের বিখ্যাত মেলায় সংবর্ধনা দিয়েছিলেন। ভাগলপুর দাঙ্গার তদন্ত বা বিচার সবকিছুই পেছনের সারিতে চলে গিয়েছিল লালু প্রসাদ ইয়াদভের সময়ে। আবার ওই দাঙ্গার পর থেকেই কংগ্রেস মুসলমানদের সমর্থন হারাতে শুরু করে। তারা আর কখনো কংগ্রেসের দিকে ফিরে যায়নি। বিহারে কংগ্রেসের পতনের শুরুটা হয়েছিল ওই দাঙ্গা থেকেই।"
"ওই একটা দাঙ্গা বদলে দিয়েছিল বিহারের জাতিগত সমীকরণ। পরবর্তীতে নীতীশ কুমার যখন মুখ্যমন্ত্রী হন, তিনিই ভাগলপুর দাঙ্গার বহু জমে থাকা মামলা আবারও নতুন করে বিচার শুরু করান। দোষীদের শাস্তি দেওয়া হয়। তবুও মুসলমানরা কিন্তু সেই লালু ইয়াদভের দিকেই থেকে যায় – শুধু বিজেপির ভয়ে ভীত হয়ে। অন্যদিকে লালু ইয়াদভের নিজের জাতির মানুষ তো তাকে সমর্থন করেনই – তিনি যে কামেশ্বর ইয়াদভদের মতো মুসলিম নিধনকারীদের মসীহা হয়ে উঠেছিলেন!" ব্যাখ্যা মণিকান্ত ঠাকুরের।
মুখ্যমন্ত্রী হয়ে নীতীশ কুমার ২০০৫ সালের নভেম্বরে ভাগলপুর দাঙ্গার তদন্তে বিচারপতি এনএন সিং কমিশন গড়েন। ওই কমিশন তাদের এক হাজার পাতার রিপোর্ট জমা দেয় ২০১৫ সালে। সেবছরই রিপোর্টটি বিহার বিধানসভায় পেশ করা হয়। মূলত সেই সময়ে কংগ্রেস সরকার, স্থানীয় প্রশাসন আর পুলিশকে দায়ী করা হয় ওই দাঙ্গার জন্য।
কামেশ্বর ইয়াদভ ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসে মারা গেছেন।
তিনি মারা যাওয়ার প্রায় দুবছর পরে সেই ভাগলপুর দাঙ্গার প্রসঙ্গ আবারও তুলে আনলেন আসামের বিজেপির মন্ত্রী অশোক সিংঘল। মনে করিয়ে দিলেন মুসলমানদের কীভাবে হত্যা করা হয়েছিল ভাগলপুরে। যে ভয়াবহ স্মৃতি নিয়ে বেঁচে আছেন মলকা বেগমরা।








