বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর সরানো ও নিয়োগ নিয়ে এত আলোচনা কেন?

    • Author, সজল দাস
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
  • পড়ার সময়: ৬ মিনিট

বাংলাদেশের আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শীর্ষ নেতৃত্ব গভর্নর পদে আকস্মিক পরিবর্তন দেশটির অর্থনীতিতে নতুন এক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সদ্য সাবেক গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরকে সরিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে যেমন প্রশ্ন উঠেছে, তেমনি নতুন গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের নিয়োগ নিয়েও নানা আলোচনা চলছে।

অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, হঠাৎ কি কারণে মেয়াদ থাকার পরও অরাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানটির গভর্নরকে সরিয়ে দেওয়া হলো।

নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার কযেকদিনের মধ্যে নেওয়া এই সিদ্ধান্তটি ব্যাংকিং খাতের পেশাদারিত্ব এবং স্বায়ত্তশাসনের গতিপ্রকৃতি নিয়েও নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে বলেই মনে করেন খাত সংশ্লিষ্টদের অনেকে।

তারা বলছেন, নতুন সরকার এলে নতুন কাউকে দায়িত্ব দেওয়া হবে, এটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু যেভাবে এটি করা হয়েছে, তা গ্রহণযোগ্য নয়।

সাবেক গভর্নরকে সরিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়াটি ভালো ইঙ্গিত নয় বলেই মনে করেন বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন।

তিনি বলছেন, "একজনকে সরিয়ে আরেকজনকে নিয়োগ দেওয়া হলো, তার মানে আগে থেকেই সব প্রস্তুত ছিল। রাখতে না চাইলে ওনাকে আগে থেকেই বলে দিলে হতো।"

এছাড়া মি. মনসুর গভর্নর থাকা অবস্থায় আর্থিক খাতের সংস্কারে যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল, সেগুলো চলমান থাকবে কিনা- এ নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেছেন কেউ কেউ।

অধ্যাদেশের মাধ্যমে আইন পরিবর্তনের যে কাজগুলো সাবেক গভর্নর করেছেন, সেগুলো সংসদে পাশ না হলে এটি ব্যবহার করে বিগত সরকার যেসব কাজ করেছে তার সবই বৈধতা হারাবে বলেও মনে করেন অর্থনীতিবিদরা।

তারা বলছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের এই পরিবর্তন কেবল একজন ব্যক্তির প্রস্থান বা আগমনের বিষয় নয়, এটি বাংলাদেশের সামগ্রিক আর্থিক স্থিতিশীলতার সাথে জড়িত।

গভর্নর হিসেবে নতুন নিয়োগ পাওয়া মোস্তাকুর রহমানকে নিয়েও নানা আলোচনা সামনে আসছে।

বিশেষ করে মি. রহমানের ব্যবসায়িক পরিচয়ের সঙ্গে আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রধান হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার বিষয়টি 'কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট' বা স্বার্থের দ্বন্দ্ব তৈরি করে কিনা, এমন প্রশ্ন তুলেছেন অর্থনীতিবিদদের অনেকে।

তবে এ নিয়ে বুধবার সাংবাদিকদের প্রশ্নে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, নতুন সরকারের যে কর্মসূচি বা অগ্রাধিকার রয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়নের প্রয়োজনে আরও অনেক জায়গায় পরিবর্তন হবে। এটা খুবই স্বাভাবিক বিষয় বলেও মন্তব্য তার।

"একটা নতুন সরকার এসেছে। নতুন সরকারের অগ্রাধিকার আছে। পরিবর্তন শুধু বাংলাদেশ ব্যাংকেই হয়নি। এটা অনেক জায়গায় হচ্ছে এবং হতেই থাকবে," বলেও জানান মি. চৌধুরী।

পরিবর্তনের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন

নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই নানা ইস্যুতে অস্থিরতা চলছিল বাংলাদেশ ব্যাংক কার্যালয়ে। গভর্নরের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ তুলে কর্মসূচি পালন করছিলেন ব্যাংকের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা বিবিসি বাংলাকে জানান, সরকার বদলের পর থেকেই প্রতিষ্ঠানটির সিনিয়র কর্মকর্তাদের অনেকে গভর্নরের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রকাশ্যে অসন্তোষ জানাচ্ছিলেন।

গত ২৩ ও ২৪শে ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিলের নেতৃত্বে কয়েকশ কর্মকর্তা সাবেক গভর্নরের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ কর্মসূচিও করেছেন বলে জানান তিনি।

বিক্ষুব্ধদের অভিযোগ ছিল, ড. আহসান এইচ মনসুর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রশাসনে 'স্বৈরাচারী' মনোভাব কায়েম করেছিলেন এবং ব্যাংকের নিজস্ব বিধি লঙ্ঘন করে বিলাসবহুল গাড়ি কেনাসহ বিভিন্ন আর্থিক অনিয়মে জড়িয়েছেন।

এ বিষয়ে জানতে সদ্য সাবেক গভর্নরের সঙ্গে বিবিসি বাংলা যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তার সাড়া মেলেনি।

অবশ্য তাকে দায়িত্ব থেকে সরানোর আগে একটি সংবাদ সম্মেলনে মি. মনসুর দাবি করেছিলেন, কোনো গোষ্ঠীর ইঙ্গিতে প্রতিষ্ঠানের বিধিবিধান না মেনে এখতিয়ার বহির্ভুত বিষয়ে মন্তব্য করায় কয়েকজন কর্মকর্তাকে শোকজ করা হয়েছে।

"বাংলাদেশ ব্যাংকে যেটা ঘটছে সেটি অনভিপ্রেত। কোনো একটা বিশেষ মহল কিছু স্বল্প সংখ্যক কর্মকর্তাকে ব্যবহার করে আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা এবং অর্জনকে পিছিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র হিসেবে কাজ করছে," বলেও উল্লেখ করেছিলেন তিনি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পরিবর্তনের এই প্রক্রিয়াটি স্বাভাবিক ছিল না বলেই মনে করেন অর্থনীতিবিদ ও খাত সংশ্লিষ্টদের অনেকে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুটি বেসরকারি ব্যাংকের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বিবিসি বাংলাকে বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতো একটি স্পর্শকাতর প্রতিষ্ঠানের প্রধানকে যদি বিক্ষোভের মুখে বিদায় নিতে হয়, তবে তা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর দুর্বলতাকেই প্রকাশ করে।

দেশের ব্যাংক খাতের ভবিষ্যতের জন্য এই ঘটনা মোটেই স্বস্তির নয় বলেও মনে করেন তারা।

নিয়োগ বাতিল ও নতুন নিয়োগের পুরো বিষয়টি একটি প্রক্রিয়ার মধ্যে যাওয়া উচিত ছিল বলেও মনে করেন বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ বা সিপিডি এর গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।

তিনি বলছেন, "অর্থনীতি নিয়ে সরকারের নিজস্ব কিছু চিন্তাভাবনা থাকতেই পারে কিন্তু তার মানে এই নয় যে, এভাবে বিদায় জানাতে হবে। আগের গভর্নরকে কেন যেতে হলো, সেটার কারণই আমরা পর্যন্ত বুঝতে পারলাম না।"

সংস্কার কার্যক্রমের কি হবে?

বাংলাদেশে ২০২৪ সালের অগাস্টে গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময় থেকে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে বিশাল অংকের খেলাপি ঋণ, নীতিগত অনিশ্চয়তা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থার অভাব বিদ্যমান রয়েছে।

অর্থনীতিবিদের অনেকেই বলছেন, এমন পরিস্থিতিতে দায়িত্ব নিয়ে বেশ কিছু ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন সাবেক গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর।

দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, খেলাপি ঋণ আদায়ে আইনি কাঠামো সংস্কার এবং ব্যাংক পুনর্গঠনের মতো বেশ কিছু আলোচিত পদক্ষেপ নিয়েছিলেন তিনি।

এছাড়া আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফ এর পক্ষ থেকেও খেলাপি ঋণ কমানো এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার ওপরও কড়া শর্ত দেওয়া হয়েছে।

এমন প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ব্যাংকের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারির দাবির প্রেক্ষিতে তাকে সরিয়ে দেওয়ার হঠাৎ সিদ্ধান্ত সংস্কার কাজগুলোকে অনিশ্চয়তায় ফেলবে বলেই মনে করেন সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।

বিবিসি বাংলাকে তিনি বলছেন, "রিফর্ম সব সময়ই জটিল। কারণ অনেক পক্ষ এটা পছন্দ করে না, এতে নাখোশ হয়। সেটাতে যদি সরকার প্রভাবিত হয়ে থাকে, সেটা দুঃখজনক।"

বিগত সরকারের সময় নেওয়া আর্থিক খাতের সংস্কার কার্যক্রমগুলোও বাঁধাগ্রস্ত হতে পারে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন।

তিনি বলছেন, সাবেক গভর্নর অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে আইন পরিবর্তনের কিছু কাজ করেছেন যেগুলো সংসদের মাধ্যমে পাশ হতে হবে।

বিশেষ করে ব্যাংক রেজুলেশন অর্ডিন্যান্স যদি সরকার পাশ না করে, তাহলে এটি ব্যবহার করে বিগত সরকার যেসব কাজ করেছে তার সবই বৈধতা হারাবে।

"পাঁচটি ব্যাংক একিভূতকরণের যে কাজগুলো হয়েছে, যেখানে সরকার ৩২ হাজার কোটি টাকা দিয়েছে এটিও একটি জটিলতার মধ্যে পড়বে," বলেও মত মি. হোসেনের।

নতুন গভর্নর এবং 'স্বার্থের সংঘাত' বিতর্ক

নতুন গভর্নর হিসেবে মোস্তাকুর রহমানের নিয়োগ দেশের অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে।

কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্ট এবং শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর সাথে যুক্ত মি. রহমান দেশের আর্থিক খাত সংস্কারে কতটা ভূমিকা রাখতে পারবেন, এ নিয়েও নানা ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ চলছে।

জানা গেছে, দায়িত্ব পাওয়া নতুন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান পোশাক, আবাসন ও ট্রাভেল এজেন্সির ব্যবসার সঙ্গে জড়িত।

সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলছেন, কাগজে কলমে যা আছে কেবল তার ভিত্তিতেই নতুন গভর্নরের যোগ্যতার বিচার করা ঠিক হবে না।

তার ডিগ্রি এবং বিজনেস ব্যাকগ্রাউন্ডের বিষয়গুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হওয়ার জন্য অপ্রাসঙ্গিক নয় বলেও মনে করেন তিনি।

তবে "কনফ্লিকট অব ইন্টারেস্টের বিষয়গুলো সামনে আসলেই একটু থমকে যেতে হয় যে, এগুলো ঠিকমতো রিসল্ভ হয়েছে কিনা- এটিই প্রশ্ন," বিবিসি বাংলাকে বলেন মি. মোয়াজ্জেম।

সাধারণত বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পদে অর্থনীতিবিদ বা পেশাদার আমলাদেরই অতীতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। প্রথমবারের মতো এমন একজনকে এই দায়িত্ব দেওয়া হলো যিনি পোশাক ও রিয়েল এস্টেট খাতের একজন ব্যবসায়ী।

এছাড়া দেশের একটি বেসরকারি ব্যাংকে তার নামে থাকা একটি লোন পুনঃতফসিল করার বিষয়টি নিয়েও নানা আলোচনা রয়েছে।

এক্ষেত্রে ঋণ খেলাপিদের শাস্তি দেওয়া বা ব্যাংক তদারকি করার ক্ষেত্রে তিনি কতটা নিরপেক্ষ থাকতে পারবেন, তা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন অনেকে।

"তিনি হয়তো প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব থেকে সরলেন কিন্তু মালিকানা তো তারই। এছাড়া লোন পুনঃতফসিলের বিষয়টিও তো কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্টের জায়গা," বলেন মি. মোয়াজ্জেম।

এছাড়া এই পদে নিয়োগের প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অর্থনীতিবিদদের অনেকে।

মূলত বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক পরিচালিত হয় ১৯৭২ সালের বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার অনুযায়ী। যেখানে কিছু নির্দেশনা থাকলেও গভর্নর নিয়োগে নির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা নেই।

এমনকি ব্যবসায়ী বা অন্য কোনো পেশার মানুষ গভর্নর হতে পারবেন না, এমন কিছুও সেখানে উল্লেখ নেই।

দেশের আর্থিক খাতের গুরুত্বপূর্ণ এই পদটিতে নিয়োগের সিদ্ধান্ত সরকারের। এক্ষেত্রে চার বছর মেয়াদে নিয়োগের কথা বলা হলেও সরকার চাইলে মেয়াদ বাড়াতে পারবে।

গভর্নর নিয়োগ এবং বাতিলের একটি প্রক্রিয়া থাকা উচিত বলেই মনে করেন বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন।

তিনি বলছেন, "যোগ্য ব্যক্তিদের শর্টলিস্ট করে, তাদেরকে ডাকা হবে, তার মধ্য থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।" এটি না হলে নিয়োগ এবং বাতিলের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাবে।