রেকর্ড সংখ্যক ফাঁসি দেয়া জল্লাদের মুক্তি

জল্লাদ শাহজাহান নামে পরিচিত শাহজাহান ভুঁইয়া

ছবির উৎস, Channel i TV

ছবির ক্যাপশান, জল্লাদ শাহজাহান নামে খ্যাত শাহজাহান ভুঁইয়া

বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক ফাঁসি দেয়ার রেকর্ডধারী জল্লাদ শাহজাহান নামে পরিচিত শাহজাহান ভুঁইয়া অবশেষে মুক্তি পেয়েছেন।

রোববার ১৮ই জুন বেলা পৌনে ১২টার দিকে ৩২ বছর কারাভোগ শেষে মুক্তি পান তিনি।

কেরানীগঞ্জে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের কয়েদী শাখার ইনচার্জ তানজিল হোসেন এসব তথ্য জানিয়েছেন।

তিনি জানান, দেশের বিভিন্ন কারাগারে জল্লাদের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বাংলাদেশের আলোচিত ২৬ জন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামীকে ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে রায় কার্যকর করেছেন তিনি।

এর মধ্যে রয়েছেন, শেখ মুজিবুর রহমান হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ছয় আসামী বজলুল হুদা, মুহিউদ্দিন, সৈয়দ ফারুক রহমান, সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান, মহিউদ্দিন আহমেদ, আবদুল মাজেদ।

যুদ্ধাপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ছয় জন বিরোধীদলীয় নেতা - আব্দুল কাদের মোল্লা, মুহাম্মদ কামারুজ্জামান, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, সালাহ উদ্দিন কাদের চৌধুরী, মতিউর রহমান নিজামী, মীর কাসেম আলীর ফাঁসি তার হাতেই ঘটে।

আলোচিত সন্ত্রাসী এরশাদ শিকদার, জঙ্গি নেতা বাংলাভাই, আতাউর রহমান সানী, শারমীন রীমা হত্যার আসামি মনির, ডেইজি হত্যা মামলার আসামি হাসানের মৃত্যুুদণ্ডও তিনিই কার্যকর করেছেন।

কারা কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, নানা অপরাধের অভিযোগে শাহজাহান ভূইঁয়া ১৯৯১ সালে গ্রেফতার হন। শুরুতে তাকে মানিকগঞ্জ জেলা কারাগারে পাঠানো হয়।

মানিকগঞ্জে দু'টি মামলায় দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় শাহজাহান ভুঁইয়া মোট ৪২ বছরের সাজা পেয়েছিলেন। এরমধ্যে অস্ত্র মামলায় ১২ বছর এবং ডাকাতি ও হত্যা মামলায় ৩০ বছর কারাদণ্ড পান তিনি।

তবে কারাগারে সুশৃঙ্খল জীবনযাপন করায় সাধারণ রেয়াত এবং মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামিদের ফাঁসির রায় কার্যকর করায় বিশেষ রেয়াত মিলিয়ে মোট ১০ বছর ৫ মাস ২৮ দিনের মতো সাজা মওকুফ পেয়েছেন তিনি।

সে হিসেবে তিনি দেশের বিভিন্ন কারাগারে বন্দিজীবন কাটিয়েছেন ৩১ বছর ছয় মাস দুইদিনের মতো।

আইন

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, আইন
স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

তবে তিনি ২৬টি ফাঁসি দেয়ার সবকটি’তে রেয়াত পাননি।

কেননা জেলকোড অনুযায়ী, একজন জল্লাদ একটি ফাঁসি কার্যকর করলে সর্বোচ্চ দুই মাস সাজা রেয়াত পান। তবে এক বছরে সর্বোচ্চ দুই মাস রেয়াত পাওয়া যায়। এছাড়া কোন আসামী তার মোট সাজার চার ভাগের এক ভাগের বেশি সাজা কমাতে পারেন না। সে হিসেবে শাহজাহান খান এক বছরে তিনটি ফাঁসি কার্যকর করলেও তিনি ওই বছর সর্বোচ্চ দুই মাস রেয়াতই পেয়েছেন।

কারা সূত্র বলছে, জেলখানায় তিনি ফাঁসির আসামি হিসেবে নয় বরং সবার কাছে পরিচিত ছিলেন 'জল্লাদ শাহজাহান' হিসেবে এবং মুক্তির আগের দিন পর্যন্ত তিনি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের প্রধান জল্লাদ ছিলেন। কারাগারে কয়েদীদের জল্লাদের প্রশিক্ষণও দিয়েছেন তিনি।

নিজের সাজার মেয়াদ কমাতেই তিনি কয়েদি থেকে জল্লাদ বনে যান। বাংলাদেশের প্রায় সব কারাগারে তিনি প্রধান জল্লাদ হয়েছেন বলে জানা যায়।

কারামুক্তির পর তিনি সাংবাদিকদের মাধ্যমে জানান, তাকে যেন জীবনযাপনের ব্যবস্থা করে দেয়া হয়।

তিনি বলেন, “আমার বাড়ি নাই, ঘর নাই, কিছুই নাই, আমি যে যাচ্ছি আমার নিজের বাড়িতেও যাচ্ছি না, আরেক জনের বাড়িতে উঠেছি। আমার বয়স এখন ৭৪ বছর। প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমার আবেদন যেন আমাকে চলার মতো কিছু করে দেয়া হয়।”

ফাঁসি কার্যকরের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, “প্রতিটা ফাঁসিতে একটা আবেগ থাকে। কারণ মানুষ যতোই অপরাধ করুক না কেন যখন মৃত্যুর মুখে পতিত হয়, তখন সবার একটু না একটু মায়া লাগে। কিন্তু সেই মায়া আমার লাগলেও আদালত তো করবে না।”

তার বিরুদ্ধে আনা দুই মামলায় মি. ভুঁইয়াকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে ছয় মাস করে মোট এক বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছিল। কিন্তু মি. ভুঁইয়ার পরিবার অসচ্ছল হওয়ায় আবেদনের প্রেক্ষিতে কারা কর্তৃপক্ষ সেই জরিমানার অর্থ পরিশোধ করে দেয়।

কারাগারের রেকর্ড অনুযায়ী, শাহজাহান ভুঁইয়া ১৯৫০ সালের ২৬শে মার্চ জন্মগ্রহণ করেন। তিনি নরসিংদীর পলাশ উপজেলার গজারিয়া ইউনিয়নের ইছাখালী গ্রামের বাসিন্দা।