আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
বলিউডের নায়িকাদের এত ডিপফেক ভিডিও কেন?
- Author, নূর নানজি ও শ্রুতি মেনন
- Role, বিবিসি নিউজ
এক বলিউড স্টার ক্যামেরার সামনে অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি করছেন, আরেকজন স্বল্পবসনা হয়ে ক্যামেরার সামনে পোজ দিচ্ছেন। কিন্তু আদতে এর কোনকিছুই ঘটেনি। এগুলো আসলে সাম্প্রতিক সময়ে ভাইরাল হওয়া অনেকগুলো ডিপফেক ভিডিওর মধ্যে দুটো।
এরকম ভিডিও যাদের নিয়ে করা হয়েছে তাদের মধ্যে আছেন রাশমিকা মানদানা, প্রিয়াংকা চোপড়া, জোনাস ও আলিয়া ভাটের মতো তারকারা, যাদের চেহারা বা কণ্ঠ অন্যদের দিয়ে বদলে দেয়া হয়েছে।
এক্ষেত্রে ছবিগুলো সাধারণত সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলো থেকে নেয়া হয় এবং অনুমতি ছাড়াই ব্যবহার করা হয়।
বলিউডে এত এই ডিপফেক উত্থানের কারণটা কী?
ডিপফেক আসলে আগে থেকেই আছে এবং বহুদিন ধরে তারকাদের লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে এসেছে।
“এতদিন হলিউড এই আগুনে পুড়েছে,” কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিশেষজ্ঞ আরতি সামানি বিবিসিকে বলেন, নাটালি পোর্টম্যান বা এমা ওয়াটসনের মতো হাই প্রোফাইল অভিনেত্রীরা এর শিকার হয়েছেন।
কিন্তু তিনি মনে করেন সম্প্রতি এআই যে উন্নতি সাধন করেছে, সেটা মানুষের ভুয়া অডিও ও ভিডিও তৈরি করার কাজ অনেক সহজ করে দিয়েছে।
“গত ছয় মাস বা এক বছরে এই টুলগুলো আরও নিখুঁত হয়ে উঠেছে, এ কারণেই আমরা এই কন্টেন্টগুলো এখন অন্যান্য দেশেও বেশি দেখতে পাচ্ছি,” বলেন মিজ সামানি।
“অনেক টুলই এখন সহজলভ্য হয়ে উঠেছে, ফলে খুব সামান্য খরচে অথবা খরচ ছাড়াই হুবহু বাস্তবধর্মী ছবি তৈরি করা যায় এবং এটা এখন সবার হাতে হাতে,” তিনি বলেন।
মিজ সামানি এর সাথে ভারতের কিছু একান্ত ফ্যাক্টর যোগ করেন। এখানে একটা বড় অংশ তরুণ, সামাজিক মাধ্যমের ব্যাপক ব্যবহার এবং “বলিউডের সাথে সখ্য ও মারাত্মক রকমের তারকা সংস্কৃতি।”
“ফলে ভিডিওগুলো খুব দ্রুত ছড়ায় এবং সমস্যাটাও বেশি করে ধরা পড়ে।”
তিনি আরও বলেন এরকম ভিডিও বানানোর পেছনে মূলত দুটি জিনিস কাজ করে।
“বলিউড তারকাদের নিয়ে যে কোন কিছু খুবই আকর্ষণীয় ক্লিকবেইটে পরিণত হয়, ফলে বিজ্ঞাপন থেকে অনেক অর্থ আসে। একই সাথে যারা এই ভিডিওগুলো দেখছে তাদের অজান্তেই তথ্য বিক্রি করার একটা সুযোগ তৈরি হয়।”
‘ব্যাপারটা খুবই ভয়ের’
ফেক বা ভুয়া ছবি প্রায়শই পর্নোগ্রাফি ভিডিওতে ব্যবহার হয়, আর এই ফেক ভিডিওগুলো যেকোনো কিছু থেকেই তৈরি করা সম্ভব।
সম্প্রতি, ২৭ বছর বয়সী অভিনেত্রী, রাশমিকা মানদানার একটা ইন্সটাগ্রাম ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে যেখানে কালো পোশাক পরা এক মহিলার শরীরে তার চেহারাটা বসিয়ে দেয়া হয়।
সামাজিক মাধ্যমে এটা ব্যাপক ভাইরাল হয়ে পড়ে। তবে ফ্যাক্ট চেকিং প্ল্যাটফর্ম অল্ট নিউজের এক সাংবাদিক রিপোর্ট করে যে এই ভিডিওটি আসলে ডিপফেক।
মানদানা এই ঘটনাকে ‘খুবই ভয়ের’ বলে বর্ণনা করেন এবং মানুষকে এ ধরনের জিনিস শেয়ার না করার অনুরোধ জানান।
আরেক মেগাস্টার প্রিয়াংকা চোপড়ারও একটা ভিডিও সম্প্রতি ভাইরাল হয়েছে। তবে এক্ষেত্রে তার চেহারা নয় বরং কন্ঠ বদলে দেয়া হয় যেখানে তিনি একটা ব্র্যান্ডের প্রচার চালাচ্ছেন এবং কিভাবে বিনিয়োগ করতে হবে সে সম্পর্কেও ধারণা দিচ্ছিলেন।
একই রকম ডিপফেকের শিকার হয়েছেন অভিনেত্রী আলিয়া ভাটও।
এক ভিডিওতে দেখা যায় তার মতোই দেখতে একজন ক্যামেরার সামনে অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি করছেন।
অন্যান্য তারকা যেমন ক্যাটরিনা কাইফও এর লক্ষ্যবস্তু হয়েছেন। এক্ষেত্রে টাইগার থ্রি চলচ্চিত্র থেকে তার একটা ছবি, যেখানে তিনি টাওয়েল পেঁচিয়ে আছেন, সেটাকে আরেকটা পোশাকে বদলে দেয়া হয়েছে যাতে তার শরীর আরও বেশি উন্মুক্ত করে দেয়া হয়।
শুধু বলিউড তারকাই নয় অন্যরাও এর শিকার হচ্ছেন, সম্প্রতি ভারতীয় শিল্পপতি রতন টাটার একটা ডিপফেক ভিডিও বানানো হয় যেখানে তিনি বিনিয়োগের পরামর্শ দিচ্ছেন।
তবে সাধারণত নারীদেরই বেশি করে আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেনসিটি এআই বলছে এসব ডিপফেকের ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশই হল অনুমতি বিহীন পর্ন। আর এর বেশিরভাগ শিকার নারীরা।
“এটা ভয়ংকর,” বলেন ভারতীয় প্রযুক্তি সেবা ও কনসাল্টিং কোম্পানি উইপ্রো’র গ্লোবাল চিফ প্রাইভেসি অফিসার ইভানা বার্তোলেতি।
“নারীদের জন্য এটা বেশি সমস্যার কারণ এগুলো ব্যবহার করে পর্ন বা সহিংসতার ভিডিও বানানো হয়, আর আমরা জানি যে এসবের একটা বাজার আছে,” বলেন তিনি।
“এই সমস্যাটা সবসময়ই ছিল, কিন্তু এখন যেটা দুশ্চিন্তার তা হল এসব টুলের সহজলভ্যতা ও কাজের গতি।”
মিজ সামানিও এর সাথে একমত, তিনি বলেন যে ডিপফেকের সঙ্কটটা “নারীদের জন্য ভয়ংকর মাত্রার।
“নারীদের মূল্যায়নই করা হয় তার সৌন্দর্য দেখে এবং নারী শরীর হয় লক্ষ্যবস্তু।”
মিজ সামানি বলেন, “ডিপফেক সেটাকে আরও এগিয়ে নিচ্ছে। অনুমতি ছাড়া ডিপফেকের এমন ব্যবহার নারীদের মর্যাদা ও নিজের শরীরের উপর থেকে নিয়ন্ত্রণ কেড়ে নিয়ে তা অপরাধীদের হাতকে শক্তিশালী করছে।”
ব্যবস্থা নেয়ার তাগিদ
ডিপফেক ভিডিও যখন আরো ছড়িয়ে পড়ছে, তখন সরকার ও টেক কোম্পানিগুলোর উপর চাপ বাড়ছে এ ধরণের কন্টেন্ট বন্ধে ব্যবস্থা নেয়ার।
ভারতীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে ডিপফেকের বিরুদ্ধে অভিযান চালাচ্ছে। মানদানার ভিডিও ভাইরাল হবার পর ডিপফেকের বিরুদ্ধে কথা বলেন দেশটির প্রযুক্তি মন্ত্রী রাজিব চন্দ্রশেখর।
তিনি বলেন এগুলো হল “মিথ্যা তথ্যের একেবারে সাম্প্রতিক এবং আরো ভয়ংকর ও ক্ষতিকর উদাহরণ। আর এর বিরুদ্ধে প্ল্যাটফর্মগুলোকে ব্যবস্থা নিতে হবে।”
ভারতীয় প্রযুক্তি আইনে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সাইটগুলোকে নিশ্চিত করতে হবে যে “কোন ব্যবহারকারীর দ্বারা কোন মিথ্যা তথ্য পোস্ট করা হচ্ছে না।”
যেসব প্ল্যাটফর্ম এটা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হবে আইন অনুযায়ী তাদের আদালতে নেয়া যেতে পারে।
কিন্তু মিজ বার্তোলেতি বলেন শুধু ভারত নয় এই সমস্যাটা আরও বিরাট আকার ধারণ করেছে, সারা বিশ্বজুড়েই বিভিন্ন দেশ এই সমস্যা সমাধানের উপায় খুঁজছে।
“এটা শুধু বলিউডের তারকাদেরই নয়, ডিপফেক রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী এবং অন্য লোকেদেরও লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে,” বলেন তিনি। “বিশ্বের অনেক সরকারকেই এখন চিন্তা করতে হচ্ছে যে ডিপফেকের প্রভাবে নির্বাচন ও গণতন্ত্রেও প্রভাব পড়তে পারে।”
মিজ বার্তোলেতি মনে করেন, সামাজিক মাধ্যমকে এক্ষেত্রে দায় স্বীকার করতে হবে এবং ডিপফেক শনাক্ত ও সেগুলো সরিয়ে ফেলার ব্যাপারে তড়িৎ ব্যবস্থা নিতে হবে।
মিজ সামানি বলেন পুরুষতান্ত্রিকতাও এক্ষেত্রে “গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে” এই সঙ্কট সমাধানে। “ঘটনার শিকার যারা হচ্ছেন তারা এ নিয়ে উদ্বেগ জানাচ্ছেন ও শাস্তির দাবি জানাচ্ছেন, কিন্তু খুবই কম পুরুষ এ নিয়ে কথা বলছে।”
পুরুষদের দিক থেকে আরও সহযোগিতা আসতে হবে বলে মনে করেন তিনি।