আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলা ও ইরানের প্রতিশোধ, বিস্তারিত কতটা জানা যাচ্ছে
ইরানের নেতৃত্ব এবং সামরিক বাহিনীকে লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান ব্যাপক হামলায় দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সামরিক বাহিনীকে তাদের অস্ত্র সমর্পণের আহ্বান জানিয়েছেন এবং ইরানের জনগণকে তাদের সরকারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে বলেছেন।
জবাবে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি ও মিত্র দেশগুলোর বিরুদ্ধে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে।
তাদের লক্ষ্যবস্তু ছিল ইসরায়েল, বাহরাইন, কুয়েত, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও জর্ডান।
রোববার ইসরায়েল 'তেহরানের কেন্দ্রে' নতুন করে হামলার কথা জানিয়েছে, আর ইরান পুরো অঞ্চলে হামলা অব্যাহত রেখেছে।
End of বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন:
ইরানে কেন যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল হামলা করল
ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, এই অভিযানের লক্ষ্য হলো ইরান যাতে পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী না হতে পারে সেটি নিশ্চিত করা।
"আমরা তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করব এবং তাদের ক্ষেপণাস্ত্র শিল্প সম্পূর্ণভাবে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেব। এটি সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে," তিনি সোশ্যাল ট্রুথে পোস্ট করা আট মিনিটের এক ভিডিওতে বলেছেন।
তিনি সতর্ক করে বলেছেন যে, ইরানের সশস্ত্র বাহিনী অস্ত্র সমর্পণ করলে পুরোপুরি দায়মুক্তি পাবে, তা না হলে 'নিশ্চিত মৃত্যুর মুখোমুখি' হবে।
এরপর তিনি ইরানের জনগণকে ধর্মীয় শাসনব্যবস্থা উৎখাতের জন্য প্রস্তুত হতে আহ্বান জানান:
"আমরা যখন কাজ শেষ করবো তখন আপনারা আপনাদের সরকারের নিয়ন্ত্রণ নিবেন। এটি আপনাদের হবে। সম্ভবত প্রজন্মের পর প্রজন্মে এটাই হবে আপনাদের একমাত্র সুযোগ।"
অপারেশন এপিক ফিউরি নামের এই বিশাল সামরিক অভিযান শুরু হয়েছে কয়েক সপ্তাহ ধরে ট্রাম্প হুমকি দেওয়ার পর। তিনি বলেছিলেন, ইরান যদি তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নতুন কোনো চুক্তিতে রাজি না হয়, তবে তিনি সামরিক পদক্ষেপের নির্দেশ দেবেন।
ইরান বারবার বলে এসেছে যে, তাদের পরমাণু কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ।
যুক্তরাষ্ট্র সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড বলেছে, যেসব জায়গা থেকে তাৎক্ষনিক হুমকি এসেছিল, সেগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে তারা ইরানি শাসনের নিরাপত্তা বলয়গুলো ভেঙ্গে দিতে চায়।
এর আগে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের 'সন্ত্রাসী শাসনের তৈরি অস্তিত্বগত হুমকি' নিরসনে এই সামরিক অভিযান শুরু হয়েছে।
ইরানে কী ঘটছে
শনিবার সারা দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে।
সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে রাজধানী তেহরানসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিস্ফোরণ ও কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা গেছে। এসব এলাকার মধ্যে রয়েছে তেহরান, কারাজ, ইসফাহান ও কওম (মধ্যাঞ্চল) এবং পশ্চিমাঞ্চলের কেরমানশাহ।
যেসব রিপোর্ট পাওয়া যাচ্ছে, সে অনুযায়ী হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর বা আইআরজিসি'র স্থাপনা, বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎক্ষেপণ কেন্দ্র এবং সামরিক বিমানঘাঁটি।
ইসরায়েল ডিফেন্স ফোর্স বা আইডিএফ জানিয়েছে, পশ্চিম ও মধ্য ইরানে 'ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা ও প্রতিরক্ষা অবকাঠামোর বিরুদ্ধে ব্যাপক হামলায়' প্রায় দুশো যুদ্ধবিমান অংশ নিয়েছে।
শনিবার সন্ধ্যায় ডোনাল্ড ট্রাম্প আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর ঘোষণা দেন। রবিবার সকালে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রচারিত বিবৃতিতে দেশটির সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল তা নিশ্চিত করে।
ইরানে এখন প্রায় সম্পূর্ণ ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট চলছে। ফলে দেশটি থেকে নির্ভরযোগ্য ও হালনাগাদ তথ্য পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
ইরানের সিভিল এভিয়েশন অর্গানাইজেশন জানিয়েছে, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত দেশের আকাশসীমা বন্ধ থাকবে।
দেশটির রেড ক্রিসেন্টের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার দেশজুড়ে দুশোর বেশি নিহত এবং ৭০০ জনের বেশি আহত হয়েছেন। কর্মকর্তাদের মতে, দক্ষিণ ইরানের একটি স্কুলে বিস্ফোরণে অন্তত ১৫৩ জন নিহত হয়েছেন।
এদিকে, বিবিসির মিডিয়া পার্টনার সিবিএস নিউজ একটি গোয়েন্দা সূত্র ও একটি সামরিক সূত্রকে উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, হামলায় প্রায় ৪০ জন ইরানি কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন।
আইডিএফ জানিয়েছে, নিহতদের মধ্যে ইরানের সাতজন শীর্ষ পর্যায়ের প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা রয়েছেন। এদের মধ্যে আছেন ইরানের ডিফেন্স কাউন্সিল সেক্রেটারি আলি শামখানি, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আজিজ নাসিরজাদে এবং আইআরজিসি কমান্ডার জেনারেল মোহাম্মদ পাকপুর।
ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী বলেছে, শনিবারের হামলা 'তেহরানের পথে অগ্রসর হওয়ার পথ তৈরি করেছে' এবং রোববারের হামলা শহরের মূল অংশে কেন্দ্রীভূত ছিল।
রোববার ইরানে হতাহতের কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা জানানো হয়নি, তবে ইসরায়েল দাবি করেছে যে কমান্ড সেন্টার ও সামরিক অবকাঠামো ধ্বংস করা হয়েছে।
ওদিকে ট্রাম্প আরও দাবি করেছেন, ইরানের নৌবাহিনীর নয়টি জাহাজ ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং নৌ সদর দপ্তর ধ্বংস করা হয়েছে।
ইরান কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানালো
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বার আরাঘচি সম্পূর্ণ বিনা উস্কানিতে অবৈধ একটি যুদ্ধ শুরুর দায়ে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে অভিযুক্ত করেছেন।
"আমাদের শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনী এই দিনের জন্য প্রস্তুত ছিল এবং আগ্রাসীদের তাদের প্রাপ্য শিক্ষা দেব," তিনি সামাজিক মাধ্যম এক্স-এ লিখেছেন।
সর্বোচ্চ নেতা নিহত হওয়ার পর ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশ ও সামরিক স্থাপনাগুলোর ওপর ব্যাপক আকারে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে।
ইসরায়েলে একাধিক হামলা হয়েছে। এর মধ্যে একটি হামলায় বেইত শেমেশ শহরের একটি সিনাগগ ধ্বংস হয়েছে এবং এ ঘটনায় অন্তত ৯ জন নিহত হয়েছেন। এসব হামলায় আরও প্রায় ৪৫০ জন আহত হয়েছেন।
কাতার, বাহরাইন, জর্ডান ও কুয়েতসহ যেসব দেশে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি রয়েছে তারা ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার কথা জানিয়েছে।
যদিও ভূপাতিত ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কারণ হয়েছে বলে জানা গেছে। ওমান ও সৌদি আরবও লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।
রোববার বাহরাইনে অবস্থিত একটি মার্কিন নৌঘাঁটিতে ড্রোন হামলায় বড় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে বলে এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
সংযুক্ত আরব আমিরাতে বন্দর ও বিমানবন্দর লক্ষ্য করে চালানো হামলায় তিনজন নিহত হয়েছেন এবং কুয়েতে একজন মারা গেছেন বলে খবর পাওয়া গেছে।
পেন্টাগন জানিয়েছে, এই যুদ্ধে তিনজন মার্কিন সেনা সদস্য নিহত হয়েছেন এবং আরও পাঁচজন গুরুতর আহত হয়েছেন।
তবে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, তাদের বাহিনী শত শত ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার বিরুদ্ধে সফলভাবে প্রতিরক্ষা গড়ে তুলেছে।
ওই অঞ্চলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নৌ-মিশন জানিয়েছে যে, ইরানের বিপ্লবী গার্ড জাহাজগুলোকে রেডিও বার্তায় সতর্ক করেছে যে উপসাগরের হরমুজ প্রণালী দিয়ে কোনো জাহাজ চলাচল করতে পারবে না। বিশ্বব্যাপী তেল ও গ্যাস পরিবহনের প্রায় ২০ শতাংশ এই প্রণালী দিয়েই হয়।
ইইউর ফরেন পলিসি প্রধান কাজা কাল্লাস রোববার বলেছেন লোহিত সাগর, উপসাগর ও ভারত মহাসাগরে অতিরিক্ত জাহাজ মোতায়েন করে তাদের উপস্থিতি আরও জোরদার করা হবে।
ইরান পরে সেখানে তিনটি তেলের ট্যাংকারে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ও সেগুলো পুড়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছে।
খামেনির উত্তরসূরি কিভাবে বাছাই হতে পারে
রোববার আলিরেজা আরাফির নাম অন্তর্বর্তীকালীন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
দেশটির নতুন সর্বোচ্চ নেতার আনুষ্ঠানিক নির্বাচন জনগণের সরাসরি ভোটে হয় না।
বরং ৮৮ জন সিনিয়র ধর্মীয় নেতার সমন্বয়ে নিয়ে গঠিত একটি সংস্থা এই কাজটি করে থাকে। এই সংস্থার নাম অ্যাসেম্বলি অফ এক্সপার্টস।
এর সদস্যরা প্রতি আট বছর পরপর সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হন।
ইরানের সংবিধান অনুযায়ী, এই ধর্মীয় নেতাদের এখন যত দ্রুত সম্ভব নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন করতে হবে। তবে দেশ যখন হামলার মুখে তখন নিরাপত্তাজনিত কারণে এ প্রক্রিয়া জটিল হয়ে উঠতে পারে।
ভ্রমণের জন্য অঞ্চলটি কী নিরাপদ?
এই সংঘাতের ফলে হাজার হাজার ফ্লাইট স্থগিত করা হয়েছে। এটি কোভিড-১৯ মহামারির পর বৈশ্বিক ভ্রমণে সবচেয়ে বড় ধরনের বিঘ্নগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
উইজ এয়ার ৭ই মার্চ পর্যন্ত ইসরায়েল, সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই ও আবুধাবি, জর্ডানের আম্মান এবং সৌদি আরবে মঙ্গলবার পর্যন্ত তাদের সব ফ্লাইট স্থগিত করেছে। ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ বুধবার পর্যন্ত তেল আবিব ও বাহরাইনে ফ্লাইট বাতিল করেছে।
সুইস ইন্টারন্যাশনাল এয়ার লাইন্স এক বিবৃতিতে জানিয়েছে: "সুইস এবং লুফথানসা গ্রুপ এর বিমান সংস্থাগুলো ৭ই মার্চ পর্যন্ত তেল আবিব, বৈরুত (লেবানন), আম্মান, ইরবিল (ইরাক) এবং তেহরানে ফ্লাইট স্থগিত রাখবে।"
কুয়েতের বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ইরানে সব ফ্লাইট বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে।
ইমেরেটস সাময়িকভাবে দুবাই থেকে ও দুবাইগামী সব ফ্লাইট স্থগিত করেছে। এছাড়া এয়ার ইন্ডিয়া, ভার্জিন আটলান্টিক এবং তার্কিশ এয়ারলাইন্সও তাদের ফ্লাইট বাতিলের ঘোষণা দিয়েছে।
ইরাক ও জর্ডানসহ কিছু দেশ তাদের তাদের আকাশসীমা বন্ধ করেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত জানিয়েছে, সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে তারা আংশিক ও সাময়িকভাবে তাদের আকাশসীমা বন্ধ করেছে।