সিডনিতে শপিং মলে ছুরি হামলাকারীর পরিচয় প্রকাশ করেছে পুলিশ

অস্ট্রেলিয়ার সিডনির একটি বিপণি বিতানে ছয় জনকে ছূরিকাঘাত করে হত্যার পর যে ব্যক্তি পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছিল, তার পরিচয় প্রকাশ করেছে পুলিশ।

জোয়েল কোউচি নামের ৪০ বছর বয়সী ওই ব্যক্তি খুব সম্ভবত ‘মানসিক রোগে আক্রান্ত’ বলে ধারণা করছে পুলিশ।

শনিবার সিডনির ওয়েস্টফিল্ড বন্ডি জাঙ্কশন কমপ্লেক্সে ওই ব্যক্তির হামলায় পাঁচজন নারী আর একজন পুরুষ নিহত হয়। সেই সময় একজন পুলিশ সদস্যদের গুলিতে হামলাকারীও নিহত হয়।

স্থানীয় পুলিশ জানিয়েছে ওই ঘটনায় বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে কয়েকজন আশঙ্কাজনক অবস্থায় রয়েছে। এদের মধ্যে একটি শিশুও রয়েছে।

কিন্তু কেন নারীদের বেশি লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে, এই প্রশ্নের জবাবে নিউ সাউথ ওয়েলসের পুলিশ কমিশনার কারেন ওয়েব সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘’এই বিষয়েও অবশ্যই তদন্ত হবে’’।

কিন্তু এই হামলাকে সন্ত্রাসী হামলা বলে তিনি বর্ণনা করতে চা না। কারণ পুলিশের বিশ্বাস, এর পেছনে কোন আদর্শিক কারণ নেই।

মি. কাউচি পুলিশের কাছে পরিচিত একজন ব্যক্তি হলেও এর আগে কখনো গ্রেপ্তার হননি। কুইন্সল্যান্ড পুলিশ জানিয়েছে, ১৭ বছর বয়সে তার একবার মানসিক রোগের চিকিৎসা দেয়া হয়েছিল।

তার এই হামলার ঘটনাকে ‘ভয়াবহ’ বলে তার পরিবারের সদস্যরা বর্ণনা করেছে। হতাহতদের পরিবারের প্রতি তারা সমবেদনাও প্রকাশ করেছে।

যে পুলিশ কর্মকর্তা তাকে গুলি করে হত্যা করেছেন, তার প্রতিও তাদের কোন ক্ষোভ নেই বলে জানিয়েছেন। কারণ ‘’তিনি অন্যদের রক্ষা করার জন্য তার দায়িত্ব পালন করেছেন। আমরা আশা করি, তিনিও ভালো থাকবেন।’’

সিডনিতে যে কটেজে মি. কাউচি থাকছেন, সেখানে পুলিশ তল্লাশি চালালেও তার উদ্দেশ্য সম্পর্কে কোন তথ্য পায়নি।

পুলিশের দাবি অনুযায়ী ছুরি হামলার ঘটনাটি ঘটে অস্ট্রেলিয়ার স্থানীয় সময় দুপুর তিনটার পরপর।

নিউ সাউথ ওয়েলসের অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার অ্যান্থনি কুক জানান যে সন্দেহভাজন হামলাকারী দুপুরে ৩টা ১০ মিনিটের দিকে শপিং মলে প্রবেশ করেন।

মি. কুকের ভাষ্য অনুযায়ী, এর কিছুক্ষণ পরপরই হামলাকারী শপিং সেন্টার থেকে বের হয়ে যান এবং ৩টা ২০ মিনিটের দিকে আবার শপিং মলে ঢোকেন এবং ছোরা হামলা শুরু করেন।

সিডনি শহরের পূর্বাঞ্চলের বন্ডি এলাকার ওয়েস্টফিল্ড শপিং সেন্টারে দুপুর তিনটার কিছুক্ষণ পর প্রবেশ করে সন্দেহভাজন হামলাকারী। এর কিছুক্ষণ পরই শপিং সেন্টারের পঞ্চম তলায় এই ঘটনা ঘটে।

পূর্ব সিডনির কেন্দ্রীয় এলাকার অন্যতম প্রধান শপিং মল ওয়েস্টফিল্ড শপিং সেন্টার। এটি বিখ্যাত বন্ডি বিচের কাছে অবস্থিত।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান হামলা চলাকালীন সময় শপিং সেন্টারের ভেতর ‘ভয়াবহ আতঙ্কের’ পরিস্থিতি তৈরি হয়। ভেতরে উপস্থিত মানুষজন ‘চিৎকার ও দৌড়াদৌড়ি’ করছিল বলে বলছিলেন তারা।

একজন প্রত্যক্ষদর্শী দাবি করেন তিনি হামলাকারীকে একটি ‘বড় ছুরি’ হাতে তাদের দিকে ধেয়ে আসতে দেখেন।

“সে (হামলাকারী) আমাদের দিকে এগিয়ে আসতে থাকে এবং আমি শুধু শুনতে পাই ‘ওটা ফেলে দাও’ আর তারপর গুলির শব্দ পাই। তাকে একজন পুলিশ অফিসার পেছন থেকে গুলি করে। তাকে গুলি না করলে সে হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে যেত।”

ঐ প্রত্যক্ষদর্শীর ভাষ্যে, হামলাকারী ‘খুনের নেশায় মত্ত’ ছিল। তিনি বলছিলেন যে তিনি একজন নারী ও একজন পুরুষের মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেছেন।

আরেকজন প্রত্যক্ষদর্শী রাশদান আকাশাহ বিবিসি সাংবাদিক কেটি ওয়াটসনকে জানান যে এক তরুণ একটি লাঠি নিয়ে হামলাকারীর বিরুদ্ধে লড়াই করার চেষ্টা করছিল।

১৯ বছর বয়সী আকাশাহ শপিং মলের একটি কাপড়ের দোকানে কাজ করেন। হামলাকারী হামলা শুরু করার পর আশেপাশের সবাই দৌড়াদৌড়ি করা শুরু করে বলে জানান তিনি।

“আমি এক ব্যক্তিকে দেখি হামলাকারীর সামনে একটি পোল বা খুঁটি জাতীয় লম্বা একটা জিনিস দিয়ে এসকেলেটরের সামনে দাঁড়িয়ে তার পথরোধ করার চেষ্টা করতে। তিনি দূর থেকে সেটা দিয়ে ছুরি হাতে হামলাকারীকে বাধা দেয়ার চেষ্টা করছিলেন।”

হামলাকারী হামলার এক পর্যায়ে এক নারী পুলিশ কর্মকর্তার গুলিতে নিহত হন বলে জানিয়েছে পুলিশ।

শনিবার সংবাদ সম্মেলনে অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার অ্যান্থনি কুক জানান, “হামলাকারী যখন লেভেল ফাইভে পৌঁছে গেছে, তখন তাকে পেছন থেকে অস্ত্র ফেলে দিতে বলেন একজন পুলিশ অফিসার।”

“তিনি তাকে সতর্ক করে যখন তার পেছনে পেছনে যেতে থাকেন, তখন এক পর্যায়ে সে ঐ অফিসারের দিকে ঘুরে ছুরি তোলে এবং অফিসারকে আক্রমণে উদ্যত হয়। তখন অফিসার গুলি করে এবং হামলাকারী মারা যায়।”

অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি অ্যালবানিজ এই ঘটনায় নিহত ও হতাহতদের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে সামাজিক মাধ্যম এক্সে টুইট করেছেন। তিনি লিখেছেন, “দু:খজনকভাবে, একাধিক হতাহতের খবর জানা গেছে আর সব অস্ট্রেলিয়ানের সমবেদনা এখন যাদের আপনজন হতাহত হয়েছেন, তাদের প্রতি।”

নিউ সাউথ ওয়েলস অ্যাম্বুলেন্স বিভাগের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন যে সিডনির বিভিন্ন এলাকার হাসপাতালে অন্তত আটজনকে স্থানান্তরিত করা হয়েছে।

নিউ সাউথ ওয়েলসের অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার অ্যান্থনি কুক জানিয়েছেন যে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ব্যক্তিদের মধ্যে ‘বেশ কয়েকজন গুরুতর ও আশঙ্কাজনক অবস্থায়’ রয়েছেন।

ঘটনার প্রায় তিন ঘণ্টা পর স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টার দিকে আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে হামলা সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য জানায় নিউ সাউথ ওয়েলসের পুলিশ। আহতদের মধ্যে নয় মাস বয়সী এক শিশু রয়েছে বলেও জানানো হয় ঐ সংবাদ সম্মেলনে।