আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
শেখ হাসিনার তৈরি ট্রাইব্যুনালে তারই মৃত্যুদণ্ড, যেমন ছিল আদালতের চিত্র
- Author, মুকিমুল আহসান
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
গত বছরের জুলাই অগাস্টের গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এই রায়কে ঘিরে সকাল থেকেই কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয় ট্রাইব্যুনাল ও আশপাশের এলাকায়।
এই রায় শুনতে সকাল থেকেই আদালতে হাজির হন জুলাই অগাস্টের আন্দোলনে আহত ব্যক্তি, নিহতদের পরিবারের সদস্য, জুলাই আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া শিক্ষার্থীরা।
আদালতের ভেতরের যখন রায় ঘোষণা হচ্ছিল, তখন বাইরে বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মীদের জড়ো হয়ে মিছিল শ্লোগান দিতে দেখা গেছে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করতে শেখ হাসিনা যে আদালত গঠন করেছিলেন ২০১০ সালে, তার ১৫ বছর পর সেই আদালতেই মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করা হয়েছে তার।
শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণার পর এ নিয়ে নানা আলোচনা দেখা গেছে আদালতের বাইরে।
শেখ হাসিনার রায় ঘিরে সকাল থেকে অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ঘিরে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকলেও রায় ঘোষণার আগে আদালতের বাইরে শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের দাবি জানিয়ে মিছিল শ্লোগান দিতে দেখা যায় বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মীদের।
সকাল ১১টায় রায় ঘোষণার কথা থাকলেও দুপুর সাড়ে ১২টা পর এজলাসে আসেন বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল। এরপরই টানা দুই ঘণ্টায় রায় পড়ে শোনায় আদালত।
যে রায়ে মৃত্যুদণ্ডের সাজা পেয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। যেটি বাংলাদেশের প্রথম কোন সাবেক সরকার প্রধানের মৃত্যুদণ্ডের রায়।
আদালত বসে সাড়ে ১২টায়
রোববার বিকেলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল জানায় সোমবার আদালত বসবে সকাল ১১টায়। এর আগেই আদালত কক্ষে আসেন প্রসিকিউশন টিম, আসামিপক্ষ, জুলাই আগস্টে আহত ও নিহতদের পরিবারের সদস্য, জুলাই আন্দোলনকারীরা উপস্থিত ছিল।
দুপুর বারোটা পর্যন্ত সেখানে দেখা যায় নি ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান ও দুইজন বিচারপতিকে।
দুপুর সোয়া বারোটার দিকে ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত হয়ে চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম এসে জানান, "দশ মিনিটের মধ্যে বিচারপতিরা আসবেন এজলাসে।''
দুপুর ১২টা ৩২ মিনিট। এজলাসে উপস্থিত হন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদার, বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
এরপর জুলাই অগাস্টের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে প্রসিকিউশন টিম ও সংশ্লিষ্ট সবার ভূমিকার কথা তুলে ধরেন চেয়ারম্যান মি. মজুমদার।
তিনি জানান, ছয়টি অধ্যায়ের ৪৫৩ পৃষ্ঠার রায় প্রস্তুত করেছে ট্রাইব্যুনাল। এই রায়ের সংক্ষিপ্তসার ঘোষণা করার কথাও জানান ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান।
আদালত কক্ষ কানায় কানায় পূর্ণ, বসার আসন ভরে যাওয়ায় দাঁড়িয়ে রায় শোনার জন্য অপেক্ষা করছেন অনেকে। আদালত রায় পড়া শুরু হলে, পিনপতন নীরবতা নেমে আসে আদালতে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১–এর এজলাস থেকে রায় ঘোষণার কার্যক্রম সরাসরি সম্প্রচার করে বাংলাদেশ টেলিভিশন। বাংলাদেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমও সেই ভিডিও সম্প্রচার করে।
কাঁচের দেয়ালে ঘেরা কাঠগড়ায় সাবেক আইজিপি
গত বছরের জুলাই অগাস্টে সংগঠিত মানবতাবিরোধী অপরাধের সুনির্দিষ্ট পাঁচটি অভিযোগ আনা হয় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও সাবেক আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুনের বিরুদ্ধে।
শেখ হাসিনা ও মি. কামালকে শুরু থেকেই পলাতক হিসাবে বিচারকাজ চলে। তারা অবস্থান করছেন ভারতে। এই মামলার একমাত্র আসামি সাবেক আইজিপি মি. মামুনই একমাত্র আসামি যিনি শুরু থেকে ছিলেন কারা হেফাজতে। একই সাথে তিনি এই মামলার রাজসাক্ষী।
যে কারণে সকাল থেকেই তাকে নিয়ে বাড়তি আগ্রহ ছিল সবার। মামলার রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে সকালে নয়টার পরপরই আদালতে হাজির করা হয় সাবেক আইজিপি মি. মামুনকে। সকাল থেকে তাকে রাখা হয় ট্রাইব্যুনালের হাজতখানায়।
সাড়ে এগারোটা নাগাদ কানায় কানায় পূর্ণ আদালত কক্ষ। বিচারপতিদের সামনে একপাশে আসামিপক্ষ আরেকপাশে অবস্থান ছিল প্রসিকিউশন টিমের।
আদালত কক্ষে ঢুকতেই দরজার বাম পাশে কাঁচের দেয়ালে ঘেরা ছোট একটি ঘর। আমরা যখন আদালত কক্ষে ঢুকি তখন সেই ঘরে দেখা মিললো আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য আ ম উবায়দুল মুক্তাদিরকে।
মানবতাবিরোধী অপরাধে মি. মুক্তাদিরের একটি মামলার শুনানি পূর্ব নির্ধারিত তারিখ ছিল সোমবারই। যে কারণে আগে থেকেই ওই কাঁচের কক্ষে ছিলেন মি. মুক্তাদির।
দুপুর সাড়ে ১২টায় ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান এজলাসে বসেই জানালেন ওই মামলার শুনানির পরবর্তী দিন ডিসেম্বরে। যে কারণে সেখান থেকে নিয়ে যাওয়া হয় মি. মুক্তাদিরকে।
এর ঠিক দুই মিনিটের মাথায় কাঁচের দেয়ালে ঘেরা ঘরে আনা হয় সাবেক আইজিপি মি. মামুনকে।
রায় পড়া শুরু হয়, দুপুর ১২টা ৪০ মিনিটের দিকে। যখন ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান রায় পড়া শুরু করেন তখন ওই কাঁচে ঘেরা কাঠগড়ার মধ্যে একটি চেয়ারে বসা ছিলেন সাবেক আইজিপি মি. মামুন।
কাঁচের দেয়ালের সেই ঘর থেকে সরাসরি এজলাস দেখা গেলেও সেখানে দুইটি মনিটরে আদালতের রায় দেখারও সুযোগ রয়েছে।
রায় ঘোষণার সময় বিমর্ষ মুখে কখনো মনিটরের দিকে, কখনো নিচের দিকে তাকিয়ে রায় শুনতে দেখা যায় সাবেক এই আইজিপিকে।
ভিন্ন ভিন্ন অভিযোগে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের মৃত্যুদণ্ডের রায় দেওয়া হলেও রাজসাক্ষী হওয়ায় মি. মামুনের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেনি প্রসিকিউশন টিম।
যে কারণে জুলাই অগাস্টের মানবতাবিরোধী অপরাধের প্রথম মামলায় পাঁচ বছরের সাজা দেওয়া হয় সাবেক এই পুলিশ মহাপরিদর্শকে।
নিজের সাজার রায় শোনার পরও তিনি নিশ্চুপ ছিলেন। রায়ের পরপরই তাকে পুলিশ পাহারায় পুনরায় ট্রাইব্যুনালের হাজতখানায় নিয়ে যাওয়া হয়। তবে এই পুরোটা সময় তিনি কারও সঙ্গে কোনও কথা বলেননি। রায়ের পর সাংবাদিকরা দূর থেকে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলেও চুপ ছিলেন তিনি।
নিহতদের স্বজনের কান্না
ট্রাইব্যুনালের তিন বিচারপতি মিলে প্রায় ১৯৪ মিনিট ধরে রায় ঘোষণা করেন।
বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মত এ মামলার রায় ঘোষণার কার্যক্রম আদালত থেকে সরাসরি সম্প্রচার করা হলেও নিহতের স্বজনদের অনেকেই আদালতে ভিড় করেন।
জুলাই আন্দোলনে নিহত মীর মুগ্ধের পিতা ও ভাই, নিহত সাংবাদিক তাহির জামান প্রিয়র মা, নিহত আহনাফের মা, মোহাম্মদপুরে নিহত মাহমুদুর রহমানের বোনও আদালতে উপস্থিত হয়েছিলেন।
এছাড়াও ছিলেন জুলাই অগাস্টে অঙ্গ চোখ হারানো আহতদের কেউ কেউ।
বিকেল তিনটার কিছুক্ষণ আগে রায় ঘোষণা হয়। যখন শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের রায় পড়ে শোনান তখন আদালত কক্ষে কান্নায় ভেঙে পড়েন নিহতদের স্বজনরা।
সেখান থেকে বের হয়ে তাহির জামান প্রিয়র মা সামসি আরা জামান সাংবাদিকদের জানান, শেখ হাসিন ও আসাদুজ্জামান খান কামালের মৃত্যুদন্ডে তারা সন্তুষ্ট।
তবে সাবেক আইজিপি মি. মামুনকে পাঁচ বছরের সাজা দেওয়ায় এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন মিজ জামান ও উপস্থিত নিহত অন্য পরিবারের সদস্যরাও। এ নিয়ে উচ্চ আদালতে আপিলের দাবিও জানান তারা।
আদালতজুড়ে কড়া নিরাপত্তা
ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মামলার রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে আগের রাতেই সুপ্রিম কোর্টের পক্ষ থেকে আদালতে সেনা মোতায়েন করার অনুরোধ জানানো হয়।
সকাল সাড়ে নয়টার দিকে হাইকোর্ট মাজারসংলগ্ন ট্রাইব্যুনালের ফটকে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ, র্যাব ও আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) সদস্যদের সতর্ক অবস্থানে দেখা যায়।
সেনাবাহিনী ও ডিএমপির সাঁজোয়া যান পথে পথে। মাজার গেটের সামনে সেনাবাহিনীকে অবস্থান নিতে দেখা যায়।
এর পাশাপাশি আদালতের গেটে অবস্থান নিয়ে ছিল পুলিশ, র্যাব, বিজিবির। আদালতের প্রতিটি গেটে কয়েক স্তুরের নিরাপত্তা বেষ্টনী ছিল পুলিশের।
আদালতের পাশেই হাইকোর্ট, মৎসভবন, সচিবালয় এলাকার প্রত্যেকটি মোড়ে মোড়ে বসানো হয় চেকপোস্ট এবং নিরাপত্তা তল্লাশিও জোরদার করা হয়।
হাইকোর্টের কর্মী, আইনজীবী, গণমাধ্যমকর্মী ছাড়া সাধারণ কাউকে ট্রাইব্যুনাল এলাকায় প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি।
গণমাধ্যমকর্মী, আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্য ও আইনজীবীর বাইরে এই রায় শুনতে আদালতে এসেছিলেন জুলাই অগাস্টে গণঅভ্যুত্থানে আহতরা ও নিহতদের পরিবারের সদস্যরা।
এছাড়াও জুলাই অগাস্টে আন্দোলনের কর্মী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকসুর ভিপি-জিএসসহ ছাত্রদলের কয়েকজন নেতাও এসেছিলেন ট্রাইব্যুনালের রায় শুনতে।