আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
সাঈদীর মরদেহ ঢাকা থেকে পিরোজপুর নিয়ে যাওয়াকে কেন্দ্র করে যা ঘটেছে
মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত ও জামায়াতে ইসলামীর নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মরদেহ ঢাকা থেকে পিরোজপুর নেয়াকে কেন্দ্র করে তুলকালাম কাণ্ড ঘটেছে। ঢাকার বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় চত্তর ও শাহবাগ এলাকায় সোমবার রাত থেকে শুরু করে মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত নানা উত্তেজনা চলেছে। এ পর্যায়ে পুলিশ শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে জামায়াত ইসলামী ও দেলোয়ার হোসাইন সাঈদীর সমর্থকদের সরিয়ে দেয়।
সোমবার ভোররাতে ঢাকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতাল থেকে সাইদীর মরদেহ বের করার সময় এই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
পরে কয়েকদফা সংঘর্ষের পর ভোরে পুলিশ মি. সাইদীর মরদেহ নিয়ে পিরোজপুরে রওয়ানা দেয়। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে লাশবাহী গাড়িতে করে পিরোজপুরের ইঁদুরকানীতে মি. সাইদীর প্রতিষ্ঠান সাইদী ফাউন্ডেশনে তার মরদেহ নেয়া হয়।
আরো পড়তে পারেন
ঢাকায় জানাযার অনুমতি মেলেনি
সোমবার ভোররাতে পুলিশের লাশবাহী গাড়িতে করে মি. সাইদীর মরদেহ বের করে নেয়ার সময় জামায়াত সমর্থকরা গাড়ি আটকালে পুলিশের সাথে সমর্থকদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
সোমবার রাতে দেলাওয়ার হোসেন সাইদীর মৃত্যুর খবর প্রকাশিত হওয়ার আগে থেকেই শাহাবাগের বিএসএমএমইউ হাসপাতালের বাইরে জামায়াতে ইসলামীর শতশত সমর্থক জড়ো হতে থাকেন।
রাত পৌনে নয়টার দিকে তার মৃত্যুর খবর জানা যাওয়ার পর বিএসএমএমইউ প্রাঙ্গনে আরো জামায়াত সমর্থক জড়ো হন।
সে সময় মি. সাইদীর ছেলে মাসুদ সাইদী উপস্থিত হওয়া সমর্থকদের শান্ত থাকতে এবং আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সহায়তা করার অনুরোধ করেন।
সাংবাদিকদের সাথে কথা বলার সময় দেলাওয়ার হোসেন সাইদীর ছেলে মাসুদ সাইদী জানান যে প্রশাসনের কিছু বাধ্যবাধকতা থাকায় ঢাকায় জানাজা করতে অনুমতি দেয়া হয়নি।
তিনি বলেন, “প্রশাসন জানাজা করার জন্য অনুমতি দেয়নি। যদিও সমর্থকদের দাবি ছিল ঢাকায় একটি জানাজা করার।”
এরপর ভোর তিনটার সময় মি. সাইদীর মরদেহ বহনকারী লাশবাহী গাড়ি হাসপাতাল থেকে বের হতে চেষ্টা করলে উপস্থিত থাকা সমর্থকরা বাধা দেন।
সমর্থকরা দাবি করেন মি. সাইদীর জানাজা ঢাকায় আয়োজন করতে দিতে হবে। সে সময় পুলিশ উপস্থিত জামায়াত সমর্থকদের বুঝিয়ে লাশবাহী গাড়িটি বের করার চেষ্টা করে বলে জানায় ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকা ব্যক্তিরা।
সংঘর্ষের সূত্রপাত
ঘটনাস্থলে উপস্থিত একটি টেলিভিশন চ্যানেলের সাংবাদিক বিবিসি বাংলাকে, পুলিশের সাথে কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে জামায়াত সমর্থকরা মি. সাইদীকে বহন করা গাড়ির কাঁচ ভেঙে দেয় ও চাকা নষ্ট করে দেয়।
পরে ভোর ৫টার দিকে পুলিশ হাসপাতাল প্রাঙ্গনে ক্ষতিগ্রস্ত লাশবাহী গাড়িটি রেখেই ঘটনাস্থল ছেড়ে চলে যায়। তখনও হাসপাতাল প্রাঙ্গনে ও রাস্তার দুইপাশে হাজার হাজার জামায়াত সমর্থক উপস্থিত ছিল।
এর কিছুক্ষণ পরেই পুলিশ হাসপাতালের বাইরে থেকে হাসপাতাল প্রাঙ্গনে টিয়ারগ্যাস ও রাবার বুলেট ছোড়ে। হাসপাতালের ভেতরে থাকা জামায়াত সমর্থকরা ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলে পুলিশ ক্ষতিগ্রস্ত অ্যাম্বুলেন্সটি বাইরে নিয়ে আসে ও আরেকটি অ্যাম্বুলেন্সে মি. সাইদীর মরদেহ স্থানান্তর করে।
সে সময় ছত্রভঙ্গ জামায়াত সমর্থকরা হাসপাতালের বাইরে ইট-পাটকেল ছুঁড়ে কয়েকটি গাড়ি ভাঙচুর করে এবং রাস্তায় থাকা কয়েকটি মোটর সাইকেলে আগুন দেয়।
ভোর ৬টার দিকে পুলিশি পাহারায় পিরোজপুরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে অ্যাম্বুলন্সেটি।
পুলিশের বক্তব্য
মি. সাইদীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে জামায়াতের সমর্থকদের সাথে পুলিশের সংঘর্ষের বিষয়ের ব্যাখ্যা দিয়ে মঙ্গলবার সকালে ঢাকা মেট্রোপলিটান পুলিশের কমিশনার খন্দকার গোলাম ফারুক একটি সংবাদ সম্মেলন করেন।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান যে হাসপাতালের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ার পর রাতেই মি. সাইদীর জানাজার নামাজ পড়ার অনুমতি দেয় পুলিশ।
“আমরা জানাই যে আগামীকাল (১৫ই অগাস্ট) শোক দিবসের অনুষ্ঠানে আমাদের কর্মকর্তারা ব্যস্ত থাকবে, আপনারা এখানে জানাজা পড়তে পারেন এবং তারপর মরদেহ নিয়ে যেতে পারেন।”
পরে ‘এত রাতে জানাজা পড়ানো হবে না’ বলে রাত ২টার পর তারা জানাজার পরিবর্তে মোনাজাত করে এবং ‘পরে গায়েবি জানাজা পড়া হবে’ বলে সিদ্ধান্ত নেয় বলে জানান মি. ফারুক।
“এরপর লাশ যখন বের করা হয় নিয়ে যাওয়ার জন্য, তখন হাজার হাজার নেতাকর্মী লাশবাহী গাড়ির সামনে শুয়ে পড়ে। তারা লাশ পিরোজপুর নিয়ে যেতে দেবে না।”
এরপর তারা পুলিশের ওপর হামলা করে এবং পুলিশের গাড়ি ভাঙচুর করে বলে দাবি করেন তিনি। তাদের হামলায় কয়েকজন সিনিয়র পুলিশ কর্মকর্তা আহতও হন বলে জানান তারা।
মি. ফারুক জানান ফজরের নামাজের পর তাদের ‘আবারও জানাজার অনুমতি’ দেয়া হয়। কিন্তু সেসময় তারা বিএসএমএমইউ থেকে ‘পুলিশকে বের করে দিয়ে হাসপাতালের দখর নিয়ে নেয়’ এবং ‘দেশের সব জামায়াত কর্মী ও দেলাওয়ার হোসেন সমর্থকদের শাহাবাগে আসার’ জন্য ফেসবুকে প্রচারণা শুরু করে।
“তখন আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কায় আমরা বাধ্য হয়ে অত্যন্ত সীমিত আকারে তাদের ওপর শক্তি প্রয়োগ করি ও কিছু টিয়ারগ্যাস নিক্ষেপ করি। পরে সেই লাশ আমরা পিরোজপুর পাঠানোর ব্যবস্থা করি। তাদরেকে আগামীকাল গায়েবি জানাজার অনুমতি দেয়া হবে না”, বলছিলেন ডিএমপি কমিশনার।
পিরোজপুরে সাইদী ফাউন্ডেশনের চিত্র
দেলাওয়ার হোসেন সাইদীর মরদেহ আনার খবর ছড়িয়ে পড়লে ভোর থেকেই পিরোজপুরের ইদুরকানীর সাইদী ফাউন্ডেশনের মাঠে হাজার হাজার স্থানীয় মানুষ জড়ো হতে থাকে।
সেখানকার স্থানীয় সাংবাদিক মনিরুজ্জামান খান বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন যে ভোর থেকেই সাঈদী ফাউন্ডেশনের প্রাঙ্গনে জড়ো হতে থাকে মানুষ। এলাকার মানুষ ছাড়াও বেশ কিছুটা দূরের বরিশাল, পটুয়াখালী জেলা থেকেও মানুষ আসছেন বলে জানান তিনি।
জনসমাগমকে ঘিরে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতি ও টহলের কার্যক্রম ছিল বলে জানান তিনি।
সকাল দশটার কিছুক্ষণ পর মরদেহ বহন করা গাড়িটি এসে পৌঁছানোর কিছুক্ষণ পর উপস্থিত মানুষের একাংশ একদফা মিছিল করার চেষ্টা করেন। পরে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নির্দেশে মিছিল স্থগিত করেন তারা।
দুপুর দুইটায় সাইদী ফাউন্ডেশনের মাঠে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হবে বলে জানা গেছে।
বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শোক
মি. সাইদীর মৃত্যুতে বিএনপি সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল শোক প্রকাশ করে বিবৃতি দিয়েছে।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এক বিবৃতিতে অভিযোগ করেন, ’১৩ বছর বন্দী অবস্থায় থাকলেও তাকে কোনো সুচিকিৎসা দেয়া হয়নি।’
জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশও তাদের সাবেক নায়েবে আমিরের আত্মার শান্তি কামনা করে ও তার শোকসন্তপ্ত আত্মীয়-পরিবারবর্গের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে শোকবার্তা প্রকাশ করেছে।
বাংলাদেশ ইসলামী আন্দোলন ও ১২ দলীয় জোটের নেতারাও শোক বার্তা প্রকাশ করে মি. সাইদীর মৃত্যুকে ঘিরে।