নির্বাচনে ভূমিকা ঠিক করতে ডাকা জাতীয় পার্টির সমাবেশ পুলিশের বাধায় পণ্ড

ছবির উৎস, JATIYA PARY
আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে জাতীয় পার্টির ভূমিকা কী হবে– সে বিষয়ে নির্দেশনা দিতে দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে শনিবার ঢাকায় একটি সমাবেশ ডেকেছিল জাতীয় পার্টি। তবে শেষ পর্যন্ত পুলিশের বাধায় ওই সমাবেশটি পণ্ড হয়ে যায়।
জাতীয় পার্টির অভিযোগ, ঢাকার কাকরাইলে দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে সমাবেশের জন্য তারা আগেই পুলিশের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে রেখেছিলো। কিন্তু তারপরও পুলিশ তাদের সমাবেশে বাধা দিয়েছে।
দলটির মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারি বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, "দুপুর আড়াইটার দিকে সমাবেশ শুরুর কিছুক্ষণ পরেই পুলিশ হঠাৎ আমাদের সমাবেশে জলকামান ও সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়ে নেতাকর্মীদের ছত্রভঙ্গ করে দিয়ে অমানবিক আচরণ করেছে।"
যদিও পুলিশের দাবি, আগে থেকে রাস্তা ছেড়ে সমাবেশ করার জন্য বলা হয়েছিল। কিন্তু রাস্তা আটকে সমাবেশের কারণেই তাদের সেখান থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
এর আগে গত ৩০শে অগাস্ট জাতীয় পার্টির সাথে গণঅধিকার পরিষদের কর্মীদের সংঘর্ষের পর জাতীয় পার্টির কার্যালয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটে।
বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে জাতীয় পার্টির কার্যক্রম নিষিদ্ধের দাবি তোলা হলেও শেষ পর্যন্ত সরকার সে পথে হাঁটেনি। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার উদ্যোগ কিংবা বিভিন্ন অনুষ্ঠানের বাইরে রাখা হচ্ছে দলটিকে। তাদের বিভিন্ন সমাবেশে পুলিশ কিংবা অন্য রাজনৈতিক দলের বাধা দেওয়ার ঘটনাও ঘটছে।
অর্থাৎ রাজনীতির মাঠে যখন এক রকম কোণঠাসা অবস্থা, ঠিক তখন ঢাকায় সারাদেশের নেতাকর্মীদের এনে বড় পরিসরে মিটিংয়ের ডাক দিয়েছিল দলটি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, জাতীয় পার্টি নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের অস্পষ্ট অবস্থানের কারণে আগামী নির্বাচন ঘিরে দ্বিমুখী সংকটে রয়েছে দলটি।

ছবির উৎস, JATIYA PARY
যে কারণে ডাকা হয়েছিল নেতাকর্মীদের
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
শনিবার ঢাকায় জাতীয় পার্টির পক্ষ থেকে যে সমাবেশটি ডাকা হয়েছিল সেখান থেকে দলের চেয়ারম্যান জিএম কাদেরসহ নেতাকর্মীদের নামে মামলা প্রত্যাহার, বন্দি নেতাকর্মীদের মুক্তি, আগামীতে অবাধ সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পাশাপাশি বেশ কিছু দাবি জানানো হয়েছিল।
দলটির নেতারা জানিয়েছেন, এই সমাবেশে অংশ নিতে সারা দেশের জেলা-মহানগর জাতীয় পার্টি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীদের ঢাকায় উপস্থিত থাকার জন্য বলা হয়েছিল।
শেখ হাসিনা সরকার পতনের পর জাতীয় পার্টির মধ্যে স্পষ্ট বিভক্তি তৈরি হয়েছে। দলের আরেকটি পক্ষ কাউন্সিল করে নতুন কমিটি গঠনও করেছে। এমন পরিস্থিতিতে জিএম কাদেরের নেতৃত্বে জাতীয় পার্টির এই অংশটি তাদের সক্ষমতা জানান দিতে চেয়েছিল।
জাতীয় পার্টির মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারি বিবিসি বাংলাকে বলেন, "আমরা আগামীতে দেশের স্বার্থে কী করবো, কিংবা নির্বাচন পর্যন্ত দল কীভাবে সাজাবো বা নির্বাচনে যাবো কি যাবো না, মূলত সব কিছু নিয়েই আমাদের এই সমাবেশ আয়োজন করা হয়েছিল।"
এদিকে জাতীয় পার্টির জিএম কাদের অংশ যখন দলীয় এই সমাবেশ ডেকেছে ঠিক একই সময় ঢাকার গুলশানে আরেকটি দলীয় অনুষ্ঠান আয়োজন করেছিল আনিসুল ইসলাম মাহমুদের নেতৃত্বাধীন অংশ। যদিও সেই অনুষ্ঠানটি ঘরোয়াভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং সেখানে পুলিশের বাধার কোনো ঘটনাও ঘটেনি।
দলটির নেতারা বলছেন, দলের ভেতরে কোন্দলের মধ্যে তৃণমূলের কর্মীদের মনোবল চাঙ্গা করাও এই আয়োজনটির আরেকটি উদ্দেশ্য ছিল।
মি. পাটোয়ারি বলেন, "আমরা মনে করি সরকারের ইঙ্গিতেই জাতীয় পার্টি ভেঙেছে। কিন্তু আমরা এটাকে কোন্দল বলতে চাই না। তৃণমূল আমাদের সাথে আছে এবং সেই তৃণমূলের শক্তিকে সামনে রেখেই আমাদের এই সমাবেশ ছিল।"
এত কিছুর পরও যে জাতীয় পার্টি যে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী সেটা বোঝানোও তাদের উদ্দেশ্য ছিল বলে দলের ওই নেতা জানান।

ছবির উৎস, Mamunur Rashid/NurPhoto via Getty Images
পুলিশের বাধায় সমাবেশ পণ্ড
জাতীয় পার্টির সমাবেশটি ডাকা হয়েছিল বিকেল তিনটায়। তবে সমাবেশ শুরুর আগেই ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে নেতাকর্মীরা এসে জড়ো হয়েছিলেন জাতীয় পার্টির কাকরাইল কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে।
এই সমাবেশে প্রধান অতিথি থাকার কথা ছিল দলটির চেয়ারম্যান জিএম কাদেরের।
দুপুরের আড়াইটার দিকে অনুষ্ঠান শুরু হয়। সমাবেশ শুরুর ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই সেখানে পুলিশ উপস্থিত হয়। ওই সময় বিভিন্ন গণমাধ্যমের সরাসরি সম্প্রচার চলছিলো।
এতে দেখা যায়, কাকরাইলের কার্যালয়ের সামনে জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীদের ধাওয়া দিয়ে পুলিশ সরিয়ে দিচ্ছে। এ সময় পুলিশের জলকামান থেকে পানি ছুড়ে ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে নেতা-কর্মীদের ছত্রভঙ্গ করে দিতে দেখা যায়।
এ সময় পুলিশের সঙ্গে দলটির নেতাকর্মীদের সংঘর্ষ হয়।
শামীম হায়দার পাটোয়ারি বিবিসি বাংলাকে বলেন, "আমাদের শান্তিপূর্ণ কর্মী সমাবেশ ছিল। এর মাঝে পুলিশ আমাদের বলে অনুষ্ঠান সংক্ষিপ্ত করার জন্য। আমরা একটু শর্টও করেছিলাম। কিন্তু এর মধ্যে দিয়ে হঠাৎ পুলিশ আমাদের সমাবেশে পেছন দিক দিয়ে পানি ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। এতে আমরা স্তম্ভিত হয়ে যাই। এটা একটা স্বৈরতন্ত্রমূলক আচরণ বলে মনে হচ্ছে।"
পরে বিকেল সাড়ে চারটার দিকে কার্যালয়ের গেট বন্ধ দেখা যায়। কার্যালয়ের সামনে পুলিশ তখনও অবস্থান করছিল।
পুলিশের রমনা জোনের ডিসি মাসুদ আলম বিবিসি বাংলাকে বলেন, জাতীয় পার্টির সেখানে সমাবেশ করার অনুমতি ছিল না। তারপরও তারা যখন সমাবেশ করে তখন রাস্তা আটকে সমাবেশ করার চেষ্টা করেছিল।
"আমরা তাদের রাস্তা ছেড়ে সমাবেশ করতে বলেছিলাম। কিন্তু তারা সেটি করেনি বলেই পুলিশ তাদের রাস্তা থেকে সরিয়ে দিয়েছে," বলেন তিনি।
দলের মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারি বিবিসি বাংলাকে বলেন, "পুলিশ আগেই আমাদের ভয় দেখিয়েছিল আমাদের সমাবেশে অ্যাটাক হতে পারে। কিন্তু আমরা অ্যাটাকের ভয়ে ভীত না। পুলিশ আমাদের নিরাপত্তা না দিয়ে উল্টো অমানবিকভাবে আক্রমণ করেছে।"

ভোটে অংশ নেওয়ার পথ খুঁজছে জাতীয় পার্টি?
গণঅভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পতন এবং মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের পর গত এক বছরে দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে কয়েকবার হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে।
সর্বশেষ গত অগাস্টে গণঅধিকার পরিষদ নেতা নুরুল হক নুরের ওপর পুলিশের হামলা ঘিরে সেপ্টেম্বের ও অক্টোবরে দুই দফায় জাতীয় পার্টির অফিসে হামলার অভিযোগও উঠেছে গণঅধিকার পরিষদের বিরুদ্ধে।
একদিকে যখন অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর দিক থেকে অনেকটাই কোণঠাসা অবস্থায় আছে জাতীয় পার্টি, তখন অন্যদিকে দলেও ভেতরে আবারও কোন্দল চলছে গত কয়েকমাস ধরে।
আলাদা কাউন্সিল করে কমিটি করে নির্বাচনের পথ খুঁজছে আনিসুল ইসলাম মাহমুদের নেতৃত্বাধীন অন্য অংশ।
ওই অংশের নির্বাহী চেয়ারম্যান মুজিবুল হক চুন্নু বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, যদি নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরি হয় তাহলে জাতীয় পার্টি আনিসুল ইসলাম মাহমুদের নেতৃত্বে লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেবে। সেই ভোটে যদি জিএম কাদেররা তাদের অধীনে আসতে চান সেই সুযোগ তারা জিএম কাদের দেবেন।
তবে জিএম কাদের অংশের মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারি অভিযোগ করেছেন, এই কোন্দলের ফলে দলের মধ্যে কিছুটা সংকট রয়েছে। তবে এই সংকট তৈরির পেছনে সরকারকে দায়ী করেছেন তিনি।
একই সাথে মি. পাটোয়ারি বিবিসি বাংলাকে বলেছেন যে তারা আগামী নির্বাচনে অংশ নেবে কি নেবে না, কোন প্রেক্ষাপটে তারা ভোটে যাবেন এ সমস্ত বিষয়গুলো তারা মূল্যায়ন করছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন এই মুহূর্তে জাতীয় পার্টি নিয়ে সরকারের অবস্থানের কারণে রাজনীতিতেও কিছুটা অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে।
বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, "জাতীয় পার্টি নিয়ে সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ আছে সত্য। কিন্তু তাদের কার্যক্রম তো সরকার নিষিদ্ধ করে নাই।"
তিনি বলেন, "এক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা অস্বচ্ছ। তারা জাতীয় পার্টিকে হ্যাঁ বা না কিছুই বলছে না। সুতরাং এখানে জাতীয় পার্টিকে সরকারের মর্জির ওপর নির্ভর করতে হবে। যে কারণে তাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যতও বলা যাচ্ছে না।"








