আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
আবারও নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদের কড়া সমালোচনা করলেন প্রধানমন্ত্রী
নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের পক্ষে বিশ্বের বরেণ্য ব্যক্তিদের একটি খোলা-চিঠি নিয়ে কড়া সমালোচনা করেছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
মি. ইউনূসের প্রতি বাংলাদেশ সরকারের আচরণের বিষয়ে গভীর উদ্বেগ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বরাবর গত মঙ্গলবার ওই খোলা-চিঠি দিয়েছিলেন বিশ্বের ৪০ জন ব্যক্তি।
চিঠিটি যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকায় বিজ্ঞাপন আকারে পুরো পাতাজুড়ে প্রকাশিত হয়েছিল।
সোমবার কাতার সফর নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনে ওই চিঠির প্রসঙ্গটি উঠে আসে।
এসময় সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে অধ্যাপক ইউনূসকে ইঙ্গিত করে পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, “যিনি এতো নামীদামী, নোবেল প্রাইজ প্রাপ্ত, তার জন্য ৪০ জনের নাম খয়রাত করে এনে এডভারটাইজমেন্ট (বিজ্ঞাপন) দিতে হবে কেন? তাও আবার বিদেশি পত্রিকায়? এটাই আমার প্রশ্ন।?”
চিঠিতে ৪০ বিশ্বনেতার মধ্যে রয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন, দেশটির সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট আল গোর, জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব বান কি মুন, আয়ারল্যান্ডের সাবেক প্রেসিডেন্ট মেরি রবিনসন, প্রয়াত মার্কিন সিনেটর এডওয়ার্ড এম কেনেডির ছেলে টেড কেনেডি জুনিয়রের মতো আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, “আমাদের দেশে কিছু আইন আছে, সেই আইন অনুযায়ী সব চলবে এবং সেটা চলে।.. কেউ যদি আইন ভঙ্গ করে, শ্রমিকদের অধিকার কেড়ে নেয়, শ্রম আদালত আছে সেটা দেখে। এক্ষেত্রে সরকার প্রধান হিসেবে আমার তো কিছু করার নেই। সেখানে আমাকেই বা কেন বলা হল?”।
এছাড়া ড. ইউনূস গ্রামীণ ব্যাংকের এমডি পদে থাকাকালীন তার পদ বহাল রাখার জন্য বিভিন্ন দেশের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা চাপ প্রয়োগের চেষ্টা করেছিলেন বলে প্রধানমন্ত্রী জানান।
এ নিয়ে, ড. ইউনূসের মন্তব্য জানতে ইউনূস সেন্টারের সাথে যোগাযোগ করা হলেও কোন সাড়া পাওয়া যায়নি।
গত ৪ঠা মার্চ থেকে ৮ই মার্চ পর্যন্ত কাতার সফর শেষে দেশে ফিরে সোমবার গণভবনে সংবাদ সম্মেলন করেন প্রধানমন্ত্রী।
কাতার সফরকালে প্রধানমন্ত্রী এলডিসি-৫ এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানসহ বেশ কয়েকটি ইভেন্টে যোগ দেন।
কাতার সফরের নানা দিকসহ নির্বাচন, দ্রব্যমূল্য ইত্যাদি নানা বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দেন তিনি।
জাতিসংঘ এলডিসি সম্মেলনে স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে এটাই বাংলাদেশের শেষ অংশগ্রহণ হতে পারে বলে তিনি আভাস দিয়েছেন।
“নির্বাচনকে সামনে রেখে ষড়যন্ত্র হচ্ছে”
নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশের একটি গোষ্ঠী অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করছে কিন্তু তারা সেটা পারবে না বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
সেইসাথে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রীর দফতর থেকে নির্বাচন কমিশনকে নিরপেক্ষ ও স্বাধীন করে দেয়ার কথাও জানান তিনি।
এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আওয়ামী লীগ সরকার প্রথম নির্বাচন কমিশন করার জন্য আইন করে দিয়েছে.. প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে তাদের নির্ভরশীলতা সরানো হয়েছে। আওয়ামী লীগই প্রথম নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীন করে দিয়েছে।”
ইভিএম নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, "ইভিএম নিয়ে ওদের আপত্তি, তাই বিষয়টি নির্বাচন কমিশনের ওপর ছেড়ে দিয়েছি। ওরা যতটুকু ভালো বুঝে তাই করবে। কারণ, কমিশনকে অবাধভাবে গড়ে তুলেছি।"
এছাড়া অনেক ঘাত প্রতিঘাত মোকাবিলা করে তার সরকার রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ধরে রেখেছেন সেইসাথে গণতান্ত্রিক ধারা এবং উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
স্বল্পোন্নত দেশগুলোকে প্রতিশ্রুত সহায়তার আহ্বান
কোভিড মহামারী ও চলমান ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে বিশ্বব্যাপী যে খাদ্য, জ্বালানি ও আর্থিক সংকট দেখা দিয়েছে তার প্রেক্ষিতে বাংলাদেশসহ উত্তরণের পথে থাকা স্বল্পোন্নত দেশগুলোকে প্রতিশ্রুত সহায়তা দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, “আমি আমার বক্তব্যে স্পষ্টভাবে বলেছি যে স্বল্পোন্নত দেশগুলো করুণা বা দাক্ষিণ্য চায় না, বরং আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তাদের ন্যায্য পাওনা চায়।”
এবারের কাতার সফরে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ, আর্থিক সহায়তা, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ, প্রযুক্তি হস্তান্তর, নিরাপদ অভিবাসন, জলবায়ু অর্থায়ন প্রাপ্তি ইত্যাদি বিষয়ে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর বিশেষ প্রয়োজনের কথাগুলো তুলে ধরেন।
এছাড়া বাংলাদেশসহ উত্তরণের পথে থাকা দেশগুলোর উন্নয়ন গতিশীল রাখতে বর্ধিত সময়ের জন্য স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য প্রযোজ্য সুবিধাগুলো অব্যাহত রাখা এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের আহ্বান জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, জাতিসংঘ এলডিসি সম্মেলনে স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে এটাই বাংলাদেশের শেষ অংশগ্রহণ। কারণ, ২০২৬ সালে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বেরিয়ে যাবে।
এদিকে ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে রোহিঙ্গাদের সহায়তা অব্যাহত রাখার বিষয়টি অনেকটাই গুরুত্ব হারিয়েছে বলে তিনি জানান।
“মিয়ানমারের সাথে আমরা আলোচনা করে যাচ্ছি, তাদের বোঝানোর চেষ্টা করছি। তাদের দেশের নাগরিক তাদের দেশে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া উচিত। কিন্তু তাদের মধ্যে সেই লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।” প্রধানমন্ত্রী বলেন।
এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মহলের সহায়তা দাবি করেছেন তিনি।
বাংলাদেশে বিনিয়োগের আহ্বান
এবারের সফরে বাংলাদেশ ও কাতারের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়ন বিশেষ করে অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব ঢেলে সাজানোর বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।
কাতারে শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর নেতৃবৃন্দের সমন্বয়ে আয়োজিত বিজনেস সামিটে তিনি কাতারের ব্যবসায়ীদের বাংলাদেশের কৃষি ও শিল্প খাতে বিনিয়োগের পাশাপাশি, তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানে বাংলাদেশের পাশে থাকার আহ্বান জানান।
প্রধানমন্ত্রী দুই দেশের সরকারের মধ্যে একটি যৌথ ব্যবসা ও বিনিয়োগ কমিটি এবং দুই দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠনের সমন্বয়ে একটি যৌথ বিজনেস ফোরাম গঠনের প্রস্তাব রেখেছেন।
এছাড়া, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সামুদ্রিক গ্যাস অনুসন্ধান, জ্বালানি সঞ্চালন ব্যবস্থা, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, পর্যটন, স্টার্ট-আপসহ বিভিন্ন খাতে কাতারের ব্যবসায়ীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
সফরকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ বিন খলিফা আল থানির সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে কাতার থেকে এলএনজি আমদানি, প্রবাসী শ্রমিকদের ইস্যুসহ দুই দেশের দ্বি-পক্ষীয় সম্পর্ক ও ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণ বিষয়ে আলাপ করেন।
রমজানে দ্রব্যমূল্য
আসন্ন রমজানে দ্রব্যমূল্য নিয়ে মানুষের যেন কষ্ট না হয় সেজন্য দাম নিয়ন্ত্রণে সরকার যথাযথ ব্যবস্থা নিয়েছে বলে আশ্বাস দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
দ্রব্যমূল্য যাতে না বাড়ে সেজন্য প্রয়োজনীয় সব পণ্য আমদানি করা হচ্ছে বলে তিনি জানান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “বিশ্বে মুদ্রাস্ফীতি এখন এতো বেশি যে ২০০ ডলারের গম ৬০০ ডলার দিয়ে কিনতে হচ্ছে। ভোজ্যতেল, চিনির দামেরও একই অবস্থা। এরপরও সাধ্যমতো আমরা কিনে নিয়ে আসছি। পরিবহন খরচও বেড়েছে।”
এমন অবস্থায় পরনির্ভরশীলতা কাটিয়ে উঠতে অনাবাদী জমিতে আবাদ করার পাশাপাশি নিজের চাহিদা পূরণে ব্যক্তিগত পর্যায়ে উৎপাদনের আহ্বান জানান তিনি।
সেইসাথে মজুদদারদের ব্যাপারে সজাগ থাকার পরামর্শ দেন তিনি।