বিক্ষোভে আবার উত্তাল ইরান, যুক্তরাষ্ট্রের হুমকিতে পাল্টা হুমকি

রবিবার থেকে তেহরানে বিক্ষোভ চলছে (ছবিতে)

ছবির উৎস, EPA

ছবির ক্যাপশান, রবিবার থেকে তেহরানে বিক্ষোভ চলছে

জীবনযাত্রার ঊর্ধ্বমুখী ব্যয়ের প্রতিবাদে ইরানে বিক্ষোভ প্রাণঘাতী রূপ নিয়েছে। কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস অন্তত সাতজন নিহত হওয়ার খবর দিচ্ছে।

বিক্ষোভকারী এবং নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষে বৃহস্পতিবারে ছয়জনের মৃত্যুর খবর জানিয়েছে ইরানের আধা-সরকারি ফার্স সংবাদ সংস্থা এবং মানবাধিকার সংস্থা হেঙ্গাও। দক্ষিণ-পশ্চিম ইরানের লোরদেগান শহরে দুইজন, আজনায় আর তিনজন ও কুহদাশ্ত শহরে একজন।

আবার ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, বুধবার রাতে পশ্চিম লোরেস্তান প্রদেশের কুহদাশ্ত শহরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে সংঘর্ষে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)-সংশ্লিষ্ট এক নিরাপত্তা সদস্য নিহত হয়েছে। যদিও বিক্ষোভকারীদের দাবি, নিহত ব্যক্তি তাদেরই একজন ছিলেন এবং নিরাপত্তা বাহিনী তাকে গুলি করে হত্যা করেছে।

রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম আরও জানায়, ওই এলাকায় পাথর নিক্ষেপের ঘটনায় ১৩ জন পুলিশ ও বাসিজ সদস্য আহত হয়েছেন।

বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলোতে দেখা যায়, বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর চলমান সংঘর্ষের সময় গাড়িতে আগুন দেওয়া হচ্ছে।

অনেক বিক্ষোভকারী দেশের সর্বোচ্চ নেতার শাসনের অবসানের দাবি জানিয়েছেন। কেউ কেউ আবার রাজতন্ত্র ফিরে আনার দাবিও তুলেছেন।

এদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান সরকারকে হুমকি দিয়েছেন যে, ইরানে বিক্ষোভকারীদের উপর নিরাপত্তা বাহিনী গুলি চালালে তিনি তাদের সাহায্য করবেন।

এর জবাবে ইরান বলেছে, কোনো বিদেশি হস্তক্ষেপের সুযোগ দেওয়া হবে না।

যেভাবে সূত্রপাত

ইরানের তেহরানে দোকানদার এবং ব্যবসায়ীরা প্রতিবাদে নামার পর দাঙ্গা-বিরোধী পুলিশ কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে, ছবি: ২৯ শে ডিসেম্বর, ২০২৫

ছবির উৎস, EPA

ছবির ক্যাপশান, ইরানের তেহরানে দোকানদার এবং ব্যবসায়ীরা প্রতিবাদে নামার পর দাঙ্গা-বিরোধী পুলিশ কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে, ছবি: ২৯ শে ডিসেম্বর, ২০২৫
স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

মূলত ইরানের মুদ্রার বড় ধরনের দরপতন ও জীবনযাত্রার ঊর্ধ্বমুখী ব্যয়ের ব্যাপারে সরকারের পদক্ষেপের বিরুদ্ধে রবিবার থেকে বিক্ষোভ শুরু হয়, যা দেশটির অন্যান্য অনেক জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে।

এই বিক্ষোভ শুরু হয় তেহরানে। খোলা বাজারে মার্কিন ডলারের বিপরীতে ইরানি মুদ্রার মূল্য অনেক বেশি কমে যাওয়ায় দোকানদাররা ক্ষুব্ধ হয়ে রাস্তায় নামেন।

মঙ্গলবারের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও এতে যুক্ত হন। এরপর এটি একাধিক শহরে ছড়িয়ে পড়ে এবং বিক্ষোভকারীরা ধর্মীয় শাসকদের বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে থাকেন।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের যাচাই করা একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, লোরেস্তান প্রদেশে রাতে একটি জ্বলন্ত ভবনের সামনে কয়েক ডজন মানুষ জড়ো হয়েছে, মাঝে মাঝে গুলির শব্দ শোনা যাচ্ছে এবং লোকজন কর্তৃপক্ষকে উদ্দেশ করে "নির্লজ্জ, নির্লজ্জ" বলে চিৎকার করছে"

মুদ্রার পতন মুদ্রাস্ফীতিকে আরও বাড়িয়েছে, যা সরকারি হিসাবেও মার্চ থেকে ৩৬ শতাংশের ওপরে রয়েছে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞায় ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতিতে এই চাপ আরও বেড়েছে।

বিবিসি পার্সিয়ান সার্ভিস জানাচ্ছে, দোসরা জানুয়ারি শুক্রবার জুমার নামাজ শেষে অংশগ্রহণকারীরা অন্যান্য শহরের বিক্ষোভকারীদের সমর্থনে স্লোগান দিয়েছে।

বিবিসি এবং অন্যান্য সূত্রে পাওয়া ভিডিওতে দেখা গেছে, তারা মসজিদ থেকে বের হয়ে স্লোগান দিয়েছে,

"ইরানিরা, চিৎকার কর—তোমার অধিকার দাবি কর" এবং "স্বৈরাচারীর মৃত্যু হোক।"

২০২২ সালে মাশা আমিনি র হেফাজতে মৃত্যুর পর যে বিক্ষোভ হয়েছিল, তার পর থেকে এটির মাত্রাই সবচেয়ে তীব্র পর্যায়ের। তবে এর ব্যাপ্তি তখনকার মতো বড় নয়।

গত কয়েক দশকে ইরান বারবার বড় ধরনের অস্থিরতা মোকাবিলা করেছে। সেসব ক্ষেত্রে সাধারণত কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও গণগ্রেপ্তারের মাধ্যমে বিক্ষোভ দমন করেছে। তবে এবারের অর্থনৈতিক সংকট কর্তৃপক্ষকে আরও দুর্বল করে দিতে পারে বলছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

ইরানি ডকুমেন্টারি ডিরেক্টরস অ্যাসোসিয়েশন এক বিবৃতিতে বলেছে যে, দেশে সাম্প্রতিক বিক্ষোভ "কোনও সাময়িক ঘটনা নয় বা কেবল অর্থনৈতিক সমস্যার প্রতিক্রিয়া নয়।"

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, "সাম্প্রতিক বিক্ষোভগুলো প্রাথমিকভাবে অর্থনৈতিক সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও, মূলত এগুলো আরও গভীর দাবির প্রতিফলন, মানবিক মর্যাদা, নাগরিক অংশগ্রহণের অধিকার এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতার দাবি। এই বিক্ষোভগুলোকে শুধু অর্থনৈতিক কারণে সীমাবদ্ধ করা বাস্তবতার অসম্পূর্ণ বর্ণনা হবে এবং সমস্যার মূল কারণ বোঝা বা স্থায়ী সমাধান খুঁজতে কোনো সহায়তা করবে না।"

ট্রাম্পের হুমকি, ইরানের তীব্র প্রতিক্রিয়া

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প

ছবির উৎস, Reuters

ছবির ক্যাপশান, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্যে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ইরান

এমন অবস্থায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান সরকারকে শুক্রবার হুমকি দিয়েছেন যে, ইরানে বিক্ষোভকারীদের উপর নিরাপত্তা বাহিনী গুলি চালালে তিনি তাদের সাহায্য করবেন।

মিঃ ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন: "যদি ইরান তাদের রীতি অনুসারে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের গুলি করে এবং সহিংসভাবে হত্যা করে, তাহলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের উদ্ধারে এগিয়ে আসবে।"

তিনি আরও বলেন: "আমরা পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত।"

ট্রাম্পের বার্তার কড়া প্রতিক্রিয়া এসেছে ইরানের দিক থেকেও।

ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ নেতার উপদেষ্টা আলী শামখানি বলেছেন, "ইরানের মানুষ আমেরিকানদের বাঁচানোর অভিজ্ঞতা ভালোভাবেই জানে, ইরাক ও আফগানিস্তান থেকে শুরু করে গাজা পর্যন্ত।"

তিনি সামাজিক মাধ্যম এক্সে লিখেছেন "যে হাত হস্তক্ষেপের অজুহাতে ইরানের নিরাপত্তার কাছে আসবে, তা পৌঁছানোর আগেই অনুশোচনামূলক জবাব দিয়ে কেটে ফেলা হবে।"

তিনি আরও বলেন, "ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা একটি লাল রেখা, এটা কোনো দুঃসাহসী টুইটের বিষয় নয়।"

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকাই বলেছেন, "আমেরিকার দাবি যে তারা ইরানের মানুষের জন্য দুঃখপ্রকাশ করছে, তা এই দেশের ইরানিদের বিরুদ্ধে অতীতের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে কোনোভাবেই মেলে না।"

তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ লিখেছেন, "আমেরিকা অতীতে যা করেছে—১৯৫৩ সালে ড. মোহাম্মদ মোসাদ্দেকের নির্বাচিত সরকারের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান সংগঠিত করা, ১৯৮৮ সালে ইরানের যাত্রীবাহী বিমান গুলি করে নামিয়ে নারী-শিশুদের হত্যা করা, এবং ৮ বছরের যুদ্ধে সাদ্দামকে সর্বাত্মক সমর্থন দেওয়া, এসব ইতিহাসের পর এখন তারা ইরানিদের জন্য দুঃখপ্রকাশের অজুহাতে হামলার হুমকি দিচ্ছে।"

তিনি জোর দিয়ে উল্লেখ করেন, "ইরানিরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করবে, কোনো বিদেশি হস্তক্ষেপের সুযোগ দেওয়া হবে না।"

এর আগে, মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ফার্সি পাতাও ইরানের বিক্ষোভের প্রতি প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিল। এক্স নেটওয়ার্কের একটি পোস্টে লিখেছিল: "ইরানে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীরা ভয়, সহিংসতা এবং গ্রেপ্তারের মুখোমুখি হচ্ছে এমন প্রতিবেদন এবং ভিডিও দেখে আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। মৌলিক অধিকার দাবি করা কোনও অপরাধ নয়। ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের সরকারকে অবশ্যই ইরানি জনগণের অধিকারকে সম্মান করতে হবে এবং দমন-পীড়ন বন্ধ করতে হবে।"

বিক্ষোভ নিরসনে সরকারের চেষ্টা

বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারে অনেক দোকান বন্ধ

ছবির উৎস, Reuters

ছবির ক্যাপশান, বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারে অনেক দোকান বন্ধ, ছবি: ৩০ শে ডিসেম্বর, ২০২৫

হেঙ্গাও মানবাধিকার সংস্থার বরাত দিয়ে রয়টার্স জানাচ্ছে, সর্বশেষ বিক্ষোভে ২৯ জনকে আটক করা হয়েছে, যার মধ্যে ১৪ জন কুর্দি, ৭ জন লোর, ৭ জন নারী এবং ২ জন শিশু।

পশ্চিমের লোরেস্তান প্রদেশে, যেখানে লোর জাতিগোষ্ঠীর বসবাস বেশি এবং তীব্র বিক্ষোভ হয়েছে, এক সিনিয়র বিচারিক কর্মকর্তা রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে বলেছেন, "জনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা হুমকির মুখে ফেলে এমন বেআইনি কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে কোনো সহনশীলতা দেখানো হবে না।"

ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস সাতজনকে গ্রেপ্তারের খবর দিয়েছে, যার মধ্যে পাঁচজনকে রাজতন্ত্রবাদী বলে বর্ণনা করা হয়েছে এবং আরও দুজনকে ইউরোপীয় ভিত্তিক গোষ্ঠীর সাথে যুক্ত বলে দাবি করা হয়েছে।

ইরানের পুলিশ প্রধান আহমদরেজা রাদান বলেছেন যে পুলিশ "শত্রুদের অস্থিরতা ও বিভাজনের পরিকল্পনা"কে "কার্যকর নজরদারির মাধ্যমে ব্যর্থ করে দেবে।"

তবে সর্বশেষ অস্থিরতার মধ্যে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান শান্তির সুরে কথা বলেছেন, জীবনযাত্রার ব্যয় সংকট নিয়ে বিক্ষোভকারীদের নেতাদের সঙ্গে আলোচনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। যদিও মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, নিরাপত্তা বাহিনী বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালিয়েছে।

বৃহস্পতিবার, ট্রাম্পের হুমকির আগে, পেজেশকিয়ান স্বীকার করেছেন যে সংকটের জন্য কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতাই দায়ী।

তিনি বলেছেন, "আমরাই দায়ী... আমেরিকা বা অন্য কাউকে দোষারোপ করবেন না। আমাদের সঠিকভাবে কাজ করতে হবে যাতে জনগণ আমাদের নিয়ে সন্তুষ্ট থাকে... সমস্যার সমাধান আমাদেরই করতে হবে।"

পেজেশকিয়ানের সরকার অর্থনৈতিক উদারীকরণের একটি কর্মসূচি চালাচ্ছে, তবে এর একটি পদক্ষেপ—কিছু মুদ্রা বিনিময় নিয়ন্ত্রণ তুলে দেওয়া—অফিসিয়াল বাজারের বাইরে ইরানি রিয়ালের তীব্র পতন ঘটিয়েছে।

তবে একই সঙ্গে দেশটির অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ মোভাহেদি-আজাদ সতর্ক করে বলেছেন, অস্থিরতা সৃষ্টি করার যেকোনো চেষ্টা "কঠোর জবাবের" মুখে পড়বে।