সঞ্জু স্যামসন বারবার বাদ পড়েও যেভাবে হয়ে উঠলেন ভারতের ম্যাচ জয়ের হিরো

পড়ার সময়: ৪ মিনিট

'জাস্টিস ফর সঞ্জু স্যামসন', দক্ষিণ ভারতীয় এই ক্রিকেটারের জন্য ন্যায়বিচার চেয়ে গত ১০ বছর ধরে, এই লাইনটি সামাজিক মাধ্যমে অসংখ্যবার ট্রেন্ডিং হয়েছে। রোববার রাত থেকে আবারও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছেন কেরালা রাজ্যের এই ক্রিকেটার। শুধু ভারতে নয়, চির প্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানের ক্রিকেকপ্রেমীরাও অভিভূত তার এই প্রত্যাবর্তনে।

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে সেমিফাইনালে যাওয়ার 'গেটপাস' ছিল রোববারে কলকাতার ইডেন গার্ডেন্সের যে ম্যাচ, সেখানেই ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে সঞ্জু স্যামসনের ৫০ বলে অপরাজিত ৯৭ রানই ভারতের পক্ষে খেলার মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

এর আগে ভারতের সেমিফাইনালে ওঠা কিছুটা অনিশ্চিতই ছিল। তবে সঞ্জুর ব্যাটেই ভাগ্য ফিরল ভারতের। যার জেরে আবারও চর্চায় কেরালার এই ক্রিকেটার।

আর পয়লা মার্চের রাত থেকে তার জন্য 'ন্যায়বিচার' চেয়ে নয়, এবারে তার নায়কোচিত প্রত্যাবর্তনের জন্য 'হিরো' হিসাবে ভাইরাল হয়েছেন তিনি।

সেঞ্চুরি অধরা থাকলেও রোববার দেশকে সেমি ফাইনালে পৌঁছে দিয়ে প্রায় ৬৬ হাজার দর্শকের সামনে পিচের ওপর নতজানু হয়ে বসে পড়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে সঞ্জু যেন বুঝিয়ে দিলেন তিনি ফুরিয়ে যাননি।

চলতি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের শুরুতে বাদ পড়েও কলকাতার ইডেন গার্ডেন্সে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে দুরন্ত ইনিংস খেলে নিজেকে ফের প্রমাণ করলেন দক্ষিণ ভারতের কেরালা থেকে উঠে আসা এই খেলোয়াড়।

ম্যাচের পরে আবেগপ্রবণ সঞ্জু

ভারতের জয়ের পর তার আবেগ প্রকাশ, স্ত্রীর সঙ্গে ভিডিও কল, সব কিছু থেকেই তার এতদিনের যন্ত্রণার ছাপ ফুটে উঠছিল।

ম্যাচ শেষে সঞ্চালকের প্রশ্নের উত্তরে সঞ্জু বলেন, "আজকের দিনটা, এই ইনিংসটা আমার কাছে অনেক দামি।"

"যে দিন থেকে আমি ক্রিকেট খেলতে শুরু করেছি, যখন থেকে দেশের হয়ে খেলার স্বপ্ন দেখেছি, সেদিন থেকেই আমি আমি অপেক্ষা করেছিলাম এই দিনটার জন্য।"

সঞ্জু স্যামসনের জন্ম কেরালার তিরুবনন্তপুরমে। ওই রাজ্যটি আবার ভারতের অন্যান্য অনেকর রাজ্যের মতো ক্রিকেটের জন্য খুব একটা পরিচিত নয়।

যদিও আগে রবিন উত্থাপা বা এস শ্রীসন্থ কেরালা থেকে উঠে এসেছেন, তবে ওই রাজ্য থেকে আর কেউ বিশেষ ভারতীয় ক্রিকেট দলে জায়গা পাননি।

তাই সঞ্জুর সাফল্যে উচ্ছ্বসিত কেরালার কংগ্রেস সংসদ সদস্য শশী থারুর।

রোববার নিজের এক্স হ্যান্ডেলে তিনি লেখেন, "সঞ্জুর সাফল্যে আমি খুবই গর্বিত। স্বস্তি বোধ করছি ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে তার অসাধারণ ইনিংস দেখে।

"আমি খুবই কষ্ট পেয়েছিলাম যখন তিনি দল থেকে বাদ পড়েন। সঞ্জু নিজেকে প্রমাণ করতে পেরেছেন। তিরুবনন্তপুরমের এই ছেলেকে নিয়ে আমি খুবই গর্বিত", মন্তব্য করেন মি. থারুর।

রোববার রাতে ইডেন গার্ডেন্সের ম্যাচ শেষে সাংবাদিক বৈঠকে ভারতীয় ক্রিকেট দলের কোচ গৌতম গম্ভীর যখন প্রশংসায় ভরিয়ে দিচ্ছেন সঞ্জুকে, তার আগেই নিজের টুপি খুলে সঞ্জুকে অভিবাদন জানান ভারতীয় দলের অধিনায়ক সূর্য কুমার ইয়াদভ।

ক্রিকেট বিশেষজ্ঞদের মতে গত দুই দশকে, রোহিত শর্মার পর সঞ্জু স্যামসনই ভারতের এমন একজন ব্যাটার যিনি সহজেই বড় বড় ছক্কা মারার ক্ষমতা রাখেন।

তিনি জানেন কোনটা সঠিক সময়, কোনটা সঠিক বল।

প্রতিভাকে চিনেছিলেন দ্রাবিড়

সঞ্জু স্যামসনের প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে অভিযেক হয় ১৭ বছর বয়সে। কেরালাতেই প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেট খেলতেন তিনি।

শুরুটা তেমন ভাল না হলেও সঞ্জুর কেরিয়ারের সঙ্গে প্রত্যাবর্তন শব্দটা যেন সমার্থক।

আইপিএলে রাজস্থান রয়্যালসের হয়ে তিনি খেলতে শুরু করেন ২০১৩ সালে। নজর কাড়েন তখনই।

ভারতীয় ক্রিকেট দলের প্রাক্তন কোচ তথা রাজস্থান রয়্যালসের তৎকালীন কোচ রাহুল দ্রাবিড় বলেছিলেন "সঞ্জু স্যামসন তাদের মধ্যে একজন, যারা টিম ইন্ডিয়ার ভবিষ্যৎ।"

ভারতীয় দল যখন ২০১৫ সালে জিম্বাবোয়ে সফরে যায়, সেই দলে সুযোগ পান সঞ্জু স্যামসন। তার অভিষেক হয় টি-২০ স্কোয়াডেও। তবে মাত্র ১৯ রান করেন সেবার।

তারপর ফের দলে ফিরতে তাঁকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়।

তার একদিনের ক্রিকেটের প্রথম শতরান দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে, ২০২৩ সালে।

আইপিএল এবং ঘরোয়া ক্রিকেটে ভালো পারফরম্যান্স সত্ত্বেও, সঞ্জু স্যামসন ২০২৪ সাল পর্যন্ত টিম ইন্ডিয়ায় নিজের জায়গা পাকা করতে পারেননি।

আবার ২০২৪ সালে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের টিমে জায়গা পেলেও প্রথম একাদশে থাকতে পারেননি।

কিন্তু যখন সুযোগ পান তখন সব সমালোচনার জবাব দিয়ে মাত্র পাঁচটি টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে তিনটি শতরান করেন।

তারপরেও তার ভাগ্য সেভাবে সঙ্গ দেয়নি। দলে তার জায়গা অনিশ্চিত থেকেছে, যা নিয়ে বারবার সমর্থকদের প্রশ্নের মুখেও পড়েছেন ভারতীয় দলের কোচ ও অধিনায়ক।

সামাজিক মাধ্যমে লেখা হয়েছে, 'জাস্টিস ফর সঞ্জু স্যামসন।'

বাদ পড়েও কামব্যাক

চলতি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের শুরুতে স্কোয়াডে থাকলেও ঈশান কিষান দুরন্ত ফর্মে দলে ফিরে আসায় অনিশ্চিত হয়ে পড়েন সঞ্জু স্যামসন।

পরে অভিষেক শর্মার অফ ফর্মের কারণে প্রথম একাদশে জায়গা হয় তার।

রোববার ইডেনে ভারতীয় দলের গোটা ব্যাটিং অর্ডারে যখন ধস, তখন ক্রিজের একদিক আঁকড়ে থাকলেন সঞ্জু।

ব্যক্তিগত সাফল্যের চেয়ে এগিয়ে দিলেন দলকে। মাত্র তিন রানের জন্য শতরান হাতছাড়া হলেও তার জন্য কোনও আক্ষেপ নেই এই ভারতীয় ক্রিকেটারের।

টিম ইন্ডিয়ার অধিনায়ক সূর্য কুমার ইয়াদভ ম্যাচ শেষে বলেছেন, 'যাঁরা অপেক্ষা করে তাদের সঙ্গে ভাল কিছু ঘটে। কঠোর পরিশ্রমের ফল পেয়েছেন সঞ্জু'।