ভারতের এক রহস্যময় খুন যেভাবে আগাথা ক্রিস্টির প্রথম গোয়েন্দা উপন্যাসের প্রেরণা

প্রথম উপন্যাসের সাফল্যের পর আগাথা ক্রিস্টি ১৯২৪ সালে তার বাড়ির নামকরণ করেছিলেন স্টাইলস।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, প্রথম উপন্যাসের সাফল্যের পর আগাথা ক্রিস্টি ১৯২৪ সালে তার বাড়ির নামকরণ করেছিলেন স্টাইলস
    • Author, চেরিল্যান মোলান
    • Role, বিবিসি নিউজ, মুম্বাই

কিছু বিষয় কিন্তু পারিবারিক কলহের চেয়েও বেশি মুখরোচক হয়, বিশেষত তা যদি হয় কোন রহস্যময় খুনের ঘটনা। আর সে মামলায় যারা জড়িত, তারা যদি আপনার আত্মীয়ের মধ্যে কেউ না হন!

এই বিষয়টা অনেকের চেয়ে ভাল জানতেন বিখ্যাত লেখিকা আগাথা ক্রিস্টি, যিনি ‘কুইন অফ ক্রাইমস’ নামে পরিচিত। আর তাই হয়তো, তার প্রথম উপন্যাস 'দ্য মিস্টিরিয়াস অ্যাফেয়ার অ্যাট স্টাইলস' পাঠককে এমন একটা হত্যা কাহিনী শোনায় যার সূত্রপাত সেই পারিবারিক কলহের জেরেই।

আগাথা ক্রিস্টির লেখা ‘হুডানইট’-ধর্মী এই উপন্যাসটা প্রকাশিত হয়েছিল ১৯২০ সালে। এমিলি ইংলেথর্প নামে এক ধনী নারীর খুনের ঘটনাকে ঘিরেই বোনা গল্প।

এমিলি ইংলেথর্পের পুরো পরিবার, বন্ধু-বান্ধব এবং ঘনিষ্ঠ বন্ধু এভলিন হাওয়ার্ডসহ প্রায় সবাই সন্দেহ করে এই খুনের জন্য দায়ী তার (এমিলি ইংলেথর্পের) স্বামীই, যিনি তার চেয়ে ২০ বছরের ছোট।

গল্পের হাত ধরেই পাঠকদের প্রথম আলাপ হয় আগাথা ক্রিস্টির অন্যতম কালজয়ী চরিত্রগুলোর মধ্যে একটা এরকিউল পোয়রোর সঙ্গে। কিছুটা খামখেয়ালি স্বভাবের এই গোয়েন্দা।

তার পরবর্তী বইয়ের মতোই এই গল্পেও রয়েছে একাধিক সন্দেহভাজন ব্যক্তির উল্লেখ, একের পর এক তাক লাগানো টুইস্ট, এমন একটা সূত্রের উল্লেখ যা চোখের সামনেই রয়েছে অথচ বোঝা সহজ নয় এবং সব শেষে একটা বড় উন্মোচন যেখানে প্রকাশ পায় আসল অপরাধী কে।

তবে 'দ্য মিস্টিরিয়াস অ্যাফেয়ার অ্যাট স্টাইলস' উপন্যাসটার অনন্যতা বোধ হয় এর গল্পে - যা একটা সত্যি খুনের ঘটনা থেকে অনুপ্রাণিত।

এক শতাব্দী আগে উত্তর ভারতের মুসৌরিতে ঘটেছিল এই ঘটনাটা। পাহাড়ি এই অঞ্চল ভ্রমণপিপাসুদের কাছে বরাবরই জনপ্রিয়।

সালটা ১৯১১, বছর ৪৯-এর ফ্রান্সেস গার্নেট ওহমেকে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা হয় একটি নামী হোটেলের ঘর থেকে। এক আইরিশ ব্যারিস্টারের তৈরি ওই হোটেলটার নাম স্যাভয়।

ময়নাতদন্তের রিপোর্টে দেখা যায় মিজ ওহমেকে প্রসিক অ্যাসিড (একটি সায়ানাইড ভিত্তিক বিষ) দেওয়া হয়েছিল। খুনের অভিযোগ আনা হয়েছিল তার বন্ধু ইভা মাউন্ট স্টিফেন্সের বিরুদ্ধে, যার বয়স ছিল ৩৬।

‘অদ্ভুত পরিস্থিতির’ কারণে (যেমনটা ১৯১২ সালে একটা অস্ট্রেলিয়ান সংবাদমাধ্যমে ব্যাখ্যা করা হয়েছিল) এই খুনের মামলাটা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে শিরোনাম হয়ে ওঠে। স্থান পায় ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমেও, যেখানে ‘মুসৌরি হত্যা বিচার', 'হোটেল রহস্য' এবং 'ক্রিস্টাল গেজিং ট্রায়াল’ শিরোনাম দিয়ে মামলার বিচারের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ দেওয়া হচ্ছিল সে সময়।

‘দ্য মিস্টেরিয়াস অ্যাফেয়ার অ্যাট স্টাইলস’ উপন্যাসের হাত ধরেই পাঠকদের সঙ্গে প্রথম আলাপ হয় গোয়েন্দা হারকিউল পোইরোটের।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ‘দ্য মিস্টিরিয়াস অ্যাফেয়ার অ্যাট স্টাইলস’ উপন্যাসের হাত ধরেই পাঠকদের সঙ্গে প্রথম আলাপ হয় গোয়েন্দা এরকিউল পোয়রোর
স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

ভারতীয় লেখক রাস্কিন বন্ড, যিনি মুসৌরিতে বাস করেন এবং শান্ত এবং সবুজ পার্বত্য শহর সম্পর্কে বিস্তৃতভাবে লিখেছেন, তার একটা প্রবন্ধতেও বিষয়টার উল্লেখ রয়েছে।

ওই হত্যাকাণ্ড এবং আগাথা ক্রিস্টির প্রথম বইয়ের মধ্যে একটি যোগসূত্র তুলে ধরেছেন বিখ্যাত লেখক রাস্কিন বন্ড।

তিনি বলেন, ‘যে পরিস্থিতিতে ওই অপরাধ সংগঠিত হয়েছিল’ তার উল্লেখ আগাথা ক্রিস্টির বইয়ে রয়েছে কারণ ঘটনাটা বেশ ‘চাঞ্চল্যকর’ ছিল সেই সময়ে।

তথ্য অনুযায়ী, মিজ ওহমে ভারতে এক দশকেরও বেশি সময় যাবত বসবাস করছিলেন। লক্ষ্ণৌ শহরের বাসিন্দা ইভা মাউন্ট স্টিফেন্সের সঙ্গে এই একাকী নারীর (ফ্রান্সেস গার্নেট ওহমে) বন্ধুত্ব হয়।

আধ্যাত্মবাদী ইভা মাউন্ট স্টিফেন্সের কাছে স্ফটিক গোলকের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ দর্শনের মতো একাধিক বিষয়ে অনুশীলন করেছিলেন মিজ ওহমে।

দু’জনে কিছুদিন হোটেল স্যাভয়-এ একসঙ্গে ছিলেন।

মিজ স্টিফেন্স দাবি করেন তার বন্ধুর (মিজ ওহমের) স্বাস্থ্য ভালো যাচ্ছিল না এবং তিনিই তার দেখাশোনা করছিলেন। কিন্তু প্রসিকিউশনের অভিযোগ ছিল মিজ স্টিফেন্স তার লাভের জন্য মিজ ওহমকে বিষ দিয়ে খুন করেন।

কারণ মিজ ওহমে তার বন্ধুকে মোটা অংকের অর্থ, তিনটি নেকলেস এবং অন্যান্য গহনা রেখে গিয়েছিলেন যার উল্লেখ ছিল তার লেখা একটা চিঠিতে।

অন্যদিকে, অভিযুক্ত পক্ষের আইনজীবীর দাবি ছিল, মিজ ওহমে যে ব্যক্তিকে বিয়ে করতে ভারতে এসেছিলেন, তার মৃত্যু, ‘অবিরত দুঃখ’ আর নিজের অসুস্থতার কারণে আত্মহত্যা করেছেন।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় আগাথা ক্রিস্টি নার্স হিসাবে কাজ করতেন এবং সেই সময় বিষ সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করেছিলেন তিনি।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় আগাথা ক্রিস্টি নার্স হিসাবে কাজ করতেন এবং সেই সময় বিষ সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করেছিলেন তিনি।

এই মামলায় একের পর এক নয়া মোড় হতবাক করেছিল পুলিশসহ অনেককেই। যেমন তদন্তে প্রথমে জানা গিয়েছিল ঘটনার আগে মিজ স্টিফেন্স লক্ষ্ণৌ চলে গিয়েছিলেন এবং দ্বিতীয়ত, হোটেলের যে কামরা থেকে মৃতদেহ উদ্ধার করা হয় সেটা ভেতর থেকে বন্ধ করা ছিল।

পুলিশ মিজ ওহমের হোটেলের কামরা থেকে ঘুমের ওষুধের বোতল এবং আর্সেনিক আর প্রসিক অ্যাসিডের দুটি লেবেল ছাড়া আর কিছু পায়নি।

সে সময়ে, অর্থাৎ উনিশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে, রসায়নবিদের কাছ থেকে ওষুধ কিনতে ক্রেতাদের সই করতে হতো। যদিও প্রসিকিউশনের তরফে বলা হয়, প্রসিক অ্যাসিড কেনার জন্য যে ব্যক্তি সই করেছিলেন তার সঙ্গে ওহমের চিঠিতে পাওয়া সই মেলে না।

প্রসিকিউশন আরও বলে, ছয় মাস আগে এক বন্ধুর সঙ্গে কথোপকথনের সময় মিজ স্টিফেন্স ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন মিজ ওহমের মৃত্যুর বিষয়ে। একই সঙ্গে আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছিলেন, এক ডাক্তারের সঙ্গে তার বাগদান হবে এবং মৃত্যুর আগে ফ্রান্সেস গার্নেট ওহমে নিজের সমস্ত সম্পত্তি সেই ব্যক্তিকে দিয়ে যাবেন।

অন্যদিকে, মিজ স্টিফেন্সের পক্ষের আইনজীবী দাবি করেন, তিনিই (স্টিফেন্সই) ছিলেন মিজ ওহমের ‘সবচেয়ে নিবেদিত সঙ্গী’। একই সঙ্গে এমন কোনও প্রমাণ মেলেনি যা বলছে অভিযুক্ত (মিজ স্টিফেন্স) ওই বিষ কিনেছিলেন বা তার বন্ধুর উপর সেটা প্রয়োগ করেন।

শেষ পর্যন্ত স্টিফেন্সকে বেকসুর খালাস করে দেওয়া হয় এবং বিচারক মন্তব্য করেন, “প্রকৃতপক্ষে কোন পরিস্থিতিতে মিজ ওহমের মৃত্যু হয়েছিল তা কখনওই জানা যাবে না।”

এই মামলার প্রতিফলন আগাথা ক্রিস্টির বইয়ে রয়েছে। তার গল্পেও কেন্দ্রীয় চরিত্র এমিলি বিষক্রিয়ার কারণে মারা যায়। শুধু তাই নয়, মিজ ওহমের মতো, এমিলির দেহ যে কামরা থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল সেটাও ভিতর থেকে বন্ধ করা ছিল।

শেষ পর্যন্ত জানা যায়, যায় এমিলির সঙ্গী এভলিন হাওয়ার্ডই তাকে বিষ দিয়ে খুন করেছিল। একই সঙ্গে প্রমাণিত হয় এভলিন তার সই জাল করে ছদ্মবেশে বিষ কিনেছিলেন। আর বন্ধুকে খুনের পিছনে উদ্দেশ্য ছিল অর্থ হাতানো।

মিজ ওহমের খুনের মামলার মতোই, এমিলির মৃত্যুর অনেক আগে তাদের (এমিলির) বাড়ি ছেড়ে চলে যান বন্ধু এভিলিন হাওয়ার্ড। তাহলে ঠিক কীভাবে ষড়যন্ত্র বাস্তবায়িত করেন তিনি? এর উত্তর অবশ্য দিতে পারেন একমাত্র গোয়েন্দা পোয়রো!

কয়েক দশক পরেও এই দু’টি মামলার মধ্যে মিল ভক্তদের কৌতূহলী করে তোলে।

ভারতীয় লেখক মঞ্জিরি প্রভু যার লেখার বিষয় অপরাধমূলক ঘটনা, তিনি ২০২২ সালে ‘ইন্টারন্যাশানাল আগাথা ক্রিস্টি ফেস্টিভালে’ তার (আগাথা ক্রিস্টির) প্রথম উপন্যাস এবং ‘মুসৌরি হত্যা’র মধ্যে অদ্ভুত মিলের কথা উল্লেখ করেন।

প্রসঙ্গত, ভারতে বিষক্রিয়ার ফলে মৃত্যুর ঘটনা একমাত্র আগাথা ক্রিস্টিকেই গোয়েন্দা গল্পের অনুপ্রেরণা দিয়েছে এমনটা নয়।

সেসিল ওয়ালশও আগ্রায় একটি ঘটনার উল্লেখ করেন যাকে বলা হয় ‘ক্রাইম অফ প্যাশন’। সে সময় আগ্রা ছিল ব্রিটিশ শাসিত ভারতের আগ্রা এবং আওধের সংযুক্ত প্রদেশের অধীনে একটা অঞ্চল। এবং ওই অপরাধের ঘটনা পুরো বিশ্বকে হতবাক করেছিল।

'দ্য আগ্রা ডাবল মার্ডার: এ ক্রাইম অব প্যাশন ফ্রম দ্য রাজ’- বইয়ে সেসিল ওয়ালশ লিখেছেন, কীভাবে মিরাট শহরে বসবাসকারী ইংরেজ নারী অগাস্টা ফুলাম এবং অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান ড. ক্লার্ক তাদের নিজের যথাক্রমে তাদের স্বামী এবং স্ত্রীকে বিষ দিয়েছিলেন। ষড়যন্ত্রকারীদের উদ্দেশ্য ছিল পথের কাঁটা সরিয়ে একসঙ্গে থাকা।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের মতো, ভারতেও উনিশ শতকে বিষক্রিয়ার ঘটনা হামেশাই ঘটতো। বিষাক্ত পদার্থ, বিশেষত আর্সেনিক বিক্রির উপর কোনও নিয়ন্ত্রিত ছিল না।

ডেভিড আর্নল্ড তার বই ‘টক্সিক হিস্ট্রিস: পয়জন অ্যান্ড পলিউশন ইন মডার্ন ইন্ডিয়া’তে লিখেছেন কীভাবে আর্সেনিকের বিষক্রিয়া বাধ্য করেছিল ১৯০৪ সালে ‘ইন্ডিয়ান পয়জনস অ্যাক্ট’ চালু করতে। এই আইনের উদ্দেশ্য ছিল বিষের ব্যবহার আর বিক্রিতে নিয়ন্ত্রণ আনা।

"দশ বছর পরে, যখন ১৯১৪ সালে পয়জনস অ্যাক্টের কার্যকারিতা পর্যালোচনা করার সময় আসে, তখন ইউপি (ইউনাইটেড প্রভিন্স) সরকার সাম্প্রতিক বছরগুলিতে বিষক্রিয়ার দুটো কুখ্যাত ঘটনার কথা উল্লেখ করে –একটা ছিল ওহমে হত্যা, অন্যটি ফুলম-ক্লার্ক মামলা", তিনি বইটিতে লিখেছেন।

সত্য ঘটনাকে কেন্দ্র করে বোনা অপরাধমূলক গল্প একটা চিত্তাকর্ষক ধারা হিসাবে রয়ে গিয়েছে যা চলচ্চিত্র, পডকাস্ট এবং ওয়েব শোগুলির মাধ্যমে দর্শকদের মুগ্ধ করে চলেছে।

কিন্তু আগাথা ক্রিস্টির ভক্তদের জন্য ‘দ্য মিস্টিরিয়াস অ্যাফেয়ার অ্যাট স্টাইলস’ সব সময়ই একটা বিশেষ স্থান দখল করে থাকবে সে বিষয়ে কোনও সংশয় নেই।