মাদকবিরোধী অভিযানে ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন, পুলিশ কি চাইলেই পেটাতে পারে?

    • Author, সজল দাস
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
  • পড়ার সময়: ৬ মিনিট

ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, ধানমন্ডি লেক এবং চাঁদপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পুলিশের অভিযানে মারধর ও আটকের ঘটনা ঘিরে নানা আলোচনা-সমালোচনা চলছে। অভিযানের সময় পুলিশ অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ করেছে কিনা এমন প্রশ্নও সামনে আসছে।

ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পুলিশের মাদকবিরোধী অভিযানের সময় দুইজন সাংবাদিক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও পথচারিদের মারধর করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

এমনকি কয়েকজনকে হাতকড়া পরিয়ে আটক করতেও দেখা গেছে সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একাধিক ভিডিওতে। অবশ্য পরে তাদেরকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

ভুক্তভোগী অনেকের দাবি, কোনো ধরনের অবৈধ কিছু না পেয়েও পুলিশ তাদেরকে মারধর করেছে। যদিও পুলিশ বলছে, অভিযান চালানোর সময় কাজে বাঁধা দেওয়ার কারণেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

মারধরের ঘটনা 'ভুল বোঝাবুঝির' কারণে হয়েছে বলেও দাবি ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ রমনা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মাসুদ আলমের।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মাদক বিরোধী অভিযানের এই ঘটনা ছাড়াও ঢাকাসহ কয়েকটি জেলায় পুলিশের একাধিক অভিযানে তরুণ ও কিশোর বয়সীদের আটকের ঘটনা নিয়ে নানা আলোচনা চলছে।

এসব অভিযানে পুলিশের অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগের বিষয়টি নিয়ে যেমন প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে তেমনি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে, বিশেষ করে ছিনতাই ও মাদকের ব্যবহার কমাতে এর পক্ষেও কথা বলেছেন কেউ কেউ।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এর মধ্য দিয়ে পুলিশের বিরুদ্ধে আইনের অপব্যবহারের যে অভিযোগ সাধারণ মানুষের রয়েছে সেটি আবারও সামনে এসেছে।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশের এমন পদক্ষেপ দরকার হলেও আইনের মধ্যে থেকেই এসব অভিযান পরিচালনা করা উচিৎ বলেও মনে করেন তারা।

এদিকে, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ঘটনায় চার পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

এছাড়া সামাজিক মাধ্যমে প্রচারিত ভিডিওগুলো পর্যালোচনা করে অভিযানের সময় আইনের ব্যত্যয় ঘটলে অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর।

ঘটনা সম্পর্কে যা জানা যাচ্ছে

দেশের বিভিন্ন স্থানে পুলিশের মাদক বিরোধী অভিযান পরিচালিত হলেও ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ঘটনাটি নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে।

এই অভিযানের সময় দুইজন মাল্টিমিডিয়া সাংবাদিক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও পথচারীদের মারধর করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া এ সংক্রান্ত একাধিক ভিডিওতে পুলিশের সঙ্গে কয়েকজনকে তর্কে জড়াতে দেখা যায়। বাকবিতণ্ডার এক পর্যায়ে লাঠিচার্জ করে পুলিশ।

এসময় দুইজনকে হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যেতেও দেখা যায় সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে। যেখানে একজনকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিসেবে পরিচয় দিতে দেখা গেছে।

ওই ভিডিওতে পুলিশের একজন সদস্য দাবি করেন, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মাদক বিরোধী অভিযানের সময় জেরার মুখে পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলা করেন একজন মাদকসেবী। এই ঘটনায় পুলিশের একজন সদস্য আহত হয়েছেন বলেও দাবি করেন তিনি।

অন্য একটি ভিডিওতে, ঢাকা মহানগর পুলিশের রমনা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার বা ডিসি মাসুদ আলমের সাথে একজনকে তর্কে জড়াতে দেখা যায়।

বাকবিতণ্ডার এক পর্যায়ে হঠাৎ এক পুলিশ সদস্য তাকে পেছন থেকে টেনে-হিঁচড়ে মাটিতে ফেলে লাঠি দিয়ে পেটাতে শুরু করেন।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ঘটনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নাঈম উদ্দিন এবং বাংলানিউজের মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার তোফায়েল আহমেদসহ কয়েকজন আহত হয়েছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী নাঈম উদ্দিন জানান, 'বহু ভাষার সন্ধ্যা' নামক একটি অনুষ্ঠান নিয়ে আলোচনা করতেই সহকর্মীদের সঙ্গে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গিয়েছিলেন তিনি।

"আমাদের কাছে অবৈধ কিছু না পেয়েও তর্ক করার অভিযোগ তুলে আমাদের পুলিশ মারধর করে। আমার আরেক বন্ধুকেও তারা পিটিয়েছে," বিবিসি বাংলাকে বলেন মি. উদ্দিন।

এই ঘটনায় আহত তোফায়েল আহমেদ নামে আরেকজন গণমাধ্যমকর্মী অভিযোগ করেন, পুলিশের মাদকবিরোধী অভিযানের সংবাদ সংগ্রহ করতে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গিয়েছিলেন তিনি।

এদিকে পুরো বিষয়টিকে 'ভুল বোঝাবুঝি' বলে দাবি করছেন ওই সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত ডিএমপি রমনা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মাসুদ আলম।

তার দাবি, অভিযানের সময় এক মাদকাসক্তের হামলায় একজন পুলিশ সদস্য আহত হলে এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি হয়। এ সময় ভুল করে কয়েকজন সাংবাদিকের ওপরও মারধরের ঘটনা ঘটে বলে তিনি জানান।

কয়েকজন শিক্ষার্থীকে মারধরের বিষয়ে মি. আলম বলেন, অভিযানের অংশ হিসেবে সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের তল্লাশির এক পর্যায়ে কয়েকজন তর্কে জড়ান এবং তল্লাশি চালাতে বাঁধা দেন।

পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে তিনি নিজে হস্তক্ষেপ করে পুলিশ সদস্যদের থামিয়েছেন বলেও দাবি করেন পুলিশের এই কর্মকর্তা।

মি. আলম বিবিসি বাংলাকে বলেন, "আমাদের দুই তিনজন সদস্য আলোচনার মধ্যে পেছন থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই শিক্ষার্থীকে মারধর করে, এই ঘটনাটা অনাকাঙ্ক্ষিত। যারা এটা করেছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে।"

সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ছাড়াও গত রবিবার ও সোমবার ঢাকার ধানমণ্ডি লেক এবং চাঁদপুর শহরের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে বেশ কয়েকজন তরুণ ও কিশোরকে আটক করেছে পুলিশ। তাদেরকে মারধর করা, কানে ধরিয়ে উঠবস করানো বা মুচলেকা নিয়ে ছাড়ার অভিযোগ উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধে।

এসব ঘটনায় আটককৃতদের বিরুদ্ধে মাদকসেবী কিংবা কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য এমন নানা অভিযোগ আনা হয়েছে পুলিশের তরফ থেকে।

পুলিশ বলছে, নির্দিষ্ট তথ্য ও অভিযোগের প্রেক্ষিতেই এসব অভিযান চালানো হয়েছে। গভীর রাতে এসব এলাকায় কম বয়সী কিছু কিশোর এবং তরুণ নিয়মিত মাদকের ব্যবহার করছিল বলেও দাবি তাদের।

কিন্তু এভাবে কোনো অভিযান চালাতে গিয়ে মারধর করা বা কানে ধরে উঠবস করানো বা অপমান করার ক্ষমতা পুলিশের আছে কিনা, সামাজিক মাধ্যমে অনেকে সেই প্রশ্ন তুলেছেন।

পুলিশ কতটা শক্তি প্রয়োগ করতে পারে?

পুলিশের বিরুদ্ধে আইনের ব্যত্যয় ঘটানো কিংবা অতিরিক্ত বল প্রয়োগের অভিযোগ নতুন নয়। জনবান্ধব পুলিশিংয়ের কথা বলা হলেও বাহিনীর অনেকে সদস্যের কর্মকাণ্ডে নানা সময় প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে এই বাহিনী।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সিআরপিসি, পেনাল কোড, পিআরবি এবং সংবিধান এসব আইনগত কাঠামো পুলিশের কাজের ধরন ও মাত্রা নির্ধারণ করে দেয়। যেখানে পুলিশ কোন পরিস্থিতিতে কি অ্যাকশন নিবে সে সম্পর্কেও বলা আছে।

সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরশেদ বলছেন, পুলিশ কী করতে পারবে, কী পারবে না এগুলো আইনগত কাঠামোয় স্পষ্টভাবে বিধিবদ্ধ। বলপ্রয়োগ হতে হবে প্রয়োজনীয়, সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং যথাসম্ভব সীমিত।

এছাড়া পুলিশের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে বলেও মনে করেন তিনি। পরিস্থিতি অনুযায়ী পুলিশের শক্তি প্রয়োগের যথার্থতা জরুরি।

আন্তর্জাতিক মানদণ্ড, বিশেষ করে জাতিসংঘের বেসিক প্রিনসিপলস বলছে, শক্তির প্রয়োগ হবে 'অ্যাবসোলুটলি নেসেসারি' এমন পরিস্থিতিতে। অর্থাৎ যেখানে অন্য কোনো উপায় নেই।

মি. মোরশেদ বলছেন, "পরিস্থিতি অনুযায়ী পুলিশের সিদ্ধান্ত ভিন্ন হতে পারে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের পরিস্থিতি অনেক দিন ধরেই ভালো নয়। মাদকের আখড়ায় পরিণত হয়েছে ওই এলাকাটি।"

উদ্ভুত পরিস্থিতি পুলিশের ভূমিকাকে বৈধতা দেয় কিনা সেটা দেখা প্রয়োজন বলেও মনে করেন তিনি। পুলিশ কেন আঘাত করেছে সেটি তদন্ত ছাড়া বলা কঠিন, কারণ দুই পক্ষই যার যার মতো করে ব্যাখ্যা দিচ্ছে।

"অতিরিক্ত কেউ কিছু করলে, পুলিশ হলে তাকেও আইনের আওতায় আসতে হবে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে অনেকের মধ্যে আইন ভাঙার একটা প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, সেটাও ঠিক নয়," বলে মনে করেন মি. মোরশেদ।

অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের নিয়মিত অভিযান এবং টহলের প্রয়োজন রয়েছে তবে এগুলো করতে গিয়ে পুলিশ মারমুখি হচ্ছে, এটি গ্রহণযোগ্য নয় বলেই মনে করে সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ তৌহিদুল হক।

তিনি বলছেন, অতীতে পুলিশের অনেকে যেভাবে মারমুখি হয়ে এমন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতেন তেমন একটি চেষ্টা অনেকের মধ্যে দেখা যাচ্ছে।

"সরকার আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার কথা বলছে কিন্তু মাঠপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা ভিন্ন," বলেন মি. হক।

প্রশিক্ষিত বাহিনী হিসেবে পুলিশকে যেমন আইন ও বিধানের মধ্যে থেকে কাজ করতে হবে তেমনি পুলিশের কাজে বাঁধা সৃষ্টি করা কিংবা তাদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণও গ্রহণযোগ্য নয় বলে তিনি মনে করেন।