সৌদি আরব কেন ফুটবলে এত অর্থ ঢালছে?

সবশেষ দলবদলে এক বিলিয়ন ইউএস ডলার খরচ করেছে সৌদি ক্লাবগুলো

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, সবশেষ দলবদলে এক বিলিয়ন ইউএস ডলার খরচ করেছে সৌদি ক্লাবগুলো

ইউরোপের গ্রীষ্মকালীন দলবদলের সময় ফুটবলারদের নিয়ে প্রতিবছরই ক্লাবগুলোর মধ্যেই কাড়াকাড়ি লেগে যায়, পছন্দের ফুটবলারকে হয়তো টেনে নিয়ে যায় প্রতিপক্ষ ক্লাব। তবে এই বছর হুমকিটা ছিল এই মহাদেশের বাইরে সৌদি আরব থেকে।

১৯৭০ সালে শুরু হওয়া সৌদি প্রো লিগ এ বছর একের পর এক তারকা ফুটবলারদের নিয়ে সারা বিশ্বের শিরোনামে উঠে আসে।

সর্বশেষ দলবদলে সৌদি ক্লাবগুলো বিশ্বসেরা সব ফুটবলারদের তাদের দেশে টানতে খরচ করেছে প্রায় ১ বিলিয়ন ইউএস ডলার। ওই একই সময়ে তাদের চেয়ে বেশি অর্থ খরচ করেছে কেবল ইংলিশ ক্লাবগুলো।

তবে এই হিসেব শুধুমাত্র দলবদলের জন্য ক্লাবগুলোকে যে অর্থ দিতে হয়েছে সেটার। এর বাইরে রয়েছে খেলোয়াড়দের লোভনীয় বেতন ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধা।

আর এটাকে হঠাৎ একবারের একটা চমক বলতে রাজি নন সৌদি প্রো লিগের প্রধান নির্বাহী কার্লো নোহরা। তিনি বলছেন সৌদি সরকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে যতদিন পর্যন্ত আয় ও খেলার মানের দিক দিয়ে বিশ্বের শীর্ষ লিগগুলোর কাতারে এটি না পৌঁছাবে, ততদিন পর্যন্ত সৌদি প্রো লিগকে আর্থিক সহায়তা দিয়ে যাবে সরকার।

“সৌদি প্রো লিগ যেটা করছে, যা দেখছেন, এগুলো আসলে এখন অন্য দেশের লিগগুলোরও করা উচিত। আমরা সেরাদের তালিকায় যেতে চাই, আর সেজন্য মাঠে খেলার মান বাড়াতে যা করা দরকার আমরা সবই করছি,” রয়টার্সকে জানান নোহরা।

রোনালদোর পথ ধরে নেইমার, বেনজেমাও নাম লিখিয়েছেন সৌদি লিগে

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, রোনালদোর পথ ধরে নেইমার, বেনজেমাও নাম লিখিয়েছেন সৌদি লিগে

সৌদি লিগে নাম লেখানোদের তালিকায় রয়েছেন ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ড নেইমার।

তিনি মাত্র কয়েক বছর আগেও ছিলেন ইতিহাসের সবচেয়ে দামি ফুটবলার, যখন ফ্রেঞ্চ ক্লাব পিএসজি তাকে ২৪২ মিলিয়ন ইউএস ডলারে বার্সেলোনা থেকে কিনে নেয়।

বিবিসি স্পোর্টস বলছে রিয়াদের ক্লাব আল হিলাল এই ব্রাজিলিয়ানের জন্য খরচ করেছে ৯৮ মিলিয়ন ইউএস ডলার।

অন্যান্য উল্লেখযোগ্য দলবদলের মধ্যে আছে আলজেরিয়ার রিয়াদ মাহরেজ, যিনি মাত্রই ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিতেছেন। আছেন ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদার পুরষ্কার ব্যালন ডি অর জয়ী ফ্রান্সের করিম বেনজেমা-ও।

বছরের শুরুতেই অবশ্য তারা পুরো বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দেয় যখন পর্তুগিজ সুপারস্টার ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড থেকে পাড়ি দেন আল নাসর ক্লাবে।

নানা মাধ্যম থেকে জানা যায় রিয়াদের ক্লাবটি তার সাথে আড়াই বছরের জন্য চারশো মিলিয়ন ডলারের চুক্তি করেছে।

বেশিরভাগ চুক্তিগুলোই করেছে সৌদি প্রো লিগের চারটি ক্লাব - আল হিলাল, আল নাসর, আল আহলি ও আল ইতিহাদ। সৌদি আরব পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড (পিআইএফ) এর অর্থে পরিচালিত হয় ক্লাবগুলি, যার সম্পূর্ণ অর্থমূল্য প্রায় ৭৭৬ বিলিয়ন ইউএস ডলার।

আর এ সবগুলো ক্লাবেরই নিয়ন্ত্রক সৌদি ক্রাউন প্রিন্স ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমান।

বিশ্লেষকরা অবশ্য সৌদি প্রো লিগের ভবিষ্যত নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করছেন

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, বিশ্লেষকরা অবশ্য সৌদি প্রো লিগের ভবিষ্যৎ নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করছেন

বিশ্বকাপের স্বপ্ন

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

কিন্তু কেন সৌদি ক্লাবগুলো বিশ্বের অন্যান্য ক্লাব ও ফুটবলারদের পেছনে এত অর্থ খরচ করছে?

এটা আসলে তাদের সমন্বিত কৌশলেরই একটা অংশ, যার লক্ষ্য শুধু নিজেদের দেশে ফুটবলের মান উন্নয়ন করাই নয় বরং আরও বেশি কিছু।

২০১৬ সালে সৌদি আরব 'ভিশন ২০৩০'-এর ঘোষণা দেয়, সরকার নানা প্রকল্প হাতে নেয় যার লক্ষ্য তেল নির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে অন্যান্য দিকেও বিনিয়োগ করা।

এক্ষেত্রে খেলাধূলায় বিশেষ আগ্রহ লক্ষ্য করা যায় তাদের।

দেশটির নিজস্ব ফর্মুলা ওয়ান গ্রাঁ প্রিঁ রয়েছে, প্রফেশনাল গলফ অ্যাসোসিয়েশন-পিজিএর একটা বড় শেয়ার হোল্ডার তারা, এমনকি ২০২৯ সালের এশিয়ান উইন্টার গেমসের আয়োজকও দেশটি, আর সেজন্য তারা মরুভূমির মাঝেই একটা স্কি রিসোর্ট তৈরি করছে।

তবে এসব বিনিয়োগ কিন্তু শুধু দেশটির জনগণ, যাদের অধিকাংশের বয়স চল্লিশের নিচে, তাদের অবসর আর বিনোদনের জন্য করা হচ্ছে না।

সৌদি আরবের আসল লক্ষ্য হল মানবাধিকার লঙ্ঘনের নানা অভিযোগে বাইরের দুনিয়ায় তাদের দেশের যে নেতিবাচক ইমেজ আছে সেখান থেকে খেলাধূলার সাহায্যে বের হয়ে আসা।

আরো অনেক দেশই এই পন্থা অবলম্বন করেছে ... তাদের প্রতিবেশী সংযুক্ত আরব আমিরাত আর কাতার খেলাধূলায় প্রচুর বিনিয়োগ করেছে, দেশ দুটি ফুটবল ক্লাব ম্যানচেস্টার সিটি ও পিএসজির মালিকানা পর্যন্ত কিনে নিয়েছে।

কাতার ২০২২ ফিফা বিশ্বকাপও আয়োজন করেছে, যা ছিল ইতিহাসে প্রথমবার কোনও মুসলিম ও মধ্যপ্রাচের দেশে বিশ্বকাপ।

সৌদি আরবও একই পথে হাঁটছে। দেশের বাইরে ইংলিশ ক্লাব নিউক্যাসল ইউনাইটেডের মালিকানা তারা কিনে নেয় ২০২১ সালে।

তবে প্রতিবেশী দেশগুলো বাইরে যতোটা বিনিয়োগ করেছে তার বিপরীতে সৌদি নিজের দেশেই খেলাধূলার ক্ষেত্রে ব্যাপক বিনিয়োগ করতে থাকে।

বিবিসি বাংলায় আরো পড়ুন:
খেলাধূলা দিয়ে দেশের ভাবমূর্তি প্রতিস্থাপনের চেষ্টা সৌদি আরবের

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, সৌদি আরবের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনসহ নানা অভিযোগ আছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের

তবে সৌদি আরবই প্রথম নয়, এর আগে অন্য দেশও ইউরোপের প্রতিযোগী হিসেবে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছে।

২০১৬ আর ২০১৭ সালের দিকে চীনের বিভিন্ন ক্লাব যারা রিয়েল এস্টেট ব্যবসায় যুক্ত, তারা ইউরোপ থেকে বেশ কিছু হাই-প্রোফাইল চুক্তি সম্পন্ন করে। কিন্তু তাদের এই চমকের ইতি ঘটে কয়েক বছরের মাথায় করোনাভাইরাস মহামারিতে।

তাহলে সৌদি আরবও কি চীনের মতো ভাগ্য বরণ করবে নাকি এটি ইউরোপের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পারবে?

অর্থনীতিবিদ স্টেফান লেগে, যিনি ফুটবল বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ, তিনি অবশ্য খানিকটা সংশয় প্রকাশ করছেন। তার বিশ্বাস বিশ্বজুড়ে খেলোয়াড় ও দর্শকদের আকর্ষণের বিচারে ইউরোপ বেশ এগিয়ে।

“এখন পর্যন্ত যে জিনিসটা খেলোয়াড়দের সৌদি আরবে আনছে তা হল অর্থ। একটা মর্যাদার ক্লাব বা প্রতিযোগিতা প্রতিষ্ঠা পেতে কয়েক দশক লেগে যায়।” লেগের ব্যাখ্যা হল, “দীর্ঘদিন ধরে স্থায়ী বিনিয়োগ ও দারুণ ব্যবস্থাপনাই পারে সৌদি আরবে একটা আকর্ষণীয় ফুটবল লিগ গড়ে তুলতে।”

ফুটবল লেখক সামিন্দ্রা কুন্তির পরামর্শ হল যদি সৌদি আরব তাদের লিগকে আরও আকর্ষণীয় করতে চায় তাহলে তাদের আরও তরুণ খেলোয়াড় আনতে হবে: “বেনজেমা, রোনালদো, নেইমার তারকার ব্যাপারটা যোগ করছে, কিন্তু তারা তাদের সেরা সময় পেছনে ফেলে এসেছে।”

কুন্তি বলেন এছাড়া ইউরোপের আছে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ যা বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ও ধনী ক্লাবগুলোর প্রতিযোগিতা।

“শেষ পর্যন্ত ইউরোপই আসলে এগিয়ে থাকে...তাদের এই ক্লাব টুর্নামেন্ট সকল খেলোয়াড়ই জিততে চায়, সব তারকারাই এখানে খেলে, বাণিজ্যিকভাবেও এটা খুবই সফল, তাই আমার মনে হয় না সৌদি আরব এটাকে ছাপিয়ে যেতে পারবে”, বলছিলেন তিনি।

খেলাধূলাকে সফট পাওয়ার হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা সৌদি আরবের

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, খেলাধূলাকে সফট পাওয়ার হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা সৌদি আরবের

‘স্পোর্টসওয়াশিং’

সমালোচকরা খেলাধূলার ক্ষেত্রে সৌদি সরকারের এমন বিনিয়োগের একটা নাম দিয়েছে – “স্পোর্টসওয়াশিং”, যার অর্থ সাংবাদিক জামাল খাসোগজি হত্যা বা মানবাধিকার লঙ্ঘন এমন নানা বিষয়ে দেশের নষ্ট হওয়া ভাবমূর্তি খেলাধূলার মাধ্যমে ফিরিয়ে আনা।

যুক্তরাষ্ট্র সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানকে এই হত্যায় অনুমোদন দেয়ার জন্য অভিযুক্ত করে থাকে, কিন্তু সৌদি আরব সবসময় এটা অস্বীকার করে এর দায় চাপিয়েছে 'সরকারের বিপথগামী কিছু এজেন্টের’ উপর।

কোন কোন বিশ্লেষক মনে করেন ভাবমূর্তি বা মর্যাদা প্রতিষ্ঠাই সৌদি আরবের একমাত্র উদ্দেশ্য নয়।

“বিশ্ব জুড়েই দেশগুলো খেলাধূলা ও বিনোদনকে বিভিন্ন নীতি নির্ধারণে সফট পাওয়ার হিসেবে ব্যবহার করে থাকে,” বলেন প্যারিসের স্কেমা বিজনেস স্কুলে খেলাধূলা ও ভূরাজনৈতিক অর্থনীতির অধ্যাপক সাইমন চ্যাডউইক।

“আমরা আসলে বিভিন্ন দেশের বিশ্ব জুড়ে মানুষের মন ও হৃদয় জয়ের এক প্রতিযোগিতার কথা বলছি। বৃটেন, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, ভারত এবং আরও অনেক দেশই এটা সফলভাবে ব্যবহার করেছে। এখন সৌদি আরবও একই কাজ করছে,” বলছিলেন তিনি।

Skip YouTube post
Google YouTube কনটেন্টের জন্য কি অনুমতি দেবেন?

এই নিবন্ধে Google YouTubeএর কনটেন্ট রয়েছে। কোন কিছু লোড করার আগে আমরা আপনার অনুমতি চাইছি, কারণ তারা হয়ত কুকি এবং অন্যান্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে থাকতে পারে। আপনি সম্মতি দেবার আগে হয়ত Google YouTube কুকি সম্পর্কিত নীতি এবং ব্যক্তিগত বিষয়ক নীতি প়ড়ে নিতে চাইতে পারেন। এই কনটেন্ট দেখতে হলে 'সম্মতি দিচ্ছি এবং এগোন' বেছে নিন।

সতর্কবাণী: বিবিসির নয় এমন ওয়েবসাইটের কনটেন্টের জন্য বিবিসি দায়ী না YouTube কনটেন্টে বিজ্ঞাপন থাকতে পারে

End of YouTube post