আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
তিস্তার বন্যা, ভূমিধস ও বৃষ্টিতে বিপর্যস্ত সিকিম, সেনা সদস্যরা হতাহত
রোববার রাতে উত্তর সিকিমের ছাতেন এলাকায় ভারতীয় সেনাবাহিনীর একটি শিবিরে প্রবল ভূমিধসের ঘটনায় তিনজন ভারতীয় সেনা সদস্য নিহত হয়েছেন এবং আরও ছয়জন নিখোঁজ রয়েছেন বলে সামরিক বাহিনীর সূত্রে জানানো হয়েছে।
ভূমিধসে আহত চারজন সেনা সদস্যকে উদ্ধার করা হয়েছে। নিখোঁজ ছয়জনকে খুঁজে বের করার জন্য উদ্ধার অভিযান চলছে।
নিহতদের মধ্যে রয়েছেন হাবিলদার লাখবিন্দর সিং, ল্যান্স নায়েক মুনিশ ঠাকুর এবং পোর্টার অভিষেক লাখাড়া।
এই ভূমিধসের সূত্রপাত হয় প্রবল বৃষ্টিপাতের কারণে, যা রোববার সন্ধ্যা সাতটা নাগাদ মংগন জেলার লাচেন এলাকার কাছে শুরু হয়।
এর আগে গত কয়েকদিন ধরেই সিকিমে একটানা প্রবল বৃষ্টি চলছে, তিস্তার জলোচ্ছ্বাসে মংগনে ওই নদীর ওপর একটি সেতু জলের তোড়ে ভেসে গিয়ে উত্তর সিকিম কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
তিস্তার জলোচ্ছ্বাস নদীর ভাঁটির এলাকা পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশেও অবধারিতভাবে প্রভাব ফেলবে, সেখানেও সতর্কবার্তা জারি করা হয়েছে।
লাচেং, লাচুন-সহ উত্তন সিকিমের জনপ্রিয় পর্যটনস্থলগুলোতে এর ফলে শত শত পর্যটক আটকা পড়েছেন।
তবে আজ সোমবার উত্তর সিকিমের লাচুং শহর থেকে গত ৩০ মে থেকে আটকে পড়া ১০০ জনেরও বেশি পর্যটককে উদ্ধার করে দজংগুর ফিডাং এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলে বার্তা সংস্থা পিটিআই জানিয়েছে।
তারা ছিলেন সেই ১,৬০০রও বেশি পর্যটকদের দলে, যারা ভারী বৃষ্টিপাতজনিত ভূমিধস এবং নদীর জলস্তর বৃদ্ধির কারণে লাচুং এলাকায় আটকে পড়েছিলেন।
আরও একটি পর্যটকদের দল, যার মধ্যে ১,৬৭৮ জন ছিলেন, তারা ফিডাংয়ের উদ্দেশে রওনা হয়েছে বলেও পিটিআই জানিয়েছে।
অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত ও ওই অঞ্চলে মেঘভাঙা বৃষ্টির কারণে তিস্তা নদীর জলস্তর এখনও বিপদসীমার ওপরে, যার ফলে উত্তর সিকিমের অনেক এলাকায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
ভারতীয় আবহাওয়া বিভাগ (আইএমডি) সতর্কবার্তা জারি করে স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটকদের 'অপ্রয়োজনীয় ভ্রম'ণ থেকে বিরত থাকতে নির্দেশ দিয়েছে, সম্ভব হলে ঘরে থাকার এবং নদীতীর ও ভূমিধসপ্রবণ এলাকা থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দিয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার (২৯শে মে) পশ্চিমবঙ্গে এসেছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। তবে তার সে দিন সিকিমেও যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু খারাপ আবহাওয়ার কারণে সেই সফর বাতিল করতে হয়।
বস্তুত সেইদিন থেকেই পরিস্থিতি খারাপ হচ্ছিল সিকিমের, আবহাওয়াও ছিল অত্যন্ত দুর্যোগপূর্ণ।
শনিবার উত্তর সিকিমের বিভিন্ন জায়গায় ধস নামে এবং তার জেরে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
শেষ পাওয়া খবর অনুযায়ী, সিকিমের সাত মাইলের মধ্যে নামচি জেলার লেগশিপ ও কিউজিংয়ের মাঝেও ধস নেমেছে। মংগন জেলাতে এখনও লাল সতর্কতা জারি রয়েছে।
আটক পর্যটকদের উদ্ধার করতে তৎপর হয়েছে জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী এবং সেনাবাহিনী। পর্যটকদের উপদ্রুত এলাকা থেকে সরিয়ে আনতে বিকল্প পথ এবং উপায় খুঁজছে প্রশাসনও।
তবে পর্যটকদের উদ্ধারে প্রশাসনের সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন লাচুং হোটেল অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যেরাও।
উত্তর সিকিমের বিস্তীর্ণ এলাকায় রবিবার রাত পর্যন্ত ব্যাপক বৃষ্টি হলেও সোমবার সকালে অনেক জায়গাতেই রোদের দেখা মিলেছে। তার পরেই উদ্ধারকাজ শুরু করা হয়।
সংবাদ সংস্থা এএনআই জানিয়েছে, প্রশাসনের পাশাপাশি উদ্ধারকাজে হাত লাগিয়েছেন স্থানীয় লাচুংপা সম্প্রদায়ের মানুষজনও। এই সম্প্রদায়ের অনেক মানুষই স্থানীয় হোটেলের মালিক।
সোমবার সকালে আবহাওয়ার কিছুটা উন্নতি হতেই তাঁদের অনেকে আটকে থাকা পর্যটকদের ব্যাগ বয়ে গাড়িতে নিয়ে গিয়ে তোলেন।
মেঘভাঙা বৃষ্টির জেরে তিস্তার জলস্তরও বৃদ্ধি পেয়েছে। সঙ্গে নেমেছে ধস। এর ফলে সেখানকার বহু এলাকা বাকি ভূখণ্ডের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
উত্তর সিকিমের বিভিন্ন জায়গায় বেড়াতে গিয়ে আটকে পড়েন পর্যটকেরা। শনিবার প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছিল, সেই সংখ্যাটা দেড় হাজারেরও বেশি।
সিকিম সরকারের পক্ষ থেকে আগেই তাঁদের হোটেল এবং হোমস্টেতে থেকে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে উত্তর সিকিমের অনেক জায়গাতেই এখনও বিদ্যুতের সমস্যা রয়েছে। চুংথাঙে জলের সমস্যা রয়েছে।
প্রশাসন ও সেনাবাহিনী যৌথ ভাবে উদ্ধার কাজ শুরু করেছে। তবে প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে উদ্ধার অভিযানে বিঘ্ন ঘটছে।
তিস্তা নদী সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দাদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করার কথা ভেবেছে প্রশাসন। তাদের ওই অঞ্চল থেকে সরিয়ে নিয়ে আসার চেষ্টা করা হচ্ছে।
কারণ বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হলে ডিকচু, সিংথামের মতো এলাকা ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হবে। প্রচুর মানুষের মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে বলেও প্রশাসন আশঙ্কা করছে।
এরই মধ্যে উত্তর সিকিমের চুংথাং থেকে মুন্সিথাং যাওয়ার রাস্তায় দুর্ঘটনার কবলে পড়ে পর্যটকদের একটি গাড়ি। ১১ জন পর্যটককে নিয়ে গাড়িটি প্রায় বারোশো ফুট নীচে তিস্তায় পড়ে যায়।
পাশাপাশি উত্তর-পূর্ব ভারতের একাধিক রাজ্য, যেমন মিজোরাম, অসম, ত্রিপুরা, মণিপুরেও প্রবল বৃষ্টির জেরে ধসের কবলে পড়েছে বহু এলাকা। ধসের সঙ্গে বহু জায়গা বন্যারও কবলে।
সব মিলিয়ে ওই রাজ্যগুলোতে কমপক্ষে ১২ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে প্রশাসনিক সূত্রের খবর। ইতিমধ্যে ১৯ জনের মৃত্যুর খবরও সামনে এসেছে।
আইএমডি জানিয়েছে এটাই শেষ নয়, আগামী কয়েকদিনে এর থেকেও খারাপ আবহাওয়া দেখা যাবে উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলিতে।