গবাদি পশুর মাংস বিক্রি নিয়ে কী নির্দেশ দিল পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি সরকার?

ছবির উৎস, ANI
- Author, প্রত্যুষ রায়
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, দিল্লি
- Published
- পড়ার সময়: ৬ মিনিট
গরু, মোষ সহ গবাদি পশু জবাই করে কাটা ও মাংস বিক্রি করা নিয়ে পুরোনো একটি আইন নতুন করে বলবৎ করার নির্দেশ দিয়েছে পশ্চিমবঙ্গের সরকার।
প্রকাশ্যে গবাদি পশুর মাংস কাটা ও বিক্রিতে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ১৯৫০ সালের প্রাণীসম্পদ আইন অনুযায়ী কিছু নিয়ম কানুন বলবৎ করেছেন। এই নির্দেশ অনুযায়ী সরকারি কর্মকর্তার অনুমোদন ছাড়া গবাদি পশু হত্যা করা যাবে না।
এর ফলে পশ্চিমবঙ্গের কিছু গবাদি পশুজাত মাংস ব্যবসায়ী তাদের ব্যবসায় প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন। কোরবানির ঈদের আগে এই নির্দেশ আসায় গবাদি পশুর বাজারে প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন কেউ কেউ ।
এই নির্দেশ ছাড়া আরও এমন কিছু নির্দেশ দিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার, যেগুলি নিয়ে বিতর্ক বেঁধেছে।

ছবির উৎস, Sudipta Das/NurPhoto via Getty Images
মাংস বিক্রি নিয়ে নতুন নির্দেশিকায় কী আছে?
ভারতে পশ্চিমবঙ্গ হলো এমন একটি রাজ্য, যেখানে গোমাংস বিক্রি ও খাওয়ার উপর কোনও নিষেধাজ্ঞা নেই। রেস্তোরাঁয় বিভিন্ন পদ যেমন মেলে, তেমনই বাজার থেকেও কিনে আনা যায় গোমাংস, যা উত্তর ভারতের একাধিক রাজ্যে স্বাভাবিক চিত্র নয়।
তবে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ক্যাবিনেটের তরফে যে নির্দেশিকাগুলি জারি করা হয়েছে, সেগুলি নতুন নয়, ১৯৫০ সালের প্রাণীসম্পদ সুরক্ষা আইনটিকেই তিনি বলবৎ করতে জোর দিয়েছেন।
বিজেপির তরফ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, "পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেস সরকার থাকার সময়ে এই আইনটি কঠোরভাবে বলবৎ করতে সরকার গরিমসি করেছে।"
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
এই আইনটিতে বলা হয়েছে, ১৪ বছরের নিচে বয়স এমন গবাদি পশুকে বলি দেওয়া যাবে না। পশুর মাংস কাটার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট স্থানীয় কর্তৃপক্ষ বা পশ্চিমবঙ্গের প্রাণীসম্পদ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের লিখিত অনুমতি প্রয়োজন।
এই আইনটিতে পশু অর্থে ষাঁড়, বলদ, গরু, বাছুর ও মোষকে বোঝানো হয়েছে। বলা হয়েছে, পৌরসভার চেয়ারম্যান ও পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি প্রথমে প্রাণীটিকে দেখে ঠিক করবেন যে পশুটির বয়স ১৪ বছরের বেশি কিনা।
যদি তা না হয়, পশুটি যদি বিকলাঙ্গ হয় বা সন্তান প্রজননে অক্ষম হয়, সেক্ষেত্রেও কর্মকর্তা বলি দেওয়ার সার্টিফিকেট ইস্যু করতে পারেন।
নির্দিষ্ট কারণ না দেখিয়ে যদি আধিকারিক শংসাপত্র জারি না করেন, তবে রাজ্য সরকারের কাছে নালিশও জানাতে পারেন ওই গবাদি পশুর মালিক।
এই নিয়ম সব ধর্মের বলিপ্রথা এবং মাংস বাজারজাতকরণের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। এই আইনটি যে এই বছর নতুন করে বলবৎ করা হচ্ছে তা নয়, বরং আগেও ২০২৪ সালে কলকাতা হাইকোর্টের রায় অনুযায়ী এই আইন বলবৎ করেছিল রাজ্য সরকার।
এছাড়াও পশুর মাংস ঢেকে বিক্রি করা ও বাসি মাংস বেশিক্ষণ পরে বিক্রি না করা প্রভৃতি বিষয়ে নির্দেশিকা জারি করেছে সরকার।
End of বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন

ছবির উৎস, Sudipta Das/NurPhoto via Getty Images
বিক্রিতে কী প্রভাব?
বিজেপির বক্তব্য, পশ্চিমবঙ্গে গোমাংস বিক্রি বন্ধ করতে বলা হয়নি সরকারের তরফে। সম্প্রতি ক্যানিং পূর্ব বিধানসভার এক বিজেপি নেতা ওই অঞ্চলের জীবনতলা বাজারে একাধিক গোমাংসের দোকানে ঘুরে ঘুরে দোকানীদের আশ্বস্ত করে বলেন, "গোমাংস বিক্রিতে কোনও রকম নিষেধাজ্ঞা জারি করার পরিকল্পনা নেই।"
আলিউল পেয়দা নামে ওই বিজেপি নেতা বলেন, "গোমাংস বিক্রিতে কোনও নিষেধাজ্ঞা নেই। শুধু পর্দার আড়ালে ঢেকে বিক্রি করা ও হাইজিন সংক্রান্ত নিয়ম কঠোরভাবে পালন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।"
কলকাতায় বহু মোঘলাই, চিনা ও মাল্টিক্যুজিন রেস্তোরাঁয় গোমাংস যথেষ্ট সহজলভ্য। কলকাতার পার্ক স্ট্রিটের তেমনই এক রেস্তোরাঁর মালিক বিবিসি বাংলাকে জানান, "এই নিয়মের জন্য এখনও পর্যন্ত রেস্তোরাঁয় গোমাংস সরবরাহে কোনও প্রভাব পড়েনি।"
তবে উত্তরবঙ্গে ছবিটা একটু আলাদা। বিবিসি সংবাদদাতা সুত্রে জানা গিয়েছে, ভূটান সীমান্ত ঘেষা শহর জয়গাওঁতে একটি গোমাংসের দোকান বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ওই দোকানটির মূল ক্রেতা ছিলেন মূলত ভুটানের বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর কিছু মানুষ। তারা মাংস না পেয়ে ফিরে গিয়েছেন বলে খবর।
প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী, কলকাতার নিউমার্কেটের কাছে মিট মার্কেটের গোমাংসের দোকানগুলিও স্বাভাবিক বিক্রিবাটা চালাচ্ছে।
কলকাতার খাদ্য গবেষক ও ভ্লগার, ইন্দ্রজিৎ লাহিড়ী জানান, "একাধিক দোকানে গোমাংস যেভাবে প্রকাশ্যে রাস্তার উপর ঝুলিয়ে বিক্রি করা হয় তা যথেষ্ট স্বাস্থ্যবিধি মেনে করা হয় না।"
'নিরপেক্ষ' শব্দটির উপর তিনি বিশেষ জোর দিয়ে বলেন, "সরকার যদি নিরপেক্ষভাবে এই আইন কার্যকর করতে পারে তবে সেটির উপর কোনও আপত্তি নেই।"
হুগলি জেলার এক গোমাংসের দোকানী বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, "কলকাতার দিকে গোমাংসের চাহিদা শহরতলির থেকে বেশি, তাই সেখানে টাটকা মাংসই বিক্রি হয়। অনেক সময়েই শহরতলীতে গরুর মাংসের ক্রেতা মিলতে সমস্যা হয়। বিক্রিও হয় ধীর গতিতে।"
স্বাস্থ্যবিধি সংক্রান্ত নির্দেশিকাকে স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেছেন, "বিক্রির হার না বাড়লে আগে থেকে কেটে রাখা মাংস বিক্রি না করা তাদের জন্য লোকসান সৃষ্টি করতে পারে।"

ছবির উৎস, ANI
বেআইনি স্থাপনায় বুলডোজার
বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে একটি প্রচলিত কথা আছে 'বুলডোজার জাস্টিস।' অর্থাৎ বিচার শুরুর আগে বা চলাকালীন অভিযুক্তের বেআইনি বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দেওয়া।
পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতার তিলজলায় একটি বিল্ডিংয়ে আগুন লাগে গত ১২ই মে। সরকার থেকে জানানো হয় যে ওই বিল্ডিংটিতে বেআইনিভাবে চামড়ার কারখানা চলছিল।
এই ঘটনার পরে কলকাতার একাধিক বেআইনি স্থাপনা নিয়ে একটি নির্দেশ কার্যকর করা হয় সরকারের তরফ থেকে।
ওই নির্দেশিকায় জেলা প্রশাসকদের তাদের নিজ নিজ জেলার বেআইনি স্থাপনগুলি চিহ্নিত করে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সেগুলিকে 'বন্ধ করা বা সরিয়ে ফেলার' নির্দেশ জারি করা হয়েছে।
এই নির্দেশিকা আসার পরের দিন অর্থাৎ ১৩ই মে তিলজলার ওই ভবনটিতে বুলডোজার চালানো হয়।
তবে এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন আইএসএফ নেতা ও বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকী।
তিনি একটি সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে লেখেন, "চামড়া কারখানাটি ছাড়াও ঐ বাড়িতেই অন্যান্য ভাড়াটেরা ছিলেন। তারা কর্পোরেশনকে কর দেন। সুতরাং এই বুলডোজার চালিয়ে ভেঙে দেওয়াটা অসমীচীন, অসাংবিধানিক।"
তিনি আরও বলেন, "শহর কলকাতায় যে সমস্ত অবৈধ বাড়ি আছে, তাদের নোটিশ পাঠিয়ে কিছুটা সময় দেওয়া প্রয়োজন, কেননা ঐ বাড়িগুলিতে অনেক ভাড়াটিয়া তাদের পরিবার সমেত থাকেন। তাদেরও পুনর্বাসন করা প্রয়োজন।"
১৪ই মে একাধিক মামলা নিয়ে সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী হাজির হন কলকাতা হাইকোর্ট চত্বরে। তিনি বিচারপতি সুজয় পালের এজলাসে একজন আইনজীবীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে বলেন, "বাংলা বুলডোজার চালানোর রাজ্য নয়।"

ছবির উৎস, BIJU BORO/AFP via Getty Images
বাংলাদেশ সীমান্তে 'আসাম মডেল'
সম্প্রতি বিএসএফকে সীমান্তে সুরক্ষা নিশ্চিত করতে অসুরক্ষিত সীমান্তগুলি সুরক্ষিত করতে জমি হস্তান্তর প্রক্রিয়া শুরু করেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
এই বিষয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির সাংবাদিকদের বলেছেন, ''কাঁটাতার দিয়ে বাংলাদেশের মতো দেশকে এখন ডর দেখানোর মতো কোন জায়গা নাই।''
তিনি যোগ করেন, ''যদি মানুষের সাথে সম্পর্ক করতে চান, বাংলাদেশের মানুষ কাঁটাতার ভয় পায় না। বাংলাদেশের সরকারও কাঁটা তার ভয় পায় না। যেখানে আমাদের কথা বলা দরকার, আমরা কথা বলবো।''
গত ১৩ই মে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সাংবাদিকদের জানান, সীমান্তে অনুপ্রবেশ রুখতে 'আসাম মডেল' অনুসরণ করা হবে।
তবে এই আসাম মডেল সরকারিভাবে স্বীকৃত কোনও মডেল নয়। তাই এই মডেলের কার্যকারিতা কেমন, সেই নিয়ে বিতর্ক আছে।
আসাম নির্বাচনের ঠিক পরেই আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা একটি টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, আসাম থেকে রাতের অন্ধকারে চিহ্নিত অনুপ্রবেশকারীদের বাংলাদেশে পুশ ব্যাক করা হয়।
বহু বিশেষজ্ঞ আশঙ্কা করছেন, এই পদক্ষেপকেই হয়তো পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী অনুসরণ করার কথা বলেছেন।

ছবির উৎস, Debajyoti Chakraborty/NurPhoto via Getty Images
রাস্তায় বেআইনি তোলাবাজি বন্ধ করতে নির্দেশ
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর যে নির্দেশটি বিভিন্ন মহলে প্রশংসিত হয়েছে, সেটি হলো অননুমোদিত সব টোল পয়েন্ট তুলে দেওয়া।
এর আগে একাধিক জায়গা থেকে হাইওয়ে আটকে টাকা চাওয়ার অভিযোগ সামনে এসেছিল। এই অভিযোগগুলি মূলত এসেছিল সাধারণ মানুষ ও বাণিজ্যিক গাড়ির ড্রাইভারদের থেকে।
এই ধরনের অনুমোদন-বিহীন টোল পয়েন্টগুলিকে চলতি ভাষায় বলা হয় 'তোলাবাজি'।
এই সমস্যা সমাধান করতে মুখ্যমন্ত্রীর দফতর থেকে ১২ই মে জারি করা হয় একটি নোটিশ।
সেই নোটিশে মুখ্যমন্ত্রী জেলাশাসকদের নির্দেশ দিয়েছেন তাদের অঞ্চলে এমন যে যে অবৈধ অর্থ সংগ্রহের স্থানে গাড়ি চলাচল বাধাপ্রাপ্ত হয়, সেগুলির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া।







