স্পেনে দ্রুতগতির দু'টি ট্রেনের মুখোমুখি সংঘর্ষ, নিহত অন্তত ২১ জন

স্পেনের দক্ষিণাঞ্চলে দ্রুতগতির দু'টি ট্রেনের সংঘর্ষে অন্তত ২১ জন নিহত হয়েছেন। কর্তৃপক্ষ আশঙ্কা করছে, মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।

দেশটির পরিবহনমন্ত্রী অস্কার পুয়েন্তে জানিয়েছেন, ৩০ জনের বেশি মানুষ গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন।

রেল নেটওয়ার্ক পরিচালনাকারী সংস্থা আদিফ জানায়, মালাগা থেকে মাদ্রিদগামী একটি দ্রুতগতির ট্রেন কর্ডোবা শহরের কাছে আদামুজ নামের একটি এলাকার পাশে লাইনচ্যুত হয়।

ট্রেনটি লাইনচ্যুত হয়ে পাশের আরেকটি লাইনে ঢুকে পড়ে এবং সেখানে মাদ্রিদ থেকে হুয়েলভাগামী আরেকটি ট্রেনের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়।

আন্দালুসিয়ার জরুরি সেবা সংস্থা জানিয়েছে, এই দুর্ঘটনায় অন্তত ৭৩ জন আহত হয়েছেন।

স্পেনের পরিবহনমন্ত্রী পুয়েন্তে বলেন, ঘটনাটি "খুবই অস্বাভাবিক", কারণ ট্রেনটি সোজা লাইনে লাইনচ্যুত হয়েছে। ওই রেললাইনটি গত বছরের মে মাসে নতুন করে সংস্কার করা হয়েছিলো।

দুর্ঘটনার সঠিক কারণ এখনো জানা যায়নি। তদন্ত শেষ হতে অন্তত এক মাস সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ বলেছেন, দেশটি এক "গভীর শোকের এক রাত" পার করছে। মালাগা থেকে যাত্রা করা ট্রেনটি পরিচালনা করছিল বেসরকারি রেল কোম্পানি ইরিও।

ইরিও জানিয়েছে, ওই ট্রেনে প্রায় ৩০০ জন যাত্রী ছিলেন। আর রাষ্ট্রায়ত্ত রেল কোম্পানি রেনফে পরিচালিত অন্য ট্রেনটিতে ছিলো প্রায় ১০০ জন যাত্রী।

আদামুজের মেয়র রাফায়েল মোরেনো দুর্ঘটনার পর প্রথম দিকে ঘটনাস্থলে পৌঁছান। তিনি বলেন, দৃশ্যটি ছিল "একটি দুঃস্বপ্নের মতো"।

আন্দালুসিয়ার জরুরি সংস্থা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (আগের টুইটার) একটি পোস্টে দুর্ঘটনায় বেঁচে যাওয়া যাত্রীদের অনুরোধ করেছেন, তারা যেন সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট দিয়ে জানায় যে তারা নিরাপদ ও জীবিত আছেন।

উদ্ধারকর্মীরা জানান, ট্রেনের দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া অংশের কারণে জীবিত মানুষ ও মরদেহ উদ্ধার করা খুবই কঠিন হয়ে পড়েছে।

কর্ডোবার ফায়ার সার্ভিস প্রধান ফ্রান্সিসকো কারমোনা দেশটির রাষ্ট্রীয় টিভি আরটিভিইকে বলেন, "কাউকে জীবিত উদ্ধার করতে গিয়ে আমাদেরকে আগে একজন মৃত ব্যক্তিকে সরাতে হয়েছে। কাজটি খুবই কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ।"

আদিফের তথ্য অ্নুযায়ী, মালাগা থেকে স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টা ৪০ মিনিটে ট্রেনটি ছেড়ে যাওয়ার প্রায় ১০ মিনিট পর দুর্ঘটনাটি ঘটে।

নিহত ও আহতদের স্বজনদের জন্য মাদ্রিদের আতোচা, সেভিল, কর্ডোবা, মালাগা ও হুয়েলভা স্টেশনে বিশেষ ব্যবস্থা করা হয়েছে।

দুর্ঘটনার পর মাদ্রিদ ও আন্দালুসিয়ার মধ্যে সব ট্রেন চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে, যা সোমবার পর্যন্ত বন্ধ থাকবে। ক্ষতিগ্রস্ত যাত্রীদের জন্য স্টেশনগুলো খোলা থাকবে।

ইটালির রেল কোম্পানি ফেরোভিয়ে দেল্লো স্তাতোর একজন মুখপাত্র রয়টার্সকে জানিয়েছেন, দুর্ঘটনার শিকার ট্রেনটি ছিল ফ্রেচিয়া ১০০০ মডেলের, যা ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৪০০ কিলোমিটার গতিতে চলতে পারে।

ঘটনাস্থলে স্প্যানিশ রেড ক্রস জরুরি সহায়তা ও উদ্ধার কাজে অংশ নিচ্ছে। পাশাপাশি দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য কাউন্সেলিং-এর ব্যবস্থাও করা হয়েছে।

রেড ক্রসের কর্মকর্তা মিগেল আংহেল রদ্রিগ্রেজ আরএনই রেডিওকে বলেন, "তথ্যের অভাবে পরিবারগুলো প্রচণ্ড উদ্বেগের মধ্যে আছে। এই সময়টা খুবই কষ্টের।"

আরটিভিই'র সাংবাদিক সালভাদোর জিমিনেস দুর্ঘটনাকবলিত একটি ট্রেনে ছিলেন।

তিনি বলেন, ধাক্কাটা ছিল ভূমিকম্পের মতো। "আমি প্রথম বগিতে ছিলাম। হঠাৎ মনে হলো যেন ভূমিকম্প হচ্ছে, আর এরপরই ট্রেনটি লাইনচ্যুত হয়ে যায়।"

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে জিমিনেস জানান, তীব্র ঠাণ্ডার মাঝে যেসব যাত্রীরা বাসের জন্য দাঁড়িয়ে ছিলেন, তাদের মাঝে তিনিও ছিলেন।

স্পেনের রাজা ফেলিপে ষষ্ঠ ও রানি লেতিসিয়া এই দুর্ঘটনার খবরে গভীর উদ্বেগ জানিয়েছেন।

রাজপ্রাসাদের পক্ষ থেকে এক্সে বলা হয়েছে, "নিহতদের পরিবার ও স্বজনদের প্রতি আমরা গভীর সমবেদনা জানাই। আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করছি।"

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রঁ ও ইউরোপীয় কমিশনের প্রধান উরসুলা ভন ডার লিয়েনও এই দুর্ঘটনায় শোক প্রকাশ করেছেন।

এমানুয়েল ম্যাক্রঁ বলেন, "নিহতদের পরিবার ও পুরো স্পেনের মানুষের পাশে আছি।"

এর আগে ২০১৩ সালে স্পেনের গালিসিয়া অঞ্চলে দেশটির সবচেয়ে ভয়াবহ রাষ্ট্রায়ত্ত দ্রুতগতির ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটে। সে সময় ৮০ জন নিহত ও ১৪০ জন আহত হন।