চিকিৎসক শাহীন সাঈদ সম্পর্কে কী বলছেন তার বাবা এবং সাবেক স্বামী

    • Author, সৈয়দ মুজিজ ইমাম
    • Role, বিবিসি সংবাদদাতা, লক্ষ্ণৌ থেকে

পুলিশ হরিয়ানার ফরিদাবাদস্থিত আল-ফালাহ মেডিক্যাল ইউনিভার্সিটির দুই চিকিৎসককে গ্রেপ্তার করেছে। তারা হলেন কাশ্মীরের ডা. মুজাম্মিল শাকিল এবং লক্ষ্ণৌয়ের ডা. শাহীন সাঈদ।

ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. ভূপিন্দর কৌর আনন্দ ১২ই নভেম্বর এই প্রসঙ্গে একটি বিবৃতিতে উল্লেখ করেছেন যে, "আমরা জানতে পেরেছি যে তদন্তকারী সংস্থাগুলি আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের দু'জন চিকিৎসককে নিজেদের হেফাজতে নিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে তাদের শুধুমাত্র কাজের বিষয়ে যোগাযোগ ছিল। এই তদন্তে আমরা সম্পূর্ণরূপে সহযোগিতা করছি।"

জম্মু ও কাশ্মীর, হরিয়ানা ও উত্তরপ্রদেশের পুলিশের তরফে এই যৌথ অভিযান চালানো হয়েছিল। ফরিদাবাদ পুলিশের দাবি, ডা. মুজাম্মিল শাকিলের কাছ থেকে 'আপত্তিকর উপাদান' উদ্ধার করা হয়েছে। তাকে গত ৩০শে অক্টোবর গ্রেপ্তার করা হয়।

গত, দশই নভেম্বর সন্ধ্যায় দিল্লির লাল কেল্লার কাছে হওয়া বিস্ফোরণের সঙ্গে এর যোগ রয়েছে কি না তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।

ফরিদাবাদের পুলিশ কমিশনার সত্যেন্দ্র গুপ্তা সাংবাদিকদের বলেছেন, "মুজাম্মিল আল-ফালাহ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন। তার কাছ থেকে একটি কির্নিকভ রাইফেল, একটি পিস্তল এবং একটি টাইমার উদ্ধার করা হয়েছে। তার কাছ থেকে ৩৬০ কেজি দাহ্য পদার্থও উদ্ধার করা হয়েছে, তবে এটি আরডিএক্স নয়।"

ফরিদাবাদ পুলিশ সূত্রে খবর, তল্লাশি অভিযানের সময় একটি গাড়ি উদ্ধার করা হয় যা শাহীন সাঈদের নামে নথিভুক্ত করা ছিল। এরপর তাকেও গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

ফরিদাবাদের পুলিশ কমিশনারের জনসংযোগ কর্মকর্তা যশপাল বিবিসিকে ডা. শাহীন সাঈদকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।

'বিশ্বাসই করতে পারছি না'

বছর ৪৬-এর শাহীন সাঈদ আদপে লক্ষ্ণৌয়ের বাসিন্দা। তার জন্ম এবং বেড়ে ওঠাও লক্ষ্ণৌতেই। এখান থেকে তিনি প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেছেন।

তার পরিবার লক্ষ্ণৌয়ের জেসি বোস ওয়ার্ডে থাকে। লালবাগ সংলগ্ন একটি গলিতে বাবা সাঈদ আহমেদের বাড়ি। তিনি একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী। লালবাগ নামক এলাকাটি উত্তরপ্রদেশের বিধানসভা থেকে মাত্র এক কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এই এলাকা হজরতগঞ্জ সংলগ্ন।

শাহীন সাঈদকে পুলিশি হেফাজতে নেওয়ার খবর প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই অঞ্চলে নীরবতা বিরাজ করছে। বাড়ির আশপাশে বসবাসকারী পরিবারগুলির কেউই কথা বলতে চাইছিলেন না।

তবে ডা. সাঈদের বাড়ির বাইরে অবশ্য সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদের ভিড় রয়েছে। বাড়িতে পুলিশ পাহারা বসানো হয়েছে তাই পুলিশকর্মীদের উপস্থিতিও লক্ষণীয়।

তার বাবার সঙ্গে কথা বলেছে বিবিসি। মেয়ের বিষয়ে ওঠা অভিযোগ তিনি বিশ্বাস করতে পারছেন না তিনি।

বাবা সাঈদ আহমেদ বলেছেন, "ছোটবেলা থেকে ও খুবই মেধাবী ছাত্রী ছিল। এলাহাবাদ (বর্তমানে প্রয়াগরাজ) থেকে এমবিবিএস পাশ করেছে। পরে ফার্মাকোলজিতে স্পেশালাইজেশন করে।"

শাহীন সাঈদ স্থানীয় সরকারি স্কুল থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরের পড়াশোনা করেছেন। দশম ও দ্বাদশ শ্রেণিতে পরীক্ষায় ভালো নাম্বার পেয়ে উত্তীর্ণ হন। এরপর মেডিকেলের প্রবেশিকা পরীক্ষাতেও উত্তীর্ণ হন। শুরু হয় তার চিকিৎসক হওয়ার যাত্রা।

তার বাবা বলেন, "ওর গ্রেপ্তারের বিষয়ে আমি জানতে পেরেছি সংবাদমাধ্যম থেকে। আমার বিশ্বাস হচ্ছে না যে ও কোনোরকম বেআইনি কাজের সঙ্গে জড়িত।"

সাঈদ আহমেদের তিনজন সন্তান। তিনি বলেন, "আমার বড় ছেলে মোহাম্মদ শোয়েব, মেয়ে শাহীন সাঈদ আর ছোট ছেলে পারভেজ আনসারি। শাহীনের সঙ্গে শেষবার কথা বলেছিলাম প্রায় এক মাস আগে। ও কখনো সন্দেহভাজন কারো নাম উল্লেখ করেনি।"

পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হওয়া অপর এক চিকিৎসক ডা. মুজাম্মিল শাকিল, যিনি কাশ্মীরের বাসিন্দা তার সম্পর্কেও ডা. শাহীন সাঈদ কোনোদিন কিছু বলেননি বলেই জানিয়েছেন তিনি।

মি. আহমেদের কথায়, "কথোপকথনের সময় ও কোনও কাশ্মীরির কথা বলেনি। কী করছে, কেমন আছে মূলত এই সমস্ত বিষয়েই কথা হতো আমাদের। ওর কাজ নিয়ে খুব কমই কথা হয়েছে।"

শাহীন সাঈদের বড় ভাই শোয়েব সাঈদও তার বোনের বিষয়ে ওঠা অভিযোগ বিশ্বাস করতে নারাজ। তিনি বলেছেন, "আমাদের পরিবার এমন নয়। যা বলা হচ্ছে একেবারেই তেমনটা নয়। আমার বোন পড়াশোনায় খুব মেধাবী ছিল। আমি বিশ্বাস করতে পারছি না যে ওর বিষয়ে যা বলা হচ্ছে সেটা সত্যি।"

তবে তিনি জানিয়েছেন, প্রায় চার বছর ধরে বোনের সঙ্গে তার দেখা হয়নি। তবে এর পিছনে পারিবারিক কারণ ছিল বলেই দাবি করেছেন শোয়েব সাঈদ। তিনি বলেন, "পারিবারিক কারণেই এমন হয়েছে। এই দূরত্বের পিছনে অন্য কোনো কারণ ছিল না।"

এদিকে জম্মু ও কাশ্মীর পুলিশ এবং উত্তরপ্রদেশের এটিএস (অ্যান্টি টেররিজম স্কোয়াড) শাহীন সাঈদের ছোট ভাই পারভেজ আনসারিকেও জিজ্ঞাসাবাদ করছে। তিনিও পেশায় একজন চিকিৎসক।

সাহারানপুরে পারভেজ আনসারির একটা ক্লিনিক রয়েছে। লক্ষ্ণৌয়ের মারিয়াঁওর কাছে তার একটি বাড়িও রয়েছে। পুলিশ মঙ্গলবার দুই জায়গাতেই তল্লাশি চালিয়েছে।

বৈবাহিক জীবন

জাফর হায়াত নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে ২০০৩ সালে শাহীন সাঈদের বিয়ে হয়েছিল। পেশায় চিকিৎসক জাফর হায়াত একজন চক্ষু বিশেষজ্ঞ। কিন্তু ২০১৩ সালে তাদের বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে যায়।

ওই চিকিৎসক বলেছেন, "২০১২-১৩ সালে আমাদের ডিভোর্স হয়। তারপর থেকে ওর (শাহীন সাঈদের) সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নেই। আমাদের দু'জন সন্তান।"

"ডিভোর্সের সময় তাদের বয়স ছিল সাত বছর এবং চার বছর। দুই সন্তানই এখন আমার সঙ্গে আছে।"

শাহীন সাঈদের সঙ্গে তার সম্পর্কের তেমন কোনো সমস্যা ছিল না বলেই জানিয়েছেন ডা. হায়াত। তার কথায়, "আমাদের মধ্যে তেমন কোনো উত্তেজনা ছিল না। ও শুধু অস্ট্রেলিয়া বা ইউরোপে যেতে চেয়েছিল। সে সময় শাহীন কিছু (কাজের) অফার পেয়েছিল। কিন্তু আমি বলেছিলাম আমরা এখানেই থাকি।"

পড়শিরা যা বললেন

লক্ষ্ণৌয়ের যে এলেকায় ডা. সাঈদের বাড়ি, সেখান থেকে কিছুটা দূরে বাস করেন ইকতেদার হুসেন। তার কথায়। "এই পরিবারটি খুবই ভদ্র। সাঈদ সাহেব ও তার ছেলে শোয়েব দুজনেই খুব ভালো স্বভাবের মানুষ। কিন্তু এইসব কথা শুনে আমি অবাক হয়েছি।"

মি. হুসেন জানিয়েছেন দশ বছর ধরে ওই অঞ্চলে বাস করছেন তিনি। শাহীন সাঈদ সম্পর্কে তার বিশেষ কিছু জানা নেই।

ওই এলাকারই বাসিন্দা রাজিয়া বানু। তিনি অবশ্য শাহীন সাঈদকে চেনেন। গত ৪০ বছর ধরে ওই এলাকার বাসিন্দা তার বাড়ির সামনে বসেই কথা বলছিলেন।

রাজিয়া বানু বলেছেন, "আমি ছোটবেলায় শাহীনকে দেখেছি। পরে শুনলাম যে ও ডাক্তার হয়েছে। এরপর ওর সঙ্গে আর দেখা হয়নি।"

প্রতিবেশীদের কেউই ওই পরিবারের নেতিবাচক মত পোষণ করেন না। প্রতিবেশী অমিত তিওয়ারি বলেছেন, "এই পরিবারের সঙ্গে অন্যদের মেলামেশা কম, কিন্তু সবাই তাদের চেনে। শাহীন অনেক বছর ধরেই এখানে থাকে না।"

'হঠাৎ কলেজে আসা বন্ধ করে দেন'

ডা. সাঈদ ২০০৬ সালে কানপুরের গণেশ শঙ্কর বিদ্যার্থী মেমোরিয়াল (জিএসভিএম) মেডিক্যাল কলেজের ফার্মাকোলজি বিভাগে সহকারী অধ্যাপক হিসাবে যোগ দেন।

উত্তরপ্রদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর তার এই পদে নিয়োগ হয়েছিল। উত্তর প্রদেশের এটিএস-এর একটি দল মঙ্গলবার কানপুরে তদন্তের জন্য গিয়েছিল।

কলেজের রেকর্ড অনুযায়ী, ২০০৯ সালে তাকে ছয় মাসের জন্য কনৌজ মেডিকেল কলেজে স্থানান্তরিত করা হয়েছিল। এরপর ২০১০ সালে তিনি আবার জিএসভিএম কলেজে ফিরে আসেন।

ফার্মাকোলজি বিভাগের বীরেন্দ্র কুশওয়াহা বার্তা সংস্থা এএনআইকে জানিয়েছেন শাহীন সাঈদের গ্রেপ্তারের ঘটনায় তিনি অবাক হয়েছেন।

"আমি তাকে একজন সহকর্মী হিসাবে চিনি। এটি প্রায় ১৩-১৪ বছর আগের কথা," বলেছেন তিনি।

কলেজ প্রশাসন বিবিসিকে জানিয়েছে, ২০১৩ সালে অনুমতি ছাড়াই কলেজে আসা বন্ধ করে দিয়েছিলেন ডা. সাঈদ।

কলেজ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, "তার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনও সাড়া মেলেনি। প্রায় আট বছর পরে, ২০২১ সালে রাজ্য সরকার তার চাকরি খারিজ করে দেয়।"

কানপুর মেডিকেল কলেজে শাহীন সাঈদের সাবেক সহকর্মীরা জানিয়েছেন ২০১৩ সালের পর থেকে তার সঙ্গে তাদের যোগাযোগ হয়নি।

শাহীন সাঈদের এক সাবেক সহকর্মী বিবিসিকে বলেন, "হঠাৎই কলেজে আসা বন্ধ করে দেন তিনি। কেউ জানত না উনি কোথায় গেছেন। পরে খবর পাই যে হরিয়ানায় শিক্ষকতা করছেন।"