আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
চিফ প্রসিকিউটরের পদে রদবদল মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার বিচারে কতটা প্রভাব ফেলবে?
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলামকে সরিয়ে দিয়ে আমিনুল ইসলামকে নতুন চিফ প্রসিকিউটর নিয়োগ দেওয়াকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলছে বেশ আলোচনা।
এরই মধ্যে, বিএনপিপন্থি আইনজীবী নতুন চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম ট্রাইব্যুনালে গিয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন।
চব্বিশের গণ অভ্যুত্থানের পরে পাঁচই সেপ্টেম্বর তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার জামায়াতে ইসলামীপন্থি সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী তাজুল ইসলামকে চিফ প্রসিকিউটর হিসেবে নিয়োগ দেয়। যদিও আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে এই ট্রাইব্যুনালে যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত জামায়াত নেতাদের আইনজীবী ছিলেন তাজুল ইসলাম।
একইসাথে পুনর্গঠন করা হয় ট্রাইব্যুনাল।
এরপর থেকে মি. ইসলাম জুলাইয়ে গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ২১টি মামলায় চিফ প্রসিকিউটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
যেগুলোর আসামি শেখ হাসিনা, তার সরকারের মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগের নেতা, সাবেক বিচারপতি, বর্তমান ও সাবেক সেনা কর্মকর্তা এবং পুলিশের কর্মকর্তারা।
গত ১৭ মাসে বিচারিক কার্যক্রম শেষে তিনটি মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার রায় ঘোষণা করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। বিচারিক কার্যক্রম শেষে রায় ঘোষণার জন্য অপেক্ষমান রয়েছে জুলাইয়ে আন্দোলনের সময় নিহত আবু সাঈদ হত্যা মামলাসহ দুইটি মামলা।
ফলে মামলাগুলোর এই পর্যায়ে চিফ প্রসিকিউটরের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে রদবদল হওয়ায় বিচারিক প্রক্রিয়ায় কোন প্রভাব পড়বে কি না এমন প্রশ্ন উঠেছে।
যদিও আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিবর্তনের ফলে বিচারিক প্রক্রিয়ায় তেমন কোনো প্রভাব পড়বে না কিন্তু তারা আশা করছেন, বিচারিক প্রক্রিয়ায় যেসব সমস্যা ছিলো সেগুলোর নিরসন হবে।
End of বিবিসি বাংলার অন্যান্য সংবাদ
রোববার থেকেই তাজুল ইসলামের নিয়োগ বাতিলের গুঞ্জন
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রোববার রাত থেকেই তাজুল ইসলামকে চিফ প্রসিকিউটরের পদ থেকে অপসারণের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে।
ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যান এই নিয়োগ বাতিল হতে যাচ্ছে মর্মে ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস পোস্ট করেন।
মি. বার্গম্যান সাংবাদিক হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করছেন।
তবে, রাতে নিয়োগ বাতিলের প্রজ্ঞাপন দেয়নি আইন মন্ত্রণালয়।
সোমবার সকালে তাজুল ইসলামের নিয়োগ বাতিল ও নতুন চিফ প্রসিকিউটরের নিয়োগের প্রজ্ঞাপন দেয় আইন মন্ত্রণালয়।
পরে দুপুরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এক ব্রিফিং-এ তাজুল ইসলাম বলেন, "আমি তো মনে করি কোনো শঙ্কার কারণ নেই। এটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।"
নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নিলে নিজের পছন্দসই ব্যক্তিকে নিয়োগ দেবেন সেটাই স্বাভাবিক বলে জানান তিনি।
নতুন চিফ প্রসিকিউটরকে শুভকামনা জানিয়ে, প্রয়োজনে সহযোগিতা ও পরামর্শও দেবেন বলে উল্লেখ করেন তিনি।
"আমি একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে চাইবো যে বিচার প্রক্রিয়া এখানে চলমান আছে তা যেন অব্যাহত থাকে। বাংলাদেশে পুনরায় যাতে এ ধরনের অপরাধ ফিরে না আসে" বলেন তিনি।
'প্রতিহিংসা পরায়ণতার অবসান হবে বলে আশা করি'
নতুন চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম ট্রাইব্যুনালের দায়িত্ব গ্রহণ করার পরে এক প্রতিক্রিয়ায় 'জুলাই শহীদদের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী' ট্রাইব্যুনালে বিচার কার্যক্রম চালানোর অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছেন।
সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা অনুযায়ী মামলা নিষ্পত্তি হয়নি উল্লেখ করে মি. ইসলাম বিবিসি বাংলাকে বলেন, "আমি চেষ্টা করবো এই ট্রাইব্যুনালগুলোতে আরো গতিশীলতা আনার জন্য।"
তবে, ট্রাইব্যুনালের মামলাগুলো যে অবস্থায় রয়েছে তাতে বিচারিক কার্যক্রমে প্রভাব পড়বে কি না, নতুন করে তদন্ত করতে হবে কি না প্রশ্ন করলে এখনই এ বিষয়ে উত্তর দিতে রাজী হননি তিনি।
অন্ততপক্ষে সাতদিন কাজ করার পর এ বিষয়ে উত্তর দিতে পারবেন বলে জানান মি. ইসলাম।
দায়িত্ব গ্রহণের প্রথমদিনই নতুন চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম জানান, যারা অন্যায় করেনি হয়রানির শিকার হবে না তারা।
"এই ট্রাইব্যুনালে যে সকল অপরাধীরা বিচারের সম্মুখীন, তাদের জন্য সুস্পষ্ট ম্যাসেজ যে যারা কোনো অন্যায় করেননি তারা কোনো হয়রানির শিকার হবেন না, অন্তত প্রসিকিউশনের মাধ্যমে। কিন্তু যারা প্রকৃত অপরাধী তাদের প্রতি প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে একটা ক্লিয়ার ম্যাসেজ আমি দিতে চাই যে যারা অপরাধী তাদের প্রাপ্য সাজা তাদের পেতে হবে" বলেন মি. ইসলাম।
এদিকে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ট্রাইব্যুনালেরই একজন প্রসিকিউটর বিএম সুলতান মাহমুদ সাবেক চীফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে আর্থিক লেনদেনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ তুলেছেন।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীদের কেউ কেউ তাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে বিচারিক প্রক্রিয়ায় ব্যত্যয় ঘটানোর অভিযোগও তুলেছেন।
প্রসিকিউটরদের বিরুদ্ধে বাড়তি সুবিধা নেওয়ার যে অভিযোগ উঠেছে, তদন্ত করে ব্যবস্থা নেবেন কি না এমন প্রশ্ন করা হলে উত্তর না দিয়ে সময় চান তিনি।
আমিনুল ইসলাম বলেন, "আমি মনে করি যে, আমি অফিসে বসি। তো সেখানে আপনি যে কথাগুলো বললেন যদি ওইরকম কিছু হয় নিশ্চয়ই আমার কাছে আসবে এবং তখন এগুলো দেখা যাবে।"
নতুন করে এই পরিবর্তনের ফলে চব্বিশের গণ অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া কীভাবে এগোবে এমন কোন নির্দেশনা আইনমন্ত্রীর কাছ থেকে পেয়েছেন কিনা, এমন প্রশ্নে মি. ইসলাম জানান, "আইনের বাইরে অন্য কোনো নির্দেশনা থাকতে পারে না।"
জুলাইয়ের মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার বিচারিক প্রক্রিয়ার শুরু থেকেই মানবাধিকার কর্মী ও আইন বিশেষজ্ঞরা নানা ব্যত্যয় ও ত্রুটির কথা নিয়ে সমালোচনা করে আসছিলেন।
তাদেরই একজন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সারা হোসেন।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মামলায় গত ১৫ মাসে বিনা বিচারে অনেককেই দীর্ঘদিন ধরে আটকে রাখা হয়েছে।
"মূল বিষয় যেটা আমরা দেখেছি গত ১৫ মাসে যে বিনা বিচারে অনেকে আটক আছেন এবং বিনা বিচারে অনেক ভিকটিমরাও কিন্তু অপেক্ষা করেছেন অনেক মাস ধরে। কোনো সুরাহা পান নাই বা বিচার পান নাই" বলেন মিজ হোসেন।
চিফ প্রসিকিউটর পদের এই পরিবর্তনের ফলে প্রতিহিংসা পরায়ণতার অবসান হবে বলে আশাপ্রকাশ করেছেন তিনি।
"আশা করছি, বিষয়গুলো নতুনভাবে দেখা হবে, একটা সুযোগ আছে। প্রতিহিংসা পরায়ণ যে প্রক্রিয়াগুলো আমরা দেখেছি চলমান হতে, সেগুলোর আশা করি অবসান হবে" বিবিসি বাংলাকে বলেন সারা হোসেন।
তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, ''আমি আশা করছি যেই সমস্যাগুলো ইতোমধ্যে দেখা দিয়েছে যে, অনেক লম্বা সময় অনেককে আটক রাখা বিনা বিচারে এবং তদন্ত প্রক্রিয়ায় অনেক দীর্ঘসূত্রিতা নিরসনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।"
এদিকে, সুপ্রিম কোর্টের আরেকজন আইনজীবী মনজিল মোরসেদও মনে করেন, চিফ প্রসিকিউটর পরিবর্তনের ফলে বিচারে কোনো প্রভাব পড়বে না।
"নতুন যিনি নিয়োগ পেয়েছেন ট্রায়ালে তিনি অভিজ্ঞ। এক্ষেত্রে ট্রায়াল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই" বলেন মি. মোরসেদ।
একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময়কার মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আওয়ামী লীগের আমলে জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের বিচার করায় প্রতিহিংসাবশত এই বিচার হচ্ছে, আওয়ামী লীগ নেতাদের এমন রাজনৈতিক বক্তব্যের অবসান হবে বলেও মনে করেন আইনজীবী মনজিল মোরসেদ।
"নতুন চিফ প্রসিকিউটর জামায়াতে ইসলামীর না, আবার আমার যতদূর ধারণা কোনো যুদ্ধাপরাধীর পক্ষে ট্রাইব্যুনালে লড়েননি। কাজেই বিচারের বিপক্ষে আওয়ামী লীগ যে আলোচনাটা করতো সেটাও পরিবর্তন হবে" বলে মন্তব্য করেন মি. মোরসেদ।
ট্রাইব্যুনালের মামলাগুলোর যে অবস্থা
পুনর্গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জুলাইয়ের মানবতাবিরোধী অপরাধের ২১টি মামলায় ৪৫৭ জনের বিরুদ্ধে বিচার চলছে।
আসামিদের মধ্যে ২৯৩ জন পলাতক এবং ১৬৪ জন কারাগারে রয়েছে।
প্রথমে একটি ট্রাইব্যুনালে বিচারিক কার্যক্রম চললেও পরে আরেকটি ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়।
দুই ট্রাইব্যুনালে এ বছরের নয়ই ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ২৪টি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে।
যে তিনটি মামলায় রায় ঘোষণা করা হয়েছে, সেগুলোর একটিতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল।
এই মামলায় সাবেক আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন রাজসাক্ষী হওয়ায় সাজা কমিয়ে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
এছাড়া ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান হাবিবসহ ১১ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল।
এছাড়া গাজীপুরের সাবেক সংসদ সদস্য সাইফুল ইসলামসহ ১৫ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল-২। রাজসাক্ষী হওয়া এক আসামিকে খালাস করে রায় দেওয়া হয় এই মামলায়।
জুলাইয়ের মানবতাবিরোধী অপরাধের আরো ৩৪টি মামলা এখন তদন্তাধীন রয়েছে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থায়।
এরই মধ্যে, রামপুরায় ছাদের কার্নিশে ঝুলে থাকা ব্যক্তিকে হত্যার মামলার বিচার কাজ শেষ হয়েছে। আগামী চৌঠা মার্চ রায় ঘোষণা করা হবে।
এই ট্রাইব্যুনালেই আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের হওয়া গুম ও নির্যাতনের বিচার চলছে।
বিচারের মুখোমুখি হয়েছেন সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসান। সাবেক ও বর্তমান কর্মরতসহ মোট ২০জন সেনা কর্মকর্তা মামলার আসামি।
পুলিশের একেবারে উর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ মোট ৬৫ জন জুলাইয়ের মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার আসামি।