ভারতের টাটা গ্রুপের ভেতরে লড়াইয়ের কারণ কী?

    • Author, নিখিল ইমানদার
    • Role, বিবিসি নিউজ, মুম্বাই

রতন টাটার মৃত্যুর এক বছর পর একের পর এক সমস্যার মুখে পড়ছে টাটা গোষ্ঠী।

লবণ থেকে ইস্পাত- অনেক কিছুই তৈরি করে বৃহদাকার এই ভারতীয় শিল্প গোষ্ঠী। টাটা গ্রুপ রতন টাটার হাত ধরে প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত হয়েছে, তার আধুনিকীকরণও হয়েছে যা এই গোষ্ঠীকে ব্যবসায়িক দিক থেকে বিশ্বস্তরের 'পাওয়ার হাউস'-এ রূপান্তরিত করেছে। তবে এই মুহূর্তে একাধিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি টাটা গোষ্ঠী।

জাগুয়ার ল্যান্ড রোভার এবং টেটলি টি-র মতো ঐতিহ্যবাহী ব্রিটিশ ব্র্যান্ডের মালিকানাধীন এবং ভারতে অ্যাপলের জন্য আইফোন তৈরি করা বিজনেস এম্পায়ার টাটা গ্রুপ আরো একবার অভ্যন্তরীণ বিবাদের সঙ্গে লড়ছে।

গত কয়েক মাস ধরে এই শিল্পগোষ্ঠীর ট্রাস্টিদের মধ্যে চলমান বোর্ডরুমের লড়াই গোষ্ঠীর ভেতরকার গভীরতর দ্বন্দ্বকে আরো একবার প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছে।

এই বিবাদই সরকার হস্তক্ষেপ করতে বাধ্য করেছে যাতে ২০১৬ সালের মতো কোনো আইনি সমস্যা না দেখা দেয়। সেই সময় (২০১৬ সালে) তৎকালীন চেয়ারম্যান সাইরাস মিস্ত্রিকে তার পদ থেকে অপসারণ করা হয়েছিল।

কয়েক সপ্তাহ আগে দিল্লিতে কয়েকজন মন্ত্রীর হস্তক্ষেপের পর অস্থায়ী সমঝোতায় পৌঁছালেও সাম্প্রতিক রিপোর্ট বলছে, রতন টাটার ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং টাটা ট্রাস্ট-এর ট্রাস্টি মেহলি মিস্ত্রিকে তার পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে বিবিসি স্বাধীনভাবে এই দাবির সত্যতা নিশ্চিত করতে পারেনি।

বোর্ড থেকে মেহলি মিস্ত্রিকে অপসারণের খবরের বিষয়ে মন্তব্য করার জন্য বিবিসি টাটা ট্রাস্টের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে, যদিও এই বিষয়ে এখনো কোনো প্রতিক্রিয়া মেলেনি।

টাটা গ্রুপের ইতিহাস নিয়ে একটি বই লিখেছেন মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মিরচা রায়ানু। তার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে, গোষ্ঠীর ভেতরের এই বিবাদ হলো মূলত "অমীমাংসিত মামলাগুলোর পুনরুত্থান"।

অথবা এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা যে টাটা গোষ্ঠীকে আসলে কে নিয়ন্ত্রণ করে এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ শেয়ারহোল্ডার (টাটা ট্রাস্ট, যা টাটা সন্সের ৬৬ শতাংশ শেয়ারের মালিক), গোষ্ঠীর ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তে কতটা প্রভাব ফেলতে পারে।

টাটা গ্রুপের স্ট্রাকচার বেশ অনন্য। এই গোষ্ঠীর নির্ণায়ক শেয়ার রয়েছে আনলিস্টেড কমার্শিয়াল হোল্ডিং কোম্পানি বা অতালিকাভুক্ত হোল্ডিং কোম্পানি (টাটা সন্স) এর কাছে, যা একটা জনহিতকর সংস্থা (টাটা ট্রাস্ট) দ্বারা পরিচালিত হয়।

এই কাঠামো টাটা গোষ্ঠীকে ট্যাক্স বেনিফিট বা আয়কর সংক্রান্ত এবং অন্যান্য নিয়ন্ত্রক সুবিধার পাশাপাশি জনহিতকর কাজ করার অনুমতিও দেয়। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে এই বিষয়টাই আবার জনহিতকর কাজ এবং ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য-এই দুয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাকে কঠিন করে তোলে।

গোষ্ঠীর ভেতরের এই সাম্প্রতিকতম বিরোধ এমন একটা সময় দেখা যাচ্ছে যখন টাটা গ্রুপ সেমিকন্ডাক্টর এবং বৈদ্যুতিক যানবাহন-এর মতো সেক্টরে নিজেদের বিস্তারের করার চেষ্টা করছে।

একইসঙ্গে সংকটের কবলে পড়া এয়ার ইন্ডিয়াকেও পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা চালানো হচ্ছে। সরকারের কাছ থেকে ২০২১ সালে এই এয়ারলাইন কিনেছিল টাটা গোষ্ঠী। কিন্তু চলতি বছরে বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনা ঘটে। তারপরই এয়ার ইন্ডিয়াকে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা চালানো হচ্ছিল।

তাহলে সমস্যাটা কোথায়?

ভেটোর অধিকার

টাটা গ্রুপের এই বিরোধ নিয়ে ওই গোষ্ঠী প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেনি। তবে বোর্ড-এ নিয়োগ, আর্থিক অনুমোদন এবং স্টক এক্সচেঞ্জে টাটা সন্স-এর পাবলিক লিস্টিং বা তালিকাভুক্তি নিয়ে ট্রাস্টিদের মধ্যে মতপার্থক্য এই বিবাদের নেপথ্যে রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

প্রসঙ্গত, ২৬টা তালিকাভুক্ত টাটা সংস্থার হোল্ডিং কোম্পানি নিয়ে গঠিত টাটা সন্স এবং এর বাজার মূলধন প্রায় ৩২৮ বিলিয়ন (৩২,৮০০ কোটি) ডলার।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক টাটা গ্রুপের ঘনিষ্ঠ এক সূত্র বিবিসিকে জানিয়েছে কিছু ট্রাস্টি টাটা সন্সের বড় সিদ্ধান্তের উপর তাদের আরো প্রভাব বিস্তার করতে চান এবং বিরোধের একেবারে কেন্দ্রে রয়েছে বোর্ডের নমিনিকে (মনোনীত) বেছে নেওয়ার বিষয়টা। টাটা সন্স-এর বোর্ডে টাটা ট্রাস্টের তিনজন প্রতিনিধি রয়েছেন।

ওই সূত্র বিবিসিকে বলেছেন, "কোম্পানির বড়সড় সিদ্ধান্তের উপর ভেটো প্রয়োগ করার ক্ষমতা রয়েছে টাটা ট্রাস্টের নমিনির, তবে তাদের ভূমিকা সাধারণত পর্যবেক্ষণ করা এবং হস্তক্ষেপ করা নয়।"

"তবে এখন কিছু ট্রাস্টি বাণিজ্যিক সিদ্ধান্তের বিষয়ে নিজেদের ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রকে বাড়াতে চান।"

টাটা সন্সের ১৮ শতাংশ শেয়ার রয়েছে শাপুরজি পালনজি (এসপি) গ্রুপের-র কাছে। এসপি গ্রুপ সংস্থাকে শেয়ার বাজারে আনতে চায়। এটাও কিন্তু বিরোধের অন্যতম কারণ। এর জন্য দীর্ঘদিন ধরে চাপও দিচ্ছে এসপি গ্রুপ। কিন্তু টাটার বেশিরভাগ ট্রাস্টিই এর বিরুদ্ধে রয়েছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই সূত্র বলেছেন, "আশঙ্কা করা হচ্ছে যে সংস্থার পাবলিক লিস্টিং করলে (শেয়ার বাজারে আনলে) ট্রাস্টের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং ভিশন (ভবিষ্যতের রূপরেখা ও দৃষ্টিভঙ্গি বোঝাতে) কমে যাবে এবং টাটা সন্সের উপর বাজারের চাপ বাড়বে। এর একটা বড় কারণ গোষ্ঠীর অনেক নতুন ব্যবসাই এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে।"

তবে এসপি গ্রুপ এই আইপিও অর্থাৎ পাবলিক লিস্টিং-এর বিষয়টাকে তাদের "নৈতিক এবং সামাজিক প্রয়োজনীয়তা" হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে। তাদের মতে, এই পদক্ষেপ টাটার শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ রক্ষা, সংস্থায় স্বচ্ছতা আনা এবং পরিচালনার বিষয়কেও উন্নত করে তুলবে।

তবে এই প্রসঙ্গে বিবিসির কোনো প্রশ্নের উত্তর দেয়নি টাটা সন্স বা টাটা ট্রাস্ট।

প্রফেসর মিরচা রায়ানু অবশ্য মনে করেন, টাটা গ্রুপ যে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে সেই বিষয়টাকেই দর্শায় অন্দরের এই মতবিরোধ।

তার কথায়, কোম্পানির পাবলিক লিস্টিং- সংক্রান্ত পদক্ষেপ কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের অনেক বড় ব্যবসায়ী গ্রুপের নেওয়া সাম্প্রতিক বাণিজ্যিক কৌশল থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। এই দেশগুলোর বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠী "টেকসই এবং দীর্ঘমেয়াদী ভিত্তির মালিকানার মডেল" গ্রহণ করছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো এই বড়সড় গোষ্ঠীর মধ্যে অনেকেই টাটা গোষ্ঠীকে এক্ষেত্রে উদাহরণ বলে মনে করে।

"তবে একইসঙ্গে, ব্যক্তিগত বা সীমিত মালিকানাধীন সংস্থাগুলোর উপর বাহ্যিক তদারকি কমই দেখা যায়, যা প্রায়শই বিরোধ বাড়িয়ে তুলতে পারে এবং সুনামের উপরেও প্রভাব ফেলতে পারে," বলেছেন প্রফেসর রায়ানু।

টাটার ভাবমূর্তি ধাক্কা খেয়েছে

কর্মসূত্রে এককালে টাটা সন্সের প্রাক্তন চেয়ারম্যান সাইরাস মিস্ত্রির সঙ্গে পাবলিসিস্ট ও 'ইমেজ গুরু' দিলীপ চেরিয়ানের নিবিড় যোগ ছিল। তার মতে, গোষ্ঠীর ভেতরের এই বিরোধের প্রভাব ভারতের অন্যতম প্রাচীনতম এবং সম্মানিত ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচিত টাটা গ্রুপের ব্র্যান্ড ইমেজের উপর ফেলেছে।

বিবিসিকে মি. চেরিয়ান বলেন, "সাম্প্রতিক সময়ে টাটার ভাবমূর্তি অনেকবার ধাক্কা খেয়েছে। সেই সিরিজেরই আরো একটা ধাক্কা এটা।"

এই প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তিনি চলতি বছরের এয়ার ইন্ডিয়ার বিমান বিধ্বস্ত হওয়া এবং সেপ্টেম্বর মাসে জেএলআর (জাগুয়ার ল্যান্ড রোভার)-এর ইউনিটে সাইবার অ্যাটাকের প্রসঙ্গ টেনে এনেছেন। এই সাইবার অ্যাটাক ব্রিটেনের গাড়ি উৎপাদনকে সর্বনিম্ন অবস্থায় ঠেলে দিয়েছিল এমনটা গত ৭০ বছরে দেখা যায়নি।

তাছাড়া টাটা গ্রুপের ফ্ল্যাগশিপ সফ্টওয়্যার আউটসোর্সিং সংস্থা টিসিএস (টাটা কনসালটেন্সি সার্ভিসেস) ও নিজস্ব চ্যালেঞ্জের সঙ্গে যুঝছে। টাটা গ্রুপের মোট আয়ের প্রায় অর্ধেক টিসিএস-এর।

সাম্প্রতিক সময়ে সংস্থাটি ব্যাপকভাবে কর্মীদের ছাঁটাই করেছে। মার্কস অ্যান্ড স্পেন্সার সম্প্রতি টিসিএসের সঙ্গে তাদের চুক্তি বাতিল করেছে।

দিলীপ চেরিয়ান ব্যাখ্যা করেছেন, "এই বোর্ডরুমের লড়াই আরো বিভ্রান্তির সৃষ্টি করে। এখন শুধু শেয়ারের পারফরম্যান্স নিয়েই বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ থাকবে না, তাদের মনে এই প্রশ্নও উঠবে যে টাটা গ্রুপে তারা ঠিক কার সঙ্গে লেনদেন করবেন।"

এই অস্থির পরিস্থিতির মাঝে টাটা সন্সের চেয়ারম্যান এন চন্দ্রশেখরনের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে বলেও জানা গিয়েছে।

টাটা সন্সের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানিয়েছে, "এই বিবাদ বোর্ডের মধ্যে নয়, ট্রাস্টিদের মধ্যে থাকায় চেয়ারম্যান নিজের কাজ চালিয়ে যেতে পারেন। তবে এটা অবশ্যই তার কাছে এমন একটা অপ্রয়োজনীয় বিষয় যা মনোযোগকে ব্যহত করতে পারে।"

প্রসঙ্গত সংকটজনক পরিস্থিতি মোকাবিলার ক্ষেত্রে অবশ্য টাটা গোষ্ঠীর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে।

১৯৯০ এর দশকে, রতন টাটা যখন ক্ষমতা নিজের হাতে নেন এবং অপারেশনাল কাঠামোর আধুনিকীকরণের চেষ্টা করেন, তখনও এই গোষ্ঠীতে প্রচুর মতাদর্শগত বিরোধ দেখা গিয়েছিল।

কয়েক বছর আগে সাইরাস মিস্ত্রিকে বরখাস্ত করার পর যে সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল তার স্মৃতি এখনো তাজা রয়েছে।

তবে প্রফেসর রায়ানুর মতে, এবারের বিষয়টা একটু আলাদা।

তিনি বলেন, "সেই সময় টিসিএস টাটা গ্রুপের দুর্বল কোম্পানিগুলোকে সামলাচ্ছিল। টিসিএসের আগে এই ভূমিকা পালন করেছে টাটা স্টিল।"

কিন্তু বর্তমানে টিসিএস-এর ব্যবসায়িক মডেলও একটা পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। গোষ্ঠীর মোট আয়ে টিসিএস-এর অবদান ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে, টাটা গ্রুপের কাছে এমন কোনো 'স্তম্ভ' নেই যা এই অভ্যন্তরীণ বিরোধের মধ্যে গোষ্ঠীর স্থিতিশীলতাকে বজায় রাখতে পারে।

অধ্যাপক রায়ানু বলেন, "স্বল্পমেয়াদের দিক থেকে এটা অস্থিতিশীল এবং ক্ষতিকারক পরিস্থিতি বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তবে এও হতে পারে যে অনিশ্চয়তার মেঘ কেটে গেলে নতুন এবং আরো স্বচ্ছ স্ট্রাকচার দেখা যাবে যা জবাবদিহি করতেও সক্ষম।"