টেনশন বা দুশ্চিন্তায় বেশি খাওয়া কি একটি রোগ? কী প্রভাব পড়ে শরীরে?

ছবির উৎস, Getty Images
- Author, কেট বোয়ি
- Role, গ্লোবাল হেলথ, বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিস
স্ট্রেস কিংবা মানসিক চাপ মানুষের শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। স্ট্রেসের কারণে মাথাব্যথা, পেটে যন্ত্রণা, ঘুম না হওয়াসহ বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিতে পারে। শুধু তাই নয়, মানসিক চাপ কিন্তু আপনার খাদ্যাভ্যাসের উপরেও প্রভাব ফেলতে পারে।
এর কারণে খাদ্যাভ্যাসেও পরিবর্তন দেখা দেয়।
লক্ষ্য করে দেখবেন আমরা যখন কোনো কারণে মানসিক চাপের সঙ্গে লড়াই করি, তখন কখনো কখনো চকোলেট বা পিৎজার মতো খাবার খেতে ইচ্ছে করে। মাঝে মাঝে আবার কিছুই খেতে মন চায় না।
এখন প্রশ্ন হলো, স্ট্রেস কেন আমাদের ক্ষুধার ওপর প্রভাব ফেলে এবং এ সমস্যা কীভাবেই বা কাটিয়ে উঠতে পারি আমরা?
স্ট্রেস বা মানসিক চাপ
ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট রাজিতা সিন্হা যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের 'ইন্টারডিসিপ্লিনারি স্ট্রেস সেন্টার'-এর প্রতিষ্ঠাতা এবং পরিচালক।
তিনি ব্যাখ্যা করেছেন, "কোনো কঠিন এবং বিহ্বল হয়ে পড়ার মতো পরিস্থিতিতে যখন আপনার মনে হতে থাকে এখন আর কিছু করার নেই- তখন শরীর এবং মন যে প্রতিক্রিয়া দেয় সেটাই হলো স্ট্রেস"।
আমাদের চারপাশের পরিস্থিতি, উদ্বেগ এবং শরীরের পরিবর্তন, যেমন তীব্রতর খিদে বা তেষ্টা পাওয়ার মতো ঘটনা মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাসকে সক্রিয় করে তোলে।
হাইপোথ্যালামাস আমাদের মস্তিষ্কের মটরের মতো আকারের একটা ক্ষুদ্র অংশ।

ছবির উৎস, Getty Images
রাজিতা সিন্হা জানিয়েছেন, এই 'অ্যালার্ম সিস্টেম' আমাদের শরীরের প্রতি কোষের ওপর কাজ করে ও অ্যাড্রেনালিন এবং কর্টিসলের মতো হরমোনকে সক্রিয় করে তোলে।
এর ফলে আমাদের হৃদস্পন্দন এবং রক্তচাপ বৃদ্ধি পেতে পারে।
প্রসঙ্গত, স্বল্পমেয়াদে স্ট্রেস বা মানসিক চাপ কিছু ক্ষেত্রে সহায়কও হতে পারে। আপনাকে বিপদ থেকে বাঁচতে বা একটা নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে কাজ শেষ করার ক্ষেত্রে সাহায্য করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে দীর্ঘমেয়াদে মানসিক চাপ ক্ষতিকারক হতে পারে।
ক্রনিক স্ট্রেস রয়েছে অর্থাৎ দীর্ঘদিন ধরে মানসিক চাপের মধ্যে রয়েছেন এমন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ডিপ্রেশন, ঘুমের সমস্যা এবং ওজন বৃদ্ধি ইত্যাদি দেখা দিতে পারে।
ক্রনিক স্ট্রেসের জন্য দায়ী হতে পারে বিভিন্ন বিষয়, যেমন ব্যক্তিগত জীবনে সম্পর্কে সমস্যা, কাজের চাপ বা অর্থনৈতিক সমস্যার সঙ্গে লড়াই করা ইত্যাদি।
স্ট্রেসের কারণে কেন ক্ষুধায় প্রভাব পড়ে?
স্ট্রেস কখনো কখনো ক্ষুধা বা খিদে বাড়িয়ে তুলতে পারে আবার কখোনো বা তা একেবারে দমিয়েও ফেলতে পারে।
মিঠু স্টোরোনি একজন নিউরো-অপথালমোলজিস্ট। 'স্ট্রেস-প্রুফ' এবং 'হাইপার এফিশিয়েন্ট' এর মতো বইও লিখেছেন তিনি।

ছবির উৎস, Getty Images
এই বিশেষজ্ঞের কথায়, "আমার মনে আছে, পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার সময় মনে হয়েছিল আমি অসুস্থ হয়ে পড়েছি।
এখন অবশ্য আমরা জানি যে এমনটা ঘটার কারণ আমাদের গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল সিস্টেম, পেট এবং অন্ত্র, এবং মস্তিষ্কের মধ্যে সরাসরি যোগ রয়েছে"।
তিনি ব্যাখ্যা করেন যে মানসিক চাপ ভেগাস নার্ভের কার্যকলাপকে দমিয়ে দিতে পারে। এই স্নায়ু ব্রেনস্টেম (মস্তিষ্কের কান্ড) থেকে পেট পর্যন্ত গিয়েছে। এর কাজ পাকস্থলী থেকে ব্রেনে সিগনাল পাঠিয়ে জানানো পেট কতটা ভরা আছে এবং শরীরের কতটা এনার্জি প্রয়োজন রয়েছে।
ডা. স্টোরোনি ব্যাখ্যা করেছেন, "কিছু ব্যক্তির ক্ষেত্রে এই স্নায়ুর ক্রিয়াকলাপ বাধাপ্রাপ্ত হওয়ার ফলে খিদে কমে যায়"।
"আবার অন্যদিকে, আমরা এটাও জানি যে মানসিক চাপের সময় মস্তিষ্ক তৎক্ষণাৎ চিনির প্রয়োজনীয়তা অনুভব করতে থাকে"।
এই কারণে অনেকে নিজের অজান্তেই এমন কিছু খাওয়া শুরু করেন "যা তাদের দেহে এনার্জি বা শক্তি যোগায়"।
অর্থাৎ অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতির জন্য মানব শরীর নিজেকে প্রস্তুত করতে শুরু করে।

ছবির উৎস, Getty Images
ক্রনিক স্ট্রেস কীভাবে খিদেকে প্রভাবিত করে?
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
মানসিক চাপের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে লড়তে থাকলে তার প্রভাব বমি বমি ভাব বা মিষ্টি খেতে ইচ্ছে করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না।
অধ্যাপক রাজিতা সিন্হা ব্যাখ্যা করেছেন, আপনার শরীর যখন মানসিক চাপের মধ্যে দিয়ে যায়, তখন রক্তে শর্করার পরিমাণ বেড়ে যায়, যা ইনসুলিনকে (গ্লুকোজের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে যে হরমোন) স্বল্প সময়ের জন্য কম মাত্রায় কার্যকর করে তোলে।
প্রকৃতপক্ষে, গ্লুকোজ ব্যবহার হওয়ার পরিবর্তে রক্তে থেকে যায়, যা রক্তে শর্করার মাত্রাকে বাড়িয়ে তোলে।
এটা দীর্ঘমেয়াদে স্ট্রেসের সঙ্গে লড়তে থাকা ব্যক্তিদের জন্য ঝুঁকি তৈরি করে। ধীরে ধীরে রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়তে থাকে যা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে এবং ইনসুলিন প্রতিরোধ দেখা যেতে পারে যা ওজন বৃদ্ধি বা ডায়াবেটিসের কারণ হয়ে উঠতে পারে।
অন্যদিকে, ওজন বেড়ে গেলে তা শরীরকে আপেটাইট চেঞ্জ বা রুচির পরিবর্তনের প্রতি আরো সংবেদনশীল করে তোলে।
সাধারণত, যাদের শরীরে বেশি ফ্যাট থাকে তাদের ইনসুলিন প্রতিরোধের সম্ভাবনা বেশি থাকে। এর অর্থ, যখন তারা মানসিক চাপে থাকেন তখন তাদের মস্তিষ্ক আরও বেশি পরিমাণে সুগার দাবি করে।
রাজিতা সিন্হা বলেছেন, "আমরা একে ফিড-ফরোয়ার্ড চক্র বলি, যেখানে একটা জিনিস অন্যকে উৎসাহ দেয়। এটা এক ধরনের দুষ্টচক্র এবং এখান থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন"।

ছবির উৎস, Getty Images
উদ্বেগজনিত খাওয়া কীভাবে বন্ধ করা যেতে পারে?
ডা. স্টোরোনির মতে মানসিক চাপে থাকাকালীন স্ট্রেস ইটিং বা উদ্বেগজনিত খাওয়া কমানোর সবচেয়ে ভালো উপায় হলো আগাম পরিকল্পনা করা যাতে ব্যস্ত সময়ে আমরা অতিরিক্ত না খেয়ে ফেলি।
এক্ষেত্রে মূল বিষয়গুলোও ভুলে গেলে চলবে না। যেমন ঘুম সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলেই জানিয়েছেন তিনি।
ডা. স্টোরোনি বলেছেন, "এক্ষেত্রে আমি পরামর্শ দেব ঘুমের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দিতে। এর কারণ, ঘুম কিন্তু মানসিক চাপের প্রতি প্রতিক্রিয়ার সাথে যুক্ত তিনটি অঙ্গকে আবার রিসেট করে দেয়"।
ঘুম মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাস নামে সেই ক্ষুদ্র অংশ, পিটুইটারি এবং অ্যাড্রিনাল গ্রন্থিগুলোকে ভারসাম্যে ফিরিয়ে আনে যার ফলে স্ট্রেস হরমোন তৈরি হওয়া বন্ধ হয়।
ডা. স্টোরোনি বলেন, "ঘুমের ঘাটতি হলে সব ধরনের খাওয়ার ইচ্ছা, মিষ্টির প্রতি আকর্ষণ বেড়ে যায়। এর কারণ ঘুমের অভাব হলে মস্তিষ্কের আরও শক্তির প্রয়োজন পড়ে"।
তিনি ব্যাখ্যা করেছেন এক্সারসাইজ করলে স্ট্রেস থেকে রিল্যাক্সড অবস্থায় ফিরে আসার ক্ষমতাও বেড়ে যায়। মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতাও বাড়ে।
মানসিক চাপ তৈরি হতে পারে এমন সময় যদি আসন্ন হয় তাহলে এই সাধারণ বিষয়গুলোর ওপর মনোযোগ দিলে স্ট্রেসে থাকাকালীন অতিরিক্ত খাওয়া এড়ানো যেতে পারে বা নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে বলে জানিয়েছেন তিনি।

ছবির উৎস, Getty Images
এ সময় কোন খাবার এড়িয়ে চলা উচিত?
প্রফেসর সিন্হা জানিয়েছেন, মানসিক চাপে থাকলে খুব বেশি শর্করাযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো জাংক ফুড কেনা বন্ধ করা।
তার কথায়, "এটা একটা প্র্যাক্টিক্যাল (ব্যবহারিক) বিষয়। এই সব জিনিস যেন আপনার নাগালের বাইরে থাকে। কারণ এগুলো আপনার আশেপাশে থাকলেই আপনি খেতে চাইবেন"।
"দ্বিতীয় বিষয় হলো সারাদিনে নিয়ম মেনে অথচ অল্প পরিমাণে স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ার চেষ্টা করতে হবে। এতে খিদে এবং খাবারের আকাঙ্ক্ষা দু'টোই নিয়ন্ত্রণে থাকে"।
পাশাপাশি, রক্তে গ্লুকোজ-এর মাত্রা বাড়িয়ে দেয় এমন খাবার এড়ানোও দরকার। যেমন পিৎজা, মিষ্টি স্ন্যাকস এবং সাধারণ কার্বোহাইড্রেটযুক্ত খাবার এই সময় এড়িয়ে চলতে হবে, কারণ এই জাতীয় খাবার রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়িয়ে দেয়।
এর বদলে, প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার যেমন মাংস, মটরশুটি, মাছ বা স্বাস্থ্যকর কার্বোহাইড্রেটযুক্ত খাবার খাওয়া যেতে পারে বলে তিনি জানিয়েছেন। স্বাস্থ্যকর কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাবারের তালিকায় মসুর ডাল, ওটস ইত্যাদি রয়েছে।
এক্ষেত্রে আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সীমিত অ্যালকোহল সেবন। অনেকে স্ট্রেসের কমানোর জন্য অ্যালকোহল সেবন শুরু করেন।

ছবির উৎস, Getty Images
ডা. স্টোরোনি বলেন, "যদি আপনি সেই সমস্ত মানুষের মধ্যে পড়েন যারা মানসিক চাপে পড়লে অ্যালকোহল পান করে, তাহলে বলব ওই সময় (স্ট্রেসে থাকাকালীন) মদ্যপান থেকে যতটা সম্ভব দূরত্ব বজায় রাখা সবচেয়ে ভালো"।
এই সময় সামাজিক সম্পর্কগুলোর ওপর মননিবেশ করা দরকার বলেই জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
এতে একদিকে যেমন খাওয়ার ক্ষেত্রে ভারসাম্য বজায় থাকে তেমনই স্ট্রেসের সময় অনিয়ন্ত্রিত খাওয়াও এড়ানো যেতে পারে।
"স্ট্রেস এবং খাওয়ার মধ্যে যে যোগ রয়েছে, সেখানে ভারসাম্য বজায় রাখার নিজস্ব উপায় তৈরি করেছে আমাদের সমাজ।
তা সে সবার সঙ্গে বসে খাওয়া-দাওয়া হোক বা একসঙ্গে রান্না করা হোক," বলেছেন রাজিতা সিন্হা।
এই প্রসঙ্গে তিনি কিছু বেসিক প্র্যাকটিসের দিকে মনোনিবেশ করার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
তার কথায়, "কিছু বেসিকের বিষয়ে আবার জোর দেওয়ার সময় এসেছে বলে আমি মনে করি।
যাতে খাবারের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ককে পুনর্নির্মাণ করার পাশাপাশি স্ট্রেস ও খাওয়ার মধ্যেকার এই সম্পর্ক আরো ভালোভাবে বুঝতে এবং নিয়ন্ত্রণ করতে পারি আমরা"।
(বিবিসির 'ফুড চেইন' প্রোগ্রামে প্রফেসর রাজিতা সিন্হা ও ডা . মিঠু স্টোরনির সঙ্গে রুথ আলেকজান্ডারের কথোপকথনের উপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে এই প্রতিবেদনটি)








