গাজায় এগিয়ে চলেছে ইসরায়েলি ট্যাংক, একদিনে ৮০ জনের বেশি ফিলিস্তিনির মৃত্যুর খবর

ছবির উৎস, Reuters
- Author, ডেভিড গ্রিটেন
গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি গুলিতে বুধবার ৮০ জনেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের বেশিরভাগই গাজা সিটির বলে জানিয়েছে স্থানীয় হাসপাতাল।
গাজা সিটির সেন্ট্রাল দারাজ এলাকার ফাইরাস মার্কেটের কাছে বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলো আশ্রয় নিয়েছে, এমন একটি ভবন ও তাঁবুতে রাতভর হামলায় অন্তত ২০ জন নিহত হয়েছেন। যাদের মধ্যে নারী ও শিশুও রয়েছে।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তারা হামাসের দুইজন যোদ্ধাকে হামলা করেছে এবং হতাহতের তথ্য তাদের তথ্যের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
এরই মধ্যে হামাসের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত শহরের কেন্দ্রে অগ্রসর হওয়া অব্যাহত রেখেছে ইসরায়েলি বাহিনীর ট্যাংক ও সৈন্যরা।
এখনও হামাসের হাতে থাকা জিম্মিদের মুক্ত করাই স্থল অভিযানের লক্ষ্য বলে জানিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী।
একইসঙ্গে, ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠীর 'চূড়ান্ত পরাজয়' নিশ্চিত করাও এই বাহিনীর লক্ষ্য বলে তারা জানিয়েছে।
গাজার সবচেয়ে বড় শহর থেকে এখন পর্যন্ত লাখ লাখ বাসিন্দা পালিয়ে গেছে। যেখানে গত মাসেই জাতিসংঘের সমর্থিত একটি সংস্থা দুর্ভিক্ষের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
কিন্তু আরও লাখ লাখ মানুষ সেখানে এখনও ভয়াবহ মানবিক পরিস্থিতিতে রয়েছে। স্বাস্থ্য এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় পরিষেবা সেখানে ভেঙে পড়েছে।
আরেকটি পৃথক ঘটনায়, যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ বলেছেন, মঙ্গলবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে আরব মুসলিম নেতাদের এক দলের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প 'মধ্যপ্রাচ্য ও গাজায় শান্তির জন্য ২১ দফা পরিকল্পনা' উপস্থাপন করেছেন।
এই পরিকল্পনা সম্পর্কে উইটকফ বিস্তারিত আর কিছু জানাননি।
তবে তিনি বলেছেন এটা "ইসরায়েলের উদ্বেগের পাশাপাশি এই অঞ্চলের সব প্রতিবেশীর দুশ্চিন্তাকে" তুলে ধরেছে।
"আমরা আশাবাদী, এমনকি আমি আত্মবিশ্বাসী হয়েও বলতে পারি, আগামী দিনগুলোতে আমরা যে কোনো ধরনের যুগান্তকারী সাফল্য ঘোষণা করতে পারবো," বলেন তিনি।

ছবির উৎস, Reuters
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
গাজা সিটির হাসপাতালগুলো বুধবার বিকেলে জানিয়েছে, তারা মধ্যরাত থেকে ইসরায়েলি হামলা ও গুলিবর্ষণে নিহত ৬০ জনেরও বেশি মানুষের মরদেহ পেয়েছে।
হামাস পরিচালিত সিভিল ডিফেন্স এজেন্সি জানিয়েছে, ফাইরাস মার্কেটের কাছে বাস্তুচ্যুতদের আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহৃত একটি ওয়্যারহাউসে ইসরায়েলি হামলায় এক - তৃতীয়াংশ প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। তাদের মধ্যে ছয়জন নারী এবং নয়জন শিশু রয়েছে।
বিবিসিসহ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সাংবাদিকদের গাজা সিটিতে স্বাধীনভাবে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, তাই রিপোর্টগুলো ভেরিফাই বা যাচাই করা কঠিন।
কিন্তু ঘটনাস্থলের একটি ভিডিও ফুটেজে ধ্বংসপ্রাপ্ত একটি ভবনের ধ্বংসস্তুপ থেকে কম্বলে মোড়ানো একটি মরদেহ সরিয়ে নিতে দেখা গেছে লোকজনকে।
নিহতদের মধ্যে মোহাম্মদ হাজ্জাজের আত্মীয়ও রয়েছে। তিনি এএফপি নিউজকে বলেছেন, যখন মানুষ ঘুমাচ্ছিল তখন ওই স্থানে 'ব্যাপক বোমা হামলা' করা হয়েছিল।
তিনি বলেন, "আমরা এসে শিশু ও নারীদের ছিন্নভিন্ন অবস্থায় দেখতে পেয়েছি। এটি এক করুণ দৃশ্য ছিল।"
আরেকটি ছবিতে দেখা গেছে, আল আহলি হাসপাতালের বাইরে মেঝেতে সাদা কাফন এবং প্লাস্টিকের ব্যাগে রাখা ছয়টি মরদেহের পাশে বসে মানুষ শোক পালন করছে।
তালা আল-দীব নামে একজন নারী জানিয়েছেন, মরদেহগুলোর মধ্যে তার বোনের স্বামী, দুই সন্তান এবং বোনের শ্বশুরসহ চারজনের মরদেহ রয়েছে।
এ বিষয়ে ইসরায়েলি ডিফেন্স বাহিনীর মন্তব্য জানতে চাইলে তারা বলেছে, "দুই হামাস সন্ত্রাসীকে" লক্ষ্য করে হামলা করেছে তারা।
গাজা সিটির অন্যান্য স্থানের প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, দক্ষিণ-পশ্চিম তেল আল-হাওয়া এবং উত্তর-পশ্চিম রিমাল পাড়ায় ইসরায়েলি ট্যাংক দেখতে পেয়েছেন তারা।
ফিলিস্তিনি রেড ক্রিসেন্ট মঙ্গলবার জানিয়েছে, তাল আল - হাওয়ার আল - কুদস হাসপাতালের বাইরে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর বাহন মোতায়েন করা হয়েছিল এবং ইসরায়েলি গুলিবর্ষণে এটির অক্সিজেন স্টেশন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় অকেজো হয়ে গেছে।
আইডিএফ বুধবার জানিয়েছে, "হাসপাতালের দিকে সরাসরি কোনো হামলা চালানো হয়নি।"
এই ঘটনার পরিস্থতি পর্যালোচনা করা হচ্ছে বলেও জানিয়েছে তারা।
আইডিএফ আকাশ থেকে তোলা ফুটেজ প্রকাশ করেছে।
কয়েকদিন আগে রিমালের আল-শিফা হাসপাতালের কম্পাউন্ডের ভেতর থেকে হামাস যোদ্ধাদের গুলি চালানোর দৃশ্য এই ফুটেজে দেখা গেছে।

ছবির উৎস, Reuters
হামাসের একজন নিরাপত্তা কর্মকর্তাকে উদ্ধৃত করে রয়টার্স জানিয়েছে, 'অপরাধী দলের' সদস্যরা কম্পাউন্ডের বাইরে থেকে হাসপাতালের দিকে গুলি চালিয়েছে।
গাজা সিটি পরিদর্শনের সময় বুধবার আইডিএফ চিফ অব স্টাফ লেফটেন্যান্ট জেনারেল ইয়াল জমির বলেন, তারা "গাজা উপত্যকায় বিপুল সংখ্যক সৈন্য নিয়ে অভিযান চালাচ্ছে, জিম্মিদের মুক্তি এবং হামাসের চূড়ান্ত পরাজয়ের পরিস্থিতি তৈরির জন্য গাজা সিটিতে হামলার বিষয়ে দৃষ্টি আরোপ করেছে।"
তিনি আরও জানান, "গাজার বেশিরভাগ জনগণ ইতোমধ্যেই গাজা সিটি ছেড়ে চলে গেছে এবং তাদের নিরাপত্তার জন্য আমরা দক্ষিণ দিকে সরিয়ে নিচ্ছি।"
"আমি গাজার বাসিন্দাদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি: উঠে দাঁড়াও এবং হামাস থেকে বিচ্ছিন্ন হও, তোমাদের দুর্ভোগের জন্য তারা দায়ী। হামাস যদি জিম্মিদের মুক্তি দেয় এবং অস্ত্র ত্যাগ করে তবে এই যুদ্ধ এবং দুর্ভোগের অবসান হবে," বলে জানান তিনি।
হামাসের সামরিক শাখা আইডিএফকে সতর্ক করে বলেছে, গাজা সিটিতে তাদের অভিযান বাড়ালে বাকি ৪৮ জন জিম্মির জীবন হুমকির মুখে পড়বে। যাদের মধ্যে প্রায় ২০ জন জীবিত বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আইডিএফ এর বরাত দিয়ে ইসরায়েলি গণমাধ্যম জানিয়েছে, গত মাসে হামলার পরিকল্পনা ঘোষণার পর থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় সাত লাখ বাসিন্দা দক্ষিণ গাজায় স্থানান্তরিত হয়েছে।
তবে, জাতিসংঘ এবং এর মানবিক অংশীদাররা জানিয়েছে, মঙ্গলবার পর্যন্ত দক্ষিণে ঢুকেছে এমন তিন লাখ ৩৯ হাজার ৬০০ জন লোককে মনিটর করেছে তারা।
আল-মাওয়াসিতে বাস্তুচ্যুতদের জন্য ইসরায়েল মনোনীত 'মানবিক এলাকা' ইতোমধ্যেই জনাকীর্ণ এবং অনিরাপদ বলে আগেই সতর্ক করেছিল তারা।
গাজা সিটির বাসিন্দা থায়ের সাকর জানান, মঙ্গলবার স্ত্রী, সন্তান এবং বোনকে নিয়ে শেখ রাদওয়ান থেকে দক্ষিণে সফর করার চেষ্টা করেছিলেন তিনি।
এএফপিকে তিনি বলেন, "কোস্টাল রোডে ট্যাংকগুলো.... আমাদের ওপর গুলি চালায় এবং আমার বোন নিহত হয়।"
তারা এখন আল-শিফা হাসপাতালে আছে এবং "আমাদের সবাইকে মেরে ফেললেও আমরা চলে যাবো না" বলে জানান তিনি।
জাতিসংঘের মানবাধিকার কার্যালয় মঙ্গলবার গাজা সিটিতে আইডিএফের কৌশলের নিন্দা জানিয়েছে।
তারা জানিয়েছে, ইসরায়েলি হামলায় বেসামরিক নাগরিক নিহতের সংখ্যা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
আইডিএফের বেসামরিক অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করা এবং ঘরবাড়ি ধ্বংস করা" স্থায়ীভাবে বাস্তুচ্যুত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করছে।"
হামাস ইসরায়েলের দাবি না মানলে গাজা সিটি ধ্বংসের হুমকি দেওয়ার জন্য প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ-সহ ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের সমালোচনাও করেছে জাতিসংঘের মানবাধিকার কার্যালয়।
"এই ধরনের কৌশল এবং বিবৃতি বেসামরিক নাগরিকদের মধ্যে আতঙ্ক ও ভীতি সৃষ্টি করার এবং উত্তর গাজা ছেড়ে তাদের যেতে বাধ্য করার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে" বলে সতর্ক করেছে এই কার্যালয়।
দক্ষিণ ইসরায়েলে হামাসের হামলার জবাবে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী গাজায় একটি অভিযান শুরু করে ২০২৩ সালের সাতই অক্টোবর।
এতে প্রায় ১২০০ জন নিহত এবং ২৫১ জনকে জিম্মি করা হয়।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সে সময় থেকে গাজায় ইসরায়েলি হামলায় কমপক্ষে ৬৫ হাজার ৪১৯ জন নিহত হয়েছেন।








