উত্তর কোরিয়ার ইতিহাসে 'সবচেয়ে শক্তিশালী' মিসাইলের পরীক্ষা

ছবির উৎস, Getty Images
উত্তর কোরিয়া বলছে যে তারা আন্তঃ মহাদেশীয় নতুন একটি সলিড-ফুয়েল মিসাইল নিক্ষেপের পরীক্ষা চালিয়েছে এবং এটি তাদের ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার ইতিহাসে “সবচেয়ে শক্তিশালী” মিসাইল।
দেশটির রাষ্ট্রীয় মিডিয়াতে এই পরীক্ষাকে অভিনন্দন জানিয়ে একে 'অলৌকিক সাফল্য' হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
উত্তর কোরিয়ার এই মিসাইল পরীক্ষার জন্য জাপানে বেশ কিছু লোককে তাদের এলাকা থেকে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
সলিড-ফুয়েল মিসাইল ক্ষেপণাস্ত্রে মিহি পাউডারের মতো কঠিন জ্বালানি ব্যবহার করা হয়। এটি লিকুইড-ফুয়েল বা তরল জ্বালানি দিয়ে চালিত মিসাইলের চেয়েও দ্রুত নিক্ষেপ করা যায়। সলিড-ফুয়েল মিসাইলকে মাঝপথে আটকে দেওয়াও কঠিন।
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন এধরনের মিসাইলের নেতিবাচক দিকও রয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়া মনে করে সম্পূর্ণ সফল একটি সলিড-ফুয়েল আইসিবিএম তৈরি করতে উত্তর কোরিয়া আরো সময় লাগবে।
সলিড-ফুয়েল মিসাইল কী?
উত্তর কোরিয়া এর আগে যেসব আন্তঃ মহাদেশীয় সলিড ফুয়েল মিসাইল বা আইসিবিএমের পরীক্ষা চালিয়েছে সেগুলোর পাল্লা ছিল অল্প দূরত্বের। অর্থাৎ সেগুলো খুব বেশি দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করতে পারতো না। কিন্তু এই প্রথম তারা দীর্ঘ পাল্লার সলিড-ফুয়েল ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালালো।
উত্তর কোরিয়া এর আগে বেশ কিছু আন্তঃ মহাদেশীয় অর্থাৎ এক মহাদেশ থেকে আরেক মহাদেশে আঘাত করতে পারে এরকম ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছে। কিন্তু সেগুলো ছিল তরল জ্বালানির।
এ ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের ঠিক আগে তাতে তরল-জ্বালানি নিতে হয় এবং এজন্য সময়ের প্রয়োজন।

ছবির উৎস, EPA
উত্তর কোরিয়ার সবশেষ এই পরীক্ষাকে বিশেষজ্ঞরা পিয়ংইয়াং-এর অস্ত্র কর্মসূচির বড় ধরনের অগ্রগতি হিসেবে উল্লেখ করছেন।
কারণ সলিড-ফুয়েল আইসিবিএমে আগে থেকেই জ্বালানিসহ প্রস্তুত করা থাকে এবং এগুলো যেকোনো সময়ে খুব দ্রুত নিক্ষেপ করা সম্ভব।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন একারণে খুব বেশি সময় ব্যয় না করেই উত্তর কোরিয়া এসব মিসাইল দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রেও আঘাত করতে পারবে।
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় শুক্রবার বলেছে যে এই প্রযুক্তি নতুন কিছু নয়, এবং উত্তর কোরিয়া বৃহস্পতিবার যে পরীক্ষাটি চালিয়েছে যা একটি পুরোপুরি সলিড-ফুয়েল আইসিবিএম মিসাইল প্রস্তুতের “মাঝামাঝি ধাপ”।
কিম জং আনের তদারকি
উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং আন, তার কন্যা, স্ত্রী এবং বোনকে সাথে নিয়ে এই পরীক্ষাটির তদারকি করেছেন। খবরে বলা হচ্ছে মি. কিম বলেছেন যে এর পরীক্ষার কারণে প্রতিদ্বন্দ্বীরা “চরম ভীতি ও উদ্বেগের মধ্যে থাকবে।”
তিনি আরো বলেছেন পরীক্ষায় যে মিসাইল নিক্ষেপ করা হয়েছে, যা হোয়াসং-১৮ নামে পরিচিত, সেটি উত্তর কোরিয়ার আগ্রাসী সামরিক কৌশলেরই অংশ।
বৃহস্পতিবার সকালে চালানো এই পরীক্ষাটির বিষয়ে উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা কোরিয়ান সেন্ট্রাল নিউজ এজেন্সি শুক্রবারে প্রকাশিত রিপোর্টে বলছে এই পরীক্ষার প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল “উচ্চ শক্তির সলিড-প্রপেলেন্টের বিভিন্ন মোটর কতোটা নিখুঁতভাবে কাজ করতে পারে সেটা নিশ্চিত করা।
এছাড়াও এই ক্ষেপণাস্ত্রের সূক্ষ্ম কিছু প্রযুক্তি এবং পুরো নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার নির্ভরযোগ্যতা পরীক্ষা করে দেখা হয়েছে।
End of বিবিসি বাংলায় অন্যান্য খবর:
পরীক্ষার নিন্দা
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
এই পরীক্ষার ফলে জাপানের উত্তরাঞ্চলে কিছু বিভ্রান্তি তৈরি হয়। সেখানে লোকজনকে দ্রুত সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলেও ৩০ মিনিট পরেই সেই নির্দেশ প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়।
জাপানের হোক্কাইডো দ্বীপে স্কুল শুরু হতে বিলম্ব হয়। এছাড়াও কিছু কিছু ট্রেন চলাচলও বাতিল করা হয়।
জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্র এই পরীক্ষার তীব্র নিন্দা করেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, উত্তর কোরিয়ার নতুন এবং আরো শক্তিশালী এই অস্ত্রের পরীক্ষার ঘটনা হঠাৎ করেই ঘটেনি।
“উত্তর কোরিয়া কয়েক বছর ধরেই তার পুকগুকসং সিরিজের অংশ হিসেবে বৃহৎ আকারের সলিড রকেট মোটরের পরীক্ষা চালিয়ে আসছে। ২০২০ সালের পর থেকে এটা পরিষ্কার ছিল যে তারা যেকোনো সময়ে এধরনের অস্ত্রের পরীক্ষা চালাতে পারে,” বলেন ক্যালিফোর্নিয়ায় জেমস মার্টিন সেন্টারে পূর্ব-এশিয়া অস্ত্র বিস্তার প্রতিরোধ কর্মসূচির পরিচালক জেফরি লিউস।
উত্তর কোরিয়া তার পুকগুকসং সিরিজে মধ্যম-পাল্লার মিসাইলসহ সাবমেরিন থেকে নিক্ষেপ করা যায় এমন ক্ষেপণাস্ত্রও পরীক্ষা করছে।
পরমাণু অস্ত্র বিশেষজ্ঞ অঙ্কিত পান্ডা বলেন, নিক্ষেপের দিক থেকে দীর্ঘ পাল্লার সলিড-ফুয়েল মিসাইল হয়তো লিকুইড-ফুয়েল মিসাইলের চেয়েও বেশি শক্তিশালী, কিন্তু এগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ এবং সংরক্ষণ করে রাখা কঠিন।
আর্দ্রতা ও তাপমাত্রার ব্যাপারে এগুলো অনেক বেশি স্পর্শকাতর এবং সময়ের সাথে সাথে এসব মিসাইলের ক্ষমতা কমে যেতে পারে।

ছবির উৎস, KCNA
তাৎপর্যপূর্ণ সপ্তাহ
উত্তর কোরিয়ার জন্য এই সপ্তাহটি তাৎপর্যপূর্ণ কারণ দেশটিতে মি. কিমের ক্ষমতায় আরোহণের ১১ বছর পূর্তি উদযাপিত হচ্ছে। অতীতেও এসব বার্ষিকীতে দেশটির সামরিক খাতে অগ্রগতির প্রদর্শন করা হয়েছে।
উত্তর কোরিয়া বেশ কয়েক বছর ধরেই তাদের পরমাণু অস্ত্র কর্মসূচি বৃদ্ধির জন্য কাজ করছে। দেশটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও শক্তিশালী পরমাণু অস্ত্র উৎপাদনে সচেষ্ট।
সম্প্রতি তারা দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ সামরিক মহড়ার সমালোচনা করে বলেছে যে এর মাধ্যমে ওই অঞ্চলে উত্তেজনা বৃদ্ধি করা হচ্ছে।
সবশেষ এই ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষাটি চালানো হলো উত্তর কোরিয়ার প্রতিষ্ঠাতা কিম ইল সুং-এর জন্মদিনের মাত্র দু’দিন আগে।
এ উপলক্ষে দেশটিতে দীর্ঘ সময় ধরে ছুটি দেওয়া হয়।








