বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা 'অনুপ্রবেশ' ইস্যুতে আবারও বিজেপি- তৃণমূলের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ, উদ্দেশ্য কী

ছবির উৎস, SANSAD TV
- Author, রূপসা সেনগুপ্ত
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, কলকাতা
বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা 'অনুপ্রবেশের' অভিযোগ তুলে আবারও পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতাসীন তৃণমূল সরকারের সমালোচনা করলেন ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, বিজেপি নেতা অমিত শাহ। তার অভিযোগ, অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকাতে পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগণা লাগোয়া ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দিতে বাধা দিচ্ছে তৃণমূল।
অমিত শাহ ভারতের লোকসভায় অভিযোগ করেন, সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দিতে বাধা দেওয়ার কারণে বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের সুযোগ থাকছে।
'ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ফরেনারস বিল, ২০২৫' নিয়ে লোকসভায় বৃহস্পতিবার দীর্ঘ সময় আলোচনা হয়। সে সময়, অনুপ্রবেশ ইস্যুতে তৃণমূলের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন অমিত শাহ।
তিনি বলেন, "ভারত কোনো ধর্মশালা নয়। যারা পর্যটক হিসেবে, শিক্ষার জন্য, স্বাস্থ্য সমস্যা, ব্যবসা এবং বিনিয়োগের জন্য এই দেশে আসবেন, তাদের স্বাগত জানাবে ভারত সরকার।"
"কিন্তু যারা ভারতে অস্থিরতা তৈরি করার ভাবনা নিয়ে আসবেন, তা সে রোহিঙ্গা হোন বা বাংলাদেশি হোন, তাদের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ নেওয়া হবে।"
সীমান্ত দিয়ে অনুপ্রবেশের প্রসঙ্গ টেনে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ পশ্চিমবঙ্গে মমতা ব্যানার্জীর নেতৃত্বাধীন তৃণমূল সরকারের সমালোচনা করেন।
মি. শাহের অভিযোগ, "পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগণার সীমান্ত দিয়ে অনুপ্রবেশ হচ্ছে। ৪৫০ কিলোমিটার সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার কাজ আটকে রয়েছে, কারণ পশ্চিমবঙ্গ সরকার জমি দিচ্ছে না।"
"পশ্চিমবঙ্গ সরকার অনুপ্রবেশকারীদের দয়া দেখাচ্ছে বলেই কাঁটাতারের কাজ আটকে রয়েছে," যুক্ত করেন তিনি।
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
তবে এটাই প্রথম নয়। এর আগেও একাধিকবার অনুপ্রবেশ ইস্যুতে তৃণমূলের বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে দেখা গিয়েছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে।
কখনো তিনি তৃণমূলের বিরুদ্ধে অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের ভুয়া পরিচয়পত্র পাওয়ার ক্ষেত্রে সাহায্য করার অভিযোগ তুলেছেন, কখনো পশ্চিমবঙ্গের শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ভোটের জন্য জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়ে 'আপসের' অভিযোগ তুলেছেন তিনি।
এদিকে, গতকাল বৃহস্পতিবার লোকসভায় অমিত শাহ'র মন্তব্যের বিরোধিতা করেছে তৃণমূল। বিজেপির এই অভিযোগের অবশ্য পাল্টা জবাবও দিয়েছে তারা।
তৃণমূলের পক্ষ থেকে ডেরেক ওব্রায়ান সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, "অনুপ্রবেশ রুখতে বিএসএফ ব্যর্থ। অথচ আঙুল তোলা হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের দিকে। আসলে কেন্দ্র এখন নিজেদের ভুল শোধরানোর বদলে অন্যের ওপর দায় চাপাতে ব্যস্ত।"
প্রসঙ্গত, অনুপ্রবেশ নিয়ে লোকসভায় বিরোধীদের তীব্র আপত্তির মাঝেই কণ্ঠভোটে পাস হয়েছে 'ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ফরেনারস বিল, ২০২৫।' এরপর তা পরবর্তী আলোচনার জন্য রাজ্যসভায় যাবে।
অবৈধ অনুপ্রবেশ নিয়ে বিজেপি ও তৃণমূলের মধ্যে রাজনৈতিক অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগ অব্যাহত রয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এর নেপথ্যে দুই দলেরই রাজনৈতিক অংক রয়েছে যা ভোটব্যাংকের সঙ্গে সম্পর্কিত।

ছবির উৎস, SANSAD TV
কী বলেছেন অমিত শাহ?
জাতীয় নিরাপত্তা আরও জোরদার করতে এবং অনুপ্রবেশের মতো সমস্যা মোকাবিলার জন্য, 'ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ফরেনারস বিল, ২০২৫' (অভিবাসন ও বিদেশি নাগরিক বিল, ২০২৫) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে কেন্দ্র সরকার দাবি করেছে।
এই বিল নিয়ে আলোচনার সময় অমিত শাহ অভিযোগ করেন যে, "গত দশ বছরে ভারত পঞ্চম বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতিগুলোর মধ্যে ভারত এক উজ্জ্বল বিন্দু হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেছে। উৎপাদনের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে ভারত এবং সারা বিশ্ব থেকে মানুষের ভারতে আসা স্বাভাবিক।"
তবে একইসঙ্গে তিনি বলেছেন, 'অসৎ উদ্দেশ্য' নিয়ে অনুপ্রবেশও বেড়েছে।
"ব্যক্তিগত লাভের জন্য এবং দেশকে অনিরাপদ করে তোলার জন্য এখানে আশ্রয় নেওয়া মানুষের সংখ্যাও বেড়েছে। সে রোহিঙ্গা হোক বা বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী, তারা ভারতে এসে অস্থিরতা সৃষ্টি করলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে," বলেন তিনি।
এ সময় আসামের প্রসঙ্গ টেনে মি. শাহ বলেছেন, "যখন কংগ্রেস ক্ষমতায় ছিল, তখন বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী হোক বা রোহিঙ্গা, আগে আসাম দিয়ে ভারতে ঢুকত। এখন তারা পশ্চিমবঙ্গ দিয়ে ভারতে ঢোকে যে রাজ্যে তৃণমূল সরকার ক্ষমতায় রয়েছে। তাদের (অনুপ্রবেশকারীদের) আধার কার্ড ইস্যু করছে কে?"
তিনি আরও বলেন, "যে বাংলাদেশিরা ধরা পড়েছে তাদের কাছে ২৪ পরগনার আধার কার্ড রয়েছে। আপনারা (তৃণমূল ) আধার কার্ড ইস্যু করবেন, আর ওরা (অনুপ্রবেশকারীরা) সেটা নিয়ে দিল্লিতে আসবে, এটা হতে দেওয়া যায় না।"

ছবির উৎস, ANI
তৃণমূল কী বলেছে?
অমিত শাহের বক্তব্যের তীব্র বিরোধিতা করেছে তৃণমূল কংগ্রেস। তৃণমূলের সৌগত রায় তার দাবি ভিত্তিহীন বলে মন্তব্য করেন।
মি. রায় বলেন, "এর জন্য ওরা (বিজেপি) আমাদের দায়ী করতে পারে না।"
বিজেপির বিরুদ্ধে পাল্টা অভিযোগ তুলেছেন তৃণমূলের সহ-সভাপতি জয় প্রকাশ মজুমদার। তার মতে, "পশ্চিমবঙ্গের মানুষ শান্তিতে বাস করতে চান। যারা ধর্মীয় বিভাজনের রাজনীতি করেন, তাদের এখানে কোনো স্থান নেই।"
"বিজেপিকে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। ধর্মনিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি রাখতে হবে। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি কোনো প্রভাব ফেলতে পেরেছে বলে তো আমি দেখছি না।"
ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ফরেনারস বিল, ২০২৫
চলতি মাসে লোকসভায় ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ফরেনারস বিল, ২০২৫ বা অভিবাসন ও বিদেশি নাগরিক বিল পেশ করে মোদী সরকার। বিল আনার পিছনে তাদের যুক্তি, এই বিষয় সংক্রান্ত যে প্রচলিত আইন রয়েছে, সেগুলো 'ওভারল্যাপ' করে।
নতুন বিল আনার উদ্দেশ্য ওই আইনের 'সরলীকরণ' এবং জাতীয় নিরাপত্তাকে 'আরও জোরদার' করা। দেশে নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ নেওয়াও এই বিলের লক্ষ্য বলে বলা হয়েছে।
লোকসভায় ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ফরেনারস বিল, ২০২৫ নিয়ে আলোচনার প্রসঙ্গে মি. শাহ ব্যাখ্যা করেছেন, "এই বিল দেশের নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর মাধ্যমে ভারতে আসা বিদেশি নাগরিকদের ওপর নজরদারি সম্ভব হবে।"
ভারতে আসার নেপথ্যে তাদের উদ্দেশ্য জানার পাশাপাশি, তারা কোথায় কী করছেন, সে বিষয়েও নজরদারি সম্ভব হবে।
এই বিলের শর্ত অনুযায়ী, হোটেল, হাসপাতালের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে সেখানে আসা বিদেশিদের সম্পর্কিত সমস্ত তথ্য ভারত সরকারকে জানাতে হবে।
ভারতে অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের কারাবাস এবং জরিমানার কথাও বলা হয়েছে এই বিলে।

ছবির উৎস, MAMATA BANERJEE/FACEBOOK
End of বিবিসি বাংলায় অন্যান্য খবর
বিশেষজ্ঞদের মতামত
অনুপ্রবেশ ইস্যুতে মোদী সরকারের বক্তব্য এবং তৃণমূল ও বিজেপির অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের নেপথ্যে রাজনীতি ও ভোটব্যাংক রয়েছে বলেই মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
সিনিয়র সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক শিখা মুখার্জী বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, "অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের প্রতিরোধ করতে বিল আনতে চাওয়া যেকোনো দেশের ক্ষেত্রেই আইনসঙ্গত। কিন্তু এখানে যে পার্থক্য রয়েছে।"
তিনি বলেন, "আমাদের বিষয়টা কিন্তু যুক্তরাজ্য বা যুক্তরাষ্ট্রের (অবৈধ অভিবাসন) মতো নয়, যে দেশগুলোতে সবাই যাওয়ার চেষ্টা করেন।"
"সেই পরিপ্রেক্ষিতকে মাথায় রেখে আমাদের দেখতে হবে কাদের বিরুদ্ধে এই বিল আনা হচ্ছে। কারণ দেশের নিরাপত্তা সংক্রান্ত চিন্তার পিছনে একটা বিষয় হলো নাশকতামূলক কার্যকলাপ।"
"এই সমস্যা তো পাঞ্জাবে আছে, উত্তর পূর্বাঞ্চলেও আছে। কিন্তু তাদের কথা বলা হয় না। আলোচনা হয় কাদের নিয়ে? পাকিস্তানকে নিয়ে, যেটা মূলত জম্মু-কাশ্মীরের ক্ষেত্রে হয়ে থাকে। আর আলোচনা হয় বাংলাদেশকে নিয়ে" বলেন ওই সাংবাদিক।
শিখা মুখার্জী উল্লেখ করেন, জাতীয় নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে যেকোনো দেশই অবৈধ অনুপ্রবেশ রুখতে সচেষ্ট। কিন্তু কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন সরকার যেভাবে বিষয়টার ব্যাখ্যা করছে, তার পিছনে 'নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য' রয়েছে।
তিনি বলেন, "অবৈধ অনুপ্রবেশকারী এবং নাশকতা সব দেশই ঠেকাতে চায়। কিন্তু এখানে যে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, সেটা অবশ্যই রাজনৈতিক এবং এখানে নিশানা করা হয়েছে বাংলাদেশকে।"
"অমিত শাহের বক্তব্য শুনলেই বোঝা যায়, তিনি কাকে নিশানা করছেন এবং এর উদ্দেশ্য কী? ফলে বাংলাদেশ যদি নিশানা করা হয়, তাহলে বলতে হবে ওই দেশের সঙ্গে আমাদের সীমান্ত একাধিক রাজ্যে রয়েছে। কিন্তু অমিত শাহের চিন্তা হলো পশ্চিমবঙ্গ দিয়ে কে ঢুকছে।"
সাংবাদিক শিখা মুখার্জী বিষয়টাকে 'অভ্যন্তরীণ রাজনীতি' বলে মনে করেন। তার কথায়, "এটা অভ্যন্তরীণ রাজনীতির একটা অংশ। দুই দেশের মাঝে সীমান্ত দিয়ে অনুপ্রবেশ হচ্ছে সেটা নিয়ে নয়। যেমন ইউরোপ-আমেরিকাতে দেখা যায়, সেখানে বহু দেশ থেকে লোক ঢোকেন।"
আরেকজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক সৌম্য গাঙ্গুলির মতে, পুরো বিষয়টার সঙ্গে যোগ রয়েছে ভোট ব্যাংকের। তার কথায়, "পশ্চিমবঙ্গে অনুপ্রবেশ ইস্যু নতুন নয়। বাম আমলেও একই অভিযোগ উঠতে দেখা গিয়েছে। তখন নিশানায় ছিল বামেরা, আর এখন নিশানায় তৃণমূল রয়েছে।"
"তৃণমূল আর বিজেপির মধ্যে অনুপ্রবেশ নিয়ে এই অভিযোগ আর পাল্টা অভিযোগও নতুন নয়। বিজেপি এর জন্য তৃণমূলকে দায়ী করে, আর সীমান্ত সুরক্ষায় ব্যর্থতার জন্য বিএসএফকে দায়ী করে তৃণমূল বলে এটা কেন্দ্রের ব্যর্থতা। "
এই প্রসঙ্গে ভোটব্যাংকের রাজনীতিকে টেনে এনেছেন তিনি।
মি. গাঙ্গুলির মতে, "পুরো বিষয়টার সঙ্গেই ভোট ব্যাংকের যোগ রয়েছে। অংকটা খুব সহজ। ভোট ব্যাংকের কথা মাথায় রেখে তৃণমূল দেখাতে চায় যে বিজেপি মুসলমান বিরোধী এবং বিজেপি দেখাতে চায় তৃণমূল সংখ্যালঘুদের তোষণ করছে।"








