বিশ্ববিদ্যালয়ে ট্রান্সজেন্ডার নারীর বক্তৃতা বাতিল নিয়ে আসলে কী ঘটেছে?

হোচিমিন ইসলাম

ছবির উৎস, Hochimin Islam Facebook Page

ছবির ক্যাপশান, হোচিমিন ইসলাম

ঢাকার নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অনুষ্ঠানে হোচিমিন ইসলাম নামে এক ট্রান্সজেন্ডার নারীকে যোগ দিতে না দেয়ায় ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। ওই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বলছে কিছু 'অপ্রত্যাশিত' ঘটনার কারণেই তার যোগদান বাতিল হয়েছে, যা দু:খজনক।

অভিযোগ উঠেছে কেবল ট্রান্সজেন্ডার নারী পরিচয়ের কারণেই তাকে ওই আলোচনা অনুষ্ঠানে অংশ নিতে বাধা দেয়া হয়।

ওই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে দুই দিনব্যাপী ‘উইমেনস ক্যারিয়ার কার্নিভাল’ অনুষ্ঠানে শুক্রবার হোচিমিন ইসলামের বক্তব্য দেয়ার কথা ছিল।

যারা তার অংশগ্রহণের প্রতিবাদ করছেন তাদের বক্তব্য ছিল নারীদের কার্নিভালে ট্রান্সজেন্ডারকে কেন আমন্ত্রণ জানানো হবে।

এ নিয়ে কয়েকজন শিক্ষার্থীর আন্দোলনের মুখে হোচিমিনের সেশনটি বাতিল হয়ে যায়। বিষয়টি নিয়ে নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন হোচিমিন নিজেই।

বিবিসি বাংলাকে তিনি জানান, “প্রথমে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আমাকে জানালো তারা নিরাপত্তা দিয়ে নিয়ে যাবে। তারপর মাঝরাতেই বলল তারা নিরাপত্তা দিতে পারবে না।"

"এখন আমাকে মানুষ প্রতিনিয়ত মেরে ফেলার হুমকি দিচ্ছে। আমার মেসেজ বক্স অলরেডি গালাগালি আর হুমকিতে ভেসে গিয়েছে।”

এমন অবস্থায় নিরাপত্তাহীনতায় ভোগার কথা জানান তিনি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো জায়গায় এ ধরণের ঘটনা দু:খজনক ও অপ্রত্যাশিত বলে মন্তব্য করেছেন বিশ্লেষকরা।

এদিকে ওই ট্রান্সজেন্ডার নারীকে অনুষ্ঠানে আসতে দেয়া হবে না বলে যে শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদ করেছেন তাদের দাবি, একজন ট্রান্সজেন্ডার কখনও নারী হতে পারেন না এবং তাকে আমন্ত্রণ জানানোর মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এলজিবিটিকিউ বা সমকামিতার প্রচারণা চালাচ্ছে।

তবে এক্ষেত্রে নিরপেক্ষ অবস্থান নেয়ার চেষ্টা করেছে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

আরও পড়তে পারেন
স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

এ সংক্রান্ত এক লিখিত বিবৃতিতে তারা দাবি করে, তারা একদিকে যেমন সবার জন্য সম্মানজনক পরিবেশ বজায় রাখতে সচেষ্ট তেমনি তারা ভিন্ন মতকেও সম্মান জানায়।

কেন না এই দৃষ্টিভঙ্গিগুলো সমাজের বিভিন্ন বিশ্বাস ও মূল্যবোধকে প্রতিফলিত করে।

আলোচনা বাতিল হওয়া প্রসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় জানায়, “কিছু অপ্রত্যাশিত ঘটনার ফলে নির্ধারিত আলোচনা বাতিল হয়। যা বক্তা এবং আয়োজক উভয়ের জন্য দুঃখজনক।”

বিশ্ববিদ্যালয়টি সামনের দিনগুলোতে লিঙ্গ সমতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ গড়ে তুলতে সংগঠক এবং বক্তাদের সাথে নিবিড়ভাবে কাজ করবে বলেও জানায়।

এ ঘটনাকে বিশ্ববিদ্যালয় বিবেচনায় নেয়ার কথা জানালেও এ নিয়ে সামনে কোন তদন্ত হবে কিনা বা ব্যবস্থা নেয়া হবে কিনা সে বিষয়ে স্পষ্ট করে কিছু জানানো হয়নি।

এ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন সংযোগ কর্মকর্তা জানান, “আমরা এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়েছি। যা হবার হয়ে গিয়েছে। সামনে হয়তো আমাদের আরও কাজ করার সুযোগ আছে।”

মূলত ওই অনুষ্ঠানের আলোচকদের তালিকায় অন্যান্য বক্তাদের সাথে হোচিমিনের ছবিসহ পোস্টার টানানোর পর থেকেই নর্থ সাউথের কয়েকজন শিক্ষার্থী কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাকে না আনার বিষয়ে মতামত জানান।

পরে শিক্ষার্থীদের একটি অংশ হোচিমিনের বিপক্ষে ব্যানার-ফেস্টুন নিয়ে ক্যাম্পাসে অবস্থান নেন। তারা একই সাথে অনলাইনে এবং অফলাইনে এ নিয়ে প্রতিবাদ জানাতে শুরু করেন।

ওই শিক্ষার্থীরা শুক্রবার জুমার নামাজের পর থেকে নর্থ সাউথে তার উপস্থিতি ঠেকাতে অবস্থানও নেয়।

এক পর্যায়ে হোচিমিনের সেশন বাতিল করে দিতে বাধ্য হন আয়োজকরা।

পোস্টারে হোচিমিনের ছবি দেখার পর থেকে প্রতিবাদ করেন কতিপয় শিক্র্থী

ছবির উৎস, Hochimin

ছবির ক্যাপশান, পোস্টারে হোচিমিনের ছবি দেখার পর থেকে প্রতিবাদ করেন কতিপয় শিক্ষার্থী

নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এনএসইউ ইসলাম প্র্যাকটিশনার নামের একটা ফেসবুক গ্রুপে এই ঘটনাকে ক্যাম্পাসের ভেতরে অপরাধমূলক কাজ হিসেবে আখ্যা দিয়ে উপাচার্য বরাবর একটি চিঠি লেখা হয়।

সেখানে জানানো হয়, বাংলাদেশের আইনে সমকামিতা এবং এ সংক্রান্ত ধারণার প্রচার এক ধরণের ফৌজদারি অপরাধ।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই অনুষ্ঠানে হোচিমিন ইসলামকে আমন্ত্রণ জানিয়ে এলজিবিটিকিউ-এর পক্ষে প্রচার-প্রচারণা চালানো হচ্ছে বলে ওই চিঠিতে অভিযোগ করা হয়।

তাদের দাবি হিজড়া ও ট্রান্সজেন্ডার এক জিনিস নয়। এখানে তারা হিজড়া বলতে ত্রুটিপূর্ণ লিঙ্গ নিয়ে জন্ম নেয়া বোঝায় এবং ট্রান্সজেন্ডার বলতে একজন যে লিঙ্গ নিয়ে জন্মেছেন সেটাকে অস্বীকার করাকে বোঝায়।

এক্ষেত্র তারা হোচিমিন ইসলামকে নারী বলতেই অস্বীকৃতি জানান। তাদের মতে, তাকে অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানিয়ে ধর্মীয় অনুভূতিতে উস্কানি দেয়া হয়েছে।

এ নিয়ে অনুষ্ঠানের আয়োজকরা বলছেন, তারা নারীদের ক্যারিয়ার উন্নয়ন নিয়ে এই সেশনের আয়োজন করেছিলেন। সেখানে নারী বক্তার পাশাপাশি পুরুষ বক্তাও ছিলেন।

হোচিমিন ইসলামকে তেমনই একজন বক্তা হিসেবে সেশনে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল বলে তারা দাবি করেন।

অনুষ্ঠানের আয়োজক রেহনুমা করিম বিবিসিকে জানান, “যদি একজন পুরুষ বক্তা থাকলে কোন অসুবিধা না হয়, তাহলে একজন ট্রান্সজেন্ডার নারী বক্তা থাকলে সমস্যা কোথায়?"

"এখানে আমি তাকে এখন বক্তা হিসেবেই ডেকেছিলাম। শুধু তার ট্রান্সজেন্ডার পরিচয়ের জন্য ডাকা হয়নি।”

হিজরা ও ট্রান্সজেন্ডার নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, হিজরা ও ট্রান্সজেন্ডার নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে।

কিন্তু এই ইস্যুতে বিশ্ববিদ্যালয়ের কতিপয় শিক্ষার্থীর প্রতিবাদের মুখে পরিবেশ উত্তপ্ত হয়ে উঠলে হোচিমিনের নিরাপত্তা প্রশ্নের মুখে পড়ে।

এ অবস্থায় তারা হোচিমিনের সেশনটি বাতিল করার সিদ্ধান্ত নেন।

মিস করিম জানান, ওই অনুষ্ঠানটি ছিল সবার জন্য উন্মুক্ত। অর্থাৎ ওখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরের ও বাইরের সব শিক্ষার্থীই এসেছেন। এজন্য কারও প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করার কোন উপায় ছিল না।

“এমন অবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থী অনলাইনে অফলাইনে হুমকি দিতে থাকে এই অনুষ্ঠান হলে হোচিমিনকে ঢোকার আগেই ক্ষতি করা হবে বা অতিথিদের আটকে রাখবে। ইভেন্ট বন্ধ করে দেবে এমন হুমকিও দেয়া হয়। এরপরও আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা করেছি। কিন্তু শেষ মুহূর্তে শঙ্কার কথা ভেবে তার সেশনটি বাতিল করতে হয়েছে” তিনি জানান।

এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই ইস্যুর পক্ষে বিপক্ষে বিভিন্ন ধরণের পোস্ট দেখা যায়।

ট্রান্সজেন্ডার বিরোধীদের দাবি, ট্রান্সজেন্ডার কখনও নারী বা পুরুষ হতে পারে না। একে জেন্ডার ডিসফোরিয়া বলেও আখ্যা দেন তারা। এমন আরও অসংখ্য পোস্টে ঘৃণামূলক বক্তব্য দিতে দেখা যায়।

অন্য পক্ষে যারা আছেন, তাদের মতে এ ধরণের বিদ্বেষ ছড়িয়ে একজন মানুষের নিজের মতো করে বাঁচার অধিকার কেড়ে নেয়া হচ্ছে।

নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ফেসবুক পেইজে এই পোস্ট শেয়ার করা হয়।

ছবির উৎস, NSU ISLAM PRACTITIONER

ছবির ক্যাপশান, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ফেসবুক পেইজে এই পোস্ট শেয়ার করা হয়।
বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন:

বিশ্ববিদ্যালয়ে যেখানে মুক্ত চিন্তার চর্চা হওয়ার কথা সেখানে এ ধরণের পরিস্থিতি অপ্রত্যাশিত ও দুঃখজনক বলে জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ শাইখ ইমতিয়াজ।

তার মতে, ট্রান্সজেন্ডার নিয়ে জ্ঞানের অভাব থেকেই নানা ধরণের মতভেদ দেখা দিয়েছে এবং এসব বিরোধ দূর করার মতো পরিস্থিতিও তৈরি হয়নি।

এক্ষেত্রে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ব্যবসাকেন্দ্রিক মনোভাবের দিকেও আঙ্গুল তোলেন তিনি।

মি. ইমতিয়াজ বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয় বলতে যা বোঝায় তার সাথে নর্থ সাউথের এই ঘটনা সাংঘর্ষিক। যেখানে বাংলাদেশে ট্রান্সজেন্ডারদের অধিকার সংবিধান স্বীকৃত সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন পরিবেশের সৃষ্টি হওয়া ভাববার বিষয়।”

বিশ্ববিদ্যালয়ে সবার মধ্যে সাম্যতার চর্চা গড়ে তুলতে সাহিত্য সংস্কৃতির চর্চার ওপর মনোনিবেশ করা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।

এদিকে শুধুমাত্র ট্রান্সজেন্ডার পরিচয় কারণে এতো বিদ্বেষের মুখে পড়ে হোচিমিন ইসলাম অনেকটা আক্ষেপের স্বরে বিবিসি বাংলাকে বলেন, "শুধুমাত্র ভিন্ন জেন্ডার পরিচয়ের কারণে কেন আমাকে এসব সহ্য করতে হবে?"